প্রবেশিকা

**************************
আমি অত্র। আমি তত্র।
অন্যত্র অথবা –
আমার আরম্ভে আমি
নিশীথিনী, প্রভাতসম্ভবা।
**************************

Sunday, May 20, 2018

শ্মশান,বাঁক,নদী,আকাশ ( টাইটেল কার্ড )


শ্মশান,বাঁক,নদী,আকাশ

টাইটেল কার্ড

শ্মশান
নদীর গা ঘেঁষে
না'কি নদী নিজেই এগিয়ে এসেছিল শ্মশানকে ছুঁয়ে থাকতে - বাঁক নিয়ে - এখন যেখানে শহরের 'ছোটো বাজার', যেখানে শেফালি-গীতালীদের 'পাড়া' - সেইখান থেকে? হয়তো। অনেকেই বলে এই নদী আসলে বয়ে যাচ্ছিল কানমধু গ্রামের পাশ দিয়ে। মন্দাক্রান্তা লয়ে। তারপরে কোনো এক ভূমিকম্পে তার পথ বেঁকে এসেছে এইদিকে। এই শ্মশানের ধার ঘেঁষে। শ্মশান নাকি ছিল এখানেই । ছিল অনেক অনেক যুগ ধরে। শেফালী-গীতালি'দের পাড়ার 'মাসি', তখনকার, মানদা, তারও যে ছিল 'মাসী' -সেই 'মাসী'র 'মাসী'ও শুনেছে এসব। নদীর এই পথ বদলানোর গল্প। কিন্তু নিজচক্ষে দেখেনি কেউ। যা সক্কলে দেখেছে, যা দেখেছি আমিও, জন্ম থেকে, যা দেখছি আজো, প্রায় অগুনতি বছরের পরে ফিরে এসে, তা এ'ই, যে, এই শ্মশান, নদীর গা ঘেঁষে।
       শ্মশানের এই ছবিটা আজকাল চোখেভাসে। চোখ বন্ধ করলেই ভাসে। ভেসেওঠে। সত্য হয়তো, হয়, এ'ও, যে, এই ছবিটির টানেই ফিরে এসেছি। ফিরে এসেছি এই জেনে, যে, আমার মৃত্যু নিশ্চিত। ফিরে এসেছি এই আশায়, যে, এই শ্মশানেই দাহ হবে আমারো শব। আমারো ভষ্ম ভেসেযাবে, মিশেযাবে এই নদীর জলে।


~~~~~~~
সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি উঠি। বারান্দায় প্রান্তে আমার ছোটো কোঠাটি থেকে বার হয়ে হেঁটে বেড়াই। বারান্দায় । দেখি আমার ছেলের কোঠায় বাতি জ্বলছে। দেখি কখনো সে বারহয়ে আসে দরজা খুলে। বাথরুমে যায়। ওর কোঠা থেকে ছিটকে আসা আবছা আলোয় আমাদের চোখাচোখি হয়। কোনো কথা হয়না। ছন্দা দরজা করেনা। রাতে। আমি আসার পর থেকে। সে মেয়েকে কাছে নিয়ে শোয়। হয়তো পাছে আমি তার কাছে আসবার চেষ্টা করি - এই ভয়ে। এই ঘৃনায়। প্রায় প্রতি রাত্রেই আমি ওদের কোঠাতে যাই। দাঁড়িয়ে থাকি। দেখি। তারপর বার হয়ে আসি পায়্র পায়ে।
একদিন ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল ছন্দার। আধো অন্ধকারে আমাকে দেখে প্রায় চীৎকারই করে উঠেছিল। তারপর "ওহ্‌, তুমি" - বলে নিজের বুকে থুথু ছিটিয়ে - " কি ভয় পেয়েছিলাম! মাগগ্‌"। ওই কটি মুহুর্তে যেন ছন্দাকে, অন্ধকারে দেখা না গেলেও, মনে হয়েছিল এ সেই চেনা ছন্দা। অনেক অনেক যুগ আগের, অনেক অনেক জন্ম আগের চেনা ছন্দা।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার চলৎশক্তি ক্ষয়ে আসছে। ক্রমে। একেবারে অচল নই তবু। তবু দিনের বেলাগুলি আমি উঠিনা একমাত্র প্রাকৃতিক ডাক ছাড়া। আমি শুয়ে শুয়ে শক্তি সঞ্চয় করি। রাতে খানিক্ষন বারান্দায় বারান্দায় হেঁটে বেড়ানোর জন্য আর একদিন, দাহ হতে যাওয়ার আগে, নিজপায়ে হেঁটে ওই শ্মশানে ঘুরে আসার জন্য, নদীপারের পাথরে বসে নদীর জলে মুহুর্তের জন্য হলেও নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসবার জন্য।
দিনের বেলাগুলি আমি উঠিনা একমাত্র প্রাকৃতিক ডাক ছাড়া। দিনের বেলায় আমি চোখও প্রায় বন্ধ করেই রাখি। শরীর যেহেতু দুর্বল ফলে ঘুম আসে। ঘুমকে আমি ভয়পাই কারণ ঘুমের দরজা দিয়ে ঢুকেপড়ে ওই নদী, ওই শ্মশান, অনেক জন্ম আগের আমি, অনেক যুগ আগের ছন্দা। অনেক অনেক যুগের পুরনো অনেক অনেক ছবি, ছায়া, কাহিনী, কথা। তাই ঘুম পেলেই আমি চোখ খুলি। খুলে রাখবার চেষ্টা করি। দিনের বেলা। রাত্রেও - যতক্ষণ না বাতিগুলি নিভেযায়, ছন্দা আর আমার মেয়ে রিমা ঘুমিয়ে পড়ে, রজৎ, আমার ছেলে গিয়ে দরজা বন্ধ না করে নিজের কোঠায়।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
দিনের বেলাগুলি আমি উঠিনা একমাত্র প্রাকৃতিক ডাক ছাড়া। দিনের বেলায় আমি চোখও প্রায় বন্ধ করেই রাখি। আমার রোগজনিত যন্ত্রনা আমাকে ক্ষয় করে। দিনে, রাত্রে, মুহুর্মুহু। আমি টেরপাই, আমি বুঝি, কখনো কখনো, ছন্দার বিরক্তি, আমাকে ঘিরে। আমাকে একটি আপাদমস্তক আপদ ভাববার হেতুগুলিও যেন আঁচ করতে পারি। আমি অচিরেই মরেযাবো জেনেও আমার চিকিৎসার ব্যয়, দায় নিয়েছে ছন্দা। নিয়েছে আমার সদ্য যুবক হওয়া, সদ্য চাকরী পাওয়া ছেলে। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করতে চাই। কিন্তু দিবালোকে তা হয়েওঠে অসম্ভব। এমন কি রাত্রেও। তারা ঘুমিয়ে না পড়া অবধি, চারিদিক অন্ধকার না হওয়া অবধি আমি কেবলই যুক্তি আর প্রতিযুক্তিতে মেতে থাকা ছাড়া আর কিছুই পারিনা মনে মনে।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আমি চলে গিয়েছিলাম। হারিয়ে  গিয়েছিলাম - এদের সব্বাইকে ছেড়ে, এই শহর ছেড়ে, শ্মশান ছেড়ে, নদী ছেড়ে। আমি দীর্ঘকাল - যতোটা দীর্ঘকালে সাত বচ্ছর বয়সের বালক যুবক হয়, দেড় বচ্ছরের শিশুকন্যা পা দেয় কৈশোরে, 'হোম্‌ মেকার' সহধর্মিণী হয়েযায় মিউনিসেপালিটি আপিসের বড় কেরানী। আমি চলে গিয়েছিলাম। হারিয়ে  গিয়েছিলাম। শেফালি-গীতালীদের 'পাড়া'র মানদা 'মাসী'র মেয়ে ঝুমকিকে নিয়ে আমি পগার পার হয়েছিলাম। এখন ফিরেছি একা। অনেক যুগ, অনেক জন্ম পরে ফিরেছি রোগ নিয়ে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এই মুহুর্তে ছন্দার আমাকে দিয়ে আর কোনো প্রয়োজন নেই। তার যৌবন ছিঁড়েফেঁড়ে গেছে এতোদিনের ঝড়েঝাপ্টায়। কয়েক বছরের মধ্যেই রিটায়ার করবে ছন্দা। যে একফালি জমিতে একচালা তুলে আমি চলেগিয়েছিলাম তা'কে ক্রম্র দালান করেছে ছন্দা। যে ঔরসজাতদের  নিতান্ত চারাগাছ রেখে আমি পগার পেরিয়েছিলাম তারা এখন রীতিমতো গাছ। বৃক্ষসম্ভাবনা। মা-ছেলে-মেয়ে মিলে এক আশ্চর্য উত্তাপবেষ্টিত মালঞ্চ যেখানে আমি 'নেই' । তাই এই মুহুর্তে আমার এই ফিরে আসা, এই কালব্যাধি নিয়ে, এদের কারোর কাছেই বাঞ্ছিত নয়। - আমার যুক্তি আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করে। তবু প্রতিযুক্তি বলেঃ " যা ঘটলো, যা ঘটেছে, তার সব দায়ই কি তোমার? তোমার কি মনেহয়না, যে, মাত্র কয়েকটি ঘটনা যদি অন্যরকম ঘটতো তাহলেই এমনটা হতোনা?" - হ্যাঁ, প্রতিযুক্তির এই কানমন্ত্রও আমাকে ভাবিত করে। আমি পুরোনো কাহনগুলির অতলে হেঁটে যাই।







ফ্ল্যাশ্‌ব্যাক








ঘুম ঘর