প্রবেশিকা

**************************
আমি অত্র। আমি তত্র।
অন্যত্র অথবা –
আমার আরম্ভে আমি
নিশীথিনী, প্রভাতসম্ভবা।
**************************


[ পাঠক /পাঠিকার নিজস্ব বানানবিধি প্রযোজ্য ]

Monday, March 24, 2025

তিনজন ছবি আর একজন সোনালী পাখির না-গল্প

 তিনজন ছবি আর একজন সোনালী পাখির না-গল্প

১।

“আহ্‌। আ-মরি বাংলা ভাষা, করে এইরূপ একটি নাকছাবিতে তোমার মুখ উজলিবে?”





পঠনে, আমি নিশ্চিত, কমলাকান্ত বলতেন। বলতেনই, কেননা কমলাকান্ত মুখোশের আবডালের মানুষটিই প্রথম ‘অপরাধ’ আর ‘অপরাধী’ শব্দ দুইটির জট ছাড়িয়ে আলগা করেছিলেন, ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন শব্দ দুইটির। নগেন্দ্র, সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী, হীরা – কেউ কি অপরাধী? নগেন্দ্র, সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী, হীরা  – কে নয় অপরাধী? Fyodor Karamazov, Dmitri Karamazov ,Ivan Karamazov ,Smerdyakov  এমন কি Alyosha’ও নয় কি অপরাধী? হয় কি অপরাধী? নয় কি অপরাধী Raskolnikov?  অথবা কৃষ্ণকান্ত ,গোবিন্দলাল , ভ্রমর,রোহিণী ,হরলাল  – হে হয়, কে নয় – অপরাধী? অপরাধের দায় একটি বা কয়েকটি ব্যক্তি বিশেষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাকে বা তাদেরকেই “অপরাধী” বলে দাগিয়ে দিলে – রহস্য কাহিনী, অপরাধ কাহিনী, যে কোনো কাহিনী – লিখে ফেলার কাজটি হয় অতি সহজ। কিন্তু দস্তয়ভস্কি থেকে আরেকটু উজিয়ে এসে আমরা দেখেছি কিভাবে আগেই “অপরাধী” ছাপ্পা দিয়ে দেওয়া হয় এবং অতঃপর সন্ধান করতে হয় তার “অপরাধ”। – কাফকা’র “ট্রায়াল” কে ওই অপরাধী-ঠাউরানো কাহিনী-প্রথা’র বিপ্রতীপ বলেও যায় হাজির করা। এই একই স্রোতের ফসল Uketsuর ​"Strange Pictures"। কে অপরাধী? কে নয় অপরাধী? Yuki and Naomi – অপরাধী? উভয়েই? না’কি … এই প্রশ্নে ফিরে আসবো। এই মুহুর্তে, আরেরো একটু এগিয়ে গিয়ে, অনেকটা সাহস করে, বলে রাখি, যে, এই উপন্যাসের অন্তিম উপলব্ধিটি, আমি টের পাই, এই বাক্যেঃ

‘Catching the murderer doesn’t mean it’s all over. Nothing will be over until Yuta, who’s lost everyone close to him, can live a happy life.’ – পাঠক, এই বাক্যটিই, নয় কি, অলিখিত হলেও, অন্তিম বার্তা দস্তয়ভস্কির? জর্জ সিঁমোনোর? পাঠক উদ্ধৃত বাক্য যদি আমার মনে আনে এই বাক্যটি, তা’কি নিতান্ত অমূলকঃ “আমরা বিষবৃক্ষ সমাপ্ত করিলাম। ভরসা করি, ইহাতে গৃহে গৃহে অমৃত ফলিবে।” —?

এই গ্রন্থ, অন্তিমে একটি গসপেল। ঠিক যেমন দস্তয়ভস্কির “ব্রাদার্স কার্মাজভ”। তবে ফারাকটিও স্পষ্ট। এই লেখক, দস্তয়ভস্কি’র মতন জাতীয়তাবাদ আর রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ হেন কোনো কুয়াশায় আচ্ছন্ন নন। ফলে ঠিক কি হেতু অপরাধ আর অপরাধী যায়, যাচ্ছে, যাবে একাকার হয়ে তার ইঙ্গিতটি ক্ষুদ্র হলেও, স্পষ্ট দিয়ে রাখতে তিনি সক্ষমঃ 

“He killed himself. He had suffered from depression, something that no one spoke about in Japan, especially in those days. With his promotion to management, his workplace had become an increasing source of stress. For the six months before he took his life, he had been visiting a mental clinic.” – এই একটি আত্মনিধন যদি না ঘটতো তাহলে পরবর্তীতে অপরাধ-পরিস্থিতি গুলি জন্ম নিতো কি আদৌ? আর এই আত্মনিধনের হেতু ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে জাপানের তথা পুঁজিবাদের, মিথ্যার দ্বারা ফাঁপানো, অর্থনৈতিক “বুদ্বুদ” টির ফেটে টুকরো হয়ে যাওয়া। হায়, পুঁজি-পর্বতের ওই ধারে বসা দানবেরা জানে, জানতো – এমনটা হবে। তারা জানে, জানতো – এমন অসংখ্য খুনের দায়, আদতে তাদের। সঙ্গে এ’ও জানে যে, এসকল সত্ত্বেও তারা স্পর্শের বাইরে।

সে সঙ্গে আরেকটি কথাও মনে আসতে বাধ্য, এই আত্মঘাতী ব্যক্তি’র মানসিক চিকিৎসা যদি হতো সঠিক, সহজ – সেক্ষেত্রে ঘটতো কি মৃত্যুটি? জাপান, প্রযুক্তিতে ‘উন্নত’, ঠিক। কিন্তু জনমানস? জনমানসের উন্নতি, উদারতা মাপা যায়না প্রযুক্তি’র ফিতায়, ঠিক যেমন আম জনতার আদত হাল মাপা যায় না জিডিপি’র হারে। অর্থনীতি, যা উৎপাদন ও বন্টনের খাতে নির্ণীত, তার প্রভাব, পারিবারিক জীবন কে কিভাবে প্রভাবিত করে, করেছে – যতোক্ষন এই উৎপাদন ও বন্টন হবে পুঁজিবাদী পন্থায়, তারও একটি “বিষবৃক্ষ” এই উপন্যাস। এখানে এসে আমার মনে আসে ১৮৮৪ সালে লিখিত Frederick Engels এর “The Origin of the Family, Private Property and the State” এর কথা।

পাঠক, যে মেয়েটি টের পেয়েছিল, যে, সে সম্ভবত চলেছে খুন হতে এবং সে এ’ও টের পেয়েছিল, যে, কে সেই সম্বভাব্য আততায়ী এবং কিভাবে সংঘটিত হতে পারে এই হত্যা? তথাপি, সে কেন – না তার স্বামীকে না পুলিশ-গোয়েন্দাকে জানায় না এই বিপদের কথা? লেখক জানাচ্ছেনঃ “She was estranged from her parents, unemployed and no longer young. She had nowhere to go. And so, she had pretended she didn’t know that X wanted her dead.” হায়,১৮৮৪ সালে যা দেখতে পাচ্ছিলেন এঙ্গেলস, তারই কি বিষফুল নয় এই ঘটন?  — “আদিম” শব্দের যে স্তরে মানুষ  মাতৃতান্ত্রিক সম্প্রদায় হিসাবে বাস করতো তখন সন্তানরা ছিল মা’র অধীন। কেননা পিতৃত্ব ছিল অনিশ্চিত। দেখিয়েছেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলস বলছেন, যে,  সমাজ যতোক্ষন ছিল মাতৃতান্ত্রিক, ততোক্ষণ মাতৃত্বের অধিকার অনুসারে সমাজে নারীদের স্থান ছিল উচ্চ। পিতৃতন্ত্রের উদ্ভবের কেন্দ্রে রয়েছে  কৃষি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্থান। “বহুবিবাহ” বা না-বিবাহ থেকে এক পুরুষ-এক নারী’র নিউক্লিয়ার পরিবার আদতে যা করলো, তা হলো পুরুষ উত্তরাধিকারীদের নিমিত্ত এনে দিলো নিরাপত্তা আর যার ফলে নারী, ক্রমেই পরাধীন, তারা তাদের স্বামীর উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। — হায়, অদ্য যখন “ভিলেজ” মানে “গ্লোব”, তখনো, যেমন দেখিয়েছেন অভিজিৎ দসেনগুপ্ত তাঁর “কুহক যাত্রা” উপন্যাসে, ভারতবর্ষের সুন্দরবন অঞ্চলে, অদ্যাপি পিতৃত্ব অনিশ্চিত কিন্তু সমাজের মাতৃতান্ত্রিক কাঠামো, “সভ্যতা”র দ্বারা, লোপাট। এঙ্গেলস এ’ও দেখিয়েছেন যে “The first class opposition that appears in history coincides with the development of the antagonism between man and woman in monogamous marriage."  এবং পরে, সামন্ত সমাজ থেকে পুঁজিবাদের দিকে যাত্রায়, পুঁজিবাদী পারিবার-কাঠামো  সম্পত্তি কুক্ষিগত-করন এবং শ্রেণী বৈষম্যকেঙ্ক্রমেই শক্তিশালী করে গিয়েছে। যাচ্ছে। কারণ  বুর্জোয়া বিবাহ বাস্তবে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সম্পত্তি’ই  সম্পর্ক। তা’ই  ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নির্ধারণ করে। নতুবা সেই পাখি-ভালাবাসে-বালিকাটি কে কেন টের পেতে হয়ঃ “ All of her happy family memories had been because of her father. Her mother had been able to stand there, smiling gently, because Father was next to her. She had merely played at being the caring mother for Father’s sake, to ensure his love.” — পাঠক, “ to ensure his love” ! আশ্চর্য! আবার আশ্চর্য নয়ও, যদি এঙ্গেলসের যুক্তি গুলি অনুধাবন করি, যদি পুঁজিবাদের মূল কথাটি পারি আত্মস্থ করতে। – এই যে “মা” মহিলা, যাকে নিজ স্বামীর “প্রেম” পেতে “আদর্শ মাতা” রোল-প্লে করতে হয়, সে’ও কি নয় সমান অসহায় তাকে যে খুন করে ফেলে, তারই মতো? – অবশ্যই। নতুবা ‘Catching the murderer doesn’t mean it’s all over.’ – এই বাক্যটি বুদ্ধ্বত্ব হারিয়ে হয়ে উঠবে “words… words .. words” ………।

পাঠক,  “ X ( the wife) took the opposite approach to raising their son. If  Y (son) didn’t want to go out, he could stay in the house. If he didn’t want to talk to people, there was no need to make him. Trying to force him to act in ways he didn’t want would only traumatize the boy and make him withdraw even more.” – এই ভাবনা মাতা-জনের। 

পক্ষান্তরে বালকের পিতাঃ “If we don’t teach him the proper way to behave now, it’ll go poorly for him in the future.’ ‘But . . . You hit him for that?’ ‘Spare the rod, spoil the child. The way I see it, when a child passes the age of ten, their ego starts to rear up. If all you do is talk to them, they won’t listen at all. From now on, he’ll get the physical discipline he needs. It’s a parent’s duty.’ She couldn’t believe her ears. You should start hitting children after the age of ten? She’d never heard such a thing. Her husband had always been stubborn, unyielding in his view of the world.” – এবং বালকটিকে দেখুনঃ 

“The boy was afraid of insects but had to sleep outdoors. And if Haruto protested, his father would slap him, saying, ‘You’ve no manners!’” 

আবার মাতাজন জানে, যে “ her husband wasn’t doing it out of malice. It was, in his own way, an expression of love.”

পাঠক, যদিও Roald Dahl এর Georgy Porgy’র মাতাটি, বর্তমান পিতাটির মতন নিতান্ত লাঠি-দাবাই’ ব্যবহার করে না বা প্রহার ও করেনা, তথাপি, ওই “expression of love” এর ভয়ালতা-হেতু, মাতাটি, Georgy Porgy তে, বালকের ভীতির হেতু এবং পরবর্তীতে তার মস্তিশক-বিকৃতিরও, তথাপি, এখানে এসে না ভেবে পারিনা, যে, এই মাতা-পুত্র-পিতা’র আবহে যদি থাকতো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ, যাতে ভর করে মাতাটি বাধা দিতে পারতো ওই প্রহার-প্রধান “expression of love” কে, তাহলে, খুনাখুনি’র অভিশাপ, আগের প্রজন্মের থেকে এই প্রজন্মেও পারতো কি শিকড় মেলে দিতে?

প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার আগে সমাজে নারীর স্থান, অবস্থানের বিষয়ে এঙ্গেলসের দুটি কথা শুধু লিখে রাখিঃ

 "With the transformation of the means of production into collective property, the monogamous family ceases to be the economic unit of society…The equality of women will only be achieved when **the economic basis of monogamy is abolished.”


২।

যুক্তি, অযুক্তি, না-যুক্তি, কুযুক্তি, প্রযুক্তি।

কোথায় দাঁড়াবো? 

তত্ত্ব, পান্ডিত্য,জ্ঞান, বিদ্যা, অভ্যাস, চর্চা, অনুশীলন।

কাকে নেবো?

নিখাদ যুক্তিকে দস্তয়ভস্কি আক্রমণ করলেন তাঁর “ব্রাদার্স কার্মাজভে”। দেখা গেলো, যে লোকটি যুক্তি দিয়ে ফাইদোরের হত্যা-ঘটনার পূর্ব-ঘটনাবলীর সঠিক অনুক্রম হাজির করছে, সে কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে। ভুল মানুষকে ঠাউরাচ্ছে ‘খুনী’। পক্ষান্তরে, বিপরীত দলের উকিল মহাশয় খুনীটিকে সঠিক চিহ্নিত করছেন, কিন্তু তাঁর ঘটনা-বিশ্লেষণ সম্পূর্ন ভুল। দস্তয়ভস্কি’কে যদি “সাহিত্যিক, ফলে যুক্তি বোঝেনা” বলে এড়িয়ে যাই, তাহলে রিচার্ড ফাইন্‌ম্যান কেকি বলবো? তিনি তো বৈজ্ঞানিক। অথচ, পাঠক, দেখুনঃ

"Philosophy of science is about as useful to scientists as ornithology is to birds.", "Mathematics is not real, but it feels real. Where is this place?" , "You can know the name of a bird in all the languages of the world, but when you’re finished, you’ll know absolutely nothing about the bird.", "We never are definitely right, we can only be sure we are wrong.", "There are 10^11 stars in the galaxy. That used to be a huge number. But it’s only a hundred billion. It’s less than the national deficit! We used to call them astronomical numbers. Now we should call them economical numbers." –  এই প্রতিটি কথা’ই ফাইনম্যানের আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সন্দেহ, ব্যঙ্গ তা’কেই যা অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন।  তাঁর মতে “বিশুদ্ধ যৌক্তিক বিশ্লেষণ”  যা প্রকৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া, তা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি নয়। ফাইনম্যান বিষয়ে যাঁরা জানেন তাঁদের কথা বাদও যদি দেওয়া যায়, যদি এই উদ্ধৃত বাক্যগুলিই যায় অনুধাবন করা, তাহলে এ হয় স্পষ্ট, যে, ফাইনম্যান যৌক্তিক কাঠামোর বিমূর্ত প্রকৃতিটি স্বীকার করেন কিন্তু বাস্তবতার সাথে তার,তাদের  “চূড়ান্ত সংযোগ” নিয়ে তাঁর প্রশ্ন। আর এই পুঁজি ভিত্তিক কাঠামোতে “বিশুদ্ধ যৌক্তিক নিশ্চিতি” একটি ভ্রম, পুঁজি ভিত্তিক ব্যবস্থায়  বিজ্ঞান মিথ্যাচারের মাধ্যমে অগ্রসর হয়। অন্তিমে কেবল যুক্তি যে যথেষ্ট নয়, পরীক্ষামূলক যাচাই ব্যতিরেকে যুক্তি আদতে কুযুক্তি।

Strange Pictures কাহিনীর Isamu Kumai কিভাবে এই যুক্তি-না-যুক্তি’র গল্পটি বলে তা বলার আগে শুনে নিই আরো একজন মানুষের কথা, যিনি বিজ্ঞানী নন, সমাজ-বিজ্ঞানী, কর্মীঃ  "Man is not ruled by mystical forces; he himself creates his own history.", "The active man-in-the-world is a philosopher by the fact that he modifies reality and acts upon it." "To know oneself means to be oneself, to distinguish oneself, to be able to be critical, and to know that one’s personality is developed through struggle." , "The mode of being of the new intellectual can no longer consist in eloquence, but in active participation in practical life, as constructor, organizer, 'permanent persuader' and not just a simple orator.", "The philosophy of praxis does not aim at the peaceful resolution of existing contradictions in order to arrive at an equilibrium, but rather at the overthrowing of the contradictions themselves by means of historical action.", "The philosophy of praxis is the expression of subaltern classes, in opposition to the philosophy of intellectual elites that is detached from reality.", "Philosophy is always political: it expresses the struggles of different social groups and classes."

অর্থাৎ শুদ্ধ যুক্তির মতন বিশুদ্ধ দর্শনও কিছু হয়না। হ’তে পারেনা। প্রেক্সিস – অনুশীলন ভিন্ন কোনো দর্শনই পূর্ণতা পায়না, ঠিক যেমন অনুষঙ্গহীন যুক্তি। – কথাগুলি যে আন্তোনিও গ্রামসি’র তা, “প্রেক্সিস” শব্দটি দেখে, পাঠক, অনেকেই নিয়েছেন অনুমান করে, গ্রামসি সামগ্রিক পড়া না থাকলেও এবং আপাতত এটুকুই যথেষ্ট। “It had taken Kumai ten years to arrive at the same truth Iwata had found in only two weeks.” – কেন Iwata রহস্য ভেদ করতে পেরেছিল মাত্র দুই সপ্তাহে? কেননা সে নিয়েছিল “প্রেক্সিস” এর পথ। সে পাড়ি দিয়েছিল ওই পথে, যে পথ ধরে, ঠিক যেভাবে গিয়ে খুন হয়েছে, ধরা যাক, মিস্টার এবিসিডি। ওই পথটি সে নির্ধারন করলো তত্ত্ব এবং অনুষঙ্গের নিরিখে কিন্তু তাতে রহস্যভেদ হলোনা। হলোনা, কারণ হতে পারেনা, কারণ "The philosophy of praxis does not aim at the peaceful resolution of existing contradictions in order to arrive at an equilibrium, but rather at the overthrowing of the contradictions themselves by means of historical action." – এবং তা “গ্রামসি বলেছেন” বলে নয়, গ্রামসীও এখানে অবয়ব দিয়েছেন, অক্ষরে, তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের। যেখানে  "Man is not ruled by mystical forces; he himself creates his own history." – সেখানেই Iwata’র যাত্রা। ওই যাত্রাটি করেন নি (শারীরিক অসুস্থতা হেতু) বলেই অভিজ্ঞ সাংবাদিক  Isamu Kumai প্রথম অনুমানে, Iwata’র আঁকা ছবিটি দেখা সত্ত্বেও, ভুল মানুষকে খুনী ঠাউরে নিয়েছিলেন। সেই ভুল Kumai তখনই শুধরাতে সক্ষম হলেন যখন তিনিও “peaceful resolution of existing contradictions in order to arrive at an equilibrium” এর পথ ছেড়ে নিলেন action এর পথ, Praxis এ নেমে এলেন, ঢিল ছুঁড়লেন মৌচাকে। এই কারণেই সিমোনো’র ইন্সপেক্টর ম্যাগ্রে কে দেখি ঘটনাস্থলে বা অকুস্থলে গিয়ে ঘন্টার পরে ঘন্টা কাটাতে, প্রয়োজনে বাস করতেও কেননা এইগুলি অনুষঙ্গ, এইগুলি’ই “historical action” – যার উপর স্থাপিত হবে, ক্রমে, ম্যাগ্রের যুক্তির ভিত্তি।

Strange Pictures এর লেখক Uketsu বিষয়ে তাঁর মুখোশ-মুখ ভিন্ন কিছুই জানা যায়নি অদ্যাপি । অতএব তিনি মার্ক্স-পন্থী কি’না, তিনি গ্রামসী পড়েছেন কি’না – ইত্যাদি প্রশ্ন অবান্তর। সত্য এ’ই, যে, নিজের সময় ও সমাজকে যে’ই দেখতে পারবে সমসাময়িক উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা ও তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব গুলির সাপেক্ষে, তার বলায়, লেখায়, রেখায় মার্ক্স, মার্ক্স-ছায়া দেখতে পাওয়া যাবেই। সমসাময়িক উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা ও তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব গুলি কে অনুধাবন না করার কারনেই দস্তয়ভস্কি, এমন কি টলস্টয়কেও অন্তিমে আশ্রয় নিতে হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন Idealism এ।


৩।

 Uketsuর ​"Strange Pictures"। কে অপরাধী? কে নয় অপরাধী? Yuki and Naomi – অপরাধী? উভয়েই? না’কি … “So, what made his own mother and ‘pqr’ different? If his mother had made one wrong move, she might have turned out the same. The thought, as chilling as it was, was not one Kumai could deny.” – পাঠক, লক্ষ্য করুন, অপরাধ আর না-অপরাধ একটি সুঁতোর চেয়েও সূক্ষ দাগ। রেখা। সে পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত। অনুষঙ্গ দ্বারা চালিত। তাড়িত। “I want to be a mother forever. I never want to lose the right to that name, Mother.” – এই আর্তি আদিতম মাতাটি থেকে অধুনাতম মাতৃ-হৃদয়ের। নীড়ে পাখি। পাখি-মা। কাচ্চাবাচ্চা সহ। রামকৃষ্ণের প্রিয় ছবি। উষ্ণতা। নিরাপত্তা। … “সন্ধ্যার কাকের মতো আকাঙ্ক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে” – কিসের আকাঙ্ক্ষা? কাকের? নীড়ে ফিরে তার ছা-দের, আন্ডা-বাচ্চাদের মুখে আহার গুঁজে দেওয়ার। আর কিসের? “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে”। পাশাপাশি “want to be a mother forever” – অকৃত্রিম আর্তি। তবু তারই হাতে প্রাণ দিতে হয় অন্যদের। কিন্তু তাকে “খুনী” বলা যায়না। বলতে পারেনা, অন্তিমে সেই মনোস্তত্ত্ববীদও। বরং সে তার আগ-বয়সে, অনভিজ্ঞতার বশে, শিশু-হাতে আঁকা গাছ-ডালের তির্যকতার আংশিক ভুল অর্থ করার নিমিত্ত দায়ী করে নিজেকেই। তার যেমন মনেহয়, অদ্য সেই বালিকা, যে বৃদ্ধা, তাকে আবার বলতে ঐ ছবিটি ফিরে আঁকতে, তেমনি আমারো প্রশ্ন থাকে, অদ্য অভিজ্ঞা মনোস্ত্বাত্বিকের কাছে, অদ্য, আর কোনো বালিকা সেই একই ছবি একই ভাবে আঁকলে ঠিক কি বিশ্লেষণে পৌঁছতেন তিনি? যদি ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তাহলে এ’ই প্রমাণিত হয়, যে, “কোয়ান্টিটি”র বদল ঘটলে “কোয়ালিটি” পালটায়। সময়, বয়স – এখানে কোয়ান্টিটি। পাশাপাশি, তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসা-যাত্রা তার প্রেক্সিস। অর্থাৎ, যা ঘটেছে, যা ঘটলো, ঘটবে – কিছুই “দৈব” নয়। "Man is not ruled by mystical forces; he himself creates his own history."

একটি হত্যাকান্ডে অনুঘটক হওয়ার পরে “She felt that she no longer had the right to call herself a midwife” – এই অনুভবে উপনীত হয় এবং ধাত্রী-পেশা ত্যাগ করে, সে কিভাবে হয় অপরাধী? সে’ই কি নয় ধাত্রীদেবতা? অথচ, বাস্তবে তার হাতে প্রাণ দিয়েছে একাধিক। কুন্দনন্দিনী, হত্যা সে করেনি নিজহাতে কিন্তু ভ্রমরের মৃত্যুর দায়? অথচ সে কী আদতে চেয়েছিল এমন ঘটুক? নগেন্দ্র নিজেও কি? – না। এখানেই “অপরাধ” আর “অপরাধী” ভিন্ন। এখানেই বেজে ওঠে গানঃ

“প্রিয়ারে নিতে পারি নি বুকে,

            প্রেমেরে আমি হেনেছি,

      পাপীরে দিতে শাস্তি শুধু

            পাপেরে ডেকে এনেছি।

জানি গো তুমি ক্ষমিবে তারে

      যে অভাগিনী পাপের ভারে

            চরণে তব বিনতা।

            ক্ষমিবে না, ক্ষমিবে না

      আমার ক্ষমাহীনতা,

            পাপীজনশরণ প্রভু॥”

পাঠক, এ যে আমাকৃত অতিরঞ্জন নয়, তার প্রমাণ এই বাক্য “She  knew the truth. This time, she had committed murder for her own selfish reasons.”



৪।

দস্তয়ভস্কির সঙ্গে উকেৎসু’র আরো একটি গহন সংশ্রব এই, যে, দস্তয়ভস্কির চরিত্রেরা এবং তাঁর কাহিনীর ঘটনা প্রবাহ, আপাত বাস্তব। আদতে সকলই ঘটে যায় লেখকের মর্মে। বাইরের বাস্তবের ছায়াতে। অবশ্যই। কেননা কল্পনাও স্বয়ম্ভু নয়, তথাপি, যে অর্থে আনা কারেনিনা রক্তে-মাংসে, কুন্দনন্দিনী রক্তে-মাংসে, সেই একই অর্থে নাসতাসিয়া ফিলিপোভনা, সোনিয়া – ধারণা। তবে লাবণ্য বা সুচরিতা হেন নিতান্ত বায়বীয় এবং কথাসর্বস্ব নয়। লেভিন, ভ্রনস্কি’র পাশাপাশি রাস্কলনিকভ, প্রিন্স মিশকিন যেমন। উকেৎসু’র চরিত্র আর ঘটনাগুলিও, এবম্বিধ। এরা লেভিন/ভ্রনস্কি থেকে ঢের বেশী আত্মিয় মিশকিন/রোগোজিনের।

পাঠক, অন্তিমে, অপরাধ-অপরাধী অনুষঙ্গ সাপেক্ষে যদি আবার তাকে দেখি, যে, যে মেয়েটি,টের পেয়েছিল, যে, সে সম্ভবত চলেছে খুন হতে এবং সে এ’ও টের পেয়েছিল, যে, কে সেই সম্ভাব্য আততায়ী এবং কিভাবে সংঘটিত হতে পারে এই হত্যা? তথাপি, সে কেন – না তার স্বামীকে না পুলিশ-গোয়েন্দাকে জানায় না এই বিপদের কথা? এর আরো একটি হেতু এই, যে, “ She( the killer) had always thought of Y(murdered one) and H (her husband) as something like siblings with an age gap. The idea of them as romantic partners felt somehow wrong.” – অর্থাৎ সম্পর্কটিকে প্রথমেই ব্যাভিচার বলে চিহ্নিত করে নিয়েছিল সম্ভাব্য আততায়ী। অতঃপরঃ

“There’s something I’ve been hiding.’ 

‘What? What’s come over you all of a sudden?’

 ‘I . . . was in love with Mr abcd .’

 ‘Abcd. . . My late husband?’

এইবার দৈহিক ব্যাভিচারের সঙ্গে যোগ হলো মানসিক ব্যাভিচার।

কিন্তু, এই সমস্তই হয়তো গৌণ, এই সমস্তই হয়তো ঘটতোনা যদি ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে, জাপানের তথা পুঁজিবাদের, মিথ্যার দ্বারা ফাঁপানো, অর্থনৈতিক “বুদ্বুদ” টির ফেটে টুকরো হয়ে না যেতো আর পুঁজিবাদ মানেই এমন বুদ্বুদ আর এমনি সংহারক ফেটেপড়া। 

গ্রন্থটি যেন সেই ছবিগুলি, যা, সেই মৃত্যুগামী মেয়েটির মতো, হত্যাকারীকে শনাক্ত করবার সূত্র হিসেবে, লেখক ফ্রেখে যাচ্ছেন। রেখে যাচ্ছেন ভবিষ্যতের হাতে।


সপ্তর্ষি বিশ্বাস

২৪/০৩/২০২৫

বেঙ্গালোর


ঘুম ঘর