প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...
Showing posts with label রবিপাঠ. Show all posts
Showing posts with label রবিপাঠ. Show all posts

Sunday, August 13, 2023

রবিকবির "আমি" ও আমরা

 রবিকবির "আমি" ও আমরা


"আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হতো যে মিছে " অথবা " ফাগুনের কুসুম ফোটা হবে ফাঁকি, আমার এই একটি কুঁড়ি রইলে বাকি"....  আরো অনেক, অনেক "আমি", রবীন্দ্রগীতিতে, ঘুরেফিরে। 

এই " আমি" কোন আমি? এ কি নিতান্ত এক ব্যক্তি যাকে ব্যক্তিত্ব'র নামে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, নিভৃতির নামে বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি দিয়ে গড়েছে এই বিশ্ব ব্যবস্থা? মনে রাখতে হবে শিল্প বিপ্লব ও তৎপরবর্তী কালই রবিকবির আবহ। বিচ্ছিন্নতার, ব্যক্তির অন্তর্গত বিচ্ছেদেরো আলাপ তথা বিস্তার-কাল এটিই। গুটিকয় বাবু মিলে, তার সামান্য আগেই, মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার জন্মভূমি যে পশ্চিম, তারই, দেড় দুইজন বাদে, পল্লবগ্রাহী বিদ্যা বলে,  নিজেদের মধ্যেই কিছু রৈরৈ কান্ড বাধিয়েছেন, পরে বলা হয়েছে "বাংলার নব জাগরণ "। যা সত্য হলে বুঝতে হবে বাংলা মানে বাবু আর তাঁদের চাটুকাররাই বাংলার দুইশত ভাগ। এমত সময়ের অব্যবহিত পরেই রবিকবির আসা। ওই সময়টি খুবই সন্দেহজনক কেননা ওই সময়ের এক মহাসন্ততি মহা হুংকারে ঘোষনা করছেন ঈশ্বর পাওয়ার নিমিত্ত মানুষ খুন করতেও তিনি প্রস্তুত, হায়, ওই যে ঈশ্বর আর ওই যে মুক্তি, যা মানুষ মারার মূল্যে পাওয়া যাবে, তা যে বিচ্ছিন্নতার কি বিরাট প্রমাণ, তা ওই সময়ে নিশ্চিত টের পাননি অনেকেই। আশ্চর্য এই, যে, রবিকবি না'ত ঠিক "নবজাগৃতি-মহাজন", না তিনি "মানুষ মেরে মুক্তি" পার্টির মেম্বার। পক্ষান্তরে তিনি বলছেন "বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়। অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়, লভিব মুক্তির স্বাদ"। ফলতঃ তাঁর কাব্যের " আমি" হতে পারেনা মানুষ মেরে একা একা "মুক্তি" ঘটি পানান্তে ঈশ্বরের কিরিপায় উর্বশী, মেনকা, রম্ভার রম্ভোরুতে গড়াগড়ি।  আবার শোপেনহাওয়ার, কিয়েরকেগার্ড ইত্যাদি হেন জর্জরিত আমি বা পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের বানিয়ে দেওয়া বিজ্ঞাপনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক 'আমি'। 

  রবীন্দ্রনাথের 'আমি' বিদ্রোহী ' আমি', গণতন্ত্রের এমন কি বলা যায় সমাজতন্ত্রের 'আমি'ও। তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে মন্ত্রীমশাই, প্রধানমন্ত্রী মশাই, যার উপর গণ-খুনের অভিযোগ ঝুলন্ত, সে, যে জনতার করের অর্থে করে বেড়াচ্ছে যথেচ্ছাচার আর দেশবাসী ও বলছে " সাবাস, রাজা করেছেন তো বেশ করেছেন" —- এই যখন চালচিত্র, যখন এই লোকগুলি একদিকে তার করদাতা-অস্তিত্ব, তার গণতান্ত্রিক অস্তিত্ব –--- সমস্ত বাদ দিচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে বলছে তার চাই "প্রাইভেসি", তখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, যে, এই প্রাইভেসি নেহাৎই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। বিজ্ঞাপন- হিট মাল মশলা কিনে " ব্যক্তি " সাজার চেষ্টা, "আমি" দেখানোর ধান্দা। এই চালচিত্র আমাকে বাধ্য করে রবীন্দ্রনাথের "আমি" নিয়ে নতুন করে ভাবতে।

রবীন্দ্রনাথের 'আমি' বিদ্রোহী ' আমি', গণতন্ত্রের এমন কি বলা যায় সমাজতন্ত্রের 'আমি'ও কেননা ওই "আমি" টিকে বাদ দিয়ে, তার অধিকারকে এড়িয়ে গিয়ে, তার ন্যায্য পাওনাকে অস্বীকার করে, গণতন্ত্র,  সমাজতন্ত্র শুধু নয়, রবিকবি বলছেন, গোটা ব্রহ্মাণ্ডেরই কোনো অর্থ হয়না। ওই "আমি" টি ছাড়া ব্রহ্মাণ্ডই হয়না। অতএব " আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হতো যে মিছে"। সমবেত জনতার প্রত্যেকটি " আমি"র একজন কে বাদ দিয়েও হয় না, হতে পারেনা কোনো "ব্যবস্থা", ফাল্গুনে শত ফুল বিকশিত হওয়ার পরেও, একশত-এক সংখ্যক নামগোত্রহীন যে ছোট্ট চারাটি, প্রাচীরের ছিদ্রে, তাতেও যদি কুঁড়ি না আসে, তাহলে তোমার বসন্ত, সে যতো বজ্র নির্ঘোষেই না জাহির করুক নিজেকে, আদতে সে ফাঁকি। ফাঁকিই। আর ওই ফাঁকির বিপরীতে একমাত্র সত্য " আমরা সবাই রাজা"। এই "আমরা" র প্রতিটি "আমি" রাজা, প্রতিটি আমাতে ফুল ফোটে। যদি ফোটে তাহলেই সে ব্যবস্থা ফাঁকি নয়। আর তা না হলে, আমরা তো দেখলাম, শুধুমাত্র ধনতন্ত্রের দেখানো " আমেরিকান ড্রিম" এর ডিম না ফুটে ফেটে গেলো কিভাবে, দেখলান বার্লিন-দেওয়াল, দেখলান তিয়ানম্যান স্কোয়ার। 

"মানুষের মৃত্যু হ'লে তবুও মানব থেকে যায়" পংক্তিতে জীবনানন্দ যে অর্থ প্রয়োগ করেন "মানব" শব্দটিতে, রবীন্দ্রনাথ উচ্চারিত প্রতিটি "আমি" তে,  আমি পাই তারই ঝংকার। 

=== x ===


Sunday, February 27, 2022

মুক্তধারা

 মুক্তধারা

সপ্তর্ষি বিশ্বাস

কথামুখ

একদা এক বন্ধু তথা নাট্যকর্মীর দ্বারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "মুক্তধারা" নিয়ে লিখতে আদিষ্ট হয়েছিলাম। আদেশের কেন্দ্রে ছিল রবীন্দ্রনাঠকের যুগোপযোগী মঞ্চায়ন।

এতাবৎ কাল রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছুই লেখার ইচ্ছা, অনুরোধ, উপরোধ, আদেশ প্রায় এড়িয়ে গেছি এই হেতু, যে, ঐ মহাসমুদ্রের গহনজাত একটি নুড়ির সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলেও গহনে এতো হেউ ঢেউ ওঠে, যে, নুলিয়ার নাও নিয়ে ঐ ঢেউ এর সাগরে পাড়ি দিতে সাহস যায়না।

তবু বন্ধুর আদেশ। তাই চেষ্টা করব ভাবনাকে যথাসম্ভব সংহত রেখে আবর্তন করতে কেবল "মুক্তধারা"কেই। তবু যে সব কথা না বলে নিস্তার নেই সেগুলো প্রাঞ্জল করতে কিছুটা বিস্তার আমার প্রয়োজন।



আমার রবীন্দ্রনাথ

আমার অনুভবে যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত সৃষ্টির ধ্রুবপদ মাত্র দু'টি পংক্তিঃ

"যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে

মিলাব তাই জীবন গানে..."

বিশ্বতানের যে ধ্রুবপদটিকে  রবি ঠাকুর তাঁর জীবনে, সাহিত্যে মেলাতে চেয়েছেন সে এক অন্তহীন মুক্তির ইঙ্গিত। 'আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণের' সঙ্গে আপনার প্রাণটিকে মিলিয়ে দেওয়ার সাধনার আনন্দ, বেদনা, হাহাকার। তাঁর দেবতা তাই জীবনদেবতা যাঁকে বাঁধা যায়না কোনো বিশেষ পূজাবিধির, মন্ত্রের, ধর্মের আঙ্গিকে। বাঁধা যায়না কেননা বিশ্ব নিয়মে কোথাও কোনো বাঁধা নেই, বাধা নেই। তাই অন্তরের গতি যেখানেই রুদ্ধ সেখানেই তাঁর আপত্তি। আর অন্তরের গতি রুদ্ধ হলে সমাজ-সভ্যতার গতিও বাধ্য রুদ্ধ হতে।অতএব তাঁকে গেয়ে উঠতেই হয়ঃ  'হারে রে রে রে রে,  আমায়  ছেড়ে দে রে, দে রে–

           যেমন ছাড়া বনের পাখি মনের আনন্দে রে॥

                      ঘনশ্রাবণধারা   যেমন বাঁধনহারা,

           বাদল-বাতাস যেমন ডাকাত আকাশ লুটে ফেরে॥"

আর যেখানেই ঐ বনের পাখিহেন মনের আনন্দে বিচরন অসম্ভব সেখানেই, তাই, ভেঙ্গে যায় ঐ "বিশ্বতান"। লাঞ্ছিত হয় ধ্রুবপদঃ 'পৃথিবী মৃত্যুকেও কোলে করিয়া লয় জীবনকেও কোলে করিয়া রাখে, পৃথিবীর কোলে উভয়েই ভাইবোনের মতো খেলা করে। এই জীবনমৃত্যুর প্রবাহ দেখিলে, তরঙ্গভঙ্গর উপর ছায়া-আলোর খেলা দেখিলে, আমাদের কোনো ভয় থাকে না; কিন্তু বদ্ধ-মৃত্যু রুদ্ধ-ছায়া দেখিলেই আমাদের ভয় হয়। মৃত্যুর গতি যেখানে আছে, জীবনের হাত ধরিয়া মৃত্যু যেখানে একতালে নৃত্য করে, সেখানে মৃত্যুরও জীবন আছে, সেখানে মৃত্যু ভয়ানক নহে। কিন্তু চিহ্নের মধ্য আবদ্ধ গতিহীন মৃত্যুই প্রকৃত মৃত্যু, তাহাই ভয়ানক। এইজন্য সমাধিভূমি ভয়ের আবাসস্থল।

পৃথিবীতে যাহা আসে তাহাই যায়। এই প্রবাহেই জগতের স্বাস্থ্যরক্ষা হয়।' - রুদ্ধগৃহ, বিচিত্র প্রবন্ধ


ব্যক্তি 'আমি' রবীন্দ্রনাথের কাছে ঘুরে ঘুরে আসি, ফিরে ফিরে আসি ঐ 'মুক্তি'র ইঙ্গিতটিরই টানে। আশায়। এ মুক্তি যে ঘরে দোর দিয়ে বসা 'সন্ত'র 'মুক্তি' নয় বা 'জোতদারের গলা কাটুন' এর মুক্তি নয় তা অবশ্যই ব্যাখ্যা কিংবা উদাহরনের অপেক্ষা রাখেনা। এমনকি শ্রীরামকৃষ্ণ, যিনি 'যত মত তত পথ' হেন মুক্ত পথের পথিক রবি ঠাকুরের 'মুক্তি' সে পথে কিছুদূর গিয়েও বেঁকে যায় অন্যপথে। তাই তাঁর যে সৃষ্টি বলে জীবনদেবতার সঙ্গে বিরহ-মিলনের কথা তা'ই অবলীলায় হয়ে ওঠে রক্ত মাংসের মানব-মানবীর বিরহ-মিলন গাথাও।

এই আলোচনা যেহেতু আমার একান্তই ব্যক্তিগত রবীন্দ্র-ধারনার ভিত্তিতে তাই একে অনুসরন করতে গেলে পাঠকজনকে সতত মনে রাখতে হবে আমার এই ধারনাটিকেও।


নাটকের রবীন্দ্রনাথ


'মহারাজ, একী সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে/ চরনতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে'

' কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না শুকনো ধূলো যত / কে জানিত আসবে তুমি গো / অনাহুতের মতো'

'আজি বিজনঘরে নিশীথরাতে আসবে যদি শূন্য হাতে / আমি তাইতে কি ভয় মানি / জানি, জানি বন্ধু জানি তোমার আছে তো হাতখানি'


এরকম আরো অনেক অনেক উদাহরন, রবীন্দ্রনাথের নানা সময়ের, নানা পর্বের গান থেকে দেওয়া যায় যেখানে গানের গহনে নাটকের উপাদান নিহিত। - 'মহারাজ, একী সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে/ চরনতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে' - হ্যাঁ যদিও হৃদয়পুরে তথাপি এক আশ্চর্য আগমনের বার্তা। এই আগমনের ঘোষনাই নাটক। ঘোষনার ভঙ্গিই নাটক। তবে এই নাটককের নাটকীয়তার তারটি গ্রীক-শেক্ষপীরিয়-ইব্‌সেনিয় এমন কি আমাদের স্বদেশী সংস্কৃত নাটকের তারেও বাঁধা নয়।

' কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না শুকনো ধূলো যত / কে জানিত আসবে তুমি গো / অনাহুতের মতো' - জানিনা কে এসেছে। কোথায় এসেছে। জানিনা এ 'আসা' হৃদয়পুরে আসা নাকি সশরীরে আসা। শুধু জানি এই আসা, এই ভাবে  এতোই অপ্রত্যাশিত যে মনে হচ্ছে আগে জানা থাকলে চোখের জলে ভিজিয়ে রাখা যেতো আসবার এই পথটি ...

এ'কি নাটক নয়? কিংবা 'আজি বিজনঘরে নিশীথরাতে আসবে যদি শূন্য হাতে / আমি তাইতে কি ভয় মানি / জানি, জানি বন্ধু জানি তোমার আছে তো হাতখানি' - রাতের আবহে কে এসেছে? কি নিয়ে আসার কথা ছিল তার? আদৌ কি কথা ছিল আসার? কেজানে। জানিনা খালি হাতে এসেছে বলে অতিথি নিজে দুঃখিত কি'না কিন্তু এ'ই জানিযে সে শূন্য হাতে এসেছে বলে যার কাছে এসেছে সে দুঃখিত নয়। সে জানে ঐ হাতদুটিই তার যথেষ্ট সম্বল হতে পারে...

এ'ই যে নাটকীয়তা তার সূত্র নিহিত কবিতায়। যদিও এর চেয়ে অনেক বেশী নাটক, শেক্ষপীয়ারিয় অর্থে তাঁর 'গান্ধারীর আবেদন', 'কর্ণকুন্তী সংবাদ' বা 'বিদায় অভিশাপ' তথাপি 'শাপমোচন', 'চিত্রাঙ্গদা' বা 'শ্যামা'তেও রবীন্দ্রনাথের 'নাটকীয়তা' অতো প্রকট নয়। যে অন্তর্লীন নাটকীয়তায় গতিশীল রবি ঠাকুরের গান, সেই অন্তর্লীন নাটকীয়তাই রবি ঠাকুরের 'নাটক' বলে চিহ্নিত প্রতিটি রচনার প্রাণশক্তি। তাই স্তানিসলাভস্কি থেকে ব্রেখট, পিটার ব্রুক্‌বা হ্যারল্ড পিন্টো - কোনোখানেই রবীন্দ্রনাটকের সংজ্ঞা পাওয়া যায়না।

রবীন্দ্রগান যেমন বাহিরের নয়,  মর্মের গহন-কথা'ই তার উপজীব্য, রবীন্দ্রনাটকও সেইভাবেই বলে একটি মানুষের মর্মের অসংখ্য মুখের কথা, ভাবনার কথা,  আপনাকে ছাড়িয়ে গিয়ে 'বিশ্বতানের ধ্রুবপদ'টিকে স্পর্শ করবার পথে তাদের জয় পরাজয়ের কথা। যে অর্থে দস্তয়েভস্কির মিশ্‌কিন, রোগোজিন,রাস্কলনিকভদের অস্তিত্ব বাইরের থেকেও বেশী লেখকের মর্মের গহনে তেমনি রবীন্দ্র নাটকের আবহ, চরিত্র, আলাপচারিতার ভাষা ও ভঙ্গীও একান্তই রবীন্দ্রনাথের মর্মের জিনিস। কাজেই, আমার মতে, রবীন্দ্রনাটকের আত্মিয়তা মূলতঃ তাঁর গানের সঙ্গেই বেশী। ফলতঃ তাঁর নাটকের চরিত্রগুলি যতোনা চরিত্র তার চেয়ে ঢের বেশী 'আইডিয়া'। ঐ 'আইডিয়া' গুলির একের অপরের সঙ্গে ঘটে সংঘাত। প্রতিটি 'আইডিয়া'র নিজস্ব অস্তত্বের মর্মে দ্বিধার জন্ম দেয় ঐ সংঘাত। তবে না'ত ঐ সংঘাত 'ইদিপাস'এর সংঘাতের সমমর্মী, না'ত ঐ দ্বন্দ্ব 'হ্যামলেট'এর মর্মের দ্বন্দ্বের সমান্তরাল। তাই রবীন্দ্রনাটকে 'রাজা' নিজেও যোগ দেয় সেই মিছিলে যে মিছিল চলেছে তারই ধ্বজা ভেঙ্গে ফেলতে, চলেছে তারই বানানো বাঁধ ভেঙ্গে দিতে। অর্থাৎ আপনাকে ছাড়িয়ে গিয়ে 'বিশ্বতানের ধ্রুবপদ'টিকে স্পর্শ করবার পথে যারা পথিক তাদের ডাকে  সাড়া দিয়েই অবশেষে, যে আপাত 'ভিলেন'সে'ও হয়ে ওঠে 'হিরো'। শুধু অমলের পিসেমশাই বা কবিরাজের মতো হতভাগ্যেরা না'ত পারে ভিলেন হতে, না'ত হিরো। তাদের প্রতি করুণা আর  'বিশ্বতানের ধ্রুবপদ'টিকে স্পর্শ করবার পথে আমন্ত্রণ জানিয়েই মঞ্চে পর্দা নেমে আসে। রবীন্দ্রনাটক 'শেষ' হয়না। 

সুতরাং 'রক্তকরবী' নাটকের আবহে শম্ভু মিত্র যখন আমদানী করে বসেন কয়লা খনির 'টিপিক্যাল' বাস্তবতা - বিশেষতঃ ধ্বনির প্রয়োগে তখন 'রক্তকরবী'র অন্তর্গত বিস্তারটিকেই মরে যেতে হয়। কেননা কয়লা খনির 'টিপিক্যাল' বাস্তবতা যাকে প্রথমেই টুঁটি টিপে মারে তা হলো রবীন্দ্রনাটকের সঙ্গে রবীন্দ্রগানের আত্মিয়তাকে। এবং অন্তিমে তা চলেযায় রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব শিল্প ধারনার একেবারে বিপরীতে কেননা রবীন্দ্রনাথের শিল্প ধারনার মূল ধারনাটি এক কথায়ঃ 'সাহিত্যে আমরা জগতের সত্য চাই, কিন্তু জগতের ভার চাহি না'। (রাজসিংহ, আধুনিক সাহিত্য) আর শম্ভু মিত্র বা তৎসমরা কারবার করেন ঐ 'ভার'টুকুকে নিয়েই।


রবীন্দ্রনাথের "মুক্তধারা"

১।

আবার ফিরে যাই সেই প্রাক্‌কথনে। 

আবার বলি, আমার অনুভবে যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত সৃষ্টির ধ্রুবপদ মাত্র দু'টি পংক্তিঃ

"যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে

মিলাব তাই জীবন গানে..."

বিশ্বতানের যে ধ্রুবপদটিকে  রবি ঠাকুর তাঁর জীবনে, সাহিত্যে মেলাতে চেয়েছেন সে এক অন্তহীন মুক্তির ইঙ্গিত। 'আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণের' সঙ্গে আপনার প্রাণটিকে মিলিয়ে দেওয়ার সাধনার আনন্দ, বেদনা, হাহাকার। তাঁর দেবতা তাই জীবনদেবতা যাঁকে বাঁধা যায়না কোনো বিশেষ পূজাবিধির, মন্ত্রের, ধর্মের আঙ্গিকে। বাঁধা যায়না কেননা বিশ্ব নিয়মে কোথাও কোনো বাঁধা নেই, বাধা নেই। তাই অন্তরের গতি যেখানেই রুদ্ধ সেখানেই তাঁর আপত্তি। আর অন্তরের গতি রুদ্ধ হলে সমাজ-সভ্যতার গতিও বাধ্য রুদ্ধ হতে।অতএব সেই রুদ্ধদ্বারটি খুলে দেওয়ার কাহিনীই মূলতঃ রবীন্দ্র নাটকের অন্তর্বস্তু।

'বাল্মিকী প্রতিভা' আর 'বিসর্জন' এর কাহিনীও তাই তথাপি ঐ দুইটি নাটকে প্লটের যে ভূমিকা তা পরবর্তী রবীন্দ্রনাটকে ক্ষীয়মান। ক্রমে তাঁর 'আইডিয়া' গুলিই 'প্লট'এর স্থান নিয়ে সক্ষম হয়ে উঠেছে অদ্ভুত সাবলীলতায়। সফলতায়। 'ফাল্গুনী' তে প্লট থেকে রবীন্দ্রনাটক একেবারে মুক্ত। 

কিন্তু প্লটহীনতার দিকে রবীন্দ্রনাটকের এই যাত্রা, আমার ধারনা, মূলতঃ 'কন্টেন্ট্‌' এর দাবীতেই কেননা রবীন্দ্রনাটক মূলতঃ, তাঁর গানের মতোই, সতত বলেগেছে অন্তরের বদ্ধতা আর মুক্তির দ্বন্দ্বের কথা। 

রবীন্দ্রনাথের নাটকে যে "রাজা" সে কেবল বিত্তের রাজা নয়, সামন্তবাদের "রাজা" নয়। সে এক প্রবল শক্তির প্রতিমা ( প্রতীক নয় কদাপি) যার মর্মে আছে আপনার ও অপরের মুক্তির সংবাদ কিন্তু যে সংবাদটি তার চোখে পড়েনা বলেই সে বন্দী থাকে আপন বলের কাছে। 'রাজা' নাটকের 'রাজা'ও তা'ই। 'রক্তকরবী'র 'রাজা'ও তা'ই।'ডাকঘর' এর 'রাজা' এই রাজাদেরো রাজা। তিনি মুক্তির দূত।

'মুক্তধারা'র 'রাজা'র সঙ্গে 'রক্তকরবী'র রাজার সাদৃশ্য প্রবল। দুই 'রাজা'ই আপাতভাবে বন্দীত্বের, যন্ত্রের, শক্তির পূজারী কিন্তু অন্তরের কোথাও উভয়েই জানে এই বানানো বন্দীত্বের অসারতার কথা। টের পায় নিজ অক্ষমতাকে। তা'ই তাদের মর্মের কোথাও রঞ্জনের প্রতি, বিশু পাগলের প্রতি, যুবরাজের প্রতি, ধনঞ্জয় বৈরাগীর প্রতি এক ধরনের ভীতি মিশ্রিত শ্রদ্ধা যা থেকেই অবশেষে একজন একজন যায় আপনারি বাহিরের বলের ধ্বজাটি অন্তরের বল দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে, আরেকজন মর্মে আনন্দিত হয় আপনার পরাজয়ে।

'মুক্তধারা'য় এই বার্তাটি প্রথম টের পাওয়া যায় এই কথোপকথনেঃ

দূত। যুবরাজ বলছেন কীর্তি গড়ে তোলবার গৌরব তো লাভ হয়েছেই, এখন কীর্তি নিজে ভাঙবার যে আরো বড়ো গৌরব তাই লাভ করো। 

বিভূতি। কীর্তি যখন গড়া শেষ হয় নি তখন সে আমার ছিল; এখন সে উত্তরকূটের সকলের। ভাঙবার অধিকার আর আমার নেই। 

দূত। যুবরাজ বলছেন ভাঙবার অধিকার তিনিই গ্রহণ করবেন। 

বিভূতি। স্বয়ং উত্তরকূটের যুবরাজ এমন কথা বলেন? তিনি কি আমাদেরই নন? তিনি কি শিবতরাইয়ের? 

দূত। তিনি বলেন— উত্তরকূটে কেবল যন্ত্রের রাজত্ব নয়, সেখানে দেবতাও আছেন, এই কথা প্রমাণ করা চাই। 


যে দেবতার কথা এখানে বলছে দূত,আসলে যা যুবরাজেরি কথা,সেই দেবতাও প্রতিমা ঐ বিশ্বতানের ধ্রুবপদটির। 'মুক্তধারা'র অন্তিমে সেই বার্তাটিই অবয়ব নেয় এইভাবেঃ

সঞ্জয়। যুবরাজ মুক্তধারার বাঁধ ভেঙেছেন।

রণজিৎ। বুঝেছি, সেই মুক্তিতে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। 


অর্থাৎ বিশ্বতানের ছন্দনিয়মে যা গতিশীল তাকে বদ্ধ করার চেষ্টাতেই অসুন্দরের,বিষের সৃস্টি। তাই এই নাটকের সারকথাটি,রবীন্দ্রভাবনারো সারকথাটি উচ্চারিত হয় এইভাবেঃ 

অভিজিৎ। যা-কিছু আমার জীবনকে মধুময় করেছে সে সমস্তকেই আজ আমি নমস্কার করি।

আর আমার মনে আসতে থাকে 'যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে,দু হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে/যাবার বেলা সহজেরে /যাই যেন মোর প্রণাম সেরে/             সকল পন্থা যেথায় মেলে সেথা দাঁড়াই এসে...'

মনেপড়ে 'কি পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি ...' ... মনেপড়ে 'এ দ্যুলোক মধুময়/ মধুময় পৃথিবীর ধূলি ...'

যারা এই 'মধুময় ধূলি'কে পারেনা অন্তরে তুলে নিতে তারাই বাঁধ দিতে আসে, আসে পৃথিবীর বুকের থেকে মরা ধন তুলে নিয়ে কারবার করতে, শিশুকে অসুখের অছিলায় দূর করে রাখতে আলো বাতাসের স্পর্শ থেকে। তারাই বর্ণাশ্রমের নিগড় তুলে 'অন্ত্যজ' সংজ্ঞা দিয়ে মানুষকে বঞ্চিত করে রাখে তাদের সহজাত অধিকার থেকে। তারাই অতি উৎপাদনের পসরা বিকাতে দখল করে দেশ। বাধায় যুদ্ধ। - তাদেরকে হটিয়ে দিয়ে নয়, তাদের মর্মে বিশ্বতানের ছন্দটি জাগিয়ে তুলতেই আসে নন্দিনী, বিশু পাগল, রঞ্জন, যুবরাজ, ধনঞ্জয়, ঠাকুর্দা'রা ...। এখানে class struggle এর নিয়ম অচল। কেননা class ও নিয়ম। আর ঐ নিয়মে করা Struggle ও নিয়ম। বানানো নিয়ম। তাই  'বিশ্বতান' এর 'ধ্রবপদ'টি, মার্কস্‌, লেনিন, মাও বা গুয়েভারা'র মতো মহাপ্রাণেরাও কানে শুনলেও মর্মে নিতে পারেননা। ফলতঃ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ আর রবীন্দ্রনাথ নানা স্থানে বহুদূর সন্নিকটবর্তী হয়ে পরলেও, 'রাশিয়ার চিঠি' লিখেও , দুটি পথ ভিন্ন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে তাঁর অন্তিম মুহুর্তে স্বাভাবিক ভাবেই বলতে হয়ঃ

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে ,

হে ছলনাময়ী ।

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে

সরল জীবনে ।

এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত ;

তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি ।

তোমার জ্যোতিষ্ক তারে

যে-পথ দেখায়

সে যে তার অন্তরের পথ ,

সে যে চিরস্বচ্ছ ,

সহজ বিশ্বাসে সে যে

করে তারে চিরসমুজ্জল ।

বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু ,

এই নিয়ে তাহার গৌরব ।

লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত ।

সত্যেরে সে পায়

আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে ।

কিছুতে পারে না তা ' রে প্রবঞ্চিতে ,

শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে

আপন ভান্ডারে ।

অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে

সে পায় তোমার হাতে

শান্তির অক্ষয় অধিকার ।


২।

ফিরে আসি 'মুক্তধারা' প্রসঙ্গে।

অন্তিম বিচারে 'মুক্তধারা' ততটা সবল নয় যতোটা 'ডাকঘর', 'রক্তকরবী' আর 'রাজা'। সবল নয় কেননা 'মুক্তধারা'য় তাঁর 'আইডিয়া' গুলির ব্যক্তিকরনকে সহজেই যায় শনাক্ত করা, চিহ্নিত করা যায় তাঁর উদ্দেশ্যকে। 'মুক্তধারা' কে একটি পূর্ণাংগ রচনা না ভেবে এটিকে 'রক্তকরবী'র দিকে তাঁর যাত্রা পথের একটি মেইল ফলক বলেই ভাবতে সুবিধা হয় আমার।

রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চায়নের ব্যাপারে যখনি ভাবি তখনি মনে আসে রবীন্দ্রনাথের শিল্প ধারনার মূল ধারনাটি এক কথায়ঃ 'সাহিত্যে আমরা জগতের সত্য চাই, কিন্তু জগতের ভার চাহি না'। (রাজসিংহ, আধুনিক সাহিত্য)- মনেহয় রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চও হবে ভারহীন। চরিত্রদের পোশাক পরিচ্ছদও তাই। কেননা এখানে 'রাজা'  মানে রাজা ইদিপাস্‌ নন, এখানে 'পাগল' মানে 'সাইকিক্‌' নয়। এখানে সবই একটাই মানুষের গহনের নানান ভাবনার স্রোত। মনেহয় রবীন্দ্রনাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে পরিচালককে মূলতঃ চালিত হতে হবে নাটকটির গান গুলির দ্বারা। মঞ্চ, আলো, আবহ, চরিত্র, অভিনয় যদি সক্ষম হয় দর্শকের মর্মে নাটকের গান গুলে বাজিয়ে তুলতে তবেই সে সার্থক। নতুবা সে শম্ভু মিত্রের 'রক্তকরবী'র মতো আদত 'রক্তকরবী'র 'গ্রোটেস্ক'মাত্র।

২রা জুন ২০১৪

বেঙ্গালোর




“রঞ্ঝিস হি সহি”

 “রঞ্ঝিস হি সহি”

সপ্তর্ষি বিশ্বাস



 “রঞ্ঝিস হি সহি, দিল দুখানে কে লিয়ে আ” – “যাতনাই সই, দুঃখদায়িনী হয়েও আসো”। যদি অভিজ্ঞতার দ্বারা ব্যবহৃত হয় মেধা সেইক্ষেত্রে এই উক্তি এক ব্যথিত মানব অথনা মানবীর তার ইপ্সিতের প্রতি। গজলের আপাতসংজ্ঞাও সমর্থন করে এই ভাবনাকে। কিন্তু অভিজ্ঞতার দ্বারা ব্যবহৃত নাহয়ে মেধা যদি ব্যবহার করে অভিজ্ঞতাকে, তবে, এই ইপ্সিত বা ইপ্সিতাটি, তার মানুষীভাবটি বজায় রেখেও, “রঞ্ঝিস” আর “দুখ” এই শব্দদ্বয়ের মহিমায়, তা অতিক্রমও করে যেতে পারে অনর্গল। - “আ ফির মুঝে ছোড়কে যানে কে লিয়ে আ” – “আসো, পুনরায় ত্যাগ করে চলে যেতে এসো” – গানটির দ্বিতীয় এই পংক্তি আমাকে মনে পড়ায়ঃ “ওহে    নিষ্ঠুর, ফিরে এসো,

               আমার  করুণকোমল এসো,

     আমার  সজলজলদস্নিগ্ধকান্ত সুন্দর ফিরে এসো,

               আমার  নিতিসুখ ফিরে এসো,

               আমার  চিরদুখ ফিরে এসো” ...

এই যে গজলের “রঞ্ঝিস” আর কীর্তনে বাঁধা এই রবীন্দ্রগানের যে “নিষ্ঠুর” তারা মিলেমিশে যেখানে একাকার সেখানেই তারা পার হয়েযায় তাদের মানুষিয়ানাকে । রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন “ওহে জীবনবল্লভ”, “হে মোর দেবতা” হেন শব্দবন্ধ, তখন এই শন্দগুলি – “দেবতা”, “জীবনবল্লভ”, “জীবনদেবতা” – অভিজ্ঞতাদ্বারা ব্যবহৃত মেধার সার্থক সামান্য পরিধি পার হয়ে – দেবদেবীর মূর্তিবিগ্রহ, নিরাকার ব্রহ্মের হরবোল্‌ সাধনা, যিশু ভজনা, নামাজশুদ্ধতা – সমস্ত পারহয়ে চলেযায় – একাধারে – মহাজগতের, বহুব্রহ্মান্ডের অনন্তে। আবার শরৎ চাটুজ্জের গপ্পের বাতায়নে অপেক্ষারতা বিরহিনী নায়িকার মুখে কিংবা ব্যাক্‌গ্রাউন্ডে চালিয়ে দিলেও শব্দগুলি নিজে সংকুচিত নাহয়ে বরং কোনো এক নির্দিষ্ট রাজলক্ষীকে ব্যাপ্ত করে তোলে মহানীলে। 

“এসো” আর “ফিরে এসো” এই দুই অন্তহীন আর্তি। মানুষের। “মানুষের মৃত্যু হলে” “মানবের”। যখন রামপ্রসাদ বলেনঃ “নয়ন থাকতে দেখলে না মন, কেমন তোমার কপাল পোড়া। মা ভক্তে ছলিতে তনয়ারূপেতে, বেঁধে গেলেন ঘরের বেড়া” – তখনো তাঁর সেই কল্পমায়ের ফিরে আসার নিমিত্ত তাঁর আকুতিও অনুরূপ। ভাবোন্মাদ শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ে প্রচলিত যে গল্পে তিনি “দেখা দে, মা, দেখা দে” ক্রন্দনে নিজ কন্ঠনালীতে খড়্গস্থাপন করেন সে’ও এই “এসো”র আর্তি। কবি আহমেদ ফারাজ লিখলেন, একই গানে “কুছ্‌ তো মেরে পিন্দার-এ-মুহব্বৎ কা ভরম রখ্‌, তু কভি মুঝকো মনানে কে লিয়ে আ”, “যৎসামান্য মূল্য দাও আমার এ প্রেমের, অন্তর একবার এসো আমাকে বোঝাতে”।   গায়ক মেহেদী হাসান এই অংশের বিশ্লেষণ করেছেন এইভাবে, যে, যদি আমার প্রতি তোমার প্রীতি আর না’ও থাকে তবু শুধুমাত্র আমার এই প্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একবার এসো, যদি তা লোকদেখানো আসা হয় তাহলেও”। যদি বলি এই “আসা”র আশাতেই “ভবে আসা” প্রত্যেকের – কোনো “আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে” – সাধকের, প্রেমিকের, পাগলের – তবে খুব বিঘ্ন হয় কি, “বিদ্বজ্জনের”, মেনেনিতে? যদি হয় তাহলেও আমি বলতে বাধ্য যে, আদতে সেই “রঞ্ঝিস্‌” কে সন্ধান করে বেড়ানোই প্রকৃত মানুষের আমরণের অভিযানঃ “তুমি কাহার সন্ধানে, সকল দুখে আগুন জ্বেলে বেড়াও কেজানে” – সেই “রঞ্ঝিস্‌”, সেই “দিল দুখানে কে লিয়ে” যে আছে, তার সন্ধান, সেই “নিষ্ঠুর”, সেই “আমার  চিরদুখ ফিরে এসো” –

    যেহেতু যাকে ডাকা সে  “রঞ্ঝিস্‌”, সে “দিল দুখানে কে লিয়ে”ই আছে, সে“নিষ্ঠুর”, সেই “আমার  চিরদুখ” তাই “আসা”টিও নয় খুব সহজ কোনো আসা। হয় সে আসে দুয়ারভাঙ্গা ঝড়ের রাত্রে নয়তো তার আসার উপলক্ষ্যেই ওঠে ঝড়, ভাঙ্গে দুয়ার। তার আসবার ইঙ্গিত জানাযায় তখনই যখন “আকাশ কাঁদে হতাশসম” ... অতএব তার আসা হতে পারেনা “অ্যান্ড দেন্‌ দে লাইভড্‌ হ্যাপিলি এভার আফটার” এর জীবনহীন যাপনইঙ্গিত।  তাই “ ইক উম্র সে হুঁ লজ্জত্‌-এ-গিরিয়া সে ভি মহরুম / ইয়ে রাহত্‌-এ-জাঁ মুঝ কো রুলানে কে নিয়ে আ” –“ এক যুগ ধরে আছি কামনার দুঃখতাপহীন / এসো প্রিয়, মর্মে শুধু দুঃখ দিতে এসো” ... আমার   ক্ষুধিত তৃষিত তাপিত চিত,   নাথ হে, ফিরে এসো।

               ওহে    নিষ্ঠুর, ফিরে এসো,

শায়ের রয়েছেন কামনার দুঃখতাপহীন। অর্থাৎ বেঁচে নেই টিঁকেই রয়েছেন শুধু। তিনি চান মর্মে তাঁর ইপ্সিত-ইপ্সিতা এসে “তীব্র দহন জ্বালুক”। কেননা তাঁকেও, কবির মতো উপলব্ধি করতে হয়েছে, যে, “আমার ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে/ আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয়না কিছুই আলো”। তাই শারেরের চৈতণ্যও, প্রকৃত প্রস্তাবে, “ক্ষুধিত তৃষিত তাপিত”। ওই তাপেই দগ্ধ হয়ে জীবনানন্দ লিখেনঃ “ফিরে এসো প্রান্তরের পথে;

যেইখানে ট্রেন এসে থামে

আম নিম ঝাউয়ের জগতে

ফিরে এসো”  -

কবি বিনয় মজুমদারও তাঁর ইপ্সিতা “চাকা”কে নিয়ে যান তেমনি এক বিরাট চক্রের ব্যাপ্তিতে যে চক্র মহাকালের রথচক্রের মতোই অমোঘ। অমোঘ “রঞ্ঝিস্‌”- “ফিরে এসো ফিরে এসো চাকা

রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো”। 

মীর্জা গালিবের  কাল ১৭৯৭  থেকে ১৮৬৯ । “রঞ্ঝিস্‌ হি সহি”র কবির কাল ১৯৩১ থেকে ২০০৮। স্থানিক দূরত্বও বিপুল। 

কাল পরিসরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিনয় মজুমদারেরো দূরত্ব অনেক। যাপন প্রণালীর দূরত্ব আলোকবর্ষের। বাচনভঙ্গীরো। তথাপি বিনয়ের “চাকা”, অন্তিমে সেই নীহারিকাপথের ইঙ্গিতে উড়েযায় যেদিকে ধাবিত রবীন্দ্রগানের-কবিতার “তুমি”। কথাগুলি ভাবি, ভাবতে বাধ্য হই, আকৈশোর শোনা “রঞ্ঝিস্‌ হি সহি” গানটি সেদিন আবার শুনতে শুনতে। টেরপাই এটির কবিতাসত্তার বিস্তারের ইঙ্গিত। আবারো উপলব্ধ হয় “ফর্ম” শব্দটির সীমাবদ্ধতা। মনে আসে যুগান্তর চক্রবর্তী “অভিজ্ঞতা যেন ব্যবহার না করে আমাকে”। অনুভব হয়, প্রকৃত সমূহ শিল্প, আপনার অজানিতেই “দেবতারে প্রিয়” করে, “প্রিয়েরে দেবতা”। অনুভব হয় সুরা আর সাকি’ প্রকৃত গজলে কেবল আবহমাত্র, বড়জোর  এলিয়টকথিত “অবজেক্টেইভ কোরিলেটিভ”।

এই কথা স্মরণ করে ভরসা পাই,যে, গালিব ও তাঁর গজল বিষয়ে লিখতে গিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর “গালিবের গজল থেকে” গ্রন্থের ভূমিকার, অন্তর্গত আলোচনায়।  ১৯৬০ সালে। 

 




তোমার সৃষ্টির পথ

 তোমার সৃষ্টির পথ


একটি জীবন ফুরিয়ে এলো না’কি আরম্ভ হলো আরেক জীবন? –এই প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে পথ হেঁটে চলেছেন সেই নচিকেতা থেকে অদ্যকার প্রতিটি প্রকৃত  মানুষ। বিগ্‌ ব্যাং থেকে রিলেটিভিটি হয়ে হিগ্‌স্‌ বসন্‌ সে’ও সেই অন্বেষারি আরেক পথ। কিন্তু এইসব ভাবনার সূত্রে জড়িয়ে পরার অনেক অনেক আগে এও রাত্রে বসেছিলাম সামনের বারান্দায়। সিঁড়িতে। ভরা গ্রীষ্মের লোডশেডিং রাত। সন্ধ্যা মিলিয়েছে অনেকক্ষন। আকাশে মেঘ নেই। ধু ধু তারা। খেয়াল করিনি বাবাও কখন এসে বসেছে বারান্দায়। মোড়াতে। যখন খেয়াল করলাম তখন বাবার স্বর অন্ধকারে ছড়িয়ে দিচ্ছে এই শব্দগুলি, বাক্যগুলিঃ

রূপনারানের কূলে

জেগে উঠিলাম ,

জানিলাম এ জগৎ

স্বপ্ন নয় ।

রক্তের অক্ষরে দেখিলাম

আপনার রূপ ,

চিনিলাম আপনারে

আঘাতে আঘাতে

বেদনায় বেদনায় ;

সত্য যে কঠিন ,

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম ,

সে কখনো করে না বঞ্চনা ।

আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন ,

সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে ,

মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে ।

পাঠশালার গন্ডি পার হয়ে হাই ইস্কুলের দ্বিতীয় বা বড়জোর তৃতীয় বছে ছিল সেটা। কাজেই এই শব্দ, বাক্য গুলির ইঙ্গিত অনুভবের বয়স সেটা ছিলনা। তবু একটি নদীর তীরে, অন্ধকারে হঠাৎ জেগে উঠবার যে ছবি তা আমাকে নিলো জাদু করে। যেন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ই বলে দিলো এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের। সঞ্চয়িতার পেছনের ‘প্রথম ছত্রের সূচী’ খুঁজে বার করলাম কবিতাটি। সে’ই প্রথম জানলাম রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ লেখা’ গ্রন্থের নাম, জানলাম আরো একটি কবিতা, বাবা যেটা প্রায়ই বলে, এ’ও সেই ‘শেষ লেখা’ গ্রন্থেরঃ

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে ,

হে ছলনাময়ী ।

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে

সরল জীবনে ।

এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত ;

জীবনের প্রায় মধ্য পর্যায়ে এসে পেছন ফিরে তাকালে ভেসে ওঠে যতো ছবি, যতো স্মৃতি তাদের ভিড় থেকে শুধু একটি বা দুটি ছবিকে আলাদা করে ‘প্রিয় স্মৃতি’ বলে চিহ্নিত করা যেমন অসম্ভব তেমনি আমার মতো যাদের বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা নিজের মতো করে রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে জড়িয়ে তাদের পক্ষে, জীবনের প্রায় মধ্য পর্যায়ে এসে কিংবা জীবনের শেষ দিনেও, রবীন্দ্রনাথের ‘একটি’ বা ‘কয়েকটি’ লেখাকে ‘প্রিয়’ বলে চিহ্নিত করা তেমনি কঠিন। আজ যখন ‘হাজার শব্দের মধ্যে ১ এপ্রিলের মধ্যে ' আমার পড়া রবীন্দ্রানাথের সেরা বই' লেখা চাই।‘ – বন্ধুর এই আদেশ মান্য করতে গিয়ে বসলাম লেখার টেবিলে তখন মনের গহনে জেগে উঠলো ঐ নিদাঘ-সন্ধ্যা, বাবার কন্ঠ, ঐ কথা আর শব্দ গুলি ...


   ১৯৪১ সাল। রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ বছর। সেই শেষ বছরের ক’টি মাসে লেখা কবিতার সঙ্গে ১৯৩৯ সালের একটি কবিতা। সব মিলিয়ে ঠিক পনেরোটি কবিতায় পূর্ণ এই গ্রন্থ ‘শেষ লেখা’ – যার অনেক কবিতাই অসুস্থ কবিকে বলতে হয়েছে মুখে মুখে, অন্যেরা টুকে নিয়েছে। পরে অনেকগুলির সংশোধন, পরিমার্জন রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে করলেও ‘তোমার সৃষ্টির পথ...’ কবিতার সংশোধন, পরিমার্জন করতে পারার আগেই ফুরিয়ে এলো একটি জীবন ... একটি জীবন ফুরিয়ে এলো না’কি আরম্ভ হলো আরেক জীবন? –এই প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে পথ হেঁটে চলেছেন সেই নচিকেতা থেকে অদ্যকার প্রতিটি প্রকৃত  মানুষ। বিগ্‌ ব্যাং থেকে রিলেটিভিটি হয়ে হিগ্‌স্‌ বসন্‌ সে’ও সেই অন্বেষারি আরেক পথ। সেই অন্বেষাই রবীন্দ্ররচনা-মানচিত্রের একটি পরিধিরেখার ইঙ্গিত।  প্রথম কবিতা গ্রন্থ ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’এ’র প্রথম কবিতাতে আমরা পাই যে অচেনার উল্লেখ, এইভাবেঃ

অয়ি সন্ধ্যা , তোরি যেন স্বদেশের প্রতিবেশী

       তোরি যেন আপনার ভাই

  প্রাণের প্রবাসে মোর দিশা হারাইয়া

             বেড়ায় সদাই ।


‘প্রাণের প্রবাসে’র সেই ‘দিশাহারা’ কে অনেক খুঁজে, অনেক রূপে দেখে, না দেখে, আভা দেখে অনুমান ক’রে জীবনের অন্তিমে এসেও তারি কথা তাঁর শেষ লেখাগুলিতেঃ

প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিল

সত্তার নূতন আবির্ভাবে —

কে তুমি ,

মেলে নি উত্তর ।


বৎসর বৎসর চলে গেল ,

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিমসাগরতীরে ,

নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় —

কে তুমি ,

পেল না উত্তর ।

এখানে এসে রবীন্দ্রনাথ আরো নিরাভরন, আরো নিরাবরণ। নিরাভরন-নিরাবরণ’এর পথে যে নতুন যাত্রার আরম্ভের ইশারা নিহিত ছিল ‘প্রান্তিক’ (১৯৩৭) এ, তা’ই, ক্রমে, ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’ হয়ে সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়ে উঠতে চাইলো ‘শেষ লেখা’য়। ‘এ মোহ আবরণ খুলে দাও হে’র যে আর্তি তাই তাঁর জীবন ও রচনার যাত্রা পথে অর্জন করে নিতে নিতে এ যেন এক বাঁক। এই বাঁকের পরে যা তা’কি? এই প্রশ্নেরো সরল, নিরাবরণ উত্তর এবার শোনালেন কবি, জানালেনঃ উত্তর নেই। তবু প্রশ্ন আছে। থাকবে। ‘কে তুমি?’ ... তিনি কি নিরাকার ব্রহ্ম না’কি ব্ল্যাক্‌ হোল্‌? জানানেই। তবু সেদিকে যাওয়াই জীবনঃ

হয় যেন মর্ত্যের বন্ধন ক্ষয় ,

বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয় ,

পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয়

মহা-অজানার ।

এই গানটি কবি লিখেছিলেন ১৯৩৯ সালে। ‘ডাকঘর’ নাটকে ব্যবহারের জন্য লিখিত হলেও এই গান অবশেষে স্থান পেলো ‘শেষ লেখা’র প্রথম কবিতা হিসেবে। ( মনেহয় প্রকৃত প্রস্তাবে ‘শেষ লেখা’ তাঁর ‘আরোগ্য’ পর্যায়েরি লেখা যা তিনি লিখেছিলেন ‘আরোগ্য’ গ্রন্থ প্রকাশের পরে।) এই কবিতায় আছে তাঁর নিজের যাত্রার কথা সম্মুখের ‘শান্তি পারাবার’এর দিকে, এই গ্রন্থেরি অন্য কবিতায় আছে অজানা মহামানবের আগমনের বার্তা, যে আগমনের আবহ এই রকমঃ

উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব

নব জীবনের আশ্বাসে ।

জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয় ,

মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে ।


মনেহয় যেন রবীন্দ্রজীবনের সমস্ত আবিষ্কৃত সত্য এখানে উঠেছে সারাংশ হয়ে। ব্রহ্ম আছে কি নেই থেকে বড় কথা হয়ে উঠছে এই বাঁক পার হয়ে যা’ই আছে তাকে নির্ভিক ভাবে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি। মনেপড়ে ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ গানটি প্রথম রেডিওতে শুনেছিলাম আকাশবানী শিলিগুড়ি থেকে প্রচারিত রবীন্দ্রসংগীতের অনুরোধের আসরে। শিল্পী ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। পরে কণক দাশ ( বিশ্বাস ) এর কন্ঠে গানটি শুনে আরো অভিভূত হয়েছিলাম। সে সবই দশ থেকে বারো কেলাসের কথা। ঐ মুগ্ধতার মর্মে নাচিকেত প্রশ্ন না থাকলেও ঐ মুগ্ধতার আড়ালে আড়ালে যেন অবয়ব নিচ্ছিল প্রশ্নগুলি...

সমুখে শান্তিপারাবার ,

ভাসাও তরণী হে কর্ণধার ।

তুমি হবে চিরসাথি ,

লও লও হে ক্রোড় পাতি ,

অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি

ধ্রুবতারকার।

 এক পারাপারহীন সমুদ্রের ছবি সে’ই যে আঁকা হয়ে গিয়েছিল মর্মে তারি মূল্যে, তারি আশীর্বাদে অদ্যাপি জীবনের ছোটো ছোটো নদী নালা পার হওয়ার সাহস পাই। পেয়েছি। নিজের মর্মে ‘অসীম’ এর প্রথম সংজ্ঞা হয়ে এসেছে এক পারাপারহীন অন্ধকার সমুদ্র আর তার শিয়রে জ্বলে থাকা একটি তারা। ধ্রুবতারা ...

   এখন অনেক রাত। খোলা জানালা দিয়ে আসা জ্যোৎস্নায় দেখতে পাচ্ছি ঘুমন্ত মুখ। খোকার, খুকির। হায়, এই খোকা সে’ও মাত্র ক’দিন আগেই ছিল ঐ খুকির মতোই অবুঝ। বায়না ধরতো দোকান থেকে পক্ষীরাজ ঘোড়া কিনে দেওয়ার। আজ সে ‘হাই ইস্কুল’এ যায়। সে জানে পক্ষীরাজ ঘোড়া টোরা সব ফাঁকি! হায়, একদিন খুকিও জানবে। বড় হয়ে যাবে খুকিও। তারপর একে একে তারা ... আর ভাবতে পারিনা। টের পাই ব্রহ্ম আছে কি’না, ঈশ্বর আছে কি’না এই সমস্ত হয়ে ওঠে অর্থহীন। টের পাই মায়া। টেরপাই ঐ এক জালে আমরা সকলে বাঁধা। ঐ জালই ভয়, মৃত্যু, ব্যথা। আমি যেন শুনতে পাই অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে বাবার কন্ঠ। বাবা আবৃত্তি করে চলেছেঃ

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে ,

হে ছলনাময়ী ।

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে

       সরল জীবনে ...


২৬/০৩/২০১৩

বেঙ্গালোর


ঘুম ঘর