প্রবেশিকা

ক্ষুদ্রতম কথাটিও, প্রিয়,
বৃহতের কাছে পৌঁছে দিও ...
নতুবা কেমন তুমি কবি?
মাঝে মাঝে শুধু চিঠি দিয়ো...
কতো পথ পেরোলে অথবা
কত পথ বাকি আছে আজো –
- এইটুকু খবর জানিও...
আমি সেই চিঠিতেই খুশি...
আমার কথাটি তুমি, প্রিয়,
বিরাটের পায়ে রেখে যেয়ো।
**************************************************** **

Friday, August 28, 2015

যে উপন্যাসটি আর লেখা হবেনা তার কিছু পাতা ...


যে উপন্যাসটি আর লেখা হবেনা তার কিছু পাতা ...

 ্
১।

মনেপড়ে জীবনের প্রথম মৃত্যুটির কিনারে দাঁড়িয়ে থাকার কথা। ছবি। মনেপড়ে একটি মুখ।বাইফোকাল চশমা। কাঁচাপাকা চুল। ঠোঁটে স্মিত হাসির রেখা।কপালে বলীরেখার জ্যামিতি।শাদা ধুতি। শাদা পাঞ্জাবী। মাঝারি উচ্চতা। শ্যামলা ত্বক। একটি তক্তপোশ। তক্তপোশের উপরে একটি হারমোনিয়াম। জানালাহীন একটি কোঠা। আয়তনে মাঝারি। দরজা। দরজার সামনে টানা বারান্দা। বারান্দার পরে উঠোন। পারহয়ে আম গাছ, অর্জুন গাছ,পেয়ারা গাছ। পুকুর। পুকুরের ঐ পারে সুপারী আর নারকোলের পাহারা। কালো জলে আকাশের ছ্যা। গাছের ছায়া। পুকুর আর কোঠার মধ্যবর্তী ঘাসে ঢাকা উঠানই যেন ধূ ধূ মাঠ ...

   কোঠার ভিতরে আলো আঁধারির আলপনা। ঐ আলো আঁধারির আনাচে কানাচে সুর। নানা সুর। নানা কথা। গানের। শৈশবের। জীবনের ভোর বেলার। বোঝা না বোঝায় মেশা।‘পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই...আমি’ত সেই ঘরের মালিক নই’ ... ‘এপারে মুখর হলো কেকা ওই,একা,ওপারে নীরব কেন কুহু হায়, কুহু কুহু কুহু হায়’... ছোটো চৌকির উপর হারমোনিয়াম আর তানপুরা, দেওয়ালে পেরেক গেঁথে ঝোলানো হ্যাঙ্গারে গোটা তিন শাদা পাঞ্জাবী, কোনার দিকে কেরোসিন কাঠের টেবিলে কিছু বই, খাতা –এই আসবাব। এই আবহ। ছোটো কোঠাটিকে আসবাবহীনতা না’কি আমার শৈশবের মায়াতেই মনে হতো বিশাল কেজানে ... এখন সবই পুড়ে যাচ্ছে ঐ দাউ দাউ আগুনে, ঐ মুখ, হাসি, চশমা, হারমোনিয়াম, তানপুরা, ঐ কোঠা, ঐ গানগুলি, সুরগুলি, কথাগুলি...

২।

সে ছিল এক সময়। এক যুগ। এক দেশ। ছিলেন এক চাঁদরাম মুন্সী।

 চাঁদরাম মুন্সী ছিলেন ‘প্লীডার’। সাহেব জজ্‌দের সেই দোর্ডন্ড আমলে গ্রাম ছাড়িয়া তিনি শহরে আসিয়া ছিলেন ‘প্লীডারি’ করিতে। উচ্চতায় ছয় ফুটাধিক, তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ, শ্মশ্রুগুম্ফ সংবলিত এই যুবকের পসার জমাইতে লাগিয়াছিল অতি অল্প সময়। আঠারোটি ভাষা জানা এই মানুষটির দৈনিক উপার্জনের মাপজোখ হইত মোহর ভরা বস্তার হিসাবে। বাঘে গরুতে একঘাটে জল খাওয়ানো তিন তল্লাটের সাহেব মাজিস্ট্রেটের দল ‘মুসাবিদা’র ধরন দেখিয়া বলিয়া দিতে সক্ষম হইতেন উহা চাঁদরামের মুসাবিদা কি’না।

দীর্ঘদেহী, তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ এই মানুষটির দূর্বলতা ছিল মাত্র একটিই। তাহা মদ । কালী সাধক ঠাকুর্দার শোণিত হইতে অপর অনেক কিছুর সংগে এই একটি উত্তরাধিকারও বর্তাইয়াছিল তাঁহার শোণিতে।

  আদালত হইতে সোজা শুঁড়ি খানায় যাইতেন চাঁদরাম আর সেইখান হইতে ফিরিতেন বেহেড মাতাল হইয়া । প্রতিদিন । মদ্যপানের প্রয়োজনীয় অর্থ সঙ্গে রাখিয়া দিনের বাকি উপার্জন ঘরে পাঠাইয়া দিতেন আর্দালী মারফৎ। সাহেব সুবোরা মুন্সী’র গৃহে আসিলে যে সকল মদ দিয়া তাহাদের আপ্যায়ন করিতেন মুন্সী সেই সকল মদ সেই সাহেব সুবোদেরো অনেকেই যে চোখে দেখেন নাই নিজ স্বদেশেও তাহা সাহেব সুবোরাও প্রায়শ লইতেন স্বীকার করিয়া।

       মা জননী’ দুইটি পুত্র সন্তানের গর্ভধারিনী। গুণে লক্ষী। রূপে দুর্গা। সুশীল পুত্র দুইটি ইস্কুলে যাইত। পাশ দিতো। জলপানি পাইতো। স্ত্রী দেখভাল করিতেন অন্তঃপুরের। দিনান্তে আসিত বস্তা ভরা মোহর। তথাপি মুন্সী একদিন আদালত হইতে আর গৃহে ফিরিলেন না।

দিন দুই দশ কাটিয়া গেলো খোঁজে খবরে জল্পনা কল্পনায়। অতঃপর আলোড়ন উঠিল মহকুমা শহরে। আশে পাশের অন্যান্য শহরে বাজারেও। ইংরেজ বাহাদুরও যোগ দিলেন সেই অনুসন্ধান পর্বে কিন্তু তথাপি বছর ঘুরিয়া গেলো চাঁদরাম আর ফিরিলেন না।

রহস্যের যবনিকায় সামান্য দোলা লাগিল আরো কয়েক বৎসর পরে যখন অজ গ্রাম হইতে মহকুমার আদালতে জমির মামলা লড়িতে আসিল এক গ্রামবাসী। প্রায় কপর্দক শূন্য। সম্বল এক উকীলের ‘মুসাবিদা’ করা মামলার কাহন, আইনের মারপ্যাঁচ। সটান সে গিয়ে খোঁজ করিল ‘ডাফ্‌’ নামক সাহেবের। ‘ডাফ্‌’ সাহেব ততোদিনে এ স্থান হইতে বদলী হইয়া গিয়াছেন। তবে ঘটনাটিতে আকৃষ্ট হইয়া বয়ষ্ক ‘চার্লস্‌ সাহেব’ ডাকাইলেন তাহাকে। বলিলেন ‘ কে তোমাকে ডাফের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বলিয়াছে?’ নগেন দাস, সেই বাদী, ভয় পাইল। বলিল ‘ আজ্ঞা , আমি কিছু জানিনা ... আমার গ্রামের মোক্তার বাবু বলে দিয়েছেন...’

সাহেব বলিলঃ কি নাম সেই মোক্তারের?

নগেন দাস কিছু একটা নাম বলিলে সাহেব ভ্রূকুটি করিল। বলিল ‘ ওকে, মামলার কাগজ দেখাও ...’

ভয়ে ভয়ে নগেন দাস কাগজ পড়িতে দিলো সাহেবকে। কাগজ খানি পড়িতে পড়িতে সাহেবের ভ্রূকুটি আরো কূটিল হইল। সে বলিলঃতুমি মিথ্যা কথা বলিতেছ। এই মুসাবিদা তোমার গ্রামের কোনো উকীল মোক্তারের হইতেই পারেনা ...ওই সমস্ত গাধাদের লেখার দাড়ি, কমাও আমি চিনি। সত্য বলো কে তোমাকে লিখিয়া দিয়াছে এই কাগজ, কে’ই বা তোমাকে বলিয়াছে ডাফের সহিত সাক্ষাৎ করিতে ...’ একটূ থামিয়া , একটি কড়া বর্মা চুরুট জ্বালাইয়া লইয়া সাহেব আবার বলিলঃ যদি সত্য বলো তবে আমি নিজে এই মামলায় তোমার সহায় হইব ...

     আকাশ পাতাল ভাবিয়া, নাকের জলে চোখের জলে এক করিয়া তবে মুখ খুলিল নগেন দাস। বলিলঃ হুজুর আমার মা বাপ্‌ ...মিথ্যা বলিব না...গিয়াছিলাম প্রয়াগে, ত্রিবেণীর মেলায় ...ধর্ম করিতে। সেখানে এক সাধু পেলাম ... বাংগালী সাধু ...আমাদের দেশী ভাষায় কথা বলেন ...তাঁকে বলেছিলাম দুঃখের কথা...শুনে তিনি নিজেই লিখে দিলেন এই মুসাবিদা ...বলেদিলেন এ নিয়ে যেন ডাফ্‌ সাহেবের সঙ্গে দেখা করি...’

সমস্ত শুনিয়া আরো কিছুক্ষন চুপ থাকিল সাহেব। সিগার টানিল। কেহ কেহ বলে ঐ সময় ঐ দুর্দান্ত সাহেবের শ্যেন চক্ষুতেও না’কি দেখা গিয়াছিল অশ্রুর আভাস...সাহেব বলিলঃ কেমন ছিল দেখতে সেই সাধু? ধন্দে পড়িয়া গেলো নগেন দাস। সাহেব কি ঐ সাধুকেই খুঁজিতেছে? জেলে দিতে চায়? এমন উপকারীর এমন ক্ষতি সে জানিয়া বুঝিয়া করে কিভাবে? তাই সে যথাসম্ভব বিপরীত বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইল ... ‘ সাধু? তিনি তো বেঁটে...কালো মতন...’ আবার ধমক দিলো সাহেবঃ তুমি আবার মিথ্যা বলিতেছ...আমি বলি শূন, সে লম্বা। লম্বায় আমারি সমান...উজ্জ্বল গৌর বর্ণ...বলো ঠিক কি’না ...’  এইবার আবার নগেনের নাকের জলে চোখের জলে এক হইবার পালা...সাহেব বলিলঃ ভয় নাই, আমি তাহার কোনো ক্ষতির জন্য তোমাকে এতো সব কথা বলিনাই ...সে আমার বন্ধু...’

সাহেব মুন্সীর বাড়িতে খবর পাঠাইলেন ‘চাঁদরাম জীবিত। সে সন্ন্যাসী হইয়া গিয়াছে ...’

কাটিয়া গেলো – যেন বা – আরো একটি যুগ। গ্রীষ্মের করাল দ্বিপ্রহর।  চাঁদরামের পুত্রেরা এখন আয়, ইয়পায় করিয়া থাকে। কনিষ্ঠ শিবেন্দ্র চন্দ্রও প্লীডার হইয়াছেন। নিরুদ্দিষ্ট চাঁদরামের মতন না হইলেও পসার তাঁহারো বিপুল। বিবাহ হইয়াছে। ভিটাতে খেলিয়া বেড়ায় দু একটি কচিকাঁচাও। অভাব নাই আশ্রিত ও আত্মিয়রো।

গ্রীষ্মের করাল দ্বিপ্রহর।   আত্মিয় এবং আশ্রিতেরা প্রায় সকলেই নিজ নিজ কক্ষে অথবা খাটে পালংকে নিদ্রায় অন্যথায় নানারূপ জটিল আলোচনায় নিমগ্ন।  ছোটো মেয়েটি ঘুমাইতেছে। পাহাড়ায় রহিয়াছে আজিজের মা। বড় মেয়েটি গিয়াছে পাশের বাড়ি। তাহার সইএর সঙ্গে খেলিতে। এই সময়টুকুই একটু অবসর হাসির। পাক্‌ ঘরের পাট চুকাইয়া বড়ঘরের দিকে যাইতে যাইতে কানে আসে শব্দ। বাঁশের গেইট খুলিবার। পদশব্দ তারপর। আশ্চর্যের কিছুনাই। এই বাড়িতে অতিথি আসে যখন তখন। আজিজের মা আছে। আগাইয়া গিয়া দেখিবে নিশ্চয়। ধীরে সুস্থেই বড়ঘরের দিকে পা বাড়ান হাসি।

   পিছনের দরজা দিয়া বাহির হইয়া আসে আজিজের মা। ‘অ গা ছোটো বউ, এক সাধুবাবা এসেছেন...বাড়ির বউএর খোঁজ করছেন...’ মাথায় ঘোমটা টানিয়া আগাইয়া যান হাসি।

দীর্ধদেহী এক সন্ন্যাসী। দেখিলেই মনেপড়ে ক্যালেন্ডারে ছাপা শ্মশ্রু গুম্ফ মন্ডিত মহাদেবকে...আপনা আপনি নত হয় মস্তক। আভূমি প্রনাম করেন হাসি। দেখাদেখি করে আজিজের মা’ও। উঠিয়া গিয়া এক কুলা চাল আনিয়া সন্ন্যাসীর ঝুলিতে ঢালিয়া দিলেন হাসি। সেই চাল হইতে এক চিমটি চাল ফিরাইয়া দিলেন সন্ন্যাসী। ইহা ভাঁড়ারে রাখিতে হয়। ইহাতে মঙ্গল হয় গৃহস্থের। হাসি চাল টুকু কূলায় রাখিলে সন্ন্যাসী আরও কি একটা আগাইয়া দেন হাসিকে। হাসি দেখেন একটি ধাতব মুদ্রা। সাধু বলেনঃ মা তোমার ঠাকুরের আসনে ইহা রাখিয়া দিও। দেখিও ইহার একপিঠে রহিয়াছে শ্রীরামের বনগমনের ছবি, অন্য পিঠে সিংহাসনে আসীন রামচন্দ্র...ঐ দিকটি সর্বদা উপরে রাখিবে...’ মুদ্রাটি কপালে ছোঁইয়াইয়া সন্ন্যাসীকে আরেক বার প্রণাম করিতে গিয়া হাসি দেখেন সন্ন্যাসী নাই...যেন অদৃশ্য হইয়াছেন মুহুর্তে...

    কিয়ৎক্ষণ ঐখানে দাঁড়াইয়া থাকিয়া বড় মেয়েকে ডাকিতে উদ্যত হন হাসি। এই বাসি কাপড়ে ঐ মুদ্রা নিয়া ঠাকুরের আসনে রাখা যায়না। বরং মেয়েই রাখুক্‌ ... সে এখনো শিশু, সদা পবিত্র...মেয়েকে ডাকিতে ভিতর বাড়ির দিকে যাইতে যাইতে অকস্মাৎই কথাটি উদয় হইলো তাঁহার মনে ... কে এই সাধু? তাঁহার কর্ত্তার পিতাওযে গিয়াছিলেন সাধু হইয়া ... মেজাজী মানুষ ছিলেন এই শ্বশুর মহাশয়, সাহেব আর্টিষ্ট ধরিয়া নিজের ছবি আঁকাইয়া লইয়াছিলেন, আঁকাইয়া লইয়াছিলেন শাশুড়ির ছবিও...সেই ছবির সঙ্গে কোথাও কোনো মিল আছে কি এই সাধুর? কিভাবে থাকিবে – সেই ছবিতে শ্বশুরের অন্য রূপ ...আর ইনি ...আজ কতো বৎসর হইল তিনি সাধু হইয়াছেন... তবু সেই বিশাল উচ্চতা...চোখ...সাধুকে দেখিতে হইবে আরেকবার ...ফিরাইয়া আনিতে হইবে...হাসি ডাকেনঃ আজিজের মা...আজিজের মা...

আজিজের মা ছুটিয়া আসেঃ কি হল গ ছোটো বউ...

সাধুবাবা কোথায় গেলেন আজিজের মা? পারবে তাঁকে খুঁজে আনতে ...’ হতভম্ব আজিজের মা কিছু বুঝিবার, বলিবার পূর্ব্বেই আবার বলেন হাসিঃএই সাধুই আমার শ্বশুর গো...’ বলিয়াই তিনি ভাংগিয়া পড়েন কান্নায়...’ নিজের ঘর বাড়িতে এসেছিলেন এতোদিন পর ...আমি তাকে চিনতে পারলাম না গো...’

লোক ডাকাইয়া তাড়াতাড়ি সাধুর খোঁজ আরম্ভ হয়। লোক গিয়া খবর দিয়া আসে শিবেন্দ্র চন্দ্র’কেও। কাছাড়ি মুলতুবি রাখিয়া আসেন তিনি। খোঁজ খবর চলে সারাদিন। কিন্তু সাধুর আর কোনো খোঁজ মেলেনা...জানা যায়না তিনিই চাঁদরাম মুন্সী কি’না ... রহিয়া যায় সেই মুদ্রাটি...ঠাকুরের আসনে ...আদ্যাপি রহিয়া গিয়াছে সেই মুদ্রাটি...হায়,আজ হয়তো দিন আসিল সেই মুদ্রার অপর পিঠের সেই রামচন্দ্রের বনগমনের ছবির প্রতীক টিকে ষ্পষ্ট করিবার ...

সেই যুগ হইতে আঁচলে বাঁধা কাঁচা পয়য়ার মতো গড়াইয়া নামিল এই যুগ। তথাপি চাঁদরাম মুন্সী আর ফিরিলেন না।

৩।

দ্বিপ্রহর গুলি ইদানীং মধ্য রাত্রির মতনই নিঝ্‌ঝুম হইয়া উঠে। কিছুদিন আগেও এমনটা ছিলনা। তখনো এমনি দুপুরবেলা রাস্তা হইয়া উঠিত নদী। সকালের ইস্কুল ভাঙ্গিয়া দলে দলে কাচ্চাবাচ্চা নামিত রাস্তায়। হৈ হৈ করিয়া বাড়ি ফিরিত শ্যামল আর শিখা। শিশিরের ভ্রাতা ফটিকের দুটি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে। ইহারা আসিয়াই পিসীমার প্রতি ধাবিত। তারপর ইহাদের স্নান করাও রে, খাওয়াও রে ... সেই এক পর্ব্ব। এই পর্ব শেষ হইলে নিজেদের স্নান খাওয়া। ইহার পরে পাড়ার বৌ’ঝিরাও আসিত এক দুইজন। কিন্তু এখন সমস্তই কেমন গিয়াছে বদলাইয়া। ফটিকের ছেলেমেয়েদুটিকে ইস্কুলে পাঠানো হয়না আর। পাড়ার অর্ধেক মানুষ চলিয়া গিয়াছে। যাহারা রহিয়াছে তাহারাও পরিকল্পনা করিতেছে হিন্দুস্থান যাইবার। কেহই আর কাচ্চাবাচ্চাদের পাঠায় না ইস্কুলে। ফলে নাই সেই কলরব, নাই বৌ’ঝিদের আড্ডা মারিতে আসা। এমন কি বাড়ির কাচ্চাবাচ্ছা গুলিও আজকাল তেমন গোল করেনা। ইহারাও যেন কিছু টের পায় ...

পিছনের বারান্দায় বসিয়া বাচ্চা দুইটি যেন খেলিতেছে। ইহাদের খেলাতেও ইদানীং কোলাহল নাই। গেইটের শব্দের দিকে কান ইহাদেরো খাড়া থাকে। শব্দ হইলেই ছুটিয়া যায়। কিন্তু দরজা পারায় না। বারান্দায় যায়না। ইহাদের বারন করা হইয়াছে। লোহার গরাদ দেওয়া জানালার কিনারে ভাইবোনে একটি চেয়ার আনিয়া রাখিয়াছে। ঐ চেয়ারে উঠিয়া দেখে কে আসিল গেইট পারাইয়া। সদরের দরজাও থাকে বন্ধ। অথচ এই সদর দরজা চিরদিন খোলা ছিল পরিচিত, অপরিচিত, হিন্দু, মুসলমান সকলের জন্য। প্রায় মধ্যরাত্রে বন্ধ হইত এই দরজা। তাহার পরেও কেহ আসিয়া পরিত। শেষ রাত্রে। ভোর বেলা। কোনো কোনো রাত্রে অই দরজা বন্ধই হইতনা। শিশির ভাবেন। মনেপড়ে যে বার সুভাষ বসু আসিলেন ঐ বারের কথা। বাবা নরমপন্থী ছিলেন না কোনোদিনই। বিপিন পাল, চিত্তরঞ্জন দাশ ইঁহারাই ছিলেন বাবার ‘নেতা’। তবুও টিঁকিয়াছিলেন কংগ্রেসের সঙ্গে। কিন্তু ত্রিপুরী কংগ্রেসের পরে দলাদলি স্পষ্ট হইল। বাবা আর তাঁহার অনুগামীরা সুভাষ বসু’র পক্ষ লইলেন।

    সুভাষ বসু  যে বছর আসিয়াছিলেন এই শহরে উঠিয়াছিলেন তাঁহাদেরি বাসায়। তখনো সুভাষ বসু’র হয়তো ধারনা ছিল যে কংগ্রেসের মধ্যে থাকিয়াও কিছু করা সম্ভব। তাই বলিয়াছিলেন যে অদূরেই বিশ্বময় যুদ্ধের সম্ভাবনা। ঐ সুযোগটিকে কাজে লাগাইতে হইবে ভারতবাসীকে। আরো অনেক কথা বলিয়া ছিলেন সভায়। আলোচনায়।  যদিও শিশিরের ইচ্ছা ছিল তাঁহার সমস্ত কথা, বাবার সঙ্গে, অপর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সকলি শুনিয়া লইবেন কিন্তু বাস্তবে সুভাষ বসু’কে দেখিতে আসা লোকজনের ভিড় সামলাইয়া, উহাদের চা, জলখাবার, ‘দুফইরা ভাত’, রাত্রের ভাত দিয়া তাহা আর হয়নাই। সভার বক্তৃতাটিই শোনা হইয়াছে কেবল। তথাপি মানুষটিকে এতো নিকট হইতে দেখারো যে সার্থকতা তাহাই শিশিরকে অদ্যাপি আন্দোলিত করে।

         রাত্রে বাচ্চাগুলিকে গল্প বলিয়া ঘুম পাড়াইতে হয়। কখনো এই সমস্ত গল্প গুলিই বলেন শিশির। বলেন তাঁহার কারাবাসের বৃত্তান্ত। বাবার খুব আহ্লাদের পাত্র ছিল এই বড় নাতি আর নাতনীটি। বাবার মৃত্যুর সময় শিখা একেবারেই ছোটো কিন্তু শ্যামলের বয়স চার হইয়া গিয়াছিল তখন। বাবার দেখাদেখি সে’ও মাথায় একটি গান্ধী টুপি পরিয়া থাকিত সর্বদা। বাড়িতে ‘ক্যামেরাম্যান’ ডাকাইয়া যে একমাত্র পারিবারিক গ্রুপ ফটোটি তোলানো হইয়াছিল বাবার জীবদ্দশায় তাহাতেও শ্যামলের মাথায় ঐ গান্ধী টুপি।

এক সময় রীতিমতো অক্ষরের পোকা ছিলেন শিশির। এই কিছুদিন আগেও এত সমস্ত ব্যস্ততার মধ্যেও নিঃশেষ করিয়াছেন পত্র পত্রিকা, নাটক নভেল। কিন্তু ইদানীং আর এক নাগাড়ে বই পড়িতে মন বসেনা শিশিরের। ‘কি হইবে আমাদের’ এই ভাবনা অবচেতনকে বিবশ করিয়া রাখিবার কারনে এলোমেলো কথা মনে আসে। আসে দুশ্চিন্তা।

এক সন্ধ্যায় আসিলেন আন্‌সার সাহেব। পিছনের পথঅটি ধরিয়া। নদীর পার দিয়া। সাইকেলটি শিব মন্দিরের নিকটস্থ ঝোপে লুকাইয়া।     দ্রুত আসিয়া বারান্দায় উঠিলেন আন্‌সার সাহেব। অন্য দিন নদীর পার হইতে নীচু স্বরে হারান কিংবা ফটিকের নাম ধরিয়া ডাক দেন নতুবা গলা খাঁকারি। আজ সটান উঠিয়া আসিলেন পিছনের বারান্দায়। উঠিয়াই নীচু গলায় ডাকিলেনঃ ‘মাষ্টারবাবু আছইন নি ? মাষ্টারবাবু?’ আন্‌সার সাহেবের স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যাহা সন্ধ্যার শান্ত নীরবতাকে মুহুর্ত্তে রক্তাক্ত করিল। এযেন ভূকম্পনের পূর্বে কুকুরের ডাকের সাইরেন ধ্বনি। ঐ স্বর কানে যাওয়ামাত্র শিশির যেন আমূল উঠিলেন কাঁপিয়া। হাতের কাজ রাখিয়া সঙ্গে সঙ্গে ছুটিয়া আসিলেন।

না, মামা ত’ নাই। কেনে কইন চাইন?’ তারপরই মনে হইল মানুষটিকে অন্ততঃ বারান্দায় আমন্রিন জানানো উচিত। তখন বলিলেন ‘... আইন, ভিত্‌রে আইন্‌...’

না দিদি। ভিতরে আওয়ার সময় নাই। আমার পিছেও চর ঘুরে যে ... আসল কথা হইল মাষ্টারবাবুর নামে হুলিয়া বাইর হইব, আজকে সব কাগজ পত্র ঠিক ঠাক করা হইতে আসিল ...’

হুলিয়া? কিয়ের হুলিয়া?...’ শিশির যেন চিত্রে অর্পিত। আধো অন্ধকার দাওয়ার মধ্যেই বসিয়া পরিলেন আন্‌সার সাহেব। বলিলেন ‘দিদি একটু জল খাওয়াইবা নি? গলাটা শুকাইয়া গেছে। শালার চর ইতারে এড়াইতে কত পথ ঘুইরা যে আইতে লাগ্‌সে ...’

ত্রস্তে জল আনিয়া দিলেন শিশির। আন্‌সার সাহেবের কন্ঠস্বরের তলোয়ার, শিশিরের ত্রস্ততা ভীত করিল সুলেখাকেও। পিছনের দিকের দরজার চৌকাঠে আসিয়া দাঁরাইলেন তিনি। তাঁহাকে ঘিড়িয়া কাচ্চাবাচ্চা গুলি। সকলের দেখাদেখি হারমোনিয়াম চর্চ্চা ছাড়িয়া শ্যামলও আসিয়া দাঁড়াইল পিছনের বারান্দায়। বড় মাপের পিতলের গেলাসের জলটুকু গলাধঃকরন শেষে ক্রমে স্থিত হইলেন আন্‌সার সাহেব। অতঃপর যাহা বলিয়া গেলেন তাহার তর্জমা হয় এই রূপ, যে,কাছাড়িতে আগুন দেওয়া, সরস্বতী পূজার দিনের দাঙ্গা, তিকোনা পুকুরের জোড়া খুন এই সমস্ত মামলায় এস.ডি.ও সাহেব বড়ই বিপাকে পড়িয়াছেন কেননা এই সমস্তের হোতা মূলতঃ তিনি নিজেই। ঐ কারনেই সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাসকেও পুরিয়াছেন জেলে। নতুবা ভয় এই, যে, সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাস যেহেতু নির্বাচিত এম এল এ ফলে আসন্ন কাউন্সিলে তিনি তুলিবেন প্রসঙ্গ গুলি। এইবার মামলাটিকে আরো জোরদার করিতে মিছা সাক্ষীর সহিত আরো কিছু হিন্দু, যাঁহারা ‘স্বদেশী’ আমলে ছিলেন নেতৃস্থানীয় উহা দিগকেও আনিতে হইবে মামলার আওতায়। আজ হারানের নামে হুলিয়ার কথা চলিতেছে কাল চলিতে পারে ফটিকের নামেও হুলিয়া বাহির করিবার তোড়জোর।

এইবার ‘দিদি মাপ করবা’ বলিয়া, ঐ দাওয়াতে বসিয়াই একটি কাঁচি সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করিলেন আন্‌সার সাহেব। কিছু সময় নিঃশব্দে ধূমপান করিয়া গেলেন অতঃপর। পরে, নদীর শরীরের ঘনবদ্ধ কুয়াশা ও অন্ধকারের দিকে চাহিয়া যেন করিলেন স্বগতোক্তিইঃ ‘ দিদি, অখন পাকিস্তান হইসে। এখন এরকম আর কতো কিছুই যে হবে ...’ থামিয়া যান আনসার সাহেব। হাতের সিগারেটে টান দেন। আবার বলেনঃ ‘আমার তো রুটির গুলাম। আমরার হাত পা বান্ধা। ইরকম অই বইয়া বইয়া দেইখ্যা যাওন ছাড়া আমরার গতি নাই। জানিনা আজ যে টুক করতে পারছি ভবিষ্যতে এ’ও পারমু কি’না’ ... প্রতিটি শব্দ, বাক্য যেন ভেদ করিয়া যায় সুলেখা আর শিশিরের বাস্তব অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুকে। আন্‌সার সাহেব বলেনঃ ‘ ইতা আসলে আপনেরারে ভিটা ছাড়া করবার কারসাজি। মাষ্টারবাবুরে বুঝাইয়া কইন,ফটিকবাবুরে বুঝাইয়া কইন’। আন্‌সার সাহেবের কন্ঠের রক্তাক্ততা না’কি শিশির-সুলেখার অন্তর্গত রক্তপাত না’কি দুইয়ে মিলিয়াই যে আবহ রচিত হয় তাহাতে নিতান্ত কোলের শিশুটিও হয় বাক্‌রুদ্ধ। ইহাদের কোলাহল থামিয়া যায়। মা কিংবা পিসী’কে ছুঁইয়া ইহারাও রচনা করে এক নির্বাক বৃত্তের। আবার শোনা যায় আন্‌সার সাহেবের স্বরঃ ‘ আপনেরা হিন্দুস্তান যাইন গিয়া’ চাপা গলায় বলেন আন্‌সার সাহেবঃ

হুলিয়া বাইর হইতে আরো এক দুই দিন  সময় লাগব। এরমইধ্যে আপনেরা যাইন গিয়া। আমি সব ব্যবস্থা কইরা দিমু। মাষ্টারবাবুরে কইবা কাইল যেন অবশ্যই ইস্কুলে যাইন ...’ 

কথাগুলি বলিয়া লইয়া যেমন আকস্মিক ভাবে আসিয়া ছিলেন তেমনি আকস্মিক ভাবে চলিয়া যান আন্‌সার সাহেব। যেন মিলাইয়া যান নদীর বুকে নামিয়া আসা অন্ধকারের সূচীভেদ্যতায়। ক্রমে তাঁহার এলোমেলো চিন্তা দানা বাঁধিতে থাকে। পুনরায়। তাঁহার মনেহয় তবে  কি রেডিওতে একদা ঘোষিত ‘পার্টিশন’ অবয়ব লইতে আরম্ভ করিল সদ্য পাকিস্তান হওয়া এই মহিকুমা শহরেও? যাইতে হইবে? কিন্তু কেন? যাইতে হইবে? কিন্তু কোথায়? এই ভিটাবাড়ির কি হইবে? কি হইবে এই শিশুগুলির ভবিষ্যৎ? এই দেশের স্বাধীনতার জন্যই কি একদা জেলে পঁচিয়া মরেন নাই ইঁহারা সকলে? এই যে সুরেশ বিশ্বাস, যাঁহাকে মিথ্যা আরোপ দিয়া ফাটকে চালান করিয়াছে আন্‌সার বাহিনী তাঁহারোতো জীবনের আশি ভাগই কাটিয়া গিয়াছে জেলেই । বয়সের ও বিশ্বাসের সামান্য তারতম্য থাকিলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই মানুষটি  বাবার কিনারে সর্বদা আসিয়া দাঁড়াইতেন। তথাপি কেবলমাত্র ভীতির বশে এই বিপদের সময় মানুষটিকে গিয়া চোখের দেখাও দেখিয়া আসা হইবে না?

হায়, এই দেশ স্বাধীন হইল, এই দেশ ভাগ হইল, এই দেশে হিন্দু মুসলমানে দাঙ্গা হইল, এই দেশ ছাড়িয়া পলাইতে হইল, কিন্তু কেন? কেন এই আন্‌সার সাহেবেরা হারিয়া যায়, হারিয়া গেলো নেহেরু আর জিন্না’ আর ‘মহাত্মা’র খেতাবের কাছে?






Thursday, August 27, 2015

এই অগাস্টের ছায়া, এই অগাস্টের ছবি …




এই অগাস্টের ছায়া, এই অগাস্টের ছবি …