Thursday, February 16, 2017

“কে উঁচু?”



“কে উঁচু?”

“রবীন্দ্রনাথ দাঁড়ালেন ন্যুইয়র্কের
                           ষাটতালা বাড়ির ছায়ায়
       কে উঁচু? – উচ্চতা
চূর্ণ-চূর্ণ হলো দৈত্যরাজ্যে” – অমিয় চক্রবর্তী, তিন প্রশ্ন



এখন সবই “বড়” হচ্ছে। “বড়” “বড়” হচ্ছে।
এখন সবই “উঁচু” হচ্ছে। নিচু “উঁচু” হচ্ছে।
ছোট ছোট বাড়ি মুছে বড় বড় এপার্টমেন্ট। শহরের ছোটো গন্ডী বড় হয়ে “নিউ শিলচর”, “নিউ করিমগঞ্জ”, “নিউ টাউন”।
আর বাইরেটা যত “বড়” হচ্ছে, “উঁচু” হচ্ছে মনেহয়, ভেতরে ভেতরে ছোটো থেকে ছোটোতর, নিচু থেকে নীচতর - হয়ে যাচ্ছে প্রাণ –যেনবা নিষ্প্রাণ বস্তুদের জন্য “বড়” হয়ে উঠবার, মস্ত হয়ে উঠবার, উঁচু হয়ে উঠবার  স্থান করে দিতেই …
আমি যে প্রজন্মের সে’ও, অন্য সমস্ত প্রজন্মের মতোই, সমান অভিশপ্ত। তবে এই প্রজন্মের বিশেষ অভিশাপটি এই, যে, এরা হাতেগোণা হলেও কিছু বড়, প্রকৃত বড় প্রাণকে একদা দেখেছে আর এখন দেখছে নিস্প্রাণের “বড়” হওয়াকে। - এই প্রজন্মের যারা এই নিস্প্রাণের “বড়” হওয়াকে – ‘প্রগতির আশীর্বাদ” বা “গ্লোবালাইজেশন”এর প্রসাদ মেনে মস্তিময় তাঁরা ধন্য। তাঁরা সুখী। কিন্তু আরেকদল, যারা আমার মত, যারা আকাশচুম্বী এপার্টমেন্টে, “মল্‌”এ দেখতে পায় প্রাণের মৃত্যু আর নিষ্প্রাণের জিত তাদের সুখ-শান্তি আমৃত্যু রয়েযাবে কাঁটাতারের ওইপাড়ে।
আমাদের প্রত্যন্ত মফস্বলও এখন ক্রমে বাড়ছে। অচিরেই “নিউ করিমগঞ্জ” বা “করিমগঞ্জ নিউ টাউন” এসে পড়বে নিশ্চিত। বিগতযৌবনার স্তনের মত বিস্তার বাড়ছে কিন্তু হারাচ্ছে পেলবতা, আকর্ষণ। অথচ এই “বড়” হওয়ার যুগের আগে, এই “বড় হওয়া” যুগের আগে – যখন সেটেলমেন্ট রোডও শহরতলী আর টিল্লাবাজার ত প্রায় সীমান্ত – যখন “বড়” বাড়ি বলতে একমাত্র মনোরঞ্জন বণিকের তেতলা “রাধাকুঞ্জ” – তখন ছিলেন এই শহরে অমিতাভ চৌধুরি, ছিলেন এই শহরে, মনোজ মোহন চক্রবর্তী। ছিলেন অধুনা স্বর্গীয় দিলীপ পাল চৌধুরি, রঞ্জিত দাশ, সুশান্ত পাল। ছিলেন স্বর্গীয় দেবব্রত সোম মহাশয়।
                                               অমিতাভ চৌধুরি পড়াতেন ফিজিক্স। করিমগঞ্জ কলেজে। যেহেতু বারো কেলাশের পরেই ‘মিস্ত্রি’ হয়ে টাকা রোজগারের ধান্দাসংলগ্ন ডিগ্রী সংগ্রহে লেগে পড়েছিলাম, তাই, ফিজিক্স তথা অন্যান্য প্রকৃত বিজ্ঞানের পাঠের পাট আমার চুকে গিয়েছিল বারো কেলাসেই। তথাপি নিউটনের আপেলের মাটির দিকে নেমে আসার মর্মের রহস্যের প্রতি মুগ্ধ হতে পারার, নিবিষ্ট হতেপারার শিক্ষাটি ওই অমিতাভ চৌধুরির কাছেই পাওয়া। তাঁর কাছে পদার্থবিদ্যার হাতেখড়ি নাহলে হয়ত পরবর্তীতে আইনস্টাইন, হকিং, ফাইনমুয়ান, শ্রডিংগার পাঠ করবার, অনুধাবন করবার ইচ্ছাটিই হতনা জাগ্রত।
                                           ক্যালকুলাসের অন্তর্গত দর্শনের ইঙ্গিত পেয়েছিলাম ওই ছোটো শহরের ছোটোখাটো রঞ্জিত দাশ স্যারের কাছে। শিবানী ম্যাডামের কাছে জেনেছিলাম এলজাবরার অন্তর্গত ইঙ্গিত। তারও আগে গণিতশাস্ত্রকে ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন দিলীপ পাল চৌধুরি। … আর কত মুখ মনে আসছে … ক্রমে লিখে যাব তাঁদের কথাও – যাঁরা প্রাণে বড়, মেধায় বড়, অন্তরে বড়।
হে “বড়” এপার্টমেন্ট, বড় শহর, বড় নাগর-নাগর, জেনেরেখ তোমরা কোনোদিন পারবেনা ওই ছোটো শহরের বড় বড় প্রাণগুলির কথা মুছে দিতে।
নিউইর্কের ষাটতলা বাড়ি আজ যদি ষাট হাজার তলাও হয়, তবু, রবীন্দ্রনাথ তার মুখোমুখি দাঁড়ালে, অদ্যাপি, “কে  উঁচু” এই প্রশ্নে , কোনো এক অমিয় চক্রবর্তীর মর্মে কেঁপে উঠবে উচ্চতার সংজ্ঞা।


[আলোকচিত্রটি আমাদের প্রণম্য অধ্যাপক শ্রী অমিতাভ চৌধুরি মহাশয়ের যিনি বর্তমানে গৌহাটি নিবাসী]

Saturday, January 14, 2017

আঁচল



 আঁচল

রাখবে যদি জড়িয়ে আঁচলে
তাহালে  এ আঁচল বিস্তার
করে দিতে হবে, সখী,
আগুনে, বাতাসে, জলে
শুধু নয় –
পাপে,কামে, মর্ষ অনাচারে।
অক্ষরের চোরকাঁটা বিঁধে
আঁচলটি ছিড়ে গেলে তবু
ঢেকে নিতে হবে সে আঁচলে
সুঁড়ির দুয়ার আর গণীকা ভগিণীদের
ছেঁড়াফাঁরা স্তন, নাভি, ঊরু।

রাখবে যদি জড়িয়ে আঁচলে
তাহলে বিস্তার করে
দিতে হবে, সখী,
দ্রৌপদীর শাড়ির মতন
নানাবর্ণে, ঘামেরক্তে,
তোমার ওই অমলিন 
বিশুদ্আঁচল।

নতুবা অনর্থ হবে।
শুঘু ছিঁড়ে যাবে
আঁচলে আজন্ম বন্দী
   অভীপ্সার সব ফুলদল।