Monday, December 5, 2016

সম্পর্ক সম্পর্কেঃ দিনলিপি



সম্পর্ক সম্পর্কে
মানবিক সম্পর্কগুলি যেন একেকটি চাকের মত। মৌচাক। বোলতার চাক। যে চাক ক্রমে ক্রমে অবয়ব নেয়। দানা বাঁধে।
মাকড়সার জালের মত। যে জাল ক্রমে ক্রমে জ্যামিতি। জটিলতর।
দানা বাঁধে। কিন্তু ঠিক কিসের আঠায়? জটিল জ্যামিতি হয়। ঠিক কোন রসে? –মনেহয় স্থূল কিংবা সূক্ষ কোনো প্রয়োজনের অন্তর্গত তাগিদেই এই দানা বাঁধা। এই জ্যামিতির বিস্তার। যদি স্থূল কিংবা সূক্ষ প্রয়োজনের টান, ‘সম্পর্ক’ নামক সেতুর দুই প্রান্তে দাঁড়ানো দুটি মানুষের – ক্ষয়ে যায় তাহলে জালটি হয়ত থাকে কিছুদিন – যতদিন না তাতার বাতাস এসে ছিঁড়ে যায় তাকে। কিন্তু থাকেনা উর্ণনাভটি। থাকেনা বোলতাগুলি। মৌমাছিরা। থাকে চাক। শূন্য চাক। থাকে নিষ্প্রাণ সম্পর্কের মাইলফলক।
সন্তানের সম্পর্ক, মাতার সঙ্গে, সন্তানটির সাপেক্ষে, জঠরবাসের ইতিহাসহেতু না’কি ক্ষুন্নিবৃত্তির স্তনাশ্বাসহেতু? – যদি মাতৃস্তন্যে শিশুর প্রয়োজন না থাকত তাহলে শিশু মা’কে ‘নামের নেশায় ডাকত’ কি? মনেহয় না। মনেপড়ে একটি বৈকালের কথা।
মফস্বলি বৈকাল। সিভিল হাসপাতালের কিনারেই “কাকা”র দোকান। চা,মিষ্টি,সিঙ্গারা,কচুরি –ইত্যাদি। ছোট একটা আড্ডা, আমাদের, মূলতঃ সাবর্ণিদাকে ঘিরেই বসত, আমাদের। সেই আড্ডায় সেদিন পৌঁছে গেছি আগে আগে। বসে আছি লাস্ট বেঞ্চিতে। আড্ডা বেঞ্চি। একদা “হগ সাহেবের মার্কেট” এ চুল ছাঁটা “কাকা” স্বহস্তে চা দিয়ে গেছেন। এটা অফ্‌ টাইম। সন্ধ্যা আরেকটু ঘনালে ভিড় হবে। ভিড় হয় সকালে। ভিড় হয় দুপুরে। মূলতঃ হাসপাতালে রোগী দেখতে আসা বা রোগীর দায়িত্বে থাকা আত্মিয়, অনাত্মিয়রাই আসে এখানে। চা খেতে। সিঙ্গাড়া, ঘুঘনি খেতে। চা’য়ের চুমুকে অলস চোখে দেখছি সামনের রাস্তায় কারা আসছে, কারা হাসছে। ঠিক তখুনি দোকানে এসে ঢুকল এরা।
দোকানে এসে ঢুকলো এরা দুইজন। বসলো মুখোমুখি। একটি যুবক। একটু যুবতী। যুবকটির মুখ আর যুবতীর পিঠ আমার  মুখোমুখি। টেবিলে কনুই রেখে পরস্পরের দিকে তাদের ঝুঁকেপরা দেখে সম্পর্কের একটা আন্দাজা আপনি লেগে গেলেও যুবতীর পিঠটি তেমন দ্রষ্টব্য নয় বলে নজর দিলাম না। ওরা অর্ডার দিল। “কাকা” ব্যস্ত। তাদেরকে পারহয়ে গিয়ে চারমিনার সিগারেট কিনলাম। সিগ্রেটের দোকানে দাঁড়িয়েই একটা সিগারেট শেষ করে দ্বিতীয়টি টানতে টানতে দ্বিতীয় কাপ চায়ের জন্য যখন “কাকা”র আস্তানায় পা রেখেছি কানে এল প্রায় ফিসফিসানিঃ ‘আরেকটা সিঙ্গারা খাও? বলি?” পুরুষকন্ঠ। সস্নেহ। সপ্রেম। চোখ অনুসরণ করলো ধ্বনিকে। দুটি সদ্য শূন্য ঘুঘনির প্লেইট। সিঙ্গারা ছিল অন্য দুটিতে। মেয়েটির মুখে তখনও সিঙ্গারা। সে মাথা নেড়ে সায় দিল। যুবকটি আনন্দিত।
                             এরা যে কেতাবি সংজ্ঞায় “নিম্ন মধ্যবিত্ত” তা এদের পোষাকে, চেহারায় এমনকি বৈকালের দিকের আবছা তাদের ছায়াতেও লিখিত। সিঙ্গারা এলো। মেয়েটি মগ্ন হল সিঙ্গারায়। ছেলেটি দেখতে লাগল তার খাওয়া। তৃপ্তি করে খাওয়া। আমার চোখে ভেসে উঠলো ‘গীতাঞ্জলী’ রেস্টোরেন্ট। মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছি আমি আর আমার প্রেমিকা। ঠিক এমনিভাবেই। টেবিলে কনুই রেখে। পরস্পরের দিকে একটু ঝুঁকে। ঠান্ডা হচ্ছে কফি। দুজনেরই। জুড়িয়ে যাচ্ছে কাটলেট। ঘন্টা দুই সময় কেনা গেছে এই কফি আর কাটলেটের মূল্যে। মূল্য জোগাতে কলেজেপড়া প্রেমিকার হাতখরচ বাঁচানো সঞ্চয়ের সঙ্গে বেকার “আমি”র টিউশনি করা কিংবা গৌতমদা, শেখরদা’র কাছ থেকে “কোনো দিন ফেরৎ দিতে হবেনা” চুক্তিতে ধার করা টাকাপয়সা। কফি, কাটলেট – হয়ত একটু পরে বিরিয়ানি – হয়তো পাঁচ সাত চামচ খাব। আসলে সময় কেনা। আর কিছু নয়। কেউ ক্ষুধার্ত নয় –
    ভাবি যদি আমাদের একজন অন্ততঃ সত্যি ক্ষুধার্ত হতাম, “কাকা”র দোকানের যুগলটির মত, তাহলে? তাহলে নিশ্চিত, যে, অন্ততঃ আরো একটু ভালোবাসা, ভালোলাগা ঘিরে ঘরতো আমাদেরকে। ওই সময়টুকুর জন্য। অন্ততঃ। ‘প্রেম’ আর ‘প্রয়োজন’ বাঁধা পড়ত – তাদের ওই তৃপ্তি করে খাওয়ার আর একের তৃপ্তি দেখে অপরের মর্মে সহসা খুলে যাওয়া মমতা নির্ঝরের কলতানে।
হ্যাঁ, এমনই কিছু, এমনই কোনো নৈমিত্তিক প্রয়োজনকে ঘিরেই বোধহয় সম্পর্কের দানা বাঁধা। টিঁকে থাকা। চারাগাছ থেকে মহীরূহ হয়ে ওঠা। নৈমিত্তিকতার কিনারে এসে দাঁড়ানো যদি না থাকে তাহলে ‘সম্পর্ক’ হয়ত আসলে মরে যায়। ‘চিতা শুধু পড়ে থাকে তার,/ আমরা জানি না তাহা; — মনে হয় জীবনে যা আছে আজো তাই শালিধান/ রূপশালি ধান তাহা… রূপ, প্রেম… এই ভাবি… খোসার মতন নষ্ট ম্লান/ একদিন তাহাদের অসারতা ধরা পড়ে” ...
... এই নৈমিত্তিক প্রয়োজন হতে পারে পেট ভরে ভাত খাওয়ার, রোগশয্যায় মাথায় হাত রাখবার, দপ্‌ করে জ্বলেওঠা কামনার মুহুর্তে উরুতের ভাঁজে টেনে নেওয়ার এমনকি, নেহাৎ কথা বলবার বা চিঠি লেখবার ... তবু “ঈশ্বর”কে ডাকার মতন, বলার মতন ‘রক্তমাংসহীন’ প্রয়োজন – লোভে বা সহজ বিশ্বাসে – এ নয়।
একবার, আমার পরিণত বয়সেই, আশি পেরোনো বৃদ্ধকে দেখেফেলেছিলাম তাঁর আশি পেরোনো পত্নীকে “লিপ্‌কিস্‌” করার মারাত্মক মুহুর্তে। ‘সমাজ’, ‘সামাজিকতা’, “শ্লীলতা”, “অশ্লীলতা”হেন শব্দকে প্রায় আবাল্য তোয়াক্কা নাকরা আমিও ঘেমে যাচ্ছিলাম ওই দৃশ্য থেকে পালিয়ে আসতে আসতে। পালিয়ে এসেও ঘামছিলাম সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে। টের পাচ্ছিলাম কাউকে বলতে হবে। এখুনি বলতে হবে কথাটা। এই প্রয়োজন, বলার, মধ্যরাতে মদ্যাপ্লুত হয়ে, ফোনে পদ্য শোনানোর মতো খেউড় নয়। রক্ত মাংসের শারীরিক প্রয়োজন। ঠিক যেমন আমার বাবাকে যখন ক্যামো-থেরাপি দেওয়া হচ্ছিল, তখন, প্রতিটি ক্যামো’র পরে কারোর কাছে ‘বলা’র মারাত্মক ‘প্রয়োজন’। - সিদ্ধার্থকে ফোন করলাম। “নেটয়ার্ক বিজি”, তিনবারের চেষ্টায় জোনাককে পাওয়া গেলো। বলাগেলো। শ্বেদস্নান থামল। আমার। যেমন বাবার ক্যামোথেরাপিকালে শেখরদার সঙ্গে কথাবলার পর থামত অন্তর্গত রক্তস্নান। - এই ‘প্রয়োজন’ই ‘সম্পর্ক’। ঠিক এরকম প্রয়োজনেই প্রতিটি কার্য বা দুষ্কার্যের পর, নিজের কথাগুলি বলবার প্রয়োজনে তথাকথিত দুষ্কৃতীরা হানাদেয় গণিকাভগিণীদের সমীপে। ‘কথা’ যে অর্থে ‘ইশারা’ সেই ‘ইশারা’ তখন ধ্বনির পরিবর্তে ভর করে, হয়ত, শরীরকে। তবে অপরাধ তত্ত্বের রাশিবিজ্ঞান বলে, যে, তথাকথিত এই ‘অপরাধী’ ভ্রাতারা, অন্ততঃ তথাকথিত অপরাধান্তে যখন যায় তাদের গণিকাভগিণীদিগের নিকটে তখন শারীরিকতার লিপ্ত হয়না নব্বই ভাগের বেশীজনই। হয় বেহেড মাতাহ হয়ে আত্মগ্লানিতে পুড়িয়ে বলেযায় তার “পাপ”এর কাহন নতুবা কৃতকর্মটিকে একটি বিরাট সাফল্য বলে তার কারিশমা দেখিয়ে তৃপ্ত করে আপন অহং। - প্রায় সমান্তরাল কারনেই পশ্চিমে, বেশ কিছুকাল ধরেই, বাঁধা মেয়েমানুষের মতো, মধ্যবিত্ত আম্‌ পাব্লিক পুষে রাখে একেকজন সাইকিয়াট্রিস্টকে।
অর্থাৎ ‘কথাবলা’ এই সামান্য নৈমিত্তিকতাও সেতু। আরোগ্যের। অতএব এ’ও এক সম্পর্ক যেখানে একজন শ্রোতার জন্য তৃষ্ণার্ত আর আরেকজন সেই শ্রোতা হয়ে গিয়ে আনন্দিত হয় তার ‘সম্পর্কিত’ মানুষটির তৃষ্ণাপূরন দেখেনিয়ে – “কাকা”র দোকানের সেই যুবকেরই মত। - ভাড়াটে “সাইকিয়াট্রিস্ট” আর “কাইন্সিলিং” পার্টি কতটা তৃপ্ত হন জানিনা এই সকল বকবকানি শুনে তবে এই সকল বকবকানির নিমিত্ত হয়ে গণিকাভগিণীরা অনেক সময়েই নিজ অস্তিত্বের, পেশার মর্মে আলোকিত পুনর্জন্ম পান।
এই সকলি আমার মত। অন্য সমূহ তত্ত্বের মতনই। সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর আবর্তন ঘটেনি, ঘটেনা নিউটনের তত্ত্বহেতু। আদতে পৃথিবীর সূর্যকে পরিক্রমার সত্যটির একটি বা দুটি বাস্তবতাকে ছুঁয়ে থাকে তত্ত্ব। -আমি অনেকদিন হল বন্ধুদের সঙ্গে, মা’বাবার সঙ্গে ফোনে কথাবলা প্রায় বন্ধই করেছি – মর্মে প্রবল ইচ্ছার জলধিউচ্ছাস সত্ত্বেও, তার হেতু এই, যে, যেহেতু ভৌগোলিক ভাবে আমাদের অবস্থান কয়েক হাজার মাইলের দূরত্বে – অতএব ফোনে কথাবলা’র মাধ্যমে আমি পারব না, কোনো ভাবেই, তাদের নৈমিত্তিকতার শরীক হতে। বিপদে আপদে টাকা পাঠালেও – না। প্রতিদিন নিয়ম করে ফোন করলেও – না। ভিডিও কল্‌ করলেও – না। বরং যে চায়ের দোকানীটি, শ্মশাণের পাশে, আমার সদ্য পত্নীহারা বান্ধবটিকে মমতায় এক পেয়ালা চা দিয়েছিল সেই রাত্রে, যে শেয়ালের মত ধূর্ত্ত লোকটি  হাসপাতালে শেখরদার অসুখে রাত জেগেছে, সে, আমার যতই অপ্রিয় হোক্‌ আর আমি যতই প্রিয় হই শেখরদার, কৌশিকের – আদতে কিন্তু আমি সার্ত্রের সেই “ম্যান উইথাউট শ্যাডোজ” এর একজন ছায়া নাপড়া প্রেতই।

Monday, November 21, 2016

“হে পিতা, বাণিজ্য হোক শুরু আমাদের”...



“হে পিতা, বাণিজ্য হোক শুরু আমাদের”...
সপ্তর্ষি বিশ্বাস

যেহেতু সমূহ শিল্প প্রচেষ্টাই অন্তিমে এক সচেতন নির্মাণ প্রয়াস অতএব শিল্প হিসাবে পাঠক-শ্রোতা-দর্শক সমীপে তার সফলতার বিচার নির্মীত বস্তুটির সর্বাঙ্গসুন্দরতার উপরেই নির্ভরশীল। অর্থাৎ শিল্পযশোপ্রার্থী ‘বস্তু’টির নির্মাণপ্রচেষ্টার আবডালে কোন তত্ত্ব, জ্ঞান, দর্শন, শুভ বা অশুভ শিল্পীযশোপ্রার্থীকে দিয়ে এই কাজটি নিয়েছে করিয়ে এই সমস্তই শিল্পোপলব্ধির ক্ষেত্রে বর্জ্য। -  অবশ্যই এ’ও এক ‘মত’ মাত্র। রুচি মাত্র। ধ্রুব সত্য নয়। সর্বজনস্বীকৃত নয়। অপর সমস্ত ‘মত’ বা ‘রুচি’র মতই সীমিত সত্য। কিছুজনগ্রাহ্য। কিন্তু যেহেতু আমি এই বিশেষ মতে বা রুচিতে বিশ্বাসী, অন্ততঃ এতাবৎ, ফলতঃ আমার মর্মে, শিল্প বিচারে, এই ‘মত’ বা ‘রুচি’ ছায়া ফেলে। এই ‘মত’ বা ‘রুচি’টির নিরিখে শিল্পের সংজ্ঞাও পারে নথীবদ্ধ হতে। ‘ইজম’ও যায় খাড়াকরা। কিন্তু আপাততঃ তা আমার লক্ষ্য নয়। নির্মীত বস্তুটির সর্বাঙ্গসুন্দরতার নিরিখটি – ‘দাদা’,’সুর’,’ইম্প্রেশন’,’এক্সপ্রেশন’-সর্ব ‘ইজম’এই আমার অন্বিষ্ট।
যেহেতু শিল্পমাধ্যমগুলির মধ্যে কবিতার চর্চাতেই আমার নিবিড়তম স্বস্তি সুতরাং আমার সমস্ত শিল্পচিন্তাই প্রকাশিত, অন্তিমে, কাবিতাচিন্তার অবয়বে অতএব এই প্রকাশপ্রচেষ্টাটিতেও কবিতাই হবে আমার ‘Objective Correlative’ তাই প্রথমেই মনে আসছে ‘কবিতা’র সেই বহুবিদিত সংজ্ঞাঃ "Emotion recollected in tranquillity" – যা Wordsworth লিখেছিলেন “Preface to Lyrical Ballads” এ। পাশাপাশি আরেক যুগের আরেক যুগন্ধর কবি ও চিন্তাপ্রতিভা Eliot’ এর মতেঃ ‘Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the expression of personality, but an escape from personality’ [‘Tradition and the Individual Talent’] আবার Robert Frost’এর কথায়ঃ “Poetry is when an emotion has found its thought and the thought has found words” ...
এই তিনটি বা এবম্বিধ অসংখ্য ধারণার বা সংজ্ঞার দূরত্ব বা নৈকট্য নিয়ে আলোচনায় যাওয়া এখানে আমার বিধেয় নয়। বিধেয়টি, এইমাত্র, হয়, এই, যে নিজ নিজ কবিতাধারণায় দাঁড়িয়ে কবিযশোপ্রার্থীজন, অন্তিমে ‘কবি’ হতে পারলেন কি’না – না’কি কেবলি কবিত্বপূর্ণ কিন্তু অসংলগ্ন পংক্তিতে বিনষ্ট করেদিলেন কবিতার দেহ? – হ্যাঁ, আপাতঃ অসংলগ্নতাও কবিতা হতেপারে, কবিতার রীতি হতে পারে। স্থুল উদাহরণ Allen Ginsberg এর কবিতা। সূক্ষ উদাহরণ Octavio Paz এর কবিতা। পাঠক হিসাবে Ginsberg কে আমার বিরক্ত লাগে তাই তাঁর কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতে ইচ্ছে করছেনা তবে একথা সত্য যে আপাতঃ অসংলগ্নতার গহনে Ginsberg এর সুরটি বেজেওঠে কবিতা হয়েই। অথচ এই বাংলা ভাষায়, এই ধারাটির অনুকরণে একদা যেসব “পদ্য” লিখিত হয়েছে বা পদ্য “আন্দোলন” হয়েছে সেইসব অক্ষরপ্রচেষ্টা, হায়, ... কি এর হেতু ভাবতে গিয়ে মনে এসেছে একটি বাক্যইঃ “Immature poets imitate; mature poets steal; bad poets deface what they take, and good poets make it into something better, or at least something different.” [T.S. Eliot, The Sacred Wood] ...
যদিও রবার্ট ফ্রস্টের মতে কবিতা সেই নির্য্যাস যা অনুবাদে বিনষ্ট হয়েযায় সম্পূর্ণ তথাপি স্প্যানীশ নাজানা আমিটির উপায় ছিলনা ইংরেজি অনুবাদছাড়া তাই প্রিয় Octavio Paz এর The River এর কিছু অংশের ইংরেজি অনুবাদই উদ্ধার করছি আমার বক্তব্যকে সহজ অধিগমনের যোগ্য করতেঃ
The restless city circles in my blood like a bee.
And the plane that traces a querulous moan in a long S, the
trams that break down on remote corners,
that tree weighted with affronts that someone shakes at midnight
in the plaza,
the noises that rise and shatter and those that fade away and
whisper a secret that wriggles in the ear,
they open the darkness, precipices of a's and o's, tunnels of
taciturn vowels,
galleries I run down blindfolded, the drowsy alphabet falls in the
pit like a river of ink,
and the city goes and comes and its stone body shatters as it
arrives at my temple,
all night, one by one, statue by statue, fountain by fountain,
stone by stone, the whole night long
its shards seek one another in my forehead, all night long the
city talks in its sleep through my mouth,
a gasping discourse, a stammering of waters and arguing stone,
its story.
এই ইংরেজি অনুবাদের ছায়ায় একদা লিখেছিলাম নিম্নোধৃত পংক্তিগুলিঃ
উন্মত্ত নগরী এই
গুন্‌ গুন্‌ বেজে চলে
সারারাত নিদ্রাহীন আমার শোণিতে –
নগরীর প্রেতপ্রান্তে
লক্ষ্যহীন এরোপ্লেন, ট্রাম-বাস, বিগড়ে যাওয়া লরী
ঝাঁপ ফেলবার আগে গণিকার শেষ খরিদ্দার
আমাকে ইঙ্গিতে বলে নিশুত কাহিনী –

নক্ষত্রের গুপ্ত ইশারাতে
ব্যক্ত হলে স্বর আর ব্যঞ্জনের রীতি
নগরীর যোনিমূলে
আমি খেলি একা কানামাছি –
মাতাল অক্ষরগুলি এলোমেলো হেঁটে যেতে যেতে
অকস্মাৎ লুপ্ত হয় – ফুটপাথে, খোলা ম্যান্‌হোলে ...
নদীগুলি লক্ষ্যহীন মানচিত্র ধরে
উড়ে গিয়ে ফিরে আসে মুহুর্মুহু আমার শোণিতে ...
সঙ্গে আসে নগরীর সমূহ মর্মর মূর্ত্তি, প্রাসাদ, ফোয়ারা –

কবিতা রচনার এই ধারাটিও বাংলাভাষায় স্বাভাবিক ভাবেই ছায়া ফেলেছে। পাশাপাশি “রবীন্দ্রনাথের পর প্রথম আধুনিক রবীন্দ্রনাথ”থেকেই বাংলাভাষার কবিতায় ছায়া ফেলে আসছে, সমান্তরাল পথ কেটে সামনে এগিয়ে আসছে, কবিতাভাষা তথা ভাষাকে - পদাবলীর, বাউলের ভাষা ও ভাবনা। রামপ্রসাদ, কমলাকান্তও বাদ পড়েননি। ফলে নিবিড়তর অনুভুতিশীল, জটিলতর চিন্তনক্ষম কবিদের রচনাতে, বাংলা ভাষাতেও এসে পরেছে আপাতঃ সংলগ্নতাহীন উচ্চারণ, জটিলতর সমান্তরাল বাক্য বিন্যাসবিষ্ণু দে’র “ক্রেসিডা” কবিতার পাশাপাশি জীবনানন্দের “বেলা অবেলা কালবেলা”র পাশাপাশি রাখি গৌতম বসু’র কবিতা। পংক্তির সঙ্গে পংক্তির, ছবির সঙ্গে ছবির আপাতঃ সংলগ্নতা নাথাকার জ্যামিতি প্রতিজন কবির নিজস্ব হলেও জীবনানন্দ ও বিষ্ণু দে’ থেকে যে আলোক সরকার একেবারেই ভিন্ন বা আলোক সরকার ও অলোকরঞ্জন থেকে গৌতম বসু - তা অনুধাবনে কবিতাপাঠকের বেগ পেতে হয়না।
আলোক সরকার, গৌতম বসু, অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র -প্রমুখরা নিজ নিজ সময়ে সুনামির উদ্দামতা আর বিস্তার নিয়ে আছড়ে পরেছিলেন বাংলা কবিতায় । সেই সময় থেকে আজকে পর্যন্ত তাঁদের অনুরাগী অনেক। আর অনুগামী অনেক অনেক। অনুরাগীদের মধ্যে আমিও একজন। কিন্তু অনুগামীদের ব্যাপারে কিঞ্চিৎ আতঙ্কিত।
আতঙ্কিত, কেননা, এঁদের মধ্যে অনেক প্রকৃত কবিও আছেন কিন্তু এতাবৎ নিজস্ব কন্ঠ খুঁজে পাচ্ছেন না। কেন পাচ্ছেন না এই প্রশ্নের জবাবের মুখে প্রশ্ন ওঠে ঠিক কিসের অনুগমন করছেন তাঁরা?  এই অগ্রজ প্রকৃত কবিদের ভাবনাবলয়ের না’কি ভাষাবলয়ের? ভাবনাবলয় যদি স্পর্শ নাকরা যায় – যায় কি ভাষাবলয়ের অনুধাবন? সন্দীপন চ্যাটার্জী একবার কমলকুমার মজুমদারকে পত্রে কিছু লিখেছিল যার অর্থ হয় – দাদা গো, তুমি তো বেশ খোলতাই একখান ভাষা তোমার জন্য বানিয়ে নিয়েছ, আমি’ত দাদা ঘষে ঘষে শেষ পাচ্ছি, কিন্তু পারছিনা! – অর্থাৎ সন্দীপনের এই বোধটি, ওই পত্রটি লিখবার কালে, হয়ই নি, যে, ‘ফর্ম’ আর ‘কন্টেন্ট’ আসলে অঙ্গাঙ্গী। - ঠিক একই, অলিখিত পত্র, আমি পাঠকরি সমসাময়িক বহু কবিযশোপ্রার্থীর অক্ষরপ্রচেষ্টায়।  এইসব রচনাপ্রচেষ্টার শরীরে অনেক পংক্তি উজ্জ্বল হয়ে আছে কবিত্বে কিন্তু অন্তিমে সেই কবিত্ব ‘কবিতা’ হতে পারেনি। ঠিক যেমন উৎপল কুমার বসু’র সিংহভাগ অক্ষরপ্রচেষ্টা –
“দয়িতা, তোমার প্রেম আমাদের সাক্ষ্য মানে নাকি?
সূর্য-ডোবা শেষ হল কেননা সূর্যের যাত্রা বহুদূর”
– এহেন পংক্তির পরেও, এহেন পংক্তির পরেই মুখ থুবড়ে পড়েযেতে হয় কাঠামটিকে কেননা, যদি ধরে নিই, যে, রচনাসময়ে এঁর মনে কোনো গিমিক প্রবণতা আদৌ ছিলনা, তবে বলতে হয়, যে, ইনিও মূলতঃ জানতেন না ‘কবিত্ব’ আর ‘কবিতা’র মধ্যে তফাৎ করতে। তাঁরও ছিলনা এমন কোনো হাহাকার যাকে ভাষা দিতে তিনি কলম ধরেছিলেন যে অর্থে ঋত্বিক ধরেছিলেন ক্যামেরা আর এ’ও বলেছিলেন যে, যদি দেখি ক্যামেরা ব্যর্থ হচ্ছে আমার হাহাকারকে অবয়ব দিতে তাহলে লাথি মেরে চলেযাব ক্যামেরার মুখে, লাথি মেরে চলেযাব এই আয়তক্ষেত্রের সন্ত্রাসকে। - কোথায় সেই হাহাকার যে হাহাকারের শুশ্রূষায় “এই জল প্রকৃত শ্মশানবন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন” ? কোথায় সেই সেই অন্বেষা যা বলে “সব প্রশ্ন মুছে দাও হে দেবতা তোমার আলোয়”?
 কোথায় শান্ত, অশান্তি, প্রেম, অপ্রেম, সংঘাত, হাহাকার, প্রশ্ন, উওর – যা হোক একটা কিছু? – মর্মে কি শব্দ শুধু? বাক্য শুধু? মর্ম কি শব্দ শুধ্য? বাক্য নিছক? হায়, হয়ত তা’ই। হয়ত তা নয়। হয়ত কোনো বিশেষ একজনকে, তাঁর রচনাপন্থাকে অজান্তে অনুসরণ করতে গিয়েই রচনাপ্রচেষ্টাগুলি হয়ে উঠছে “ক্রিয়া, বিশেষণ, শব্দের কঙ্কাল” ...





 হে কবিযশোপ্রার্থী, তুমি গৌতম বসু’র কবিতায় মুগ্ধ? আলোক সরকারের? গৌতম চৌধুরির? জীবনানন্দের? রবীন্দ্রনাথ? সুধীন্দ্রনাথ? এলিয়ট? পাজ? পদাবলী? লালন? রুমি? – অভিবাদন! অর্থ হয় কবিতা তোমার মর্মে ছায়াপাতে সক্ষম। তুমি জীবিত। তোমার মেধা, গ্রে-মেটার্স, ক্রিয়াশীল। অতএব প্রিয় কবিদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে এসো, এগিয়ে এসো, নিজের পায়ে হেঁটে এসে বলঃ
“...I am old enough now to make friends.
It was you that broke the new wood,
Now is a time for carving.
We have one sap and one root -
Let there be commerce between us” [ Ezra Pound, A Pact]
হে বন্ধু, এই লক্ষ্য কর এই “commerce” শব্দটিকে। “বাণিজ্য”। বাণিজ্য কাদের মধ্যে সম্ভব? বিনিময় প্রথার বাণিজ্য অথবা মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্য? তোমার আছে পশম, আমার রেশম। এসো বাণিজ্য করি। তোমার আছে সোনা, আমার আছে মুদ্রা। কিনে নিই। কপর্দকশূন্য’র সঙ্গে বাণিজ্য চলেনা। কবিতাটির প্রথম পংক্তিগুলি এইঃ
I make a pact with you, Walt Whitman -
I have detested you long enough.
I come to you as a grown child
Who has had a pig-headed father
পাউন্ড পিতাকে ত্যাগ করেছিলেন। স্বীকার করছেন। তবু ফিরে আসছেন। আসছেন সেই পিতার কাছেই। সেই পিতার সঙ্গেই বাণিজ্য করতে। তুমিতো পিতাকে ত্যাগ করোনি। তুমি Tradition কে আশ্রয় করেছ বলেই আলোক, গৌতম,অনির্বাণরা তোমার পথিকৃৎ হয়েছেন। তোমার পথ তো পাউন্ডের পথের থেকে অনেক সহজ। তুমি পিতার কাছে ফিরে আসো সঙ্গে তোমার Individual Talent কে নিয়ে। তাকে আবিষ্কার করে নিয়ে। এসে বলঃ “হে পিতা, বাণিজ্য হোক শুরু আমাদের”...  সেই আবিষ্কার হতেপারে হাহাকার, হতেপারে অন্বেষা, হতেপারে শান্তি, হতে পারে আনন্দ, বিষাদ... কিন্তু সে তোমার নিজের শোণিতমূল্যে খরিদকরা। তার প্রতিটি অক্ষর, যতি – আবহমান বাংলার, বাংগালীর হয়েও তোমার। তোমার আশি পংক্তির কবিতা শরীরে হয়ত বারোটি আলোক-গৌতম-অনির্বাণ-প্রতিফলনে উজ্জ্বল পংক্তি থাকবেনা কিন্তু সামগ্রিক উজ্জ্বলতায় তুমি হবে ভাস্বর।