প্রবেশিকা

**************************
আমি অত্র। আমি তত্র।
অন্যত্র অথবা –
আমার আরম্ভে আমি
নিশীথিনী, প্রভাতসম্ভবা।
**************************

Sunday, October 21, 2018

শাপলা-শালুক


 শাপলা-শালুক





জলের তলায় ঘুড়ি ওড়ায়
   জলপরীদের মেয়ে।
ওই ঘুড়িদেরই একটি দু’টি
    শাপলা-শালুক হয়ে
নিঝুম ফোটে জোড়া দিঘির
    নিথর কালো জলে।
মাটির ছেলে, মাটির মেয়ে
     দুপুরবেলা হলে
শাপলা-শালুক তুলতে গিয়ে
     জলশিশুদের ডাকে
তলিয়ে যায় দিঘির ঘাটে
    নোলক, বাঁশি রেখে।।

Thursday, October 18, 2018

প্রস্তুতিপর্ব


প্রস্তুতিপর্ব
 




“শুনবেন?’চন্ডীদাস মাল’এর কন্ঠে?” বলেই সনখ অঙ্গুলী রাখলে স্পর্শলোভী ত্বকে, হে সুন্দরী, বেজে উঠলেন ‘চন্ডীদাস মাল’, গেয়ে উঠলেন “আমার এমন দিন কি হবে মা তারা” আর দেড় মিনিটের মধ্যেই তোমরাও পুনয়ার মেতে উঠলে নিজস্ব তরজায়, হে সুন্দরী, আর আমার মনে হলো একদা সমস্তই ছিল প্রস্তুতি সাপেক্ষ।, প্রতীক্ষা সাপেক্ষ...
                   একদা প্রায় সব সংসারেই থাকতেন একজন ‘ছোটোকাকা’, বেকার, শৌখিন - যিনি বাবার অফিসজামা পরে খেলা দেখতে গিয়ে ফিরে আসতেন আস্তিন ছিঁড়ে, যিনি ঠাকুর্দার ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করেও তাঁর গ্রামোফোন বাক্সে হাত চালাতে পারতেন, যিনি ভাইপো-ভাইঝি’দের সমস্ত আব্দারে সহমত, যিনি কলতলায় বসে স্নান করতে করতে গাইতেন, সুরে, আধোসুরে অথবা বেসুরেঃ “বর্নে,গন্ধে,ছন্দে,গীতিতে...” তিনিই খবর আনতেন এবার পূজোয় কার কার রেকর্ড বেরোবে, আনতেন এইচ্‌এমভি’র ক্যাটালগবই। অতঃপর বৌদিদি অথবা দিদিদের আস্কারায় কেনা হতো সেই রেকর্ড। তারপর একদিন সকালে ঘোষিত হতো, সাধারনতঃ ছুটির সকালে, “দুপুরে রেকর্ড বাজানো হবে আজ”। প্রস্তুতিপর্ব হিসাবে আড্ডাবাজি বাদদিয়ে ‘ছোটোকাকা’ সাফ করতেন প্লেয়ারে’র ধূলো, পাল্টে দিতেন পিন, ঝেড়েমুছে রাখতেন পুরোনো রেকর্ডগুলিও। বাড়ির কাচ্চাবাচ্চারা, যাদের প্রস্তুতির শুরু বাড়িতে এইচ্‌এমভি’র ক্যাটালগবই ঢোকামাত্রই, তারা ওই গ্রামোফোনসংবাদ ছড়িয়ে দিতো নিজস্ব বৃত্তে, মা-মাসি-পিসীরাও, এমন কি বাবা আর কেজো কাকারাও প্রচার করতেন ওই আনন্দ সংবাদ নিজ নিজ বৃত্তে, গোপনে।
গ্রামোফোনদুপুরের প্রতীক্ষাপীড়িত সকালগুলি যেন আর শেষই  হতে চাইতোনা।নিত্যকর্ম,জুতোপাঠ, চন্ডীসেলাই, ঘরমোছা, বাসনমাজা,‘খাওয়ার পরে রাঁধা আর রাঁধার পরে খাওয়া’... হে ঈশ্বর, এতো কাজও থাকে, থাকতে হয়, আজকের দিনে? অবশেষে এক সময় দরজায় টোকা অথবা কড়া নাড়া। এক সময় মেঝেতে মাদুর-কাচ্চাবাচ্চাদের জন্য, অতিথিদের নিমিত্ত সারাবাড়ি খুঁজে চেয়ার, মোড়া,স্টুল, জলচৌকি - বসবার ঘরে।
ঠাকুর্দা, যথারীতি, নিজস্ব আরামকেদায়ায়।
‘ছোটোকাকা’টির চুলে ঢেউ, পরনে পাঞ্জাবী, তাতে আতরের খোশবাই।গ্রামোফোন ‘ফিট্‌’ করবার সমস্ত কসরতের আড়ালে তাঁর চোখ মাঝে মাঝেই ওবাড়ির মিতাপিসীর মুখে কিংবা অলকাদির হঠাৎ সড়ে যাওয়া আঁচলের খাঁজে ... আহ্‌ সময়, কেন অতো ধীরে বও? ধীরে ধীরে বও? আর কতো অপেক্ষা করবো আমরা, প্রস্তুতি নেবো আমরা – গানের জন্য, সুরের জন্য? ...
ঠাকুর্দার কপাল ভ্রূকুটিকুটিল হওয়ার ঠিক অব্যবহিত আগেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার, প্রস্তুতির অবসান ঘটিয়ে, অকস্মাৎ গেয়ে উঠতেন কেসি দে, রামকুমার কিংবা চন্ডীদাস মাল, গেয়ে উঠতেন “স্বপন যদি মধুর এমন” কিংবা “কাদের কূলের বৌ” অথবা “আমার এমন দিন কি হবে মা তারা...” ...
হে সুন্দরী, “শুনবেন?’চন্ডীদাস মাল’এর কন্ঠে?” বলেই সনখ অঙ্গুলী রাখলে স্পর্শলোভী ত্বকে, আর বেজে উঠলেন ‘চন্ডীদাস মাল’, গেয়ে উঠলেন “আমার এমন দিন কি হবে মা তারা” আর আমার মনেহলো এ যেন সঙ্গীত নয়, সংগীতের প্রেত কেননা প্রস্তুতি, প্রতীক্ষাহেন কিছুই নেই এই নখাগ্রে বেজে উঠবার আড়ালে আর প্রকৃত প্রস্তাবে রেকর্ডের বেজেওঠা নয়, বেজে উঠবার মুহুর্তটির প্রতীক্ষা আর প্রস্তুতিই গান - ঠিক যেমন “রূপনারানের কূলে” ঘুমে, জেগে, মৃত্যু য়, “আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা”ই প্রকৃত জীবন।।

ঘুম ঘর