প্রবেশিকা

ক্ষুদ্রতম কথাটিও, প্রিয়,
বৃহতের কাছে পৌঁছে দিও ...
নতুবা কেমন তুমি কবি?
মাঝে মাঝে শুধু চিঠি দিয়ো...
কতো পথ পেরোলে অথবা
কত পথ বাকি আছে আজো –
- এইটুকু খবর জানিও...
আমি সেই চিঠিতেই খুশি...
আমার কথাটি তুমি, প্রিয়,
বিরাটের পায়ে রেখে যেয়ো।
**************************************************** **

Monday, November 24, 2014

অনন্তের সঙ্গে সংলাপ





অনন্তের সঙ্গে সংলাপ
১।
চেতনার লুপ্তপ্রায় প্রাসাদ পেরিয়ে
যে পথ গিয়েছে বেঁকে
চৈতন্যের নির্বিকল্প আঁধারের দিকে
তারি কোনো বিসর্পিল কানাগলী থেকে
কে যেন হঠাৎই বলে অন্ধকারে ডেকেঃ
“কে তুমি”? -  তখনি
তারাগুলি অন্ধকারে চুপে যায় ডুবে ...

আমি বলিঃ “এ বিরাট ব্রহ্মান্ডের কাছে
কিছুনই। বড়জোর ধূলিকণা। তবে
আমার এই মৃত্যুশীল ছায়াটির কাছে
আমিই পরিধি, কেন্দ্র, আমিই ঈশ্বর –

আমার ব্রহ্মান্ডে আমি অন্তহীন বিশ্বচরাচর...”

Sunday, November 23, 2014

কথকতাঃপথকথা





কথকতাঃপথকথা

“Home is where one starts from”
T.S.Elot, East Coker, Four Quartets

১। হাট্‌মেন্ট রোড

চলার যেখান থেকে আরম্ভ – সেই গৃহ।
তারপরে শুধু পথ। সবই পথ। পথের কিনারে
বাঁশঝাড়। ছোটোনদী। সরল খাঁ’র দিঘি।
ভুক্কুরের কচুক্ষেত। সরল খাঁ’র কবরকে ঢেকে
বৃদ্ধ বট। ঝুড়িনামা। সাপখোপ।
শ্যাওলায় সবুজ পুকুর।
-এরাই নির্ণয় করে পথের চরিত্র, ছবি, স্বভাব, অভ্যাস।
প্রতিটি চরিত্র যেন পিতামহ ভীষ্ম কিংবা হাসান-হুসেন।
প্রতিটি ঘাসের মর্মে বনপর্ব, শান্তিপর্ব, কারবালা, ওডিসি, সাইরেন –
পথ ধরে হেঁটে যাওয়া হাটের প্রতিটি লোক
ইউলিসিস্‌, দুঃশাসন, প্রবল এজিদ আর পরাক্রান্ত ভীম …


চলার যেখান থেকে আরম্ভ – সেই গৃহ।
তারপরে শুধু পথ। সবই পথ। পথের কিনারে
একা একা বসেথাকা উদাস বৃদ্ধটি
দ্বৈপায়ন ব্যাস না’কি অন্ধ হোমার?

সন্ধ্যাগমে জ্বলে দীপ – কবরে, দাওয়ায় –
পথপ্রান্তে চিতা ঐ
অনির্বান জ্বলেযায় কার? …


২। রুক্মিণীগাঁও

তখন “সোনার রোদ নিভে” আসে।
পথেনেমে বাসে কিংবা মাসের প্রথম হপ্তা হলে
অটোরিক্সা –
পার হওয়া ফ্লাইওভার, স্টেডিয়াম, আল্‌ফা ভিলা, রাজগড় রোড –
শীতকালে ঘোর সন্ধ্যা। অন্ধকার। জোনাকি। কুয়াশা।
বসন্ত, বর্ষায়, গ্রীষ্মে ত্রিসন্ধ্যার মায়াবী ও মরমী আবহ –
নেমেপড়া বাস কিংবা অটোরিক্সা থেকে।
রাস্তা শেষ। এইবার পথ শুরুহল…।

ঐ পথে হেঁটেগেলে
ভাড়াবাসা, ছোটো এক পাখির সংসার –
সন্ধ্যাগমে জ্বলে দীপ – কবরে, দাওয়ায় –
পথপ্রান্তে চিতা ঐ
অনির্বান জ্বলেযায় কার? …

একধারে মাঠ। ঝোপ। সদাব্যস্ত জোনাকির ভিড়।
আরধারে দুইমানুষ সমান দেওয়াল
শালবৃক্ষসখীদের
প্রহরায় সর্বদাই “জাগ্রত এবং প্রস্তুত” ।
মধ্যবর্তী পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
জানাযায় পথ, নদী – জন্মমাত্র তুমুল অসতী –
মধ্যবর্তিনী এরা। দুই ধার –
-দুই তীর – দুই উপপতি...



ডানদিকে মাঠ শেষ। মাঠশেষে বৃদ্ধা দোকানি
বিড়িসিগারেট বেচে। পান-চূন-তামাক-তাম্বুল –
চল্লিশ পাওয়ার বাল্ব – জাতিতে ফিলিপ্স –
রেখা হয়ে শুয়েথাকে ঝিম্‌ধরা মাঠের কিনারে
দোকানির পাহাড়ি কুকুর চোখ খুলে দেখেওনা
কেবা আসে কেবা যায় আধো অন্ধকারে –

বাঁদিকে দেওয়াল শেষ। ঘরবাড়ি। ছোটো ছোটো আঙ্গিনা – উঠান।
নামতার সুর আসে। ভেসেআসে ধূপগন্ধ, সান্ধ্য-সমাচার ...
ঐ পথে হেঁটেগেলে
ভাড়াবাসা, ছোটো এক পাখির সংসার –
পাবো কি সে পথ আমি ফিরে – শঙ্খচিল শালিকের বেশে –
যদি যাই সে দেশে আবার? ...

৩। গাঙ্গুলীবাগান
পথ নয়। রাস্তা। তাই সন্ধ্যাগমে ছিট্‌গ্রস্থ এক যুবকের
যানজট সামলানোর অভিনয়চেষ্টাটুকু ছাড়া
অন্য কোনো আভিজাত্য নেই।
এইরাস্তা মোড়ঘুড়ে মিশেযায় যেখানে বস্তিতে
বকলম টুম্পাঘোষ ও তার মা’টি মিলে
“মেস্‌” চালায় আব্রুহীন পড়েপাওয়া
দোতলার ঘরে –
এ রাস্তায় যারা হেঁটেযায়
তারা নয় যুধিষ্ঠির বা দুর্যোধনহেন
সুবিশাল। রাস্তার মানুষ তারা –
হবেনা কিছুতে তারা কখনো পথিক –
কারবালা মাঠে কিংবা কুরুক্ষেত্র বধ্যভূমিতে
এরাসব নামহীন
কচুকাটা সেনা, পদাতিক –
মাঝে মাঝে এ রাস্তায় তারা টু পাইস্‌ কামিয়ে ফেরে
ঋষি দাস নাম নিয়ে – ট্যাক্সি চেপে – পার্টিশেষে -রাতে –

এ রাস্তার আভিজাত্য, স্বভাব, অভ্যাস
আসলে নির্মীত হয় মোড়ের মাথার সেই
ছিটগ্রস্থ যানজট যুবকের হাতে।

৪। খড়্গপুর-টাটাবাবা লাইন

খড়্গপুর জংশন থেকে টাটাবাবা শহরের দিকে যে ল্যোকাল বিকালে ধাবিত
সন্ধ্যাহলে তার পথে উঠে আসে দুঃসাহসী শালের জঙ্গল।
জান্‌লা দিয়ে উড়েআসে নানা ঘ্রান, ভিন্‌গ্রহী হাওয়া ও ইঙ্গিত –
কামরায় বাতি নেই। লোকজনও নেই।
চারমিনার ঠোঁটে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে বসে অবান্তর কথা ভেবে চলি ...
“ এ কোনো চাক্‌রি না’কি? সাহাবাবু মাসপুরতে
তিন হাজার পাঁচশো দেয় লেবার সামলাতে –
অথচ পথেই পড়ে ঘাটশিলা। শালবন। বিভূতিভূষণ।
ধুস্‌শালা! এ বালের চাকরি ছেড়েদিয়ে
লাফদিয়ে নেমেযাবো ঘাটশিলা স্টেশনে কখনো...”

লাফানো হয়না তবু। ঘাটশিলা পারহয়ে টাটাবাবা। সাহা।
দুতিনদিন ছুটি নিয়ে একদুবার কলকাতায় এসে
ফিরে যাওয়া সান্ধ্য ল্যোকালে –
ঘাটশিলা। দুঃসাহসী শালের জঙ্গল।
সে জঙ্গলে একরাত্রে ঝাঁপদিয়ে পড়েছিল
গোল এক কোজাগরী চাঁদ –

টাটাবাবা, চাকরি আর সাহাদা’র ফাঁদ
ছিঁড়ে ফেলে পথে নামতে সে’ই দিলো শেষ প্ররোচনা!
যে চিঠি দিলাম তাকে “পদত্যাগ পত্র” বলে ধরাযায় কি’না
জানিনা। এলাম ফিরে কলকাতায়। অকর্মণ্য “কবি”দের বানানো শহরে –

আজ আর খুব কিছু মনেনেই শুধু
শালবন, হাওয়া আর কোজাগরী জ্যোৎস্নাঢাকা
পথ মনেপড়ে...