প্রবেশিকা

ক্ষুদ্রতম কথাটিও, প্রিয়,
বৃহতের কাছে পৌঁছে দিও ...
নতুবা কেমন তুমি কবি?
মাঝে মাঝে শুধু চিঠি দিয়ো...
কতো পথ পেরোলে অথবা
কত পথ বাকি আছে আজো –
- এইটুকু খবর জানিও...
আমি সেই চিঠিতেই খুশি...
আমার কথাটি তুমি, প্রিয়,
বিরাটের পায়ে রেখে যেয়ো।
**************************************************** **

Sunday, September 28, 2014

“হলুদিয়া পাখি সোনারি বরন...”


 “হলুদিয়া পাখি সোনারি বরন...”
সপ্তর্ষি বিশ্বাস

“হলুদিয়া পাখি সোনারি বরন পাখিটি ছাড়িল কে”, “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কম্‌নে আইসে যায়” ... মনেহয় ঐ সব গান, জন্ম জন্ম ধরে লোকের মুখে মুখে ফেরা লোকগানের থেকেই উড়ে আসে সেই পাখি। হলুদ পাখি। হলুদিয়া পাখি। সেই পাখির পা নেই তাই বসেনা কোথাও। সেই পাখির গলায় স্বর নেই তাই অন্য পাখিদের মতপ “ওমন করে বাইরে থেকে” তারা ডাকেনা।  “এমনি উড়ে ফল খেয়ে আবার আকাশে চলেযায়। কিন্তু দৈবাৎ যদি একটা পাখির ডানা জখম হয়ে সে মাটিতে পড়েযায়, আর ঠিক সেই সময় যদি তাকে শেয়ালে বা কুকুরে খেয়েফেলে, তাহলে সেই সেই শেয়াল কী কুকুর মানুষ হয়েযায়। ...  ...। তাদের দেখলেই চিনতে পারাযায়। কারণ সবটা মানুষের মতো হলেও, চোখটা হয় পাটকিলে রঙের আর কানের উপর দিকটা হয় একটু ছুঁচলো” ।  এ পাখি সব দেশে আসেনা, সব মানুষে তাদের দেখেনা। তারাও যায়না সব মানুষের দিকে। তারা মেশেনা সব পাখিদের ভিড়ে। কিন্তু  “হলদে পাখির ডানার ঝাপটা লাগলে ... বুকের মধ্যে খানিকটা ফাঁকা হয়েযায়, ফোঁপরা হয়েযায় , দুনিয়াতে হরেকরকম ভালো জিনিস আছে , কিন্তু কিছু দিয়েই আর সে ফাঁকা ভরানো যায়না। ... ...। ঘর ছেড়ে, ঘরের মানুষ ছেড়ে তাই বেড়িয়ে পড়তে হয়” ...। – ঐ পাখির ডানার ঝাপটা লেগেছিল বলেই না ঝগড়ু-ঝমরু দুইভাইয়েরই  আর  ঘর থাকা হলোনা। দেশে থাকা হলোনা ...
ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে প্রথমবার  পড়েছিলাম । বইটার মালিক ছিল তপু। প্রশান্ত ব্যানার্জী। ওদের কলকাতায় নিত্য যাতায়াচ ছিল। তাই নানান নতুন বই, মফস্বলে কক্ষনো পা নাদেওয়া বই ছিল তপুর আলমারিতে।  ... আজ ভাবি ঐ বয়সে ঐ “হলদে পাখি”র বই এর মালিকানা পেয়ে গিয়েছিল বলেই হয়ত তাড় ডানার ঝাপট্‌ও লেগেছিল তপুর গহনে আর হয়ত সেই জন্যেই তপুও আর খুব বেশীদিন থাকলোনা ঘরে। ঘর ছেড়ে, ঘরের মানুষ ছেড়ে পাড়ি জমালো ঐ অচিন হলুদ পাখির দেশেই – বয়স পুরো চব্বিশ- পঁচিশ না হতেই –
সেই প্রথমবার পড়ার খুব কিছু মনেনেই। শুধু মনে আছে গাঢ় নীল রঙের মলাট। মোটা বই। লীলা মজুমদারের অনেকগুলো গল্প-উপন্যাস-নাটক মেলানো। আর মনে আছে প্রতিটা রচনা পাঠের পড়েই এক রকমের আনন্দিত মনখারাপ। হলুদ মন খারাপ। হেমন্তের নিবেআসা বিকালের মতো ...।
সেই এগারো বারো বছর বয়সের পর আজ চল্লিশ বছর বয়স পারহয়ে সেই বই “হলদে পাখির পালক” ফিরে পড়তে গিয়ে দেখি মাত্র ত্রিশ-বত্রিশ পৃষ্ঠার এই কাহন পড়তে গিয়ে আমার কেটেযায় দিনের পরে দিন। এক একটি পংক্তিতে এসে থেমেযাই। পথ হারিয়ে ফেলি।
“ঝগড়ু”। আশ্চর্য মানুষ ঝগড়ু। তার গল্পের হলদে পাখিটির মতোই যেন সে। তাকে সক্কলে চোখে দেখলেও কজনে যে দেখতে পারে তার গহনের আকাশ কেজানে। যারা দেখতে পারে তারাও দুটি পাখি’ই যেন। দুটি শিশু। বোগি আর তার বোন রুমু। Maurice Maeterlinck এর The Blue Bird নাটকে এরাই Tyltyl – Mytyl – ভাইবোন এই নাটককে বলাহয় লীলা মজুমদারেরহলদে পাখির পালকএর প্রেরণা বলার সূত্রটুকু সরেজমিনে তদন্দ করতে গিয়ে আজ দেখি যেব্লু বার্ডভালো নাটক, ভালো রচনা হলেও তার মধ্যে প্রতীকের উপস্থিতি বড় প্রকট বড় চোখে লাগে সেই তুলনায় ঝগড়ু-নাথু- বোগি আর তার বোন রুমু অনেক সাবলীল। “ব্লু বার্ড” নাটকের মৌলিক পরিকল্পনার একটা ছায়াসূত্র পেলেও “হলদে পাখির পালক” স্বতন্ত্র রচনা। আমার বিচারে “ব্লু বার্ড” থেকে অনেক অনেক নিবিড়, গভীর আকাশের ইঙ্গিতে এই রচনা ভাস্বর।
ফিরেযাই ঝগড়ু’র কথায়। তার গল্পের হলদে পাখিটির মতোই যেন সে। তাকে সক্কলে চোখে দেখলেও কজনে যে দেখতে পারে তার গহনের আকাশ কেজানে। যদিও সে দেশ ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে, বাড়ির মানুষজন ছেড়ে বেড়িয়ে পরেছে অনেকদিন তবু সে তার “দেশ” কে মর্মে বয়ে বেড়ায়। মনে মনে বাসকরে যেনবা সেখানেই। ... তার দেশ, “দুম্‌কা” সে’ও আশ্চর্য এক দেশ। ঐ দেশে নেমে আসে ঐ আশ্চর্য হলদে পাখিরা, জোয়ারের টানে ভেসে ঐ দেশের নদীতে আসে পক্ষীরাজ ঘোড়ার কঙ্কাল, জলের মেয়ে হতভম্ব জেলের হাতে তার শাড়ির রেশম-টুকরো রেখে তলিয়ে যায় জলের অতলে। ... ইস্কুলে “সাইন্স্‌” পড়া বোগি বিশ্বাস করতে চায়না। ঝগড়ু রেগেযায়। বলেঃ ‘সত্যি যে কোথায় শেষ হয়, স্বপ্ন যে কোথায় শুরু হয় বলা মুশকিল...”। মনে আসে আরেকজন কথকের কথা যিনি বলেছিলেন “What matters in life is not what happens to you but what you remember and how you remember it.” …  যিনি নির্মাণ করেছিলেন লীলা মজুমদারের দুম্‌কা’র মতোই আরেক দেশ যা স্বপ্নে-সত্যে একাকার, প্রতীকে-প্রতিমায় মাখামাখি, যার নাম Macondo, সেই দেশে এক জিপ্‌সী বলেঃ ‘Things have a life of their own … it’s only a matter of waking up their souls’ … ভাবি, ঠিক কোন কথাটির দিকে আমাদের চোখ ফিরাতে বলছেন Marquez  এখানে? সেকি বস্তুর সত্তাকে জাগিয়ে তোলার এল্কেমি নাকি আপন সত্তায় সেই বস্তুর রূপটিকে নির্মাণ করার? মনে আসেআমারি চেতনার রঙ্গে পান্না হলো সবুজ, চুনী উঠলো রাঙ্গা হয়ে …”
লীলা মজুমদার আর মার্কেজের বলার ভঙ্গী বিভিন্ন হলেও ঐখানেই তারা এক যেখানে তাঁদের ঐ সামান্য ইঙ্গিতগুলি আমাদের মর্মে বয়ে আনে অন্য গান, অন্য কথা, অপর ভাবনা“হলদে পাখির ডানার ঝাপটা লাগলে ... বুকের মধ্যে খানিকটা ফাঁকা হয়েযায়, ফোঁপরা হয়েযায় , দুনিয়াতে হরেকরকম ভালো জিনিস আছে , কিন্তু কিছু দিয়েই আর সে ফাঁকা ভরানো যায়না। ... ...। ঘর ছেড়ে, ঘরের মানুষ ছেড়ে তাই বেড়িয়ে পড়তে হয়” ... আমার মর্মে বাজে “আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে বিশ্বঘরে পেতাম না ঠাঁই” ... মনেপড়েঃ
যে শুনেছে কানে
তাহার আহ্বানগীত , ছুটেছে সে নির্ভীক পরানে
সংকট আবর্তমাঝে , দিয়েছে সে বিশ্ব বিসর্জন ,
নির্যাতন লয়েছে সে বক্ষ পাতি মৃত্যুর গর্জন
শুনেছে সে সংগীতের মতো দহিয়াছে অগ্নি তারে ,
বিদ্ধ করিয়াছে শূল , ছিন্ন তারে করেছে কুঠারে ,
সর্ব প্রিয়বস্তু তার অকাতরে করিয়া ইন্ধন
চিরজন্ম তারি লাগি জ্বেলেছে সে হোম-হুতাশন
হৃৎপিণ্ড করিয়া ছিন্ন রক্তপদ্ম-অর্ঘ্য-উপহারে
ভক্তিভরে জন্মশোধ শেষ পূজা পূজিয়াছে তারে
মরণে কৃতার্থ করি প্রাণ শুনিয়াছি তারি লাগি
রাজপুত্র পরিয়াছে ছিন্ন কন্থা , বিষয়ে বিরাগী
পথের ভিক্ষুক মহাপ্রাণ সহিয়াছে পলে পলে
সংসারের ক্ষুদ্র উৎপীড়ন , বিঁধিয়াছে পদতলে
প্রত্যহের কুশাঙ্কুর , করিয়াছে তারে অবিশ্বাস
মূঢ় বিজ্ঞজনে , প্রিয়জন করিয়াছে পরিহাস
অতিপরিচিত অবজ্ঞায় , গেছে সে করিয়া ক্ষমা
নীরবে করুণনেত্রেঅন্তরে বহিয়া নিরুপমা
সৌন্দর্যপ্রতিমা
ঝগড়ুও তেমনি এক রাজপুত্র  ঝগড়ু নিজে না বল্লেও, লীলা মজুমদার বলে না দিলেও আমরা জানিআমরা টেরপাইআমরা জানি যা হারিয়ে যায় তা আসলে হারায় নাকোনো না কোনোদিন আবার ফিরে আসে সেই দুম্কায়খোয়াই নদীর জলেতাই ঝগড়ুর গল্প শুনে শুনে রেগে গিড়ে বোগি যখন বলেঃতোমার সব গল্প হারানোর গল্প, ঝগড়ু, পাওনি কখনো কিছু?” তখন ঝগড়ু এড়িয়ে যায়বলেতাহলে যাবে কাল দোলতার মেলায়? সেখানে কিছু পাওয়া যেতে পারে…” … হ্যাঁ সেখানে গিয়ে তারা পায়পায় সেই আশ্চর্য গাছের আশ্চর্য ফুলের সন্ধান যা কেবল অযত্নেই বাঁচে, ফুল ফোটায়, ঘ্রান ছড়ায় যেন সেই হলদে পাখিদেরি মতনসকলে তাদের দেখতে পায়না, নিতে পারেনা তার ঘ্রানযেজন পারে সে সারা জীবনের জন্য আর-মানুষ হয়েযায়গেয়ে ওঠে “হলুদিয়া পাখি সোনারি বরন পাখিটি ছাড়িল কে” কিংবা “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কম্‌নে আইসে যায়” ... ঐ সব গান, জন্ম জন্ম ধরে লোকের মুখে মুখে ফেরে ছায়াফেলে ঝগড়ুর গল্পে ঝগড়ু বলে, মেলা থেকে ফেরার পথে, হাড় জিরজিরে ঘোড়াটিকে দেখে বলেঃসব পক্ষীরাজের কি ডানা গজায় ভেবেছ নাকি? দেখছ না ওর কাঁধের উপরপকার হাড় কেমন উঁচু হয়ে রয়েছে? ওর যে ডানার কুঁড়ি রয়েছে ডানার কুঁড়ি থাকলেও সকলের ডানা গজায় না, গায়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে থাকে, একটুখানি জিরুতে দেয়না, সারাটা জীবন জ্বালিয়ে খায় …”
পড়তে পড়তে থেমেযাই ভাবি
ভাবি নিজের কথা ভাবি আশেপাশের, চেনা অচেনা, সংখ্যাতীত ডানা না গজানো পক্ষীরাজদের কথা ভাবি এই জীবনে সত্যিই কি কোনোদিন দেহে মনে লাগবে ঐ হলদে পাখির ডানাড় ঝাপট? পারহয়ে যেতে পারবো কি, কোনোদিন, পথের, চলার সমস্ত কুশাঙ্কুর? নাকি ডানার কুঁড়ি, এমনি, গায়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে থেকে থে ফসিল হয়েযাবে একদিন?
আর পড়তে পারিনা বই মুড়ে রেখে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি রাত্রির জানালায়




     লীলা মজুমদার
আলোকচিত্রঃ পরিমল গোস্বামী
কৃতজ্ঞতাঃ লাল মাটি প্রকাশনা