প্রবেশিকা

ক্ষুদ্রতম কথাটিও, প্রিয়,
বৃহতের কাছে পৌঁছে দিও ...
নতুবা কেমন তুমি কবি?
মাঝে মাঝে শুধু চিঠি দিয়ো...
কতো পথ পেরোলে অথবা
কত পথ বাকি আছে আজো –
- এইটুকু খবর জানিও...
আমি সেই চিঠিতেই খুশি...
আমার কথাটি তুমি, প্রিয়,
বিরাটের পায়ে রেখে যেয়ো।
**************************************************** **

Thursday, September 11, 2014

পথিক, অভিভূত মেয়ে, মেঘ, ঝাউগাছ আর একজন নিঃসময়ের পথিক

পথিক, অভিভূত মেয়ে, মেঘ, ঝাউগাছ আর একজন নিঃসময়ের পথিক
সপ্তর্ষি বিশ্বাস



সৌজন্যঃঅণুমাত্রিক, কালীকৃষ্ণ গুহ বিশেষ সংখ্যা,  সেপ্টেম্বর ২০১৪ 


জীবনানন্দ লিখেছিলেন "বলতে পারা যায় কি এই সম্যক কল্পনা-আভা কোথা থেকে আসে? কেউ কেউ বলেন, আসে পরমেশ্বরের কাছ থেকে। সে কথা যদি স্বীকার করি তাহলে একটি সুন্দর জটিল পাককে যেন হীরের ছুরি দিয়ে কেটে ফেল্লাম...' ... কেবল শিল্পের প্রেক্ষিতে নয় জীবনের প্রেক্ষিতেও পরমেশ্বরের ভূমিকাটিকে আমার তেমনি মনেহয়। তাই 'পরমেশ্বর' থেকে 'জীবনদেবতা' শব্দে বা 'প্রভু আমার, প্রিয় আমার' উচ্চারণে আমি অনেক বেশী স্বচ্ছন্দ। স্বচ্ছন্দ কেননা 'পরমেশ্বর' যেন এক অচলায়তন, যেন বিভূতিভূষণের 'দৃষ্টি প্রদীপ' এর সেই গোঁসাইজীর আখড়া যা আঁকড়ে থাকা যায় শুধু। যাকে সঙ্গে নিয়ে চলা যায়না। কাজেই মানুষের ঈশ্বর ঐ 'পরমেশ্বর' হতে পারেন না কিছুতেই কেননা প্রানী জগতে অচলায়তনের স্থান নেই। প্রাণী জগতের সত্য চলার সত্য।
চলা, কিন্তু কোন দিকে চলা? - জীবনানন্দের উচ্চারণের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বলি 'কেউ কেউ বলেন, "এই যাওয়া" পরমেশ্বরের "দিকে যাওয়া" সে কথা যদি স্বীকার করি তাহলে একটি সুন্দর জটিল পাককে যেন হীরের ছুরি দিয়ে কেটে ফেল্লাম...' মনে আসছে অমিয় চক্রবর্তী'র  'কোথায় চলেছো পৃথিবী' ...
তোমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।

...    ...   ...  ...

গাছ বীজ হাড় স্বপ্ন আশ্চর্য জানা
এবং তোমার আঙ্কিক অমোঘ অবেদন
    আবর্তন

নিয়ে
কোথায় চলেচ পৃথিবী।
  আমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।।

পক্ষান্তরে জীবনানন্দ বলেনঃ 'তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি রয়ে যাবো এই বাংলার তীরে' ... ভাবি এ'ও কি তবে স্থবিরতার উচ্চারণ? অচলায়তনের ঘোষনা? - কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তা নয়। এ'ও এক যাওয়া। ঘরের দিকেই যাওয়া। সেই গমনের পথ  এই 'আঙ্কিক অমোঘ অবেদন  আবর্তন'এর বিপরীত অক্ষে। তাই এইযাত্রা মানসযাত্রা।
এইবারে যদি বলিঃ
"সমস্ত ক্লান্তি এবং অনুশাসনের গল্প বলা শেষ হয়েছে। একটা পর্ব শেষ। এর পর দ্বিতীয় পর্ব। চলো,হাঁটি। মাথার উপরে নক্ষত্রলোক। ভাষাও অন্ধকার হয়ে এলো।"
সুধী পাঠক তাহলে কি নির্মীত হয় একটি বৃত্ত বা অন্ততঃ একটী ত্রিভুজ? সুধী পাঠক এই পংক্তিগুলি কবি কালীকৃষ্ণ গুহ'র অনেকদিন আগের কবিতা 'ঝাউগাছ" থেকে। -সেই থেকেই আমি চলছি তাঁর সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে। আর এই চলার মূল্যে টের পেয়েছি যে কালীকৃষ্ণ মূলতঃ ঐ চলার'ই কবি - যার চলা 'ঘরের দিকে' কিন্তু কোনো পরমেশ্বরের ঘরের ঠিকানায় নয়। তাই কালীকৃষ্ণ'র কবিতায়, যেখানেই 'ঈশ্বর' বা 'পরমেশ্বর' এর ছায়া পড়েছে আমি অস্বস্তি বোধ করেছি। উদাহরনঃ
'শোনো হে বিশ্ববাসী
অমৃতের সন্তানেরা
মরে শুধু গুবরে পোকা
আর সব ইতর প্রাণী।

জান, সেই পুরুষটিকে
যদিও যায়না জানা
জেনে নিয়ে মৃত্যু এড়াও
ঝিঁঝিঁ ডাক সময় চেনায়।
এটি সাম্প্রতিক, অর্থাৎ ২০০৯ সালের কবিতা। নাম 'ঝিঁঝিডাক'প্রকাশিত অনুবর্তন পত্রিকায়। - এই উচ্চারণ, কালীকৃষ্ণর মুখে, কেমন যেন বানানো বলে মনেহয়। 'ঝিঁঝিঁ ডাক সময় চেনায়' এই পংক্তিটি না থাকলে এই রচনাটিকে কালীকৃষ্ণ'র রচনা বলে মানতেও নারাজ হতাম আমি।
এ'ই যে উচ্চারণ, তাকি নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মতো? যতো মননদীর গতিপথ সত্যই গিয়ে থাকে বদলে তাহলে অপেক্ষা করে দেখবো নতুন পথকে কবি কতোটা নিলেন আপন শোণিতে। আবার এ'ও ভাবি, যে, সমকালে 'পরমেশ্বর' থিম নিয়ে নাড়াচাড়ার যে হুজুগ উঠেছে আবাল-বৃদ্ধ 'কবি'কূলের এ'কি তারি নষ্ট ছায়া? রবি ঠাকুরের মতো 'শেষের কবিতা' লিখে দেখাতে চাওয়া 'হাল ফ্যাশানের লেখাতেও আমার কব্জির জোর তোমাদের চেয়ে ঢের বেশী' ? ...
আমি শঙ্কিত কেননা আমি পথিক কালীকৃষ্ণের অনুগামী যিনি বলেন, ২০০৯ সালেই বলেনঃ
পথের শেষ কোথায়
এ প্রশ্ন যদি তবে
পথে পথে ঘোরে যারা
তারা কোন্‌ বাস্তবের?

এই প্রশ্নটি ঘিরে
হাহা হাসি ওঠে দেখি -
চারদিকে কোলাহল
পাগল ঘুরছে একা।

পাগল ত নয় কেউই
ভিন্ন ভিন্ন ব্যথা -
এইটুকু বুঝে নেয়া
ভিন্নতা থেকে বিষাদ।         

আনন্দ তাও একার
একাকী ভ্রমণকারী
পথে পথে ঘুরে দেখে
কত আলো-অন্ধকার!

হ্যাঁ, ঈশোপনিষদের 'একর্ষ ভ্রমণকারী'র ছায়া এখানে থাকলেও তা রয়েছে আবছা অন্ধকারে ঝাউবীথির কিনার দিয়ে চলে যাওয়া কালীকৃষ্ণর নিজস্ব স্বাভাবিকতায়। জগদ্দল 'পরমেশ্বর' নেই এখানে। - তাই আবারো চিনে নিতে পারি 'ঘরের দিকে হেঁটে যাওয়া' কালীকৃষ্ণ'কে।
হ্যাঁ কালীকৃষ্ণ ঐ অনন্ত পথিকবৃত্তিরই কথাকার নাহলে কেন বলেন, কিভাবে বলেনঃ
'অনেক দূরে যাওয়া অন্ধকার পথ -
স্বপ্ন বাস্তব এ দুই তীরভূমি
রচনা করে চলে তৃষ্ণা দাউ দাউ ...' -জবাগাছ, অনুবর্তন, ফেব্রুয়ারী ২০০২ সংখ্যা
কোথায় চলেছেন কালীকৃষ্ণ? না, তাঁর মর্মে যা'ই থাক, পাঠক হিসেবে আমি আশ্বস্ত হই এই জেনে, যে, তাঁর যাওয়া কোনো অচলায়তন পরমেশ্বরের দিকে নয়। বরং জন্ম জন্ম ধরে একটি 'ঘর' বা 'ঘোর' ছেড়ে তিনি চলেছেন কোনো অজানা এক ঘরের দিকেঃ
"বহুদিন ঘরের ভিতরে রয়েছি। ঘরে বহুযুগের
নির্জনতা। বহুযুগের ভয়।
...   ...   ...  ...
কবে বাইরে বেরুব এখন শুধু সেই প্রতীক্ষা।

ওহে পথিক, ও অভিভূত মেয়ে, ও মেঘ, ও ঝাউগাছ ..." ( প্রতীক্ষা, অনুবর্তন, জুন ২০০১ সংখ্যা)

'ওহে পথিক, ও অভিভূত মেয়ে, ও মেঘ, ও ঝাউগাছ ...' বলেই থামছেন কবি। কেন থামছেন? কি বলতে গিয়ে থামছেন? ওদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় কি তিনি আক্রান্ত না'কি তাদেরো সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়ে এই ডাক?
এখানে এসে ভাবতে হয় কালীকৃষ্ণর সময় চেতনা নিয়েও। এই যে তাঁর যাত্রা, ঘর ছেড়ে আবারো ঘরের দিকে তা'কি তুলনীয় নয় জীবনানন্দের সেই 'হাজার বছর ধরে' পথ হাঁটার? ইঙ্গিত হিসেবে কবির নিজস্ব উচ্চারণটিকেই উদ্ধৃত করছিঃ
'যে সকল ঘটনা ঘ'টে চলেছে তার মধ্যে ব'সে রয়েছি
অনেক অনেক দিন।
ভয়াবহ সব ঘটনা ঘ'টে চলেছে।

অনেকদিন পর আজ মনে হল
কী ঘটছে বাস্তবিক তা একবার ভেবে দেখা যায়।
ভেবে দেখলাম, যা ঘটছে তা
সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। রাত্রি। সূর্যোদয় আবার' [ ঘটনাবলী, অনুবর্তন, জুন ২০০১ সংখ্যা]
এমন অন্তহীন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের কথা আমরা শুনেছি জীবনানন্দে যে জীবনানন্দের সময় চেতনা আদি হীন , অন্তহীন। এই একই সময় চেতনার কথা আমরা শুনেছি এলিয়টে, এইভাবেঃ
Time present and time past
Are both perhaps present in time future,
And time future contained in time past.
If all time is eternally present
All time is unredeemable.
এর পরে অবশ্য এলিয়টের যাত্রা অন্য পথেঃ
What might have been is an abstraction
Remaining a perpetual possibility
Only in a world of speculation.
তাই না'ত জীবনানন্দ, না'ত কালীকৃষ্ণ, অন্তিমে, ঐ " world of speculation" এর সম্ভাবনার ইঙ্গিতবাহী। বরং যা ঘটে গেছে তা আবারো ঘটবে এমনি এক মর্ম বাস্তবতাকে আবহে রেখে তাঁদের যাত্রা।
যদিও অন্তিমে জীবনানন্দের সঙ্গে কালীকৃষ্ণের যাত্রা পথ গিয়েছে আলাদা হয়ে তথাপি বাংলা কবিতায়, এতাবৎ, জীবনানন্দের পর, কালীকৃষ্ণ গুহ'ই সেই নিঃসময়ের পথিক যাঁর অক্ষর পাঠকের গহনেও মেলে দিতে চায় এক পারাপার যার এক প্রান্তে বিগ্‌ ব্যাং আর অন্য প্রান্তে ব্লেক্‌ হোল্‌।



Monday, September 1, 2014

এ অনন্ত যাদুঘরে






এ অনন্ত যাদুঘরে

এ অনন্ত যাদুঘরে আমাকেও কিরিপা করে রেখেছ বিধাতা
গ্রীষ্মদিনে বিষ্টি দাও, বিষ্টিদিনে কিনেদাও মহেন্দ্রর ছাতা
ছাতা ফেঁসে জলপরে, দশদিকে ভেসেযায় ‘ধর্ম অর্থ কাম’ –
তবুও নড়েনা পাতা, অতএব  ভক্তিদরে ‘মোক্ষ’ নীলাম
করে এসে চোখঠারি – মস্তিমারি বেশ্যালয়ে আমি ও বিধাতা
দিবালোকে বিধাতার  পাপহয় অনাচারি নারী সন্দর্শনে
শিষ্যভাবে তাই আমি লটকে দিই মহেন্দ্রর ছাতা -
-দিবালোকে বিধাতার উষ্ট্রহেন দোলানো গ্রীবাতে ।
রাবন রাক্ষসের চিতা শাক্তমতে তবু অনির্বান
নিভেযায় বিধাতার ডাইবেটিস্‌জাত জলস্রোতে।
তবুও এ যাদুঘরে আমাকেও কিরিপা করে রেখেছ বিধাতা
গেলাসের টান পরলে দয়াকরে কেটেনিও মাথা।।