প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...

Saturday, February 21, 2026

এক টুকরো "নিউ ইন্ডিয়া অপেরা"

এক টুকরো "নিউ ইন্ডিয়া অপেরা"




“কলকাতার কমার্শিয়াল যাত্রা দলগুলোর সঙ্গে বেরু বাড়ির যাত্রা দলগুলো নিজেদের তুলনা করে, আর হতাশ হয়। অথচ, এত কিছুর পরেও শুধু শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।”  – অনেকদূর পড়েছি, অনেকদূর পড়া বাকি। বাকি স্ব ইচ্ছাতেই। পড়লেই পড়া শেষ হয়ে যাবে। যদিও পড়া শেষ হলেই ফুরিয়ে যাবেনা, তবু যতো বেশী সময় ধরে থাকা যায় ওই মানচিত্র না থাকা, মানচিত্রে না থাকা মানুষদের সঙ্গে – চেষ্টা তারই। তাছাড়াও, পড়তে পড়তে থামতে হচ্ছে, থামতে হয়। যেমন এখানে এসে। “শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।” কেন? কারণ এই সকল, এই যাত্রাপালা, গানবাজনা – জীবনের, যাপনের টুকরো। এইগুলি “কলাকৈবল্য” নয়। অদ্য লোকগান, যা ‘ফক’ যা আদতে ইংরেজিতে “ফাক” হয়ে পণ্য, তারও জন্ম এমনই, যাপনে, জীবনে। আদতে ‘শিল্প’, আদত শিল্প – জীবনের, যাপনেরই টুকরো। আদত শিল্পীও তা’ই। কিন্তু … পাঠ করা যাক এই অঙ্গশ টুকুঃ “দক্ষিণ বেলেবাড়ির বেশিরভাগ জমিতেই এখন ছোট ছোট চা বাগান। নদীর ধারে, কাঁটাতারের ভেতর কোনো জমিই আর পড়ে নেই। যার যেটুকু জমি আছে সেখানে চা বাগান করেছে। বাগানগুলোয় সারাদিন চা পাতা তোলা হয়। দুপুরের পর গাড়ি এসে চা পাতা ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যায়। কৃষকের জমিতে এই দুই চার দশ কুড়ি বিঘার উপর গড়ে ওঠা বাগানগুলোর কোনো ফ্যাক্টরি থাকে না, ফ্যাক্টরি থাকা সম্ভব না। আবুুর মতো ব্রোকাররা বাগান থেকে পাতি কিনে দূরের কোনো ফ্যাক্টরিতে পাঠায়”। – অর্থাৎ শ্রম যার, যাদের তাদের হাতে যন্ত্র-মালিকানা নেই। যন্ত্র মালিকের, পুঁজিপতির হাতে। পুঁজিবাদের মূল শর্ত। আর এভাবেই চা ফলানো লোকগুলির সঙ্গে দোকানে বিক্রি হওয়া চা-প্যাকেটের অপিচয়, দূরত্ব। এই দূরত্বকেই মার্ক্স বলেছেন “Alienation”। ঠিক যেভাবে শ্রম আর শ্রমজাত সামগ্রীর মধ্যে দূরত্ব নির্মাণ করে পুঁজিবাদের বিস্তার ঠিক একই ভাবে জীবন ও যাপন থেকে শিল্পকে Alienate করে, করেছে, এই পুঁজিতন্ত্রই। “শুধু শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।” বাক্যাংশটি আমাকে ধাক্কা দেয়। যাত্রাপালা এখানে নিমিত্ত। আদতে মানুষের যা কিছু, যা তার নিজের, তার মুখের ভাষা সহ, সবই ধরে রাখে এই কান্দারুরা। কান্দারুরা মহামানব নয়। নয় সেলেব ‘কপি’, সর্বঘটে কাঁঠালি কলা “সংস্কৃতি চীজ”। এরা ওই মানুষেরা, যারা কোনোভাবে, পুঁজিবাদের দ্বারা পিষে যেতে যেতেও এখনো পূর্ণ। ফলে তার যাপনের নিমিত্তই তার দরকার এই পালাগান, এই বিয়াবাড়ির ধামাইল। বলা যেতে পারে এই গ্রন্থটিও এমনই। লেখকের নিজস্ব যাপনের অতলে, প্রত্যহে, প্রাত্যাহিকে এর জন্ম। এ নয় কোনো তত্ত্বতাড়িত “তিস্তাপাড়ের” গপ্পো। এই হেতুই প্রতিটি চরিত্রের শ্রেণী চরিত্র, শ্রেণী হিসাবে তার অবস্থান তার ভাবনাকে, চাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অবলীল। লেখক ঠিক কতোটা গ্রন্থ গিলে “শ্রেণী” বুঝেছেন বা আদৌ গেলেন নি কোনো গ্রন্থ – এ নিয়ে ভাবতে হয়না কারণ যাপনই অন্তিম গ্রন্থ আর তা’ই বর্তমান লেখক পাঠ করেছেন গোগ্রাসে, পাঠ করেছেন আমূল।


Friday, January 16, 2026

কৃতজ্ঞতা পাতা

কৃতজ্ঞতা পাতা

১।

গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো তন্নিমিত্ত কৃতজ্ঞতা চূর্নী – আমার

পত্নী, কন্যা ধিঙ্গি, পুত্র ভূর্ভুস্ব – এদের জানানো জানি 

নিতান্তই বাতুলতা তবু সত্যের খাতিরে …। সে রকমই বংকু ঘোষ

নানান পর্যায়ে যাঁর পরামর্শ ছাড়া …। তাঁর ছাত্রী ছত্রিশ ব্রা 

রিমিঝিমি উৎসাহ না দিলে …। গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো 

তার জন্য ঠিকা ঝি পদ্মর মা, রান্ধা-বেটি হেটি, ডেলিভারি বয় গুলি 

নানা দোকানের, মাছ-মাংস-শব্জি অলা,চাষা, মুদী,মুদ্দফরাস, মুচী, টেংকি সাফ 

করা মেথর – নাহ ‘হরিজন’ – ইত্যাদির কোনো

ভূমিকা ছিলনা। গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো 

তন্নিমিত্ত সব কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য চূর্নী, ধিঙ্গি, ভূর্ভুস্ব, বংকু ঘোষ, 

ছত্রিশ ব্রা রিমিঝিমি আর

আমার গগনচুম্বী স্পষ্ট প্রতিভার।



২।


হাওয়ায় বাতাসে হেঁটে একটি মুদ্রিত পাতা

একটি কবিতা নিয়ে আসে। পাঠ করে আনন্দিত

পাঠ করে বেদনার্ত হই। আমি  ঋনী হই ওই

হাওয়ায় বাতাসে আসা কবিতার কাছে। কবিতা হে

তুমি কার কাছে ঋনী? কবির? তাহলে

কবি কার কাছে ঋনী? কার কার কাছে ঋনী

বৈজ্ঞানিক, কবি, শিল্পী এবং বিশিষ্ট প্রচ্ছদ ছাড়া 

শাদামাটা হাড্ডি মাংস রক্তের

লোক? আমি ঋণী কার কাছে, কার কার

কাছে? আমি ঋনী আপেলের কাছে

১৬৬৫-৬৬ সালে যে একটি আপেল ঝরেছিল 

বিলাতের একটি বাগানে – নিউটন ঋনী

সেই আপেলের কাছে, আপেল বাগানে যতো মালী

যতো দিন যতো চারা পুঁতেছিল, গাছে জল দিয়েছিল —

নিউটন ও সেই সূত্রে আমি

ঋনী সেই প্রত্যেকজন মালী আর মজুরের কাছে। পক্ষান্তরে 

ঋণ নেই আদম-ইভের অন্য আপেলে কেননা

স্বর্গের কাছে কারো কোনো ঋণ নেই, কোনো ঋণ

কখনো ছিলনা, কেননা স্বর্গ নেই, নেই কোনো

স্বর্গীয় দেবী, দেব, ওমকার, ভূমা – 

কখনো ছিলনা। আমার তোমার ঋণ

মণীন্দ্রর মুদীর দোকানে, ঋণ সুভাষের পান 

সিগারেট বিড়ি তাড়ির দোকানে। রান্ধামাসী মাণিকের মা'র 

হাতের রান্নায় আমি ঋনী, ঋনী তার রুগ্না হাতটির কাছে

জ্বরে পোড়া আমার কপাল – রান্ধামাসী মাণিকের মা

মা স্নান করতে গেলে জ্বরের কপালে তুমি

জলপট্টি না দিলে ...।  ঋণ আমার রাস্তায়, পথে

প্রত্যেক ভিক্ষুকের কাছে প্রত্যহ বেড়ে যায় 

চক্রবৃদ্ধি হারে। বাড়ে

কেননা আমার সুধী পূর্বতন পূর্বপুরুষেরা

এদের পূর্বতন পুরুষ আর মেয়েদের শুষে

হয় দালান নয় বাগান 

অন্যথায় পুঁথি, জ্ঞানটান

আমাদের জন্য রেখে গেছে। যে অভুক্ত লোকটি "জামাই" 

নামে যে খ্যাত, কারণ সে খেতো 

সকল উৎসবে গিয়ে

অণিমন্ত্রিত গিলতো 

“ত্রিশ জনের খোরাক একলাই” –

আমার ক্ষুন্নিবৃতি তার কাছে চিরন্তন ঋনী। এবং দপ্তরীরা, বিশেষত

ইকবালদা, গভর্নমেন্ট স্কুলে, ক্লাস সিক্সে ছেঁড়া বই 

জোড়া দিয়ে যে আমার হাত, পিঠ 

বাঁচিয়েছে দুর্বিজয় সিং স্যারের

বেত্রদন্ড থেকে। ঋণ আমার স্বপনকুমার 

ইন্দ্রজাল কমিক্স, প্রসাদ, উলটোরথ ও 

অদ্রীশ বর্ধনে। খবর কাগজ দেওয়া

প্রত্যেকজন দাদা,কাকু, লোকদের কাছে

ঋণ আছে তোমার, আমার, আপনার। যতো চাষা ধান রুয়ে

ক্রমে ক্রমে শুকিয়ে মরেছে আর

যতো চাষা সরকারের ঋণ 

না মেটাতে পেরে

ঝুলে গেলো গাছডালে কিংবা কড়িকাঠে –

যতো হাত, বাহু, উরু, পায়ের গোড়ালি 

আমার তোমার ঘরে টেবিল, চেয়ার, আলনা, 

গ্যাসস্টোভ, বাহারী তৈজস  – তাদের সবার ঋণ

শোধ নয়, লিখে রাখা 

ফুরাবেনা এক কবি-শিল্পী জীবনে । ঋণ আছে

বাঁশঝাড়ে, অর্জুনের ডালে। ঋণ বারান্দার থেকে দেখা 

পতিত জমিতে, মাঠে 

সজিনার শাখা আর ফুলে। প্রতিটি বেশ্যা-বোন 

মহীয়সী, রতিসূত্র-কোকশাস্ত্র থেকে 

অনেক বিরাট সত্য

ক্ষুধা শিখিয়েছে। “ঋণস্বীকার পাতা” ছাপলে 

এদের ঋণের কথা লিখবে কি তুমি? লিখবে কি

ক্রীতদাস ও রাইয়তের কথা

যাদের ঘামে ও রক্তে

 “আভিজাত্য” শব্দ ভিজে আছে? প্রেসের সেসব কর্মী

তোমার পাতার পরে পাতা 

বিষ্ঠা যারা মার্জনা করে

মুদ্রিত করেছে তোমাকে? আর যারা বাস্তবিক 

প্রতিদিন বিষ্ঠা সাফ করে 

তোমাকে, তোমার শিল্প, রুচি, সভ্যতাকে

জ্যান্ত রাখে, জ্যান্ত রাখছে রোজ? 

যাদের “হরিজন” বলে ছাপ্পা মেরে দিয়ে

দায় সেড়ে, হাত ধুয়ে এসে 

সংহত হয়েছো দর্শনে? হাওয়ায় বাতাসে হেঁটে 

একটি মুদ্রিত পাতা 

একটি কবিতা নয়

এসব বার্তা নিয়ে আসে। 


ঘুম ঘর