এক টুকরো "নিউ ইন্ডিয়া অপেরা"
“কলকাতার কমার্শিয়াল যাত্রা দলগুলোর সঙ্গে বেরু বাড়ির যাত্রা দলগুলো নিজেদের তুলনা করে, আর হতাশ হয়। অথচ, এত কিছুর পরেও শুধু শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।” – অনেকদূর পড়েছি, অনেকদূর পড়া বাকি। বাকি স্ব ইচ্ছাতেই। পড়লেই পড়া শেষ হয়ে যাবে। যদিও পড়া শেষ হলেই ফুরিয়ে যাবেনা, তবু যতো বেশী সময় ধরে থাকা যায় ওই মানচিত্র না থাকা, মানচিত্রে না থাকা মানুষদের সঙ্গে – চেষ্টা তারই। তাছাড়াও, পড়তে পড়তে থামতে হচ্ছে, থামতে হয়। যেমন এখানে এসে। “শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।” কেন? কারণ এই সকল, এই যাত্রাপালা, গানবাজনা – জীবনের, যাপনের টুকরো। এইগুলি “কলাকৈবল্য” নয়। অদ্য লোকগান, যা ‘ফক’ যা আদতে ইংরেজিতে “ফাক” হয়ে পণ্য, তারও জন্ম এমনই, যাপনে, জীবনে। আদতে ‘শিল্প’, আদত শিল্প – জীবনের, যাপনেরই টুকরো। আদত শিল্পীও তা’ই। কিন্তু … পাঠ করা যাক এই অঙ্গশ টুকুঃ “দক্ষিণ বেলেবাড়ির বেশিরভাগ জমিতেই এখন ছোট ছোট চা বাগান। নদীর ধারে, কাঁটাতারের ভেতর কোনো জমিই আর পড়ে নেই। যার যেটুকু জমি আছে সেখানে চা বাগান করেছে। বাগানগুলোয় সারাদিন চা পাতা তোলা হয়। দুপুরের পর গাড়ি এসে চা পাতা ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যায়। কৃষকের জমিতে এই দুই চার দশ কুড়ি বিঘার উপর গড়ে ওঠা বাগানগুলোর কোনো ফ্যাক্টরি থাকে না, ফ্যাক্টরি থাকা সম্ভব না। আবুুর মতো ব্রোকাররা বাগান থেকে পাতি কিনে দূরের কোনো ফ্যাক্টরিতে পাঠায়”। – অর্থাৎ শ্রম যার, যাদের তাদের হাতে যন্ত্র-মালিকানা নেই। যন্ত্র মালিকের, পুঁজিপতির হাতে। পুঁজিবাদের মূল শর্ত। আর এভাবেই চা ফলানো লোকগুলির সঙ্গে দোকানে বিক্রি হওয়া চা-প্যাকেটের অপিচয়, দূরত্ব। এই দূরত্বকেই মার্ক্স বলেছেন “Alienation”। ঠিক যেভাবে শ্রম আর শ্রমজাত সামগ্রীর মধ্যে দূরত্ব নির্মাণ করে পুঁজিবাদের বিস্তার ঠিক একই ভাবে জীবন ও যাপন থেকে শিল্পকে Alienate করে, করেছে, এই পুঁজিতন্ত্রই। “শুধু শিল্পকে গ্রামের যাত্রাপালাকে ভালোবেসে কান্দারুরা বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ।” বাক্যাংশটি আমাকে ধাক্কা দেয়। যাত্রাপালা এখানে নিমিত্ত। আদতে মানুষের যা কিছু, যা তার নিজের, তার মুখের ভাষা সহ, সবই ধরে রাখে এই কান্দারুরা। কান্দারুরা মহামানব নয়। নয় সেলেব ‘কপি’, সর্বঘটে কাঁঠালি কলা “সংস্কৃতি চীজ”। এরা ওই মানুষেরা, যারা কোনোভাবে, পুঁজিবাদের দ্বারা পিষে যেতে যেতেও এখনো পূর্ণ। ফলে তার যাপনের নিমিত্তই তার দরকার এই পালাগান, এই বিয়াবাড়ির ধামাইল। বলা যেতে পারে এই গ্রন্থটিও এমনই। লেখকের নিজস্ব যাপনের অতলে, প্রত্যহে, প্রাত্যাহিকে এর জন্ম। এ নয় কোনো তত্ত্বতাড়িত “তিস্তাপাড়ের” গপ্পো। এই হেতুই প্রতিটি চরিত্রের শ্রেণী চরিত্র, শ্রেণী হিসাবে তার অবস্থান তার ভাবনাকে, চাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অবলীল। লেখক ঠিক কতোটা গ্রন্থ গিলে “শ্রেণী” বুঝেছেন বা আদৌ গেলেন নি কোনো গ্রন্থ – এ নিয়ে ভাবতে হয়না কারণ যাপনই অন্তিম গ্রন্থ আর তা’ই বর্তমান লেখক পাঠ করেছেন গোগ্রাসে, পাঠ করেছেন আমূল।
