প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...
Showing posts with label দেশ গাঁয়ের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label দেশ গাঁয়ের কবিতা. Show all posts

Wednesday, October 16, 2024

বুনো-লতা । ২।

বুনো-লতা

২।

“জগৎ পারাবারের তীরে” যারা’ই, যে কর্মেই রত, আদতে সে সকলই “খেলা”। ওই খেলার মত্ত সক্কলেই “শিশু”। – এই সহজ কথাটি কি টের পান নি রবীন্দ্রনাথ? তাহলে কেন লিখলেনঃ “ডুবারি ডুবে মুকুতা চেয়ে,/ বণিক ধায় তরণী বেয়ে, / ছেলেরা নুড়ি কুড়ায়ে পেয়ে/   সাজায় বসি ঢেলা।” – অর্থাৎ, কেন তিনি বণিক কে, বাণিজ্যকে আলাদা করে দিলেন আর সবার থেকে? শিশুর থেকে? করলেন, বা করতে বাধ্য হলেন ওই হেতুই, যে হেতু যিশুকে বলতে হয়েছিল, যে, সূঁচের ফুটো গ’লে উট যদিবা চলে যেতে পারে, ধনী কদাপি পারবেনা স্বর্গ-দোর, তা দসে যতো বিরাট-বিশালই হোক, তা দিয়ে ঢুকতে। ওই যে লোকটি বসে গলা সাধছে আর ভাবছে সংগীত গেয়ে সে অমর হয়ে থাকবে, এই যে ধেড়ে ইন্দ্রটি পদ্যের দ্বি-পদ, ত্রিপদ, চতুস্পদ লিখে লিখে, লোককে পড়িয়ে পড়িয়ে উন্মাদ হয়ে গেলো এতাবৎ তাকে রবি ঠাকুরের চেয়ে উচ্চতর আসন বাঙালী দিলোনা বলে – ইত্যাদি, এরা শিশু। শিশু হরিহর রায়, সর্বজয়া, দুর্গা, অপু, ফাদার সিয়ের্গি, প্রিন্স মিশকিন, আনা কারেনিনা, মাদাম বোভারি’রা। এরা নিজ দৈনন্দিনে এমনই নিমজ্জিত, যে, তারা ভুলে যায়, যে, তাদের এই সকল দৈনন্দিন, এই সকল অমরতা-লোভের উর্ধেঃ “ ঝঞ্ঝা ফিরে গগনতলে,/ তরণী ডুবে সুদূর জলে,/মরণ-দূত উড়িয়া চলে” – তবু খেলে চলে তারা। খেলেই চলে। – এদের সঙ্গে যদি সাম্রাজ্যবাদী লোভ, পুঁজি তান্ত্রিক পণ্যায়ণের মূল্যে মুনাফা – ইত্যাদির খেলায় যারা মত্ত, তাদেরকে মিলিয়ে ফেলি, গুলিয়ে ফেলি “শিশু” বলে, তাহলে যে মস্ত ভুলটি হবে, তারই প্রতিপক্ষে “ডুবারি ডুবে মুকুতা চেয়ে,/বণিক ধায় তরণী বেয়ে” র অন্তর্গত লোভের কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন রবিকবি।

এই মুহুর্তে আমি যে চার-পাঁচটি লেংটা শিশুর কথা বলছি তাদের আবহে পারাবার নেই। আছে একটি মড়া খাল, যার মুখ, নদীর দিকে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বাঁধ দিয়ে। ফলে সে আর বহতা নয়। তার সারা গা’য়ে কচুরিপানার সাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পোকামাকড়,সাপ-সাপালি। মড়া-খালের পাড়ে এক সাড় শেওড়াবৃক্ষ। কয়েকটি সুপারী গাছ। টিন-চাল, টিন-দেওয়ালের খোপ। আরেক ধারে পিচ-সড়ক। তারা লেংটা খেলে বেড়ায়, দৌড়ে বেড়ায়। কান্দে, হাসে। বড় হয়। কিন্তু বেড়ে ওঠেনা। মাঝখানে সিমেন্ট-দেওয়াল। এই পাড়ে আমাদের বা। বাসা। বাড়ি। দেওয়ালের কিনারে দাঁড়িয়ে আমি যখন ওই শিশুদের নাম, তাদের কার ক’টা দাঁত উঠলো-পড়লো – এই সকল নিয়ে তাদের সঙ্গে গল্প করছি, যখন এক্কেবারে ছোটোটি, বড়দের মতোই এই দেওয়াল-ভাঙা আসরে যোগ দিতে এসে হোঁচট খেয়েও, না কেঁদে হাসছে, তখন, বেলা এগারোটা নাগাদ, ওই মেয়েটি, ওই বুনোলতা, আবার এসেছে “ফুনে চাজ” দিতে। আগে অবশ্য আমার অনুমতি সে নিয়েছে। অনুমতি ছাড়া আমাদের মতো বিরাট ভদ্রলোকের বাড়ির গেট ওরা পার হয়না। কিন্তু ওরাও আমাদের ঠিক ততোটাই প্রতিবেশী, যতোটা, আর পাশের “কয়লাবাবু”। যিনি সবংশে বকলম, যিনি কয়লার কারবারে হাত কালো না করেই কালো টাকার পর্বত গড়েছেন। তিনি বা তাঁর গুষ্টি অবশ্য অবলীলায় ঢুকেপড়ে। হাঁকডাক দিলে আলাপ সালাপও চালায়। 

বুনোলতা যখন তার “স্মাট-ফুন” চাজে লাগাচ্ছে তখন তাকে নিয়ে জেরা করছে যে, সে, আমার মা’কে দেখে রাখার, দিনরাত্রি থাকা, মাঝ বয়সী মহিলা। শিশুগুলির সঙ্গে সামান্য আড্ডা দিয়ে আমি বাইর-কোঠায় ফেরার নিমিত্ত ঘুরে দাঁড়াতেই, সেই শিশু দলের যেটি সবচে’ বড়, যার বয়স বড়জোর আট, সে ডাকলো, তার ডাকে “চুপি চুপি” মেশানো। আমিও নুয়ে কান দিলাম বাড়িয়ে। সে ফিসফিসিয়ে বল্লঃ “ক্কাকু, যে বেটি তুমরার ঘর-অ গেসে ফুন চাজ দেওয়াত, ইগু কিন্তু চুর”। হায়, চোর, হায় চুরি। হায় “না বলিয়া পরের দ্রব্য …”। বুনোলতা এই বালকের কাকি অথবা জেঠি। দুইটি ছোকরা ভাই, তাদের দুইটি বৌ – পাশাপাশি টিনিখোপে বাস করে। বালক কে নিশ্চিত তার মা’ই বলেছে, যে, বুনোলতা চোর। এবার বুনোলতাও, কালে, তার বাচ্চাকে শেখাবে, তার জা’টি, যে’ও, হয় আরো একটি বুনোলতাই, সে “চোর”। “চোর” শব্দের সংজ্ঞা এখানে, হরিহর-পত্নী সর্বজয়ার, হরিহরের দিদি, বুড়ি ইন্দির ঠাকরুন কে “চোর” বলার একই নিয়মের অধীন। অর্থাৎ দুই-পলা শর্ষের তেল, দেড়টি কাঁচা লংকা থেকে বড়জোর ইমিটেশনের শস্তা মালা’র এদিক-ওদিক। আমি বালককে বললাম, ফিস্ফিস করেই “আচ্ছা, আমি পুলিশো জানাইয়া রাখমু”। 

বাইর-কোঠায় ঢুকে আবার বসেছি লিখতে, এইবার আগমন মা’র সেই আধবুড়ি আয়া-জনের। “দাদা, আপনি বোধয় জানেন না, তাই বলছি, ওই ওকে যে বাড়ি ঢুকতে দিয়েছেন, ওর চরিত্র-স্বভাব খুব খারাপ”।

স্থির দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম “ পেটে খাওয়া না থাকলে তো স্বভাব-চরিত্র ধুয়ে বাঁচা যায়না। ওদের দেড়বেলা খাওয়া মেলেনা। তাই স্বভাব-চরিত্র বা যা খুশি’র মূল্যে ওরা খেতে পেলেই আমি খুশি। ওর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই”।

একটু দমে গেলেও মহিলা থাবলো না। “আরে জানইন নি, ও মুসলিমের সঙ্গে যায়” …।

আবার স্থির চোখে তাকাতে হলো। “শোনো, ও হিন্দুর সাথে গেলে যা, মুসলমানের সঙ্গে গেলেও তা’ই। হিন্দু-মুসলমানে আমার কিচ্ছু আসে যায়না। পেটের আর ক্ষুধার ও কিছু আসে যায়না”। 

মহিলা এবার ক্ষান্ত হলো তবে বল্লো “ওই দাদা ঘরে থাকলে এরা আসবার সাহস পায় না”।

অর্থাৎ, আমার ছোটোভাই, যে এই মুহুর্তে, মাদ্রাজে অবস্থান করছে, থাকবে কয়েকদিন সপরিবারে, সে। অর্থাৎ রূপক থাকলে এরা এতোটা সাহস পেতোনা। কিজানি। হয়তো আমিও যদি এখানেই থাকতাম, হয়তো আমাকেও ওরা ভয় পেতো। হয়তো আমার মধ্যেও ওই ভয় দেখানো ভদ্রলোকি ডালপালা মেলতো। এবং মেলাটাই স্বাভাবিক যদিনা আমরা সক্রিয় ভাবে ওই ভদ্রলোকি’র বিষ-চারাটিকে মুড়িয়ে না ফেলি, প্রতি মুহুর্তে। কিজানি। হয়তো ডাবলিনে বাস করলে জয়েস না লিখতেন ডাবলিনার্স, না ইউলিসিস। গতকাল সকালেই, লঙ্গাই বাজার গিয়ে মা’র জন্য মাছ কিনেছিলাম। হেঁটেই গেছি। ফেরাও যেতো হেঁটেই। তা’ও ফাঁকা অটোরিক্সা দেখে, উঠে পড়লাম। বসলাম অটোচালকের কিনার-সিটে। বসতে না বসতেই  অটো চালক গল্প আরম্ভ করে দিল। বল্লো, চৈত্র থেকে আশ্বিন গেলো মেঘে আর জলে। এখন কয়দিন রউদের মুখ না দেখলে সব যাবে। জানালো এই চৈত্র থেকে আশ্বিনের মেঘের নিমিত্ত 

কি কি রকমের ধান ভাল হবে, কিকি রকমের ধান হবেনা বা পরিমাণে কম হবে। সব জানালো। হায়, আমি, একদা এই শহরে জন্মে, বড় হয়ে, পরে সিলিকন-সিটি’র বাসিন্দা, আমি, “ চৈত্র”, “আশ্বিন”, “মেঘ”, “পানি”  শব্দগুলিতে  আকুল হলাম। কিন্তু  ধানের নাম ১টাও বুঝতেই পারিনি। পারিনি, যারা এই শহরে বাস করে, তারাও কি পারে? পারতো? – না। ধান, চালের সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ বহু আগেই পূর্ণ হয়েছে। “অন্ধ বিক্রেতার থেকে ধূপ কেনার সুযোগ নষ্ট হয়েছে”। 

               দিনে রান্না করতে যিনি আসেন দীপালীদি, তাকে মাছ ইত্যাদি দিয়ে বাইর-উঠানে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানলাম। এরপরে ভিতরমুখো হ’তেই দেখি দীপালিদি আমার মা’র সঙ্গে কি এক শলাপরামর্শে নিমগ্ন। কান পাতলে বোঝা গেলো, মাছ ঠিক যতো টুকরো মা খাবে, ঠিক ততো টুকরোই সে রাঁধবে নাহলে। “বুঝরা অইত …”। বুঝলাম। – বুঝলাম মাছ-টুকরো বেঁচে গেলে তা পেটে যাবে মা’র এই আয়া-জনের এবং তা দীপালিদির ইচ্ছা নয়। বুঝলাম এবং আবার এসে দাঁড়াতে হলো শূন্যে। একদিকে “আদর্শ হিন্দু হোটেল”, অন্যদিকে “হুনান রিপোর্ট”। 

এই আয়া-জনকে দেখেছি, দুপুরের পরে দুপুর একটি পুরনো শাড়ি, যা কখনো “দামী” ছিল, তার আঁচল কিংবা পাড় – সেলাই করছে। তার নিজের অন্নবস্ত্রের সংস্থান অপরের ঘরকাজ করে। ওই বুনোলতা’র মতো তার নিজের মেয়ে বা বোন রয়েছে নিশ্চয়। তথাপি, যেহেতু সে “ব্রাহ্মণ” এবং যেহেতু সে “অনেক আগের থেকেই ভদ্রলোক”, ফলে, সে নিজেকে, নিজ মনেই, বুনোলতা’র চেয়ে উপরে একটি অবস্থান দিয়ে ফেলেছে। বামনি বলে সে “উচ্চ” দীপালিদইর চেয়েও। এবং দীপালিদি, আমার ভাই’র বিয়ের পরপর, আমার ভাতৃবধূকে বলেছিল “এরা বুধয় ভালা বাবন না”। একে ঝুমা তখন নতুন বৌ, তা’য় শ্বশুরবাড়ির “ব্রাহ্মনত্ব” নিয়ে প্রশ্ন। অতএব, ঝুমা দীপালিদিকে প্রশ্ন করল, কেন এমন মনেহয় তার, প্রকৃত প্রস্তাবে, তার শ্বশুরবাড়ি মস্ত বড় ব্রাহ্মণ। দীপালিদির উত্তর “তারা আমার হাতের রান্না খান, তাই বললাম”। – অর্থাৎ বঞ্চিত হ’তে হ’তে, হ’তে হ’তে এরা নিজেদেরকে নিজেরাই পারছেনা আর সম্মান করতে। মূল্য দিতে। শুধু বুনোলতা নয়, দীপালিদি বা ওই আয়া-জন এরা প্রত্যেকেই সেই কুন্তা। এরা পরস্পরকে ঘিরে দাঁড়ালেই দানা বাঁধবে, বাঁধতে পারে, আদত প্রতিরোধ। আদত মহিষাসুর সেটি টের পেয়েই, বহু আগেই এনে দিয়েছিল জাতপাত। উপনিবেশ-ওয়ালারা একে করেছিল অস্ত্র। অতঃপর সরাসরি উপনিবেশ থেকে যখন দেশগুলি “স্বাধীনতা”র পাজামা-পাঞ্জাবী-পতাকা’তে হলো পরোক্ষ উপনিবেশ, তখন, এই জাতপাতকেই ব্যবকার করলো “স্বদেশ” এর “স্বাধীন” নেতা ও তাদের দলগুলি।

এক টুকরো মাছের লোভ, ওই আয়া-জনের, আমার মর্মে এনেদেয় ইন্দির ঠাকরুনের নোনা ফলের লোভের বৃত্তান্ত, তার নাজেহাল হওয়া ভ্রাতৃবধূ সর্বজয়ার কাছে। আবার পরবর্তীতে এই সর্বজয়াকেই দেখি, বড়লোক বাড়িতে কাজ কত্রবার আমলে, ক্ষণে ক্ষণে লোভী হ’তে, নিজের জন্য নাহোক, অপুর জন্য। বুনোলতা’র এই মোবাইল-লোভ, চার্জ-দেওয়া লোভ, এ কি নয়, দুর্গার পুঁতিমালা লোভ? ফোনে কে তাকে দেবে কোন মহার্ঘ্য সম্বাদ? বাস্তবে মোবাইলটি ঘেঁটে, গান, রিল্‌ চালিয়ে, সে নিজেকে ভেবে নেবে “সুখী” বলে, তার আশেপাশের ভদ্রলোক মেয়ে-বৌ’দের মতো বলে। এর মূল্যে সে ভুলে থাকবে তার সমূহ না পাওয়া। এতাবৎ। তার সমূহ না পাওয়া – আমরণ।


 – এই সকল “লোভ” আদতে লোভ নয়। এই সকলই প্রকাশ, জিজীবিষার। অথবা এরাই জিজীবিষা। এটি শনাক্ত করতে না পারলে, অন্তিমে, সব প্রতিরোধ, সব আন্দোলনই ভেঙ্গে যাবে। “আমার মাথা নত করে দাও” – কার কাছে? ঈশ্বর? অনন্ত? শালা, কে ঈশ্বর আর কি অনন্ত? মাথা নত করে দাও ওই সকল জিজীবিষার কাছে। জীবনের কাছে। যাপনের অন্তর্গত দুঃখের কাছে। অন্যথায়, হায়, ফিরে যেতে হয় সেই রবিকবির কাছেইঃ

“যখন তোমায় প্রণাম করি আমি,    প্রণাম আমার কোন্‌খানে যায় থামি,

      তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে

          সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে

      সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥”












বুনো-লতা (১)

 বুনো-লতা

১।

ভাসান। কখনো আনন্দের ছিল, ছিল দুঃখের। ছিল দেবী প্রতিমার চোখে অশ্রুকে চিহ্নিত করবার। তারপর, ভাসানও ভেসে গেলো নিও-লিবারেলি বানে। ভাসানের আনন্দ-বেদনা, দেবীর আগমন-গমনের যাদু-কাহনের মতোই, মুছে গিয়ে, অবয়ব নিয়েছে এক “মস্তি”। এই “মস্তি” এক চীজ বটে। “মস্ত্‌ মস্ত্‌”। শরৎ, শিশির, ঘাস – সমস্তের উপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া এক বুলডোজার। সব ভেঙ্গে, নিঙড়ে বানিয়ে তোলা একেকটি বাজার। একেকটি মোচ্ছব।

ঘড়ি-কাঁটা রাত দশটার ফলক পার হয়ে ক্রমে পৌঁছে যাচ্ছে সাড়ে দশে। এই শহর, এর শরিলে-গা’য়েও খোলা-বাজারের দাঁত-নখ দাগ। ক্ষতও হচ্ছে। তবু, কোথাও গিয়ে আর এগোচ্ছেনা। ফলে, এ এখনো অনেকটাই মফস্বল। আর আমাদের পাড়া, যেহেতু এই গঞ্জেরও প্রান্তে, ফলে, এক ঝলক অতীত-আলো, এক-পশলা পরাহত অন্ধকার, এখনো মিশে আছে এ পাড়ায়। সাড়ে দশ মানে, এ পাড়ায় অনেক রাত। রাত ছিঁড়ে, ছোটো ছোটো টুকরো করে, চলে ফিরে আসছে একটি দু’টি ভাসান-দল। মস্তি-ভাসানের মস্ত্‌ খোঁয়াড়ি কিছু ছড়িয়ে, কিছু সঙ্গে করে যাচ্ছে তারা। বাইর-কোঠায় আড্ডা দিচ্ছি আমি আর সিদ্ধার্থ। বাইর-কোঠা বলতে বাইর-বারিন্দা থেকে আলগা একটা কোঠা। আদতে রূপক এই কোঠায় বসে ছাত্রী-ছাত্র পড়ায়। ইস্কুল-কাজ করে। রাস্তার ঠিক কিনারে বলে, রাস্তা ধরে বড় গাড়ি গেলেও আওয়াজ হয় গেটে। মনেহয় কেই এলো। এমনি একটা আওয়াজ উঠলো গেটে। আমাদের আড্ডারত মন সেদিকে গেলোনা। কারন, আমরা জানি এই আওয়াজ ফাঁকি আওয়াজ, ফাঁকা আওয়াজ। এতো রাতে কে আসবে? আড্ডা চল্লো। কিন্তু এবার ঘষটানো পা-আওয়াজ। অতএব ধ্বনি এখন আর অশরীরী নয়। এবং সত্যই, তখনই, শরীর, আবির্ভূত, বাইর-কোঠার খোলা দরজার সামনে, যুবতীর। শিউরে উঠলাম। কে এই মেয়ে? একবার মনে হলো বিসর্জিতা কোনো প্রতিমা না’তো? উঠে এসেছে, সদ্য, কোনো নদী থেকে, খাল থেকে, বিরাট পুকুইর-পুষ্করিনী থেকে? জানাতে এসেছে, কিভাবে ভাসান তার বর্ন-ঘ্রান-অশ্রু-আকুতি হারিয়ে নিতান্ত মস্তি হয়ে গিয়ে, দেবীকে, দেবী দিগকে আবডালে করছে প্রহারই? – পর মুহুর্তে মনে হলো, সদ্য ভাসানের দেবী’র আশাক-পোষাক এমন অনুজ্জ্বল হয় কি করে?  গা’য়ের নাইটি – কখনো উজ্জ্বল হলুদ ছিল। এই মুহুর্তে পিচরাস্তা-কিনারের ধূলির মতন। “ চোখ দুটো চুন-চুন ,- মুখ খড়ি-খড়ি!” – তাহলে এ কী গতবছরের কুশিয়ারা-জল লেগে থাকা, বিগত বছরের কোনো প্রতিমা? “সমসাময়িক হতে শেখে নাই”? তা’ই এসেছে জানাতে?

এইবার দেবীর আঙ্গুল … “দুটো হাত, ক’খানা আঙুল”… একটি হাত উঠে এলো ডাক দেওয়ার ভঙ্গিতে। আবার শিউওরে ওঠা। কে এ? কি চায় এ? এ’কি নিশিডাক? না’কি বিশ্ব চক্র সিরিজের বিকেল ছ’টার শো থেকে উঠে আসা কোনো দুরাত্মার ছল? যেই এগিয়ে যাব, বার হয়ে আসবো বাইর-কোঠা থেকে, অমনি নিজের জামা নিজে ছিঁড়ে চিল্লিয়ে উঠবে “বাঁচাও … বাচাও” আর তার সাঁটের ছোকরাগুলি ঘিরে ফেলে বলবে “ এমনে ত ভদ্রলুক আর পথে দিয়া মাইয়া গেলে টানিয়া ঘরো লইযাইন, দে হারামজাদা লাখ টাকা দে, নাহলে …” … পা তবু, মন্থরে হলেও, এগোলো। আমি, সিদ্ধার্থ – চার পায়ে এগোলে মেয়েটি টের পেলো কিছু। এটা অন্তত টের পেলো, যে, এই যে “আমি” আমার মতো দেখতে হলেও, আমার ভাই’এর মতোও দেখতে। অর্থাৎ আমি যে মেয়েটিকে চিনতে পারছিনা, তা’ই, হয় স্বাভাবিক। এইবার সামান্য হাসি উঠে এলো মুখে। “আমি আফনারার কিনারের বাসাত থাকি”। হাত দিয়ে দেখালো পার্শ্ববর্তী জমাট অন্ধকার। এখানে একটি দু’টি টিন-চাল আর বাঁশ-বেড়ার ঘর। আগেছিল ছন-চাল আর বাঁশ-বেড়া। গোঁসাইদের জমি। আমরা বলতাম জমিদারি। বুড়া গোঁসাই’এর কয়েক লক্ষ ছানাপোনা ছিল। এই টুকরো জমিতে, বুড়া টপকালে, সব্বাই জানালো দাবী। অতএব জমি হলোনা কারোরই। কয়েক লক্ষ ছানাপোনার যেটি এখানে বাস করে, এই আমাদের বাড়িরই উল্টো গলীতে, সে’ও এখন সত্তর। এর বাপ-আমল থেকেই এখানে ছোটো ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হতো। রিক্সা চালক, ঠেলাগাড়ি চালক বা ওই কিসিমেরই শ্রম যাদের জীবিকা, তাদেরকে। এতে যেটা হতো, তা এই, যে, এদের বৌ গুলি বেগার খেটে দিতো গৌঁসাইজীর গিরস্থিতে। “সেই ট্রেডিশান” এখন টিন-চাল আর বাঁশ-বেড়া আর একদা “হুক” মারা কারেন্টের বদলে, বাধ্য হয়ে, “আসলি” কারেন্ট। ব্যস। – এই যে দেবী, অধুনা দন্ডায়মানা, আমাদের মুখামুখি, যার আবহে অন্ধকার, সে ওই গোঁসাই-প্রজাদের কারো বৌ-মেয়ে । বোঝা গেলো।  “এট্টু, দুই মিনিট চাজ দিতে পারমু নি”? তার হাতে একটি ভগ্নদশা “স্মাটফুন”। “আমরার কারেন্ট নাই”। হায়, দেবী, হায় মানুষ, হায় সভ্যতা! দু’টি আলোকিত, কারেন্টিত বাড়ির মাঝখানে এই একফালি অন্ধকার, গাড়, কঠিন, জটিল। হায়, যেখানে দেবীর, দেবীদের ঘরে ঘরে অন্ধকার, সেখানে মন্ডপ আলো করে কাকে আনো তোমরা? মেয়েটির চোখে ভিতুভিতু জিজ্ঞাসা। মুহুর্তে টের পেলাম “

খুব জ্যোৎস্না, তেমনি হাড়কাঁপানো শীত। পৌষ মাসের শেষ। সদর কাছারি হইতে লবটুলিয়ার ডিহি কাছারিতে তদারক করিতে গিয়াছি। লবটুলিয়ার কাছারিতে রাত্রে রান্না শেষ হইয়া সকলের আহারাদি হইতে রাত এগারটা বাজিয়া যাইত। একদিন খাওয়া শেষ করিয়া রান্নাঘর হইতে বাহিরে আসিয়া দেখি, তত রাত্রে আর সেই কন্‌কনে হিমবর্ষী আকাশের তলায় কে একটি মেয়ে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় কাছারির কম্পাউন্ডের সীমানায় দাঁড়াইয়া আছে। পাটোয়ারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম-ওখানে কে দাঁড়িয়ে?

পাটোয়ারী বলিল-ও কুন্তা। আপনার আসবার কথা শুনে আমায় কাল বলছিল-ম্যানেজারবাবু আসবেন, তাঁর পাতের ভাত আমি গিয়ে নিয়ে আসবো। আমার ছেলেপুলের বড় কষ্ট। তাই বলেছিলাম-যাস্।

কথা বলিতেছি, এমন সময় কাছারির টহলদার বলোয়া আমার পাতের ডালমাখা ভাত, ভাঙ্গা মাছের টুকরা, পাতের গোড়ায় ফেলা তরকারি ও ভাত, দুধের বাটির ভুক্তাবশিষ্ট দুধভাত-সব লইয়া গিয়া মেয়েটির আনীত একটা পেতলের কানাউঁচু থালায় ঢালিয়া দিল। মেয়েটি চলিয়া গেল।

আট-দশ দিন সেবার লবটুলিয়ার কাছারিতে ছিলাম, প্রতিরাত্রে দেখিতাম ইঁদারার পাড়ে সেই মেয়েটি আমার পাতের ভাতের জন্য সেই গভীর রাত্রে আর সেই ভয়ানক শীতের মধ্যে বাহিরে শুধু আঁচল গায়ে দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। প্রতিদিন দেখিতে দেখিতে একদিন কৌতূহলবশে পাটোয়ারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম-কুন্তা-যে রোজ ভাত নিয়ে যায়, ও কে, আর এই জঙ্গলে থাকেই বা কোথায়? দিনে তো কখনো দেখি নে ওকে?

পাটোয়ারী বলিল-বলছি হুজুর।

ঘরের মধ্যে সন্ধ্যা হইতে কাঠের গুঁড়ি জ্বালাইয়া গন্‌গনে আগুন করা হইয়াছে-তারই ধারে চেয়ার পাতিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া বসিয়া কিস্তির আদায়ী হিসাব মিলাইতেছিলাম। আহারাদি শেষ করিয়া আসিয়া মনে হইল একদিনের পক্ষে কাজ যথেষ্টই করিয়াছি। কাগজপত্র গুটাইয়া পাটোয়ারীর গল্প শুনিতে প্রস্তুত হইলাম।

-শুনুন হুজুর। বছর দশেক আগে এ অঞ্চলে দেবী সিং রাজপুতের বড় রবরবা ছিল। তার ভয়ে যত গাঙ্গোতা আর চাষী ও চরির প্রজা জুজু হয়ে থাকত। দেবী সিং-এর ব্যবসা ছিল খুব চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া এইসব লোককে-আর তারপর লাঠিবাজি করে সুদ আসল টাকা আদায় করা। তার তাঁবে আট-ন’জন লাঠিয়াল পাইকই ছিল। এখন যেমন রাসবিহারী সিং রাজপুত এ-অঞ্চলের মহাজন, তখন ছিল দেবী সিং।

দেবী সিং জৌনপুর জেলা থেকে এসে পূর্ণিয়ায় বাস করে। তারপর টাকা ধার দিয়ে জোর-জবরদস্তি করে এ দেশের যত ভীতু গাঙ্গোতা প্রজাদের হাতের মুঠোয় পুরে ফেললে। এখানে আসবার বছর কয়েক পরে সে কাশী যায় এবং সেখানে এক বাইজীর বাড়ি গান শুনতে গিয়ে তার চৌদ্দ-পনের বছরের মেয়ের সঙ্গে দেবী সিং-এর খুব ভাব হয়। তারপর তাকে নিয়ে দেবী সিং পালিয়ে এখানে আসে। দেবী সিং-এর বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। এখানে এসে দেবী সিং তাকে বিয়ে করে। কিন্তু বাইজীর মেয়ে বলে সবাই যখন জেনে ফেললে, তখন দেবী সিং-এর নিজের জাতভাই রাজপুতরা ওর সঙ্গে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে ওকে একঘরে করলে। পয়সার জোরে দেবী সিং সে সব গ্রাহ্য করত না। তারপর বাবুগিরি আর অযথা ব্যয় করে এবং এই রাসবিহারী সিং-এর সঙ্গে মকদ্দমা করতে গিয়ে দেবী সিং সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। আজ বছর চারেক হোলো সে মারা গিয়েছে।

ঐ কুন্তাই দেবী সিং রাজপুতের সেই বিধবা স্ত্রী। এক সময়ে ও লবটুলিয়া থেকে কিংখাবের ঝালর-দেওয়া পালকি চেপে কুশী ও কলবলিয়ার সঙ্গমে স্নান করতে যেত, বিকানীর মিছরি খেয়ে জল খেত-আজ ওর ওই দুর্দশা! আরো মুশকিল এই যে বাইজীর মেয়ে সবাই জানে বলে ওর এখানে জাত নেই, তা কি ওর স্বামীর আত্মীয়-বন্ধু রাজপুতদের মধ্যে, কি দেশওয়ালী গাঙ্গোতাদের মধ্যে। ক্ষেত থেকে গম কাটা হয়ে গেলে যে গমের গুঁড়ো শীষ পড়ে থাকে, তাই টুকরি করে ক্ষেতে ক্ষেতে বেড়িয়ে কুড়িয়ে এনে বছরে দু-এক মাস ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আধপেটা খাইয়ে রাখে। কিন্তু কখনো হাত পেতে ভিক্ষে করতে ওকে দেখি নি হুজুর। আপনি এসেছেন জমিদারের ম্যানেজার, রাজার সমান, আপনার এখানে প্রসাদ পেলে ওর তাতে অপমান নেই।”

হায়, বিভূতিভূষণ, এই “আরণ্যক”, শুধু “আরণ্যক” ই কেন, আপনার সমস্ত কাহন-কাহিনী আর মাও সে তুঙ্গের “হুনান রিপোর্ট” – এদের মাঝখানে আজো আমি দিশাহারা। আমি মার্ক্সের কাছে গেছি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক ভাবে। হে কার্ল মার্ক্স, বিদূতিভূষণ আমাকে ঠেলে দিয়েছেন আপনার দিকে। আপনার সেই কম বয়সের নোটবই গুলির দিকে। আমার বিদ্রোহ-বিপ্লব অন্তিমে ভালবাসা। ভালবাসাই। হে বিভূতি, হে কার্ল মার্ক্স, আমি বুঝিনা, আমি বুঝিনি – এতো বচ্ছর ধরে যারা বিভূতি পড়ে আসছে, পড়িয়ে আসছে, বই লিখে বাজার দোকান ছেয়ে ফেলেছে, তারা কেন চিনতে পারেনি, আজো পারেনা এই সকল কুন্তা’দের? দুর্গা দের? আর যারা চিনতে পায়, যেমন আমি, আমিই বা ঠিক কোন ভাবে কাজে লাগছি সেই প্রক্রিয়াতে, যার দ্বারা সকল কুন্তা’ই একদিন হ’তে পারে, পারবে, সিংহবাহিনী?

শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। তাই তিনদিন ধরে কারেন্ট নেই ওদের। সাড়ে সাত গন্ডা’র ওই জমিদার, ওই গু-সাই, করেনি কোনো ব্যবস্থা। অতএব, শেষ পর্যন্ত এই কুন্তা, হরিহর রায়ের মেয়ে, এই দুর্গা, সাহস করে পার হয়েছে আমাদের বাড়ির গেট। কাঁপা হাতে ফোনটি বাড়িয়ে ধরে, আরো কাঁপা স্বরে বলছে  “এট্টু, দুই মিনিট চাজ দিতে পারমু নি”? 

আমি বললাম “যা, চার্জে দে। দু মিনিট কেন? দুই ঘন্টা হলেও বা কি?”

এর নাম, আমি নিশ্চিত, বুনো-লতা। 

বন্য লতা’ই সে। বন্য লতা’ই এরা।

এ’ই দেবী। এরাই দেবী।


Monday, October 25, 2021

দেখাহবে

দেখাহবে

 


দেখা হলে কথা হবে, বাবা।

দেখা, অবশ্যই, হবে।

#

মৃত্যু পার হয়ে কোনো গ্রহ নেই, গ্রহান্তর নেই --

এই সত্য জানি আমরা দুইজনে, তবু,

দেখা হবে। দেখা হবে গ্রহান্তরে নয়,

দেখা হবে আমাদের এ ধূলি শহরেই, হয়তো সকালবেলা,

ডেকে তুলবে পড়তে বসার জন্য। হয়তো দুপুরে

সাইকেলে চেপে তুমি ক্লাস সেড়ে বাড়ি ফিরে এলে।

অথবা অনেক রাত্রে "মহামতি লেনিন" এই যাত্রাপালা শেষে

হাতধরে বাড়ি ফিরবো

পশলা বৃষ্টির শেষে

থানারোড হয়ে ... 

Sunday, August 8, 2021

পাখি,পাখিবাসা

পাখি,পাখিবাসা

এসো, সিঁদ কাটো কিংবা 

ধাক্কা দাও

দুঃসাহসে, দুঃসাহসি হাতে।

#

আটটি কুঠুরি আর নয়টিই দরজা শুধু নয়

সংখ্যার অতীত খোলা-

বন্ধ দরজার

আজব কুদরতি 

এই খাঁচা, প্রতিজন পাখি -

ভিন্ন দ্রাঘিমা,  অক্ষ,

বিভিন্ন বিস্ময়। 

কার সাড়া পেলে তার

কোন দোর খোলে, আর

কোন ঝরোখাটি

খোলা থেকে বন্ধ চিরতরে -

সুবাতাসে, কুবাতাসে, দখিনায়, ঝড়ে

সে জানেনা নিজে।

অতএব তুমি হে পথিক কিংবা

গো সিঁদেল চোর, তুমি,

টোকা দাও, ধাক্কা দাও, সিঁদ কাটো যদি

জানিনা হে, সে কোন কোঠাটি

তোমার নিমিত্ত খুলবে, বন্ধ হয়ে যাবে... 

তবু যদি আমার এই দুর্গ, পরিখা

পরীক্ষার সাধ হয়, তবে

এসো, সিঁদ কাটো কিংবা 

ধাক্কা দাও

দুঃসাহসে, দুঃসাহসি হাতে।


---

করিমগঞ্জ, ০৭।০৮ - ০৮।০৮।২১

সপ্তর্ষি বিশ্বাস 



Tuesday, August 3, 2021

শাদা আর কালো

 শাদা আর কালো



ফুরোনো দিনের সব আলো,

এলবাম, শাদা আর কালো।

এখন যেখানে লোহা-সেতু

সেখানেই ছিল এক সাঁকো।

সেতুটি প্রহরীহেন জাগে -

সাঁকো ডাকে গহনে আমাকে।

#

সেতু বেয়ে যারা যায়, যাবে,

তারা কেউ চেনে কি সাঁকোকে?


সেতু নয়, সাঁকোটিকে আঁকি।

শাদাকালো এলবামে রাখি।।

____________________________
ফোটো (c) সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য 

Monday, August 2, 2021

"ফিরে এসো"

 "ফিরে এসো"

 "আম নিম ঝাউএর জগতে ফিরে এসো"

-ফিরে এসো, জীবনানন্দ দাশ, মহাপৃথিবী

 

ফিরে এসো হাসপাতাল থেকে। ফিরে এসো

গাড়িতে নাহলে এম্বুলেন্সেও। তবু

ফিরে এসো আরো দুয়েকদিনে।

 

একদিন এ গ্রহটি করেছ স্থাপন

গ্রহান্তর থেকে এসে একা। তুমি

ছাড়া সবই কি নীরব! আরেকবার

ফিরে এসে শুধু আমাদের হাতের কব্জিতে

শিরাগুলি করো অনুভব।

 

সপ্তর্ষি বিশ্বাস, ০১/০৮/২০২১

করিমগঞ্জ

Sunday, November 10, 2019

"আর কি কখনো কবে... "

"আর কি কখনো কবে... "

এইতো বিকাল নামছে। নভেম্বর মাসের বিকাল। এখুনি
সিদ্ধার্থ আসবে। গেটের আওয়াজ পাওয়া যাবে। মা'কে
বলব 'মা, দুকাপ চা'। তারপর বিকালের রোদ পিঠে করে
দুজনে বেরিয়ে পড়ব, সাইকেলে কিংবা পায়ে হেঁটে। 'কাকু'র
দোকান থেকে চারমিনার ধারে কিনে মোড় পারহলে
আদিত্যস্যারের বাড়ি, রূপসী বাংলার মতো
ছায়াঘন, রহস্যে শানিত। ( এখানে থাকেনা কেউ বহুদিন
হলো। স্যারের অসুস্থ ছেলে কিজানি সে বেঁচে আছে কিনা।
স্যারকেও দেখিনি যে কতো যুগ হল। অথচ ইস্কুলজন্মে,
কোনো এক যুগে স্যার ছিলেন অনেকেরই হিরো) পারহয়ে
সিগারেট জ্বালাবো সাবধানে। নভেম্বররোদ পিঠে আমাদের
যাওয়ার কিনারে নটীখালও কুশিয়ারা থেকে বয়ে যাবে
লঙ্গাই'এর টানে। আসবে বাঁশের পুল, ডানদিকে ( বাঁশের পুলটি
কবে রাতারাতি সিমেন্টের ব্রীজ হয়েগেছে। রাতারাতি পরবাসী 
হয়েগেছি আমরাও কবে)। পারহলে বনমালী রোড। মস্তান
হীরাপান্না আর সুপারি-নারকোল গাছ, টিলা আর গোরস্থান
হয়ে বনমালী রোডও শেষে লঙ্গাই নদীতে মিশেছে। হাতের
ডাইনে রেখে তাকে আমরা যাবো সোজা হেঁটে হাসপাতাল
রোডে। হাসপাতাল রোড ঠিক নয়, একে লোকে পাগলা পট্টি
বলে - কেজানে কবের কোন সাধক, প্রেমিক কিংবা পাগলের
স্মরণে, সম্মানে। ( ননী পাগলা, যিশুপাগলা বলা হতো যাঁকে –
ঝোলা ব্যাগে বাইবেল ও যিশুবাণী নিয়ে শহরের পথে ঘুরে ঘুরে
পাঠ করে শোনানো ব্যতীত যাঁর আর অন্য কোনো পাগলামি
দেখিনি কখনো তাঁর বাস পাগলা পট্টিতে কিন্তু ছিলনা কখনো।)
পাগলাপট্টির মোড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে নভেম্বররোদ মরেগিয়ে
সন্ধ্যা হচ্ছে। অদূরেই রাজ্যহীন মহারাজ আর পত্নীহীন
স্বামীদের রামকৃষ্ণ মিশনে নিয়মিত নামতাহেন 'খন্ডন  ভব বন্ধন' 
চলছে তারস্বরে, সুরে ও বেসুরে। তিষ্টুদা তখনো হয়ত বদলি নিয়ে
পাকাপাকি আসেনি এখানে। সম্ভবত শনিরবিবারে আসতো 
– পরিস্কার মনে নেই। তবে 'স্বস্তিকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে' আমাদের 
আড্ডা,নিয়মিত, তিষ্টুদাদের বাড়ি আরেক কাপ চা খাওয়ার পরে। 
নভেম্বর মাসের রাত্রি এতক্ষণে ডালপালা মেলেছে শহরে। অদূরেই
কুশিয়ারা। স্বস্তিকাতে খদ্দের বলতে আমরা তিনজন ছাড়া
মালিকের পাত্র মিত্র দু চারজন হবে। মুখোমুখি শূন্য  কোর্টবাড়ি। 
মামলা লড়তে যারা আসে – সকালে দুপুরে – তাদের শিঙারা, চা
স্বস্তিকার আদত ব্যবসায়। সন্ধ্যাহতে তাই শুনশান। তাই স্বস্তিকাতে
আমাদের এ নিভৃত আসর। বিল নিয়ে ভাবনা নেই। তিষ্টুদা
আছে। রীতিমতো চাকরি করে ক’বছর ধরে। নকশালবাড়ি
থেকে ঘুরে কথা রোজই কবিতা পেরিয়ে পৌঁছে যায় গানে। সিদ্ধার্থ
ভালো গায়। তিষ্টুদারো কন্ঠ সুরেলা। গাওয়ার আবেগে আমি যে
বেসুরো এই সত্য ভুলেগিয়ে মিলাই আমিও কন্ঠ 'শংখচিলে', 'হেঁই
সামালো ধানে'। মনেহয় সোনার ফসলে মানুষের স্বর্ণযুগ
প্রকৃতই আসে। ( যদিও রাজীব-জ্যোতি-জয়শ্রীরামে কালনেমির
লংকাভাগে আগেই নেমেছে)। ঘড়ির অবাধ্য কাঁটা সাড়েদশ
পার হয়েগেলে আমাদের ঘরেফেরা পালা হেঁটে হেঁটে, মৃদুস্বরে
গান গেয়ে গেয়ে। হাটমেন্ট রোড ধরে।  সরল খাঁর দিঘি
পারহয়ে। 'আপনারা এলে ভালো লাগে'। কয়েকদিন
না আসার পরে স্বস্তিকার মালিকজন একদিন বলেছিল আর
একদিন চা বানানো বালকটি এসে দিঘল স্বপ্নচোখ মেলে
বসেছিল সারাক্ষণ আমাদের পাশের টেবিলে। দেখি
ক্যালেন্ডারে নভেম্বর কবেই আবার এসেগেছে। অপেক্ষায়
বসে আছি। সিদ্ধার্থ কখন আসবে। তিষ্টুদা কি বাড়িতে
এসেছে? ছুটি নিয়ে এই শনিবারে?

সপ্তর্ষি বিশ্বাস
১০/১১/২০১৯

Sunday, May 18, 2014

ময়নাদ্বীপের মাঝি






ময়নাদ্বীপের মাঝি

আমাদের 'ময়নাদ্বীপ' এ নিয়ে যাবে বলে
পদ্মা, মেঘনা, গঙ্গা, কুশিয়ারা, বরাক পেরিয়ে
এসেছিল সেই মাঝি আজ ভোরবেলা।

শতাব্দীর শ্যাওলা ঢাকা গাছতলে বসে
গেয়েছিল জলে ডোবা প্রিয় গান গুলি।
'ময়নাদ্বীপ'এর কথা রূপকথা হয়ে
ছড়িয়ে যাচ্ছিল আজ -
ঘাসে ঘাসে, বৃষ্টিধোয়া শাখায়, পল্লবে -

তারপর শ্লথ পায়ে দ্বিপ্রহর এলে
আমরা 'ময়নাদ্বীপ' এ ভেসে যেতে অপারগ জেনে
বাঁকা তার লাঠি ঠুকে ফিরে চলে গেলো
কূপীর আলোয় জ্বলা 'আতাল বস্তী'তে...


হে মাঝি, কুবের মাঝি, তুমি এ শহরে
'ময়নাদ্বীপ'এর গান গেয়ে গেয়ে কবে
যেদিন নিজেই এক 'ময়নাদ্বীপ' হবে
আমার কঙ্কাল আমি সেদিন বিছিয়ে দেবো
বাঁশের সাঁকোর মতো তোমার গমনে ...

মাঝি হে, স্বপ্নে নয়,
তোমার রক্তে মাংসে, ক্ষয়ে আসা হাড়ে
আমার বিশ্বাস, বলো,
আজো ফের নীড় পেতে পারে?

Saturday, May 17, 2014

'পদ্ম' বিষয়ে শিলালিপি



'পদ্ম' বিষয়ে শিলালিপি

১।
ফুটেছে 'পদ্ম' আর তাকে ঘিরে আছে
হাঘরে, হাভাতে নয় -লোভী মুখগুলি।

'ছেলের ওষুধ কিন্‌বো, পদ্ম তুই আগুনে ঝাঁপা "
"ঝাঁপাবিনা? শালি রেন্ডী, বংশের ইমান ইজ্জত
সব গেছে! গেরামের সব্বে জানে রেন্ডী তুই!
তিন দিনে টাকা না পাঠালে জেনে রাখ্‌ তোর আর বাপ্‌-ভাই নেই!"


'পদ্ম' সে'ত 'পুষ্প' নয়, শুধু 'ফুল' , তাই
বাপ্‌-ভাই সম্পোক্কের লোভে
ঝাঁপ দেয় আবারো আগুনে।
পাঁপড়ি গুলি ঝলসে যায় - তবু -
পদ্ম একা পোড়ে তার ভাড়াটে কোঠাতে...।
২।
হে শেফালী, তোমার সম্মান
দিতে জানি। তবু -
'পদ্ম' একটি 'ফুল'। 'পুষ্প' নয়। তাই
প্রণয়  সম্ভব নয় জেনেও দুপুরে
শুধু সাঁতারের লোভে ঝাঁপ দিয়ে অতলান্ত ডুবে
শিকড়ে বাকড়ে তার জড়িয়ে জড়িয়ে
দেখেছি সে 'পারিজাত', তবু
তথাগত ভিন্ন আর অপর কেহই
জানেনি এ শিলালিপি
সন্ত ও সভ্যতাঘেরা
কবন্ধ এ দাহ্য পৃথিবীতে।

ঘুম ঘর