প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...
Showing posts with label আমার শিক্ষকেরা. Show all posts
Showing posts with label আমার শিক্ষকেরা. Show all posts

Tuesday, November 14, 2017

“…এখন কোথায়?”

“…এখন কোথায়?”
সপ্তর্ষি বিশ্বাস

‘আমার মাথা নত করে দাও, হে তোমার, চরণধূলার তলে’
১।
ছিলনা কিছুই তবু ছিল অনেক।
ছিল শহরের দুই প্রান্তে দুই নদী আর শহরের কিনার ধরিয়া, রেল লাইনের কিনারে কিনারে ধাবিত টেলিগ্রাফের তারহেন, খাল। নটী খাল। ঐ নটী খালের পাড়েই ছিল বাড়ি। ‘বাসা’ নয়, ‘বাড়ি’। ছিল ভোর ভোর ঘুমভাঙ্গা অতঃপর মা’র তাহের ‘দুধমুড়ি’অন্তে রাস্তায় নামা। সাইকেলে। ‘বড় রাস্তা’র আগে ঐ “কাল্ভার্ট অব্দি যেখানে খালের বক্ষকাটা নালা মিশিয়াছে ভুক্কুরের কচু ক্ষেতে, উমেশ শ্যামের, কালা মিয়ার ধান ক্ষেতে। ঐ খানেই মুখামুখি দোকান – মণীন্দ্রমাজন আর সুভাষের। আগইয়া গিয়া ভুক্কুরের কচুক্ষেত, ধান ক্ষেত। পারাপারহীন জলা। লোকমুখে সরল খাঁ’র দিঘি। পার্শ্বেই কবর। সরল খাঁ’র। বাঁশ ঝাড়। টিলা। হাট্মেন্ট রোড। - এইবার বড় রাস্তা। সেটেল্মেন্ট বাজার। বাজারের উল্টাদিকের পাকা রাস্তায় শহর ফুরায়।  আসে টিল্লা বাজার। ‘বডার। মফস্বলেরও ‘শহরতলী’…
        রোলা বার্থ, সেই বিদগ্ধজন, বলিয়াছেন “মীথ্ আসলে, হয়, এক বিশেষ ভাষাপ্রক্রিয়া”। জন্মিতেছে আমারও, বিশ্বাস,তাহাতে, ক্রমে। হ্যাঁ, সকলই এখন মীথ্ । মীথ্ নেতাজী মেলা। মেলার “বিদ্যুৎকন্যা”, মীথ পথিপার্শ্বে যুগলবৃক্ষের বিস্তার, মীথ সরল খাঁ, সরল খাঁ’র কবর, মীথ ‘সন্তর’ বাজাররাস্তায় “লোহার ব্রীজ” , লঙ্গাইনদীর কাঠের পুল, বনমালী রোডের বাঁশের সাঁকো। মীথ, অদ্য, সেই সকল “মানুষ গড়ার কারিগরেরা”ও – মীথ্ দেবব্রত সোম, দিলীপ পাল, রঞ্জিত দাস, অমিতাভ চৌধুরি … অদ্য হয় অসম্ভব, সত্যই, ভাষায় নির্মাণ করা সেই চালচিত্র, যে চালচিত্রে ছিলেন ইঁহারা, অর্পিত। সেই পৃথিবী, ভাষাপৃথিবী, রচনার অক্ষমতা লই স্বীকার করিয়া তথাপি চেষ্টা লই, জলের লিপিতে, রাখিতে কিছু ইঙ্গিত, কেজানে কোন্ অনাগতজনের নিমিত্ত…







২।
ছিলনা কিছুই তবু ছিল অনেক।
ছিলেন স্যার, অমিতাভ চৌধুরি। ছিল তাঁর মোটা কাঁচের চশমা আর বিরাট, বিষণ্ণ এক উঠানের আরধারে তাঁর প্রায় জনশূন্য বাড়িটি।
শহরের যে প্রান্তে কুশিয়ারা নদী, সেই প্রান্তের এক মনখারাপ গলীতে স্যারের বাড়ি। বাড়িতে স্যার একা’ই থাকতেন তখন। বারান্দা থেকে পাওয়া যেতো তাঁর ফিল্টার উইল্স্ সিগারেটের ঘ্রাণ। সামনের বারান্দা থেকে একটা অন্ধকার করিডর ধরে এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে স্যারের পড়ানোর ঘর। দেওয়ালে কাঠের তাক। বই। স্টেট্স্ম্যান্ পত্রিকা। মস্ত একটা কাঠের টেবিল ঘিরে দুটি কাঠের বেঞ্চি। কয়েকটা চেয়ার। এদেরই পাশাপাশি স্যারের খাটিয়া। উল্টোদিকের দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে ডাঁই করা ফিল্টার উইল্সের প্যাকেট। খালি আর না-খালিতে মেশানো। ঐ ডাঁই থেকে, বাজি ধরে সিগারেট চুরি করেছিল আমার ছোটোভাই।
ছিলেন স্যার, অমিতাভ চৌধুরি। তাঁর মোটা কাঁচের চশমা। ছিল সন্ধ্যায় নিত্যি লোডশেডিং আর সিগারেট দু আঙ্গুলের ফাঁকে নিয়ে তাঁর হাত বাড়িয়ে দেওয়া মোমের শিখার দিকে। না’ত মুখ নেবেন মোমের কাছে,না’ত মোমবাতিকে হাতে করে আনবেন মুখের কাছে। প্রায় শিক্ কাবাব বানানোর কায়দায় মিনিট দুই সিগারেটের মাথাটা মোমের শিখায় চেপে রেখে তারপর তিন চারটে ব্রহ্ম টান। সিগারেটের জ্বলে ওঠা।
                              সিগারেট দু আঙ্গুলের ফাঁকে নিয়ে মোমের শিখার দিকে ঐ হাত বাড়িয়ে দেওয়া থেকে সিগারেটের প্রকৃত জ্বলেওঠার মুহুর্তটি ছিল আমার কাছে, আমাদের কাছে  থ্রীলারপ্রায়। চোখের পলক ফেলতে পারতাম না, ক্যালকুলাসের প্রব্লেম কিংবা ডিনামিক্সের সমস্যা সমাধানরত আমাদের হাতগুলি থেমে যেতো। … সেটা ১৯৮৮/৮৯ সাল। এগারো কেলাস। করিমগঞ্জ কলেজ।  শতকরা ৩০০ ভাগ মফস্বলি “ইন্টেলেক্চুয়াল” হয়ে উঠছি। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, পায়ে হাওয়াই চটি, মুখে চারমিনার আর মগজে “বিপ্লব”। কলেজের দেওয়াল পত্রিকায় কবিত্বের বিজ্ঞাপন। “দিদি”দের আস্কারা। সহিপাঠিনীদের চোরা চাউনি। মর্মে সতত সঙ্গীতঃ “বালকবীরের বেশে তুমি করলে বিশ্বজয়, একি গো বিস্ময়…”  আমরাও, ক্রমে বিড়ি সিগারেটে হয়ে উঠিছি সড়গড়। এক সন্ধ্যায় স্যারের বাড়ির পাঠশেষে মোড়ের দোকানেই সিগারেট কিনে জ্বালাতে গিয়ে বাদ্লা বাতাসে নাজেহাল হচ্ছি। তখনই স্যারও এসেছে ওই দোকানে সিগারেট কিনতে। সিগারেটপ্রজ্জ্বলনপ্রক্রিয়ায় প্রায় সমাধিস্থ আমরা লক্ষই করিনি স্যারকে। জানিনা কতক্ষণ এনন চলছিল। অকস্মাৎ পরচিত কন্ঠের একটি মাত্র বাক্য বা খন্ড বাক্যঃ “তিন লেটার ফাইয়া মেট্রিক্ ফাশ্ করলায় আর সিকেরেট ধরানি দেখ্স্না’নি?” – বাক্যটি উচ্চারিত হওয়ামাত্র –আমি- সঙ্গে আর কে কে ছিল? , রাহুল, দেবর্ষি, অরূপ দাশ, পঙ্কজ দাশ, অয়ন, জয়দীপ বণিক? ঠিক মনে পড়ছেনা … প্রত্যেকের মুখে এবং পেটে হাসির হুলুস্থুল গুড় গুড় করেই আবার তলপেটে চালান। হাসলে উপায় নেই। অতএব হজম করো এবং কর পলায়ণ।
           তবে ঐ ওতোটুকুই। বেশী কথা স্যারকে বলতে শুনিনি কোনোদিন। স্থির চোখে, চশমার কাঁচের ভিতর দিয়ে একটি চাউনি। ঐ যথেষ্ট। কলেজ ইলেকশনের সময়েও দেখেছি কুমারেশ,সজল দত্ত’হেন “মাস্তান”ও স্যারকে আসতে দেখেই সর্দারি ছেড়ে ভোঁকাট্টা দিয়েছে। অথচ তেমন লম্বা চওড়া ত ননই – রীতিমতো বেঁটে’ই ছিলেন স্যার। ছিল এক আরোগ্য-অসম্ভব চর্মরোগ যার প্রকোপে স্যার বহুযুগ ইন্দ্রলুপ্ত। একদা আমাদের বাড়িতে, প্রতি রবিবারে এক আসর বসতো। বলাযায় “স্টাডি সার্কল”। পালা করে পাঠ হতো “দাস ক্যাপিটেল্”। পরে “ওরিজিন অফ্ স্পেসিস্”। আসতেন নানা বিষয়ের অধ্যাপকেরা। ফিজিক্সের তুষারকাকু আর স্যার, অমিতাভ চৌধুরি। বোটানি-জুলজির প্রদীপ বিকাশ বাবু। আরো আসতেন কেউ কেউ। স্মৃতি এখন প্রতারণা করছে। কয়েকদিন জেঠু, মানে সুজিৎ চৌধুরিকেও দেখেছি আসতে। তখন আমি পাঁচ-কিংবা ছয় কেলাসের ছাত্র। স্যারকে তখন থেকেই দেখছি ঐ ইন্দ্রলুপ্ত মস্তকে। আরোগ্য-অসম্ভব ওই চর্মরোগই হয়তো তাঁর আজীবন অকৃতদারত্ব পালনের হেতু। নতুবা বেঁটে খাটো হলেও ওই রকম সুপুরুষ, একদা প্রেসিডেন্সির নামজাদা এই ছাত্রটির অবিবাহের অন্য কোনো হেতু পারেনা থাকতে। একদা আরো কয়েকজন অধাপক বন্ধুর সঙ্গে মিলে বাড়িতে পোলট্রি ফার্ম খুলেছিলেন স্যার সম্ভবতঃ সমবায় তত্ত্বের প্রয়োগপরীক্ষার নিমিত্ত। কুক্কুটদিগের খাদ্য কিংবা ব্যবহার্য কোনো পদার্থ, যা ছিল বিষাক্ত, তা’ই স্যারের এই মারাত্মক অসুখের হেতু।
যদিও কলেজে উঠেই, অংকস্যার রঞ্জিত দাশ স্যারের ভাষায়, “প্রেমময়” পুরুষ হয়ে গেছি, যদিও সিগারেট টান্তে শিখেছি সেই সাতের কেলাস থেকে, যদিও কলেজ ইলেক্শানে দাঁড়ানোর তোড়জোড় গিয়েছে আরম্ভ হয়ে –তথাপি স্যারের হোম্টাস্ক মিস্ করবার সাহস ছিলনা।
দাবা খেলতেন স্যার। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের কিনার দিয়ে যেতে যেতে আড়চোখে তাকিয়ে অনেকদিনই দেখেছি স্যার দাবায় নিমগ্ন। প্রতিপক্ষে কখনো ফিজিক্সেরই সুব্রত লালা, কখনো আমার বাবা। মাঝেমাঝে তুষারকাকুকে সঙ্গে নিয়ে, কখনো একাও – স্যার আসতেন বাবার সঙ্গে আড্ডা দিতে। ওই রকম সময়ে যদি আমারও বেরোতে হত নিজ আড্ডার দরকারে সামনের দরজা দিয়ে বেরোতে সাহস পেতাম না। পেছন দিয়ে চুপি চুপি গেটের কাছে এসে, প্রায় নিঃশব্দে গেট খুলে বেরোতাম। - না, একে ‘ভয়’ বলেনা। বলে ‘সমীহ’, বলে ‘সম্মান’ যা শুধুমাত্র ‘প্রফেসর’, ‘গোল্ড মেডেলিস্ট’, ‘তোমার মাননীয় শিক্ষক’ – ইত্যাদি দ্বারাই যায়না অর্জন করা।
স্যার ‘প্রাইভেট’ পড়াতেন। ঠিক। কিন্তু তা অর্থলোভ বা অর্থের প্রয়োজনহেতু নয়। পড়ানোর বাসনায় পড়ানো, পড়াতে ভালোলাগার সম্মোহনে পড়ানো। কলেজে স্যার এগারো-বারো কেলাসে পাঠ দিতে আসতেন না। মূলতঃ অনার্স’ক্লাসেই পড়াতেন। কিন্তু অনার্সছাত্রদের প্রাইভেটে পড়াতেন না স্যার। মাঝেমধ্যে অতিপ্রিয় এবং অতিমেধাবী এক আধজনকে বাড়িতে আসতে বলতেন বিশেষ কিছু বুঝিয়ে দিতে। তারই সমান্তরালে ছিলেন সেইসব ‘অধ্যাপক’রাও যাঁরা অনার্সের ক্লাসে অর্ধেক পড়িয়ে বা না পড়িয়ে প্রকারান্তরে ছাত্রদের জানিয়ে দিতেন ‘প্রাইভেটে পড়তে এসো, নোট্ পাবে’। ‘নোট’ এর চল এগারো-বারো কেলাসেও ছিল। কিন্তু অমিতাভ চৌধুরি নোট্ দেননি কোনদিন।
তবে আমার বিধি ছিল বাম। আমাদের এগারো কেলাসের মাঝামাঝি  স্যারের চর্মরোগের প্রকোপ এমনই বেড়ে গেলো যে স্যারকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলকাতা চলে যেতে হলো চিকিৎসাহেতু।
         অতএব অমিতাভ চৌধুরি স্যারের অনুপস্থিতির সুযোগে সেই আকাশ, বাতাস, ঘোষ ডায়রী, যশোদা, অশোকা রেস্টোরেন্ট, বাজারের বাইরে পলানের বীয়ারের দোকান, বাজারে নেমেই হাতের ডান দিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া, ঝাঁপ টানা স্বদেশী, বিদেশী মদের দোকান, কলেজের ফিজিক্স্ লেবরেটরীর পেছনের পুকুরধার, সহপাঠিনীদের স্তনের ভাঁজ, চোখের সঙ্গীতে নিজেকে দিলাম পুরোপুরি বিলীন করে। সাইকেলে চেপে ঘুড়ে বেড়াই শহরের এই মাথা থেকে ঐ মাথা। এইতো আরশোলা-পাখির মতন এক শহর তারি অলী-গলী-রেল লাইন, ছোটো দোকান, বড়ো দোকান, মাঝারি পার্ক, দুই শ্মশান, দুই নদী, নালা নর্দমা, থানার টিলা, টিলার উপরে সরকারি গেস্ট হাউস, ওল্ড মিশন রোডের শেষ প্রান্তে পুরোনো মিশনের ভাঙ্গা দেওয়াল – এই সব দেখে দেখে, দেখে দেখে আশ মেটেনা – তখনো, হায়, এখনো…
    এমনি করে ভোলানাথের ষাঁড়ের মতো সাইকেলে শহর চষে বেড়ানোর এক বিকেলে হঠাৎই শুনলাম এক কন্ঠঃ “অরেবা, সাইকেলখান্ এট্টু থামাও চাইন…” পরিচিত কন্ঠ। প্রিয় কন্ঠ।ব্রেক্ কষলাম। সাইকেল থামলো। রাস্তার বাঁদিকে। ফুটপাথ। কৃষ্ণা স্টোর্স। রিক্সায় স্যার। রঞ্জিত দাস।
সে আরেক কাহিনী, আরেক মহাবৃক্ষের উপাখ্যান। সে’ও বলব। বলে যাব তবে আরেকদিন। আপাততঃ ফিরেযাই অমিতাভ চৌধুরির কথায় যাঁর মৃত্যুসংবাদের হাহাকার এখনো মর্মে হেউঢেউ  …
৩।
কে ছিলেন এই অমিতাভ চৌধুরি?
যদি বলি ছিলেন সফল অধ্যাপক। পদার্থবিদ্যার। ছিলেন কৃতী ছাত্র। তাতে আর যা’ই বলাহোক্, বলা হয়না সেই মীথ্টির কথা যে মীথ্টি পিতামহ ভীষ্মপ্রায়, যে মহীরূহটি বনস্পতিপ্রায়। কেননা ছিলেন সফল অধ্যাপক কেবল পেশায় নয়, মর্মেও। মর্মেও, কেননা ‘পাশ দেওয়ার পড়া’র, পড়ানোর আলপথটি ধরে সাবধানে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে যেতেই, আমাদের মর্মে তিনি প্রোথিত করে দিয়েছিলেন সেই রাজপথটির খসড়া, যা, সিন্হা-রায় চৌধুরির ‘ইন্টারমিডিয়েট ফিজিক্স’ হয়ে ক্রমে চলেগেছে, হয়তো ‘গ্রভিটেশন্যাল ওয়েভ’এর দিকে, চলেগেছে যেখানে গঙ্গা মিলেছে আকাশগঙ্গায়। এমনকি আমাহেন ছাত্র – যে নয় ‘রিসার্চ স্কলার’, নয় মার্কাকরা ‘সাইন্টিস্ট’ বা নিতান্ত অধ্যাপকও – সে’ও যে পুস্তক বিপণীতে গিয়ে কিনেফেলে ফাইনম্যানের লেকচার সিরিজ বা ‘ইন্‌ সার্চ অফ শ্রডিংগার্স ক্যাট্‌’হেন গ্রন্থ আর সভয়ে হলেও রত হয় পাঠে – এর রহস্য, উৎস নিহিত অমিতাভ চৌধুরি এবং অমিতাভ চৌধুরিহেন মুষ্টিমেয় মনীষারই নিমিত্ত। বারো কেলাসের পরে যেহেতু প্রযুক্তি ছিল আমার পাঠ্য সুতরাং “হাইয়ার ফিজিক্স”এর কোনো “স্কুলিং” আমার নেই যা, এমন কি তথাকথিত “পাশ্‌ কোর্স” এ বিএসসি বন্ধুদের আছে। সুতরাং ‘আমি কে’, ‘আমি কেন’ হেন প্রশ্নের তাড়নায় পদার্থবিদ্যার দিকে ধাবিত হওয়ার আমার যে দুঃসাহস তার মর্মে ওই বারো কেলাসে, ওই অমিতাভ চৌধুরির পড়ানো ‘কোয়ান্টাম ফিজিক্স’ এর অধ্যায়গুলিই ছিল সম্বল। এখানে উল্লেখ্য স্যারের এক অতিপ্রিয় ছাত্র দেবাশিস ভট্টাচার্যের নামও। পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম আমরা। রাজাদা – মানে দেবাশিস ভট্টাচার্য – আর আমি। আমার বাবা, রাজাদার বাবা উভয়েই পড়াতেন সেই ‘করিমগঞ্জ কলেজে’ই যেখানে পড়াতেন অমিতাভ চৌধুরি। হ্যাঁ, বারো কেলাসের পরে রাজাদা’ও পাঠ নিয়েছে প্রযুক্তির তথাপি অদ্যাপি তার অনুসন্ধিৎসা ও পাঠ, পদার্থবিদ্যার, তারও মর্মে এই স্যার, এই অমিতাভ চৌধুরি। রাজাদাহেন আরো অসংখ্য কৃতীছাত্র, স্যারের, ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। তাদের কৃতিত্বের তুলনায় আমি সত্যই ‘অকৃতি অধম’ তথাপি, এগারো-বারো কেলাসের সেই দিনরাত্রিগুলির দিকে তাকিয়ে টেরপাই, স্যার, অমিতাভ চৌধুরি, আমাকেও “কম করে কিছু” দেননি।
৪।
আমি স্যারের জন্মসন জানিনা। জীবনী জানিনা। আমি তাঁর যাপনের ক্রনোলজি জানিনা। আমি জানি তাঁকে ততোটুকুই যতোটুকুর আলোতে তিনি আমার মর্মে ভাস্বর অদ্যাপি। মাত্র কয়েকমাস আগেই, প্রায় ২৬/২৭ বৎসর পরে, শুনেছিলাম তাঁর কন্ঠস্বর, শেষবার, টেলিফোনে। জানতাম স্যার করিমগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছেন গৌহাটিতে, অনেকদিন। আর কিছুই জানতাম না। ক্রমে, ২০১৬ সালের মাঝামাঝি স্যারের কণিষ্ঠা ভগিনী দেবীদত্তাদি’র সঙ্গে নিতান্ত আকস্মিকভাবেই পরিচয় হয়েগেল। তাঁর কাছেই পেলাম স্যারের খবর। আমার সঙ্গে দিদির যোগাযোগ হয়েছে শুনে স্যার দিদিকে বলেছিলেন আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চান।
বাবা তখন আমার কাছেই। ফোন করলাম এক দুপুরে।
ফোন বাজছে। মনিটরে দেখাচ্ছে “ডায়ালিং”। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড ... আর আমার চেতনা পিছিয়ে যাচ্ছে দশ বছর, পনেরো বছর ... “ওয়েট্‌ আর মাস্‌ এর ডিফারেন্স”, “ আন-সার্টেনিটি প্রিন্সিপল”, মোটা কাঁচের চশমা ,বিরাট বিষণ্ণ এক উঠানের আরধারে প্রায় জনশূন্য একটি বাড়ি, একটি সিগারেটের জ্বলেওঠা …
অবশেষে ধ্বনিত হলঃ”হ্যালো” …
হায়! ‘সময় করেনা ক্ষমা’। যদিও কন্ঠের সেই গাম্ভীর্য, সেই ব্যক্তিত্ব প্রায় অটুট তবু যা গিয়েছে টুটে তা’ই ক্লোরোফিল। ওই স্বরে হলুদ শিরার আভা। “স্যার প্রণাম” এটুকু বলে নিয়েই বাবাকে দিলাম ফোন। তাঁদের বার্তালাপ দাঁড়িয়ে শুনবার মতো অবস্থা আমার নেই তখন। ফোন স্পীকারে থাকায় কানে আসছে সবই তবু যেন ঠিক বুঝতে পারছিনা। আমি ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। চোখে ভাসছে আমাদের ছোতো বসবার কোঠাটি, আমি সেই কেলাস ফোর-ফাইভ, “অরজিন অফ স্পেসিস” পড়া হচ্ছে, অনেকের মধ্যে স্যার আর বাবা, আশি পাওয়ার বাল্বের আলোয় আলোকিত সন্ধ্যা, বাবা-তুষারকাকু-স্যার …আড্ডা চলছে, চা চলছে, দাবা চলছে, পুড়েযাচ্ছে সিগারেট …
“আমি ডিসেম্বরো করিমগঞ্জ আইমু …”
“আইন রঞ্জুবাবু আইন, আইয়া খালি একটা খবর দেইন যে” …
“রঞ্জুবাবু”! হ্যাঁ, স্যার অনেকের কাছে খ্যাত ছিলেন “রঞ্জুবাবু” বলে, “রঞ্জুদা” বলে …
হ্যাঁ, ক্যালেন্ডারে এই বছরের ডিসেম্বর মাস আসবে, পরের বছরেও আসবে, আরো অনেকবারই আসবে তবে “রঞ্জুবাবু” আর করিমগঞ্জ আসবেন না …
৫।
... এতদূর এসে জীবনানন্দ দাশের পংক্তি গুলি মনে পড়ছেঃ
আমলকী গাছ ছুঁয়ে তিনটি শালিক
কার্তিকের রোদে আর জলে
……….
সূর্য? না কি সূর্যের চপ্পলে

পা গলিয়ে পৃথিবীতে এসে
পৃথিবীর থেকে উড়ে যায়
এ জীবনে ঢের শালিক দেখেছি
তবু সেই তিনজন শালিক কোথায়।


... “এ জীবনে ঢের শালিক দেখেছি, তবু সেই তিনজন শালিক কোথায়”?
আমি বলি, নিজ মনে প্রায়শই বলিঃ এ জীবনে ঢের “অধ্যাপক”,”শিক্ষক”, ‘মাস্টারমশাই” ও “মাস্টর” দেখেছি, দেখবোও, তবু সেই  দেবব্রত সোম, দিলীপ পাল, সুশান্ত পাল, রমাপদ ভট্টাচার্য, রঞ্জিত দাস, অমিতাভ চৌধুরি’রা এখন কোথায়? …



সপ্তর্ষি বিশ্বাস
১৩/১১/২০১৭
বেঙ্গালোর

Sunday, March 11, 2012

জলিল স্যার


                                                              জলিল স্যার

১।
জলিল স্যারের প্রসংগে কিছু বলিবার অর্থ এমন একটি প্রজাতি সম্বন্ধে বলা যাহা প্রায় বিলুপ্ত বহুদিন...এমনকি আমাদের মফস্বল শহরগুলি হইতেও...
জলিল স্যার যখন মাষ্টারিতে ঢুকিয়াছিলেন তখনো মুড়ি-মুড়কির দড়ে মাষ্টারি বিক্রির যুগ আরম্ভ হয়নাই। তখনো ভোরবেলা গ্রামদেশের ভিটা হইতে ইষ্টিশান পর্যন্ত হাঁটিয়া আসিয়া ভিড়েভরা বাসে চাপিয়া অথবা দুলকি চালে চলা কয়লায় টানা ট্রেনে চাপিয়া মফস্বল শহরে আসিয়া পরিচিত পান-বিড়ির দোকানে পূর্বরাত্রে রাখিয়া যাওয়া সাইকেলখানি লইয়া ইস্কুলে পড়াইতে আসা শিক্ষক দেখা যাইত...
এইসব অবশ্যই জলিল স্যারের যৌবনের কথা যাহা আমি দেখিনাই, যাহা আমরা দেখিনাই।আমরা যখন জলিল স্যারকে দেখিতে আরম্ভ করি তখন আমারা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এবং তাঁহার গ্রামের বাড়িতে তাঁহার দ্বিতীয় পুত্রও ছাত্র পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শ্রেণির। আমাদের মফস্বল শহরে তখন ইহাই একমাত্র হাইয়ার সেকেন্ডারী ইস্কুল যেইখানে ছেলে-মেয়ে,মাধ্যমিকের পর,একত্রে পড়িতে পারে এবং একমাত্র হাইয়ার সেকেন্ডারী ইস্কুল যেইখানে সাইন্স পড়ানো হইয়া থাকে। ফলে যাঁহারা ছিলেন এগারো-বারো কেলাসে পাঠদানের অধিকারী তাঁহারা চালে চলনে বার্তায় ভংগীতে সেকেন্ডারি শিক্ষকগন হইতে আপনাদিগের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ফিকিরে থাকিতেন।সেকেন্ডারি শিক্ষকগনের একদল ঐসব হায়ার সেকেন্ডারি অধ্যাপকদিগের তালে তাল দিয়া নিজ প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিতেন,আরেকদল সু্যোগ খুঁজিতেন হায়ার সেকেন্ডারি অধ্যাপকদিগকে বাঁশ দিবার। আবার শহরের আমলাদিককে অনর্থক তৈল প্রদানের কর্মটি উভয়পক্ষই করিতেন একত্রে। সৌরীন নামে একটি অতি ডেঁপো ছোকড়া ছিল আমাদের সহপাঠী। ঐ দুই দলের শিক্ষক-শিক্ষিকাগনই সর্বতোমুখী চেষ্টা লইতেন তাহার প্রিয় হওয়ার কেননা জাতিতে তাহার পিতা ছিলেন ডিভিসনেল ফরেস্ট অফিসার
একজন সেকেন্ডারি শিক্ষকের জ্যেষ্ঠভ্রাতা ছিলেন রাজ্যের রাজধানীর বড় এক আমলা। ঐ শিক্ষকজন ক্লাস নিতে আসিয়া বা পথে দেখা হইলে,ছাত্র,ছাত্রর মাতাপিতা,রিক্সাচালক,মুদীর দোকানী সকলকেই সেই দাদার কীর্তি-কাহিনী উদারভাবে শুনাইয়া দিতে কার্পণ্য করিতেন না।ছিলেন দুই মহাকবি।একজন উচ্চমাধ্যমিক ক্লাশে জুলজি পড়াইতেন অন্যজন নিম্ন-মাধ্যমিকে...কিন্তু ঠিক কি বিষয় যে তিনি পড়াইতেন তাহা বুঝিনাই কদাপি...কেননা বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ অধ্যয়ন সমস্ত বিষয়ের ক্লাসেই তিনি আসিতেন এবং পড়াশুনায় নিতান্ত দূর্বল তথা নিরীহ ছেলেগুলিকে লইয়া রগড় করিয়াই তিনি কেলাস কাবার করিয়া দিতেন। প্রধান শিক্ষক,যে তিনজনের আমল আমি দেখিয়াছি তন্মধ্যে,অনিন্দ্য ভট্টাচার্যই একমাত্র সেই সেকেন্ডারি কবিকে কিছুদূর বাগে আনিতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই আমার অনুমান।
এইরূপ মাদারির খেলের সমান্তরালে জলিল স্যার,বাসস্টপ হইতে সাইকেলে চাপিয়া,আসিতেন প্রত্যহ সকাল সাড়ে নয়টায়।শ্মশ্রুগুম্ফবিহিন পরিষ্কার কামানো মুখমন্ডল,বাম পার্শ্বে সিঁথি কাটিয়া আঁচড়ানো চুল। ধব্‌ধবে শাদা শার্ট,কালো পেন্টুলুন। মুখে ঈষদ হাসির রেখা। পূর্বে বর্ণিত কোনো দলেরি সদস্য ছিলেননা তিনি। ছাত্র-শিক্ষক কাহারো সন্মুখেই আপনাকে কবি, সাহিত্যিক কিংবা মহাজ্ঞানী হিসাবে প্রতিপন্ন করিবার প্রয়াস বা প্রচেষ্টার কোনো বালাই ছিলোনা তাঁহার। অথচ কাহারো সহিত বিবাদ বচসায় দেখিনায় তাঁহাকে যেমন দেখাযাইত অন্য অনেককেই...ষ্পষ্ট মনেপড়ে দুই হায়ার সেকেন্ডারি অধ্যাপক স.বাবু আর র.বাবুর প্রায় হাতাহাতি ইস্কুল কেন্টিনের সন্মুখে... স.বাবু মূলতঃ ছিলেন গুন্ডা প্রকৃতির আর র.বাবু ছিলেন তাঁহার অঞ্চলের কুচক্রীদিগের মাথা তদুপরি উভয়েই বাস করিতেন প্রায় এক পাড়ায় অতএব সংঘর্ষ নানা কারনেই বাধিতে পারে...
ফাইভ হইতে টেন্‌ সব শ্রেণীতেই ক্লাশ লইতেন জলিল স্যার। ক্লাস নাইন-টেনে তাঁহার নিকট পাঠ নিয়াছি সমাজ অধ্যয়নের। ক্লাস সিক্সে সম্ভবতঃ ভূগোল।চট্‌পটে ছাত্র বলিয়া তাঁহার বিশেষ স্নেহ যেমন পাইয়াছি তেমনি অতি দুরন্ত স্বভাবের কারনে সেভেন-এইট্‌ পর্যন্ত কিল-চড়ও খাইয়াছি বিস্তর। অন্ততঃ ক্লাস সেভেন অবধি জলিল স্যার আমাদের ভয়ের পাত্রই ছিলেন। অথচ তেমন যে মারধর করিতেন তাহাও নহে,তেমন মারাত্মক কোনো শাস্তিও দিতেননা। যাহা দিতেন তাহার নাম চিমটি। বাহুতে কিংবা পেটে। সেই চিমটি হইতেও বেশী ছিল চিমটির ভয়।পড়া করিয়া না আনিলে বা খাতা-বই মনেকরিয়া না আনিলে জুটিত সেই চিমটি।তবে তখন টের না পাইলেও আজ বুঝি সেই চিমটিতেও মিশ্রিত থাকিত স্নেহ ...
                                         ইস্কুলবাড়িটির আকৃতি অনেকটা ইংরেজী ইউ অক্ষরের ন্যায়।ইউটির ঠিক মধ্যবিন্দুতে আধো-অন্ধকার কোঠাটি প্রিন্সিপালের কোঠা। লাগোয়া কোঠা ভাইস্‌ প্রিন্সিপালের। ঐ কোঠাগুলিকে ঘিরিয়া অফিসরুম।ইউর কেন্দ্রটির দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইলে ডানপার্শ্বে যে কোঠাগুলি দেখাযায় সেইগুলি বড় বড় মোটা মোটা ইঁটের তৈয়ারি। থামগুলিও তেমনি দশাসই।ইউআকৃতির।ইস্কুলবাড়ির ঐ অংশ সম্ভবতঃ বৃটিশ আমলের অবদান।এই সম্পূর্ণ অংশটিতে লাল রঙের চূনকাম। টানা বারান্দার একপার্শ্বে ক্লাসরুমের সাড়ি।ক্লাশঘরগুলির ঐ পারে দন্ডায়মান গোটা পাঁচ বয়স্ক আমগাছ। তাহাদের গায়ে শ্যাওলা।তাহাদের ছায়ায় ঐ দিকটি সর্বদাই স্যাঁতস্যাঁতে।ঐদিকে উঁচু দেওয়াল।পারাইয়া বড় খেলার মাঠ।বৃটিশ আমলের কোঠাগুলিতেই বসিত ফাইভ- সিক্সের ক্লাস। অদ্যাপি চোখে ভাসে সেই আধো-অন্ধকার কোঠাটিতে জলিল স্যার চেয়ারে উপবিষ্ট। ভূগোল পড়াইতে গিয়া নানাদেশের গল্প বলিতেছেন ... কখনোবা আমাদিগকে লিখিতে দিয়া তাকাইয়া আছেন জানালা দিয়া...আমগাছগুলির পাতার ভিতর দিয়া আলোছায়ার কাটাকুটি আসিয়া পড়িয়াছে স্যারের টেবিলে,ক্লাসঘরের মেঝেতে...
প্রতিজন ছাত্রেরি খাতা খুঁটাইয়া পড়িতেন জলিল স্যার। ভুল হইলে বুঝাইয়া দিতেন। দিতেন চিমটিও। কোনো না কোনোভাবে শিখাইয়া লইতেন যাহা শিখাইবার। ক্লাস সেভেন-এইটে আমাদের বি সেক্সনে ক্লাস করাননাই তিনি। কিন্তু সেভেনের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার ইতিহাস-খাতা দেখিয়াছিলেন তিনিই। আমার লেখা কয়েকটি উত্তর ভালোলাগায় টীচার্স-কমন্-রুমে ডাকাইয়া লইয়া পিঠ চাপডাইয়া দিয়াছিলেন...
ইউর কেন্দ্রটির দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইলে বামপার্শ্বে যে কোঠাগুলি সেইগুলি অপেক্ষাকৃত নূতন।সেইগুলির গায়ে সাদারঙ। সেই কোঠাগুলিতে ক্লাস বসে সেভেন হইতে টেনের ছেলেদের। ক্রমে আমরাও একদিন লালবাড়ি হইতে উত্তীর্ণ হইলাম শাদাবাড়িতে। সেভেন-এইট্‌ ডিঙ্গাইয়া উঠিলাম ক্লাস নাইনে।আবারো আসিলেন জলিল স্যার। সমাজবিদ্যা পাঠ দিতে।
এইসব কথা ১৯৮৭-৮৮ সালের।
২।
ইস্কুলের গন্ডি পারাইলাম। এগারো-বারো কেলাস কলেজে পড়িয়া অতঃপর কারিগরি শিখিতে চলিয়া গেলাম হোস্টেলে।খুব বেশী দূরে নহে,৫৬ কিলোমিটার দূরের প্রতিবেশী শহরে। ইতিমধ্যে আমাদের বন্ধু তপু আমাদের শহরে বেশ নেতা হইয়া উঠিয়াছে। তপু আমার বন্ধু সেই ক্লাস সিক্স হইতেই। রীতিমতো ভালোছাত্র ছিল সে। পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও নানা রকমের পড়াশুনা ছিল তপুর। মনে আছে সত্যজিৎ রায়ের সম্পাদনা করা ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প’ আমি পড়িয়াছিলাম তপুর দৌলতেই...ইস্কুলে সেও ছিল জলিল স্যারের পছন্দের ছাত্রদের একজন।
        ক্রমে রাজনীতিতে জড়াইল তপু। রেকর্ড ভোট পাইয়া কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি হইল। তপুর এবম্বিধ উন্নতিতে আমরাও আমোদ এবং বন্ধু হিসাবে সুবিধা দুইই পাইতেছিলাম। কিন্তু এবম্বিধ উন্নতির সহিত গুন্ডা এবং গুন্ডামির সম্পর্ক কালক্রমে নিবিড় হয় স্বাভাবিক ভাবেই। সেইভাবেই তপুর একদিন হাঙ্গামা বাধিল শহরের কুখ্যাত মাস্তানভ্রাতাদ্বয়ের সঙ্গে। উহারা আমাদের শহরে হীরা-পান্না নামে সুবিখ্যাত। এই হীরা-পান্না নাম তাহাদের পিতৃপ্রদত্ত নাকি তাহাদের প্রতিভায় মুগ্ধ হইয়া শহরের জনগনপ্রদত্ত তাহা বলা মুশকিল। ঠিক কি লইয়া কিভাবে তাহাদের সহিত তপুর ঝামেলা বাঁধিয়াছিল জানিনা তবে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি আসামাত্র অন্য বন্ধুদের মুখে শুনিলাম কিয়দ্দিবস পূর্বেই হীরা-পান্নার সহিত তপুর প্রকাশ্য বচসা হইয়া গিয়াছে,সন্ধ্যাবেলা,শহরের একমাত্র আলোকিত রাস্তা ষ্টেশনরোডে। পরদিন আড্ডাস্থলে গিয়াও শুনিলাম আরো কাহিনী। তপু সেই সন্ধ্যায় আড্ডায় আসেনাই।
        আরো এক দুইদিন কাটিয়াগেলো। সেইদিন সকালে উঠিয়া চা-জলখাবার খাইয়া সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ নিজের কোঠায় দরজা ভেজাইয়া সবে সিগারেট টানিতে আরম্ভ করিয়াছি তখুনি হন্তদন্ত হইয়া আসিয়া দরজায় ধাক্কাদিল কূটন –
        এই কূটন,আমি,তপু আর মনিদীপ ছিলাম ইস্কুলে ঘনিষ্ঠতম। আমরা ক্লাস সেভেনে উঠিলে মনিদীপের বাবা গেলেন বদলী হইয়া। ইতিপূর্বে জুবিনের বাবার বদলী হইয়াছিল ... জুবিন ... জুবিন বট্‌ঠাকুর ... যে বর্তমানে জুবিন গর্গ নামে খ্যাত ... এইবার মণিদীপ গেলো ...রহিয়া গেলাম কূটন,আমি আর তপু। পরে, ক্রমে, রাজনীতি,রাজনৈতিক ধ্যান-ধারনা লইয়া তপুর সঙ্গেও একসময় এক রকমের দূরত্ব আমাদের গড়িয়া উঠিয়াছিল ঠিক কিন্তু ঐ সমস্তই রাজনীতি,রাজনৈতিক ধ্যান-ধারনার মতো বাহ্যিক। গহনে আমরা ছিলাম বন্ধুই।
               বারো কেলাসের পর আমিও ছাড়িলাম শহর। কূটন একা হইল। হোস্টেলে নূতন বন্ধু-বান্ধব হইল আমার। কূটনেরো জুটিল নতুন বন্ধু। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের হ্রাস হইলনা কিছুমাত্র। শনি-রবিবারের ছুটি বা অন্যান্য ছুটিতে বাড়ি আসিতাম ঐ বন্ধুত্বের টানেই। তপুকে সর্বদা পাওয়া না গেলেও মাঝে মধ্যেই অন্য দলবলকে এড়াইয়া সে আসিত আমাদের সঙ্গে আড্ডা মারিতে...
       ফিরিয়া যাই গ্রীষ্মের ছুটির সেই সকালে যখন সকালে উঠিয়া চা-জলখাবার খাইয়া সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ নিজের কোঠায় দরজা ভেজাইয়া সবে সিগারেট টানিতে আরম্ভ করিয়াছি তখুনি হন্তদন্ত হইয়া আসিয়া দরজায় ধাক্কাদিল কূটন – কূটন আসিয়া এক শ্বাসে যাহা বলিল তাহার মর্ম এই,যে,আজ সকালেই হীরা-পান্নার সহিত তপুর বিরাট মারামারি হইয়া গিয়াছে, ষ্টেশনরোডে - হীরা-পান্না নাকি তলোয়ারের কোপ মারিয়াছে তপুকে। তপু নাকি হাসপাতালে। কেহ ফোন করিয়া খবর দিয়াছে কূটনকে। সে রিক্সা লইয়াই আসিয়াছে আমাকে লইয়া হাসপাতালে যাইবার জন্য।
       রিক্সায় হাসপাতালে পৌঁছিতে লাগিল মিনিট কুড়ি। তেমন কিছু বড় না হইলেও হাসপাতালটিতে পাঁচ ছয়টি ওয়ার্ড। পুরুষ ওয়ার্ডের প্রথমটি দেখিলাম। তপু নাই। দ্বিতীয়টিতে ঢুকিয়া ইতিউতি দেখিতেছি তখনি কানে আসিল একটি পরিচিত কন্ঠঃ বিশ্বাস...সৌমিত্র...এদিকে আয়......ঐ কন্ঠ জলিল স্যারের। ওয়ার্ডের প্রান্তে, জানালার ধারের শেষ বেডে তপু শায়িত। নাকে অক্সিজেন,হাতে সেলাইনের নল,সমস্ত শরীরে বেন্ডেজ। বেন্ডেজ ছাড়াও ক্ষত রিহিয়াছে শরীরে। দেখিয়া জীবিত কি মৃত বুঝিবার উপায় নাই...রুগীর বিছানার কিনারে চেয়ারে বসিয়াআছেন জলিল স্যার। হাতে একটি তালপাতার পাখা। তাহাদ্বারা তাড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিতেছেন রক্তের ঘ্রানে আকূল হইয়া উঠা মাছিগুলিকে।
     তপুর জেনারেল সেক্রেটারি আমল আমরা দেখিয়াছি। দেখিয়াছি তপুদার সামান্য কৃপাদৃষ্টির আশায় তপুকে ঘিড়িয়া থাকা ছেলে ছোকড়ার দঙ্গল। সেই তপু,হয়তো এ তাহার মৃত্যু শয্যাই,এইখানে সে একা,নির্বান্ধব। বাপ-মা-ভাইও নাই কিনারে...
জলিল স্যার বলিলেনঃ আমি এসে দেখেছি বেডে নিয়ে এসেছে ওরা তপুকে,তারপরই সবাই চলেগেলো...আমি বলিলামঃ বাড়ির লোক... জলিল স্যার মাথা নাড়িলেন। আসেনাই। জানি উহারা তপুকে লইয়া নাজেহাল...তবু এমন অবস্থায়...হাতপাখা নাড়িতে নাড়িতে জলিল স্যার বলিলেনঃ বিশ্রীভাবে মেরেছে...কেজানে আর সেড়ে উঠবে কিনা... শেষের দিকে তাঁহার গলা স্পষ্ট ধরিয়া আসিল...আমার মনে পড়িল আবছা আবছা শোনা একটি ঘটনা, জলিল স্যার সম্বন্ধে...আমাদের বয়স্ক তাঁহার যে ছেলেটি ছিল সে নাকি মারা গিয়াছে...বর্ষার রাত্রে জলভরা মাঠের পথদিয়া ফিরিতেছিল সে।ঝড়-ঝঞ্ছায় ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়িয়া জলে পড়িয়া যায়। তাহাতেই বিদ্যুৎস্পৃস্ট হইয়া মারাযায় সে... অদ্যাপি সেই কাহিনীর সত্যাসত্য জানিনা তথাপি পিছন ফিরিয়া তাকাইলে জলিল স্যারের যে মুখ ভাসিয়া উঠে চক্ষে তাহা এক প্রকৃত পিতারি মুখ ... যিনি একটি বা দুইটি সন্তানের জৈব পিতা হওয়ার মূল্যে সকল বালক-বালিকাকেই করিয়া লইয়াছেন নিজ সন্ততি ...
     সেইযাত্রা প্রানে বাঁচিয়া গিয়াছিল তপু...হয়তোবা জলিল স্যারের প্রার্থনাবশেই। কিন্তু অবশেষে তাহার অকালমৃত্যুই হইয়াছিল সেই ঘটনার তিন-চারি বৎসরের মধ্যে।
      তথ্য হিসাবে এইখানে আরেকটি কথাও বলিয়া রাখাযায়,যে,তপু বিজেপি করিত,ছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদেরো সক্রিয় সদস্য আর জলিল স্যার ছিলেন মুসলমান...
৩।
জলিল স্যারের কথা মনেপড়ে।
নানাসময়ে নানাকারণেই মনেপড়ে। বাড়িতে গেলে যে ইস্কুলে যাই একবার তাহার একটি প্রধান কারন জলিল স্যার এখনো আছেন। গেলে দেখাহয়,কথাহয়। টের পাই সেই টান, যাহা নাড়ির ... টের পাই যে সময় আসিতেছে, ক্রমে, তাহার ছায়ায় না শিক্ষকের মর্মে থাকিবে ঐ টান, ছাত্রের প্রতি ... না’ত ছাত্রের মর্মে থাকিবে ঐ শ্রদ্ধা শিক্ষকের প্রতি ...
     যখন জলিল স্যার অবসর লইবেন তখনো বাড়িতে গেলে ইস্কুল দেখিতে যাইব ঠিকই তবে তখন ইস্কুলের চত্বরটি দেখাভিন্ন অন্য খুব বেশী কিছু টান আর থাকিবেনা।
                 
--------  
১৬/৫/২০১০ – ৩/০৩/২০১২
বেঙ্গালোর
------
 প্রথম মুদ্রণঃ সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর      

ঘুম ঘর