প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...
Showing posts with label নস্টালজিয়া. Show all posts
Showing posts with label নস্টালজিয়া. Show all posts

Wednesday, July 9, 2025

টুকরো ক্যালেন্ডারে

 টুকরো ক্যালেন্ডারে




পেরোতে পারিনা।

১৯৯০ সাল, বড়জোর ৯১,৯২। তারপরে আর 

ডানা ঝাপটিয়ে

ওড়েনা ক্যালেন্ডার। ভাবি,

এইভাবে ডানাকাটা পাখি হয়ে

বেঁচে থাকা যায় নাকি। অথচ আমি তো 

—কিভাবে জানিনা

২০২৫ এ পৌঁছে গেছি। তবে আমি

ভূত? প্রেত বা যক্ষ? আগলিয়ে বসে আছে

ক্যালেন্ডারের ছেঁড়াপাতা ভরা 

দিন ও তারিখ গুলি? নাহলে কিভাবে

কলেজ-দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে

বসে দেখি

“শ্রীরাধা” হল্‌ এর  ম্যাটিনি-টিকিট ভিড়? “রাধা”র সতীন

“শ্রীদুর্গা” হল্‌। মুখামুখি। ম্যাটিনির

দর্শক ক্রমে দুর্গারও নাভি ঘিরে

অর্ধবৃত্তে মাছিদের মতো

এখন জমছে, ক্রমে। কলেজ-দেওয়ালে 

পা ঝুলিয়ে বসে বসে

দেখি “শ্রীরাধা”র জঙ্ঘার মাঝখানে

গ’লে গেলো ভিড়। ডানা 

ঝাপটায়, তবে,পোস্টার গুলি 

উড়তে পারেনা। “বই” এসে চলে গেলে —

“বই” এসেছিল এ ঘোষণা নিয়ে

আরো কিছুদিন ঘোরে

টুকরো টুকরো, টুকরো নক্সী

কাঁথার মফস্বলে। বৃষ্টিতে শিলা

পতনের মতো এসব ছবিই ঝরে

আমার ভূগোলে। “বিভাবরী যায়

জাগরণে” – গান 

এ গ্রহেও চলে আসে

যেখানে এখন ২০২৫ –

‘২৪ পার হয়ে। আসবে অচিরে

‘২৬ ও এই 

গ্রহের ক্যালেন্ডারে। আমার ভূগোলে

হাওয়া ঘুরে যাবে 

‘৮০-৯০’এ ফিরে। স্বেচ্ছা-বন্দী

আমি তবে এই 

টুকরো ক্যালেন্ডারে?

Wednesday, October 16, 2024

বুনো-লতা । ২।

বুনো-লতা

২।

“জগৎ পারাবারের তীরে” যারা’ই, যে কর্মেই রত, আদতে সে সকলই “খেলা”। ওই খেলার মত্ত সক্কলেই “শিশু”। – এই সহজ কথাটি কি টের পান নি রবীন্দ্রনাথ? তাহলে কেন লিখলেনঃ “ডুবারি ডুবে মুকুতা চেয়ে,/ বণিক ধায় তরণী বেয়ে, / ছেলেরা নুড়ি কুড়ায়ে পেয়ে/   সাজায় বসি ঢেলা।” – অর্থাৎ, কেন তিনি বণিক কে, বাণিজ্যকে আলাদা করে দিলেন আর সবার থেকে? শিশুর থেকে? করলেন, বা করতে বাধ্য হলেন ওই হেতুই, যে হেতু যিশুকে বলতে হয়েছিল, যে, সূঁচের ফুটো গ’লে উট যদিবা চলে যেতে পারে, ধনী কদাপি পারবেনা স্বর্গ-দোর, তা দসে যতো বিরাট-বিশালই হোক, তা দিয়ে ঢুকতে। ওই যে লোকটি বসে গলা সাধছে আর ভাবছে সংগীত গেয়ে সে অমর হয়ে থাকবে, এই যে ধেড়ে ইন্দ্রটি পদ্যের দ্বি-পদ, ত্রিপদ, চতুস্পদ লিখে লিখে, লোককে পড়িয়ে পড়িয়ে উন্মাদ হয়ে গেলো এতাবৎ তাকে রবি ঠাকুরের চেয়ে উচ্চতর আসন বাঙালী দিলোনা বলে – ইত্যাদি, এরা শিশু। শিশু হরিহর রায়, সর্বজয়া, দুর্গা, অপু, ফাদার সিয়ের্গি, প্রিন্স মিশকিন, আনা কারেনিনা, মাদাম বোভারি’রা। এরা নিজ দৈনন্দিনে এমনই নিমজ্জিত, যে, তারা ভুলে যায়, যে, তাদের এই সকল দৈনন্দিন, এই সকল অমরতা-লোভের উর্ধেঃ “ ঝঞ্ঝা ফিরে গগনতলে,/ তরণী ডুবে সুদূর জলে,/মরণ-দূত উড়িয়া চলে” – তবু খেলে চলে তারা। খেলেই চলে। – এদের সঙ্গে যদি সাম্রাজ্যবাদী লোভ, পুঁজি তান্ত্রিক পণ্যায়ণের মূল্যে মুনাফা – ইত্যাদির খেলায় যারা মত্ত, তাদেরকে মিলিয়ে ফেলি, গুলিয়ে ফেলি “শিশু” বলে, তাহলে যে মস্ত ভুলটি হবে, তারই প্রতিপক্ষে “ডুবারি ডুবে মুকুতা চেয়ে,/বণিক ধায় তরণী বেয়ে” র অন্তর্গত লোভের কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন রবিকবি।

এই মুহুর্তে আমি যে চার-পাঁচটি লেংটা শিশুর কথা বলছি তাদের আবহে পারাবার নেই। আছে একটি মড়া খাল, যার মুখ, নদীর দিকে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বাঁধ দিয়ে। ফলে সে আর বহতা নয়। তার সারা গা’য়ে কচুরিপানার সাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পোকামাকড়,সাপ-সাপালি। মড়া-খালের পাড়ে এক সাড় শেওড়াবৃক্ষ। কয়েকটি সুপারী গাছ। টিন-চাল, টিন-দেওয়ালের খোপ। আরেক ধারে পিচ-সড়ক। তারা লেংটা খেলে বেড়ায়, দৌড়ে বেড়ায়। কান্দে, হাসে। বড় হয়। কিন্তু বেড়ে ওঠেনা। মাঝখানে সিমেন্ট-দেওয়াল। এই পাড়ে আমাদের বা। বাসা। বাড়ি। দেওয়ালের কিনারে দাঁড়িয়ে আমি যখন ওই শিশুদের নাম, তাদের কার ক’টা দাঁত উঠলো-পড়লো – এই সকল নিয়ে তাদের সঙ্গে গল্প করছি, যখন এক্কেবারে ছোটোটি, বড়দের মতোই এই দেওয়াল-ভাঙা আসরে যোগ দিতে এসে হোঁচট খেয়েও, না কেঁদে হাসছে, তখন, বেলা এগারোটা নাগাদ, ওই মেয়েটি, ওই বুনোলতা, আবার এসেছে “ফুনে চাজ” দিতে। আগে অবশ্য আমার অনুমতি সে নিয়েছে। অনুমতি ছাড়া আমাদের মতো বিরাট ভদ্রলোকের বাড়ির গেট ওরা পার হয়না। কিন্তু ওরাও আমাদের ঠিক ততোটাই প্রতিবেশী, যতোটা, আর পাশের “কয়লাবাবু”। যিনি সবংশে বকলম, যিনি কয়লার কারবারে হাত কালো না করেই কালো টাকার পর্বত গড়েছেন। তিনি বা তাঁর গুষ্টি অবশ্য অবলীলায় ঢুকেপড়ে। হাঁকডাক দিলে আলাপ সালাপও চালায়। 

বুনোলতা যখন তার “স্মাট-ফুন” চাজে লাগাচ্ছে তখন তাকে নিয়ে জেরা করছে যে, সে, আমার মা’কে দেখে রাখার, দিনরাত্রি থাকা, মাঝ বয়সী মহিলা। শিশুগুলির সঙ্গে সামান্য আড্ডা দিয়ে আমি বাইর-কোঠায় ফেরার নিমিত্ত ঘুরে দাঁড়াতেই, সেই শিশু দলের যেটি সবচে’ বড়, যার বয়স বড়জোর আট, সে ডাকলো, তার ডাকে “চুপি চুপি” মেশানো। আমিও নুয়ে কান দিলাম বাড়িয়ে। সে ফিসফিসিয়ে বল্লঃ “ক্কাকু, যে বেটি তুমরার ঘর-অ গেসে ফুন চাজ দেওয়াত, ইগু কিন্তু চুর”। হায়, চোর, হায় চুরি। হায় “না বলিয়া পরের দ্রব্য …”। বুনোলতা এই বালকের কাকি অথবা জেঠি। দুইটি ছোকরা ভাই, তাদের দুইটি বৌ – পাশাপাশি টিনিখোপে বাস করে। বালক কে নিশ্চিত তার মা’ই বলেছে, যে, বুনোলতা চোর। এবার বুনোলতাও, কালে, তার বাচ্চাকে শেখাবে, তার জা’টি, যে’ও, হয় আরো একটি বুনোলতাই, সে “চোর”। “চোর” শব্দের সংজ্ঞা এখানে, হরিহর-পত্নী সর্বজয়ার, হরিহরের দিদি, বুড়ি ইন্দির ঠাকরুন কে “চোর” বলার একই নিয়মের অধীন। অর্থাৎ দুই-পলা শর্ষের তেল, দেড়টি কাঁচা লংকা থেকে বড়জোর ইমিটেশনের শস্তা মালা’র এদিক-ওদিক। আমি বালককে বললাম, ফিস্ফিস করেই “আচ্ছা, আমি পুলিশো জানাইয়া রাখমু”। 

বাইর-কোঠায় ঢুকে আবার বসেছি লিখতে, এইবার আগমন মা’র সেই আধবুড়ি আয়া-জনের। “দাদা, আপনি বোধয় জানেন না, তাই বলছি, ওই ওকে যে বাড়ি ঢুকতে দিয়েছেন, ওর চরিত্র-স্বভাব খুব খারাপ”।

স্থির দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম “ পেটে খাওয়া না থাকলে তো স্বভাব-চরিত্র ধুয়ে বাঁচা যায়না। ওদের দেড়বেলা খাওয়া মেলেনা। তাই স্বভাব-চরিত্র বা যা খুশি’র মূল্যে ওরা খেতে পেলেই আমি খুশি। ওর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই”।

একটু দমে গেলেও মহিলা থাবলো না। “আরে জানইন নি, ও মুসলিমের সঙ্গে যায়” …।

আবার স্থির চোখে তাকাতে হলো। “শোনো, ও হিন্দুর সাথে গেলে যা, মুসলমানের সঙ্গে গেলেও তা’ই। হিন্দু-মুসলমানে আমার কিচ্ছু আসে যায়না। পেটের আর ক্ষুধার ও কিছু আসে যায়না”। 

মহিলা এবার ক্ষান্ত হলো তবে বল্লো “ওই দাদা ঘরে থাকলে এরা আসবার সাহস পায় না”।

অর্থাৎ, আমার ছোটোভাই, যে এই মুহুর্তে, মাদ্রাজে অবস্থান করছে, থাকবে কয়েকদিন সপরিবারে, সে। অর্থাৎ রূপক থাকলে এরা এতোটা সাহস পেতোনা। কিজানি। হয়তো আমিও যদি এখানেই থাকতাম, হয়তো আমাকেও ওরা ভয় পেতো। হয়তো আমার মধ্যেও ওই ভয় দেখানো ভদ্রলোকি ডালপালা মেলতো। এবং মেলাটাই স্বাভাবিক যদিনা আমরা সক্রিয় ভাবে ওই ভদ্রলোকি’র বিষ-চারাটিকে মুড়িয়ে না ফেলি, প্রতি মুহুর্তে। কিজানি। হয়তো ডাবলিনে বাস করলে জয়েস না লিখতেন ডাবলিনার্স, না ইউলিসিস। গতকাল সকালেই, লঙ্গাই বাজার গিয়ে মা’র জন্য মাছ কিনেছিলাম। হেঁটেই গেছি। ফেরাও যেতো হেঁটেই। তা’ও ফাঁকা অটোরিক্সা দেখে, উঠে পড়লাম। বসলাম অটোচালকের কিনার-সিটে। বসতে না বসতেই  অটো চালক গল্প আরম্ভ করে দিল। বল্লো, চৈত্র থেকে আশ্বিন গেলো মেঘে আর জলে। এখন কয়দিন রউদের মুখ না দেখলে সব যাবে। জানালো এই চৈত্র থেকে আশ্বিনের মেঘের নিমিত্ত 

কি কি রকমের ধান ভাল হবে, কিকি রকমের ধান হবেনা বা পরিমাণে কম হবে। সব জানালো। হায়, আমি, একদা এই শহরে জন্মে, বড় হয়ে, পরে সিলিকন-সিটি’র বাসিন্দা, আমি, “ চৈত্র”, “আশ্বিন”, “মেঘ”, “পানি”  শব্দগুলিতে  আকুল হলাম। কিন্তু  ধানের নাম ১টাও বুঝতেই পারিনি। পারিনি, যারা এই শহরে বাস করে, তারাও কি পারে? পারতো? – না। ধান, চালের সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ বহু আগেই পূর্ণ হয়েছে। “অন্ধ বিক্রেতার থেকে ধূপ কেনার সুযোগ নষ্ট হয়েছে”। 

               দিনে রান্না করতে যিনি আসেন দীপালীদি, তাকে মাছ ইত্যাদি দিয়ে বাইর-উঠানে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানলাম। এরপরে ভিতরমুখো হ’তেই দেখি দীপালিদি আমার মা’র সঙ্গে কি এক শলাপরামর্শে নিমগ্ন। কান পাতলে বোঝা গেলো, মাছ ঠিক যতো টুকরো মা খাবে, ঠিক ততো টুকরোই সে রাঁধবে নাহলে। “বুঝরা অইত …”। বুঝলাম। – বুঝলাম মাছ-টুকরো বেঁচে গেলে তা পেটে যাবে মা’র এই আয়া-জনের এবং তা দীপালিদির ইচ্ছা নয়। বুঝলাম এবং আবার এসে দাঁড়াতে হলো শূন্যে। একদিকে “আদর্শ হিন্দু হোটেল”, অন্যদিকে “হুনান রিপোর্ট”। 

এই আয়া-জনকে দেখেছি, দুপুরের পরে দুপুর একটি পুরনো শাড়ি, যা কখনো “দামী” ছিল, তার আঁচল কিংবা পাড় – সেলাই করছে। তার নিজের অন্নবস্ত্রের সংস্থান অপরের ঘরকাজ করে। ওই বুনোলতা’র মতো তার নিজের মেয়ে বা বোন রয়েছে নিশ্চয়। তথাপি, যেহেতু সে “ব্রাহ্মণ” এবং যেহেতু সে “অনেক আগের থেকেই ভদ্রলোক”, ফলে, সে নিজেকে, নিজ মনেই, বুনোলতা’র চেয়ে উপরে একটি অবস্থান দিয়ে ফেলেছে। বামনি বলে সে “উচ্চ” দীপালিদইর চেয়েও। এবং দীপালিদি, আমার ভাই’র বিয়ের পরপর, আমার ভাতৃবধূকে বলেছিল “এরা বুধয় ভালা বাবন না”। একে ঝুমা তখন নতুন বৌ, তা’য় শ্বশুরবাড়ির “ব্রাহ্মনত্ব” নিয়ে প্রশ্ন। অতএব, ঝুমা দীপালিদিকে প্রশ্ন করল, কেন এমন মনেহয় তার, প্রকৃত প্রস্তাবে, তার শ্বশুরবাড়ি মস্ত বড় ব্রাহ্মণ। দীপালিদির উত্তর “তারা আমার হাতের রান্না খান, তাই বললাম”। – অর্থাৎ বঞ্চিত হ’তে হ’তে, হ’তে হ’তে এরা নিজেদেরকে নিজেরাই পারছেনা আর সম্মান করতে। মূল্য দিতে। শুধু বুনোলতা নয়, দীপালিদি বা ওই আয়া-জন এরা প্রত্যেকেই সেই কুন্তা। এরা পরস্পরকে ঘিরে দাঁড়ালেই দানা বাঁধবে, বাঁধতে পারে, আদত প্রতিরোধ। আদত মহিষাসুর সেটি টের পেয়েই, বহু আগেই এনে দিয়েছিল জাতপাত। উপনিবেশ-ওয়ালারা একে করেছিল অস্ত্র। অতঃপর সরাসরি উপনিবেশ থেকে যখন দেশগুলি “স্বাধীনতা”র পাজামা-পাঞ্জাবী-পতাকা’তে হলো পরোক্ষ উপনিবেশ, তখন, এই জাতপাতকেই ব্যবকার করলো “স্বদেশ” এর “স্বাধীন” নেতা ও তাদের দলগুলি।

এক টুকরো মাছের লোভ, ওই আয়া-জনের, আমার মর্মে এনেদেয় ইন্দির ঠাকরুনের নোনা ফলের লোভের বৃত্তান্ত, তার নাজেহাল হওয়া ভ্রাতৃবধূ সর্বজয়ার কাছে। আবার পরবর্তীতে এই সর্বজয়াকেই দেখি, বড়লোক বাড়িতে কাজ কত্রবার আমলে, ক্ষণে ক্ষণে লোভী হ’তে, নিজের জন্য নাহোক, অপুর জন্য। বুনোলতা’র এই মোবাইল-লোভ, চার্জ-দেওয়া লোভ, এ কি নয়, দুর্গার পুঁতিমালা লোভ? ফোনে কে তাকে দেবে কোন মহার্ঘ্য সম্বাদ? বাস্তবে মোবাইলটি ঘেঁটে, গান, রিল্‌ চালিয়ে, সে নিজেকে ভেবে নেবে “সুখী” বলে, তার আশেপাশের ভদ্রলোক মেয়ে-বৌ’দের মতো বলে। এর মূল্যে সে ভুলে থাকবে তার সমূহ না পাওয়া। এতাবৎ। তার সমূহ না পাওয়া – আমরণ।


 – এই সকল “লোভ” আদতে লোভ নয়। এই সকলই প্রকাশ, জিজীবিষার। অথবা এরাই জিজীবিষা। এটি শনাক্ত করতে না পারলে, অন্তিমে, সব প্রতিরোধ, সব আন্দোলনই ভেঙ্গে যাবে। “আমার মাথা নত করে দাও” – কার কাছে? ঈশ্বর? অনন্ত? শালা, কে ঈশ্বর আর কি অনন্ত? মাথা নত করে দাও ওই সকল জিজীবিষার কাছে। জীবনের কাছে। যাপনের অন্তর্গত দুঃখের কাছে। অন্যথায়, হায়, ফিরে যেতে হয় সেই রবিকবির কাছেইঃ

“যখন তোমায় প্রণাম করি আমি,    প্রণাম আমার কোন্‌খানে যায় থামি,

      তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে

          সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে

      সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥”












বুনো-লতা (১)

 বুনো-লতা

১।

ভাসান। কখনো আনন্দের ছিল, ছিল দুঃখের। ছিল দেবী প্রতিমার চোখে অশ্রুকে চিহ্নিত করবার। তারপর, ভাসানও ভেসে গেলো নিও-লিবারেলি বানে। ভাসানের আনন্দ-বেদনা, দেবীর আগমন-গমনের যাদু-কাহনের মতোই, মুছে গিয়ে, অবয়ব নিয়েছে এক “মস্তি”। এই “মস্তি” এক চীজ বটে। “মস্ত্‌ মস্ত্‌”। শরৎ, শিশির, ঘাস – সমস্তের উপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া এক বুলডোজার। সব ভেঙ্গে, নিঙড়ে বানিয়ে তোলা একেকটি বাজার। একেকটি মোচ্ছব।

ঘড়ি-কাঁটা রাত দশটার ফলক পার হয়ে ক্রমে পৌঁছে যাচ্ছে সাড়ে দশে। এই শহর, এর শরিলে-গা’য়েও খোলা-বাজারের দাঁত-নখ দাগ। ক্ষতও হচ্ছে। তবু, কোথাও গিয়ে আর এগোচ্ছেনা। ফলে, এ এখনো অনেকটাই মফস্বল। আর আমাদের পাড়া, যেহেতু এই গঞ্জেরও প্রান্তে, ফলে, এক ঝলক অতীত-আলো, এক-পশলা পরাহত অন্ধকার, এখনো মিশে আছে এ পাড়ায়। সাড়ে দশ মানে, এ পাড়ায় অনেক রাত। রাত ছিঁড়ে, ছোটো ছোটো টুকরো করে, চলে ফিরে আসছে একটি দু’টি ভাসান-দল। মস্তি-ভাসানের মস্ত্‌ খোঁয়াড়ি কিছু ছড়িয়ে, কিছু সঙ্গে করে যাচ্ছে তারা। বাইর-কোঠায় আড্ডা দিচ্ছি আমি আর সিদ্ধার্থ। বাইর-কোঠা বলতে বাইর-বারিন্দা থেকে আলগা একটা কোঠা। আদতে রূপক এই কোঠায় বসে ছাত্রী-ছাত্র পড়ায়। ইস্কুল-কাজ করে। রাস্তার ঠিক কিনারে বলে, রাস্তা ধরে বড় গাড়ি গেলেও আওয়াজ হয় গেটে। মনেহয় কেই এলো। এমনি একটা আওয়াজ উঠলো গেটে। আমাদের আড্ডারত মন সেদিকে গেলোনা। কারন, আমরা জানি এই আওয়াজ ফাঁকি আওয়াজ, ফাঁকা আওয়াজ। এতো রাতে কে আসবে? আড্ডা চল্লো। কিন্তু এবার ঘষটানো পা-আওয়াজ। অতএব ধ্বনি এখন আর অশরীরী নয়। এবং সত্যই, তখনই, শরীর, আবির্ভূত, বাইর-কোঠার খোলা দরজার সামনে, যুবতীর। শিউরে উঠলাম। কে এই মেয়ে? একবার মনে হলো বিসর্জিতা কোনো প্রতিমা না’তো? উঠে এসেছে, সদ্য, কোনো নদী থেকে, খাল থেকে, বিরাট পুকুইর-পুষ্করিনী থেকে? জানাতে এসেছে, কিভাবে ভাসান তার বর্ন-ঘ্রান-অশ্রু-আকুতি হারিয়ে নিতান্ত মস্তি হয়ে গিয়ে, দেবীকে, দেবী দিগকে আবডালে করছে প্রহারই? – পর মুহুর্তে মনে হলো, সদ্য ভাসানের দেবী’র আশাক-পোষাক এমন অনুজ্জ্বল হয় কি করে?  গা’য়ের নাইটি – কখনো উজ্জ্বল হলুদ ছিল। এই মুহুর্তে পিচরাস্তা-কিনারের ধূলির মতন। “ চোখ দুটো চুন-চুন ,- মুখ খড়ি-খড়ি!” – তাহলে এ কী গতবছরের কুশিয়ারা-জল লেগে থাকা, বিগত বছরের কোনো প্রতিমা? “সমসাময়িক হতে শেখে নাই”? তা’ই এসেছে জানাতে?

এইবার দেবীর আঙ্গুল … “দুটো হাত, ক’খানা আঙুল”… একটি হাত উঠে এলো ডাক দেওয়ার ভঙ্গিতে। আবার শিউওরে ওঠা। কে এ? কি চায় এ? এ’কি নিশিডাক? না’কি বিশ্ব চক্র সিরিজের বিকেল ছ’টার শো থেকে উঠে আসা কোনো দুরাত্মার ছল? যেই এগিয়ে যাব, বার হয়ে আসবো বাইর-কোঠা থেকে, অমনি নিজের জামা নিজে ছিঁড়ে চিল্লিয়ে উঠবে “বাঁচাও … বাচাও” আর তার সাঁটের ছোকরাগুলি ঘিরে ফেলে বলবে “ এমনে ত ভদ্রলুক আর পথে দিয়া মাইয়া গেলে টানিয়া ঘরো লইযাইন, দে হারামজাদা লাখ টাকা দে, নাহলে …” … পা তবু, মন্থরে হলেও, এগোলো। আমি, সিদ্ধার্থ – চার পায়ে এগোলে মেয়েটি টের পেলো কিছু। এটা অন্তত টের পেলো, যে, এই যে “আমি” আমার মতো দেখতে হলেও, আমার ভাই’এর মতোও দেখতে। অর্থাৎ আমি যে মেয়েটিকে চিনতে পারছিনা, তা’ই, হয় স্বাভাবিক। এইবার সামান্য হাসি উঠে এলো মুখে। “আমি আফনারার কিনারের বাসাত থাকি”। হাত দিয়ে দেখালো পার্শ্ববর্তী জমাট অন্ধকার। এখানে একটি দু’টি টিন-চাল আর বাঁশ-বেড়ার ঘর। আগেছিল ছন-চাল আর বাঁশ-বেড়া। গোঁসাইদের জমি। আমরা বলতাম জমিদারি। বুড়া গোঁসাই’এর কয়েক লক্ষ ছানাপোনা ছিল। এই টুকরো জমিতে, বুড়া টপকালে, সব্বাই জানালো দাবী। অতএব জমি হলোনা কারোরই। কয়েক লক্ষ ছানাপোনার যেটি এখানে বাস করে, এই আমাদের বাড়িরই উল্টো গলীতে, সে’ও এখন সত্তর। এর বাপ-আমল থেকেই এখানে ছোটো ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হতো। রিক্সা চালক, ঠেলাগাড়ি চালক বা ওই কিসিমেরই শ্রম যাদের জীবিকা, তাদেরকে। এতে যেটা হতো, তা এই, যে, এদের বৌ গুলি বেগার খেটে দিতো গৌঁসাইজীর গিরস্থিতে। “সেই ট্রেডিশান” এখন টিন-চাল আর বাঁশ-বেড়া আর একদা “হুক” মারা কারেন্টের বদলে, বাধ্য হয়ে, “আসলি” কারেন্ট। ব্যস। – এই যে দেবী, অধুনা দন্ডায়মানা, আমাদের মুখামুখি, যার আবহে অন্ধকার, সে ওই গোঁসাই-প্রজাদের কারো বৌ-মেয়ে । বোঝা গেলো।  “এট্টু, দুই মিনিট চাজ দিতে পারমু নি”? তার হাতে একটি ভগ্নদশা “স্মাটফুন”। “আমরার কারেন্ট নাই”। হায়, দেবী, হায় মানুষ, হায় সভ্যতা! দু’টি আলোকিত, কারেন্টিত বাড়ির মাঝখানে এই একফালি অন্ধকার, গাড়, কঠিন, জটিল। হায়, যেখানে দেবীর, দেবীদের ঘরে ঘরে অন্ধকার, সেখানে মন্ডপ আলো করে কাকে আনো তোমরা? মেয়েটির চোখে ভিতুভিতু জিজ্ঞাসা। মুহুর্তে টের পেলাম “

খুব জ্যোৎস্না, তেমনি হাড়কাঁপানো শীত। পৌষ মাসের শেষ। সদর কাছারি হইতে লবটুলিয়ার ডিহি কাছারিতে তদারক করিতে গিয়াছি। লবটুলিয়ার কাছারিতে রাত্রে রান্না শেষ হইয়া সকলের আহারাদি হইতে রাত এগারটা বাজিয়া যাইত। একদিন খাওয়া শেষ করিয়া রান্নাঘর হইতে বাহিরে আসিয়া দেখি, তত রাত্রে আর সেই কন্‌কনে হিমবর্ষী আকাশের তলায় কে একটি মেয়ে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় কাছারির কম্পাউন্ডের সীমানায় দাঁড়াইয়া আছে। পাটোয়ারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম-ওখানে কে দাঁড়িয়ে?

পাটোয়ারী বলিল-ও কুন্তা। আপনার আসবার কথা শুনে আমায় কাল বলছিল-ম্যানেজারবাবু আসবেন, তাঁর পাতের ভাত আমি গিয়ে নিয়ে আসবো। আমার ছেলেপুলের বড় কষ্ট। তাই বলেছিলাম-যাস্।

কথা বলিতেছি, এমন সময় কাছারির টহলদার বলোয়া আমার পাতের ডালমাখা ভাত, ভাঙ্গা মাছের টুকরা, পাতের গোড়ায় ফেলা তরকারি ও ভাত, দুধের বাটির ভুক্তাবশিষ্ট দুধভাত-সব লইয়া গিয়া মেয়েটির আনীত একটা পেতলের কানাউঁচু থালায় ঢালিয়া দিল। মেয়েটি চলিয়া গেল।

আট-দশ দিন সেবার লবটুলিয়ার কাছারিতে ছিলাম, প্রতিরাত্রে দেখিতাম ইঁদারার পাড়ে সেই মেয়েটি আমার পাতের ভাতের জন্য সেই গভীর রাত্রে আর সেই ভয়ানক শীতের মধ্যে বাহিরে শুধু আঁচল গায়ে দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। প্রতিদিন দেখিতে দেখিতে একদিন কৌতূহলবশে পাটোয়ারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম-কুন্তা-যে রোজ ভাত নিয়ে যায়, ও কে, আর এই জঙ্গলে থাকেই বা কোথায়? দিনে তো কখনো দেখি নে ওকে?

পাটোয়ারী বলিল-বলছি হুজুর।

ঘরের মধ্যে সন্ধ্যা হইতে কাঠের গুঁড়ি জ্বালাইয়া গন্‌গনে আগুন করা হইয়াছে-তারই ধারে চেয়ার পাতিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া বসিয়া কিস্তির আদায়ী হিসাব মিলাইতেছিলাম। আহারাদি শেষ করিয়া আসিয়া মনে হইল একদিনের পক্ষে কাজ যথেষ্টই করিয়াছি। কাগজপত্র গুটাইয়া পাটোয়ারীর গল্প শুনিতে প্রস্তুত হইলাম।

-শুনুন হুজুর। বছর দশেক আগে এ অঞ্চলে দেবী সিং রাজপুতের বড় রবরবা ছিল। তার ভয়ে যত গাঙ্গোতা আর চাষী ও চরির প্রজা জুজু হয়ে থাকত। দেবী সিং-এর ব্যবসা ছিল খুব চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া এইসব লোককে-আর তারপর লাঠিবাজি করে সুদ আসল টাকা আদায় করা। তার তাঁবে আট-ন’জন লাঠিয়াল পাইকই ছিল। এখন যেমন রাসবিহারী সিং রাজপুত এ-অঞ্চলের মহাজন, তখন ছিল দেবী সিং।

দেবী সিং জৌনপুর জেলা থেকে এসে পূর্ণিয়ায় বাস করে। তারপর টাকা ধার দিয়ে জোর-জবরদস্তি করে এ দেশের যত ভীতু গাঙ্গোতা প্রজাদের হাতের মুঠোয় পুরে ফেললে। এখানে আসবার বছর কয়েক পরে সে কাশী যায় এবং সেখানে এক বাইজীর বাড়ি গান শুনতে গিয়ে তার চৌদ্দ-পনের বছরের মেয়ের সঙ্গে দেবী সিং-এর খুব ভাব হয়। তারপর তাকে নিয়ে দেবী সিং পালিয়ে এখানে আসে। দেবী সিং-এর বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। এখানে এসে দেবী সিং তাকে বিয়ে করে। কিন্তু বাইজীর মেয়ে বলে সবাই যখন জেনে ফেললে, তখন দেবী সিং-এর নিজের জাতভাই রাজপুতরা ওর সঙ্গে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে ওকে একঘরে করলে। পয়সার জোরে দেবী সিং সে সব গ্রাহ্য করত না। তারপর বাবুগিরি আর অযথা ব্যয় করে এবং এই রাসবিহারী সিং-এর সঙ্গে মকদ্দমা করতে গিয়ে দেবী সিং সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। আজ বছর চারেক হোলো সে মারা গিয়েছে।

ঐ কুন্তাই দেবী সিং রাজপুতের সেই বিধবা স্ত্রী। এক সময়ে ও লবটুলিয়া থেকে কিংখাবের ঝালর-দেওয়া পালকি চেপে কুশী ও কলবলিয়ার সঙ্গমে স্নান করতে যেত, বিকানীর মিছরি খেয়ে জল খেত-আজ ওর ওই দুর্দশা! আরো মুশকিল এই যে বাইজীর মেয়ে সবাই জানে বলে ওর এখানে জাত নেই, তা কি ওর স্বামীর আত্মীয়-বন্ধু রাজপুতদের মধ্যে, কি দেশওয়ালী গাঙ্গোতাদের মধ্যে। ক্ষেত থেকে গম কাটা হয়ে গেলে যে গমের গুঁড়ো শীষ পড়ে থাকে, তাই টুকরি করে ক্ষেতে ক্ষেতে বেড়িয়ে কুড়িয়ে এনে বছরে দু-এক মাস ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আধপেটা খাইয়ে রাখে। কিন্তু কখনো হাত পেতে ভিক্ষে করতে ওকে দেখি নি হুজুর। আপনি এসেছেন জমিদারের ম্যানেজার, রাজার সমান, আপনার এখানে প্রসাদ পেলে ওর তাতে অপমান নেই।”

হায়, বিভূতিভূষণ, এই “আরণ্যক”, শুধু “আরণ্যক” ই কেন, আপনার সমস্ত কাহন-কাহিনী আর মাও সে তুঙ্গের “হুনান রিপোর্ট” – এদের মাঝখানে আজো আমি দিশাহারা। আমি মার্ক্সের কাছে গেছি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক ভাবে। হে কার্ল মার্ক্স, বিদূতিভূষণ আমাকে ঠেলে দিয়েছেন আপনার দিকে। আপনার সেই কম বয়সের নোটবই গুলির দিকে। আমার বিদ্রোহ-বিপ্লব অন্তিমে ভালবাসা। ভালবাসাই। হে বিভূতি, হে কার্ল মার্ক্স, আমি বুঝিনা, আমি বুঝিনি – এতো বচ্ছর ধরে যারা বিভূতি পড়ে আসছে, পড়িয়ে আসছে, বই লিখে বাজার দোকান ছেয়ে ফেলেছে, তারা কেন চিনতে পারেনি, আজো পারেনা এই সকল কুন্তা’দের? দুর্গা দের? আর যারা চিনতে পায়, যেমন আমি, আমিই বা ঠিক কোন ভাবে কাজে লাগছি সেই প্রক্রিয়াতে, যার দ্বারা সকল কুন্তা’ই একদিন হ’তে পারে, পারবে, সিংহবাহিনী?

শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। তাই তিনদিন ধরে কারেন্ট নেই ওদের। সাড়ে সাত গন্ডা’র ওই জমিদার, ওই গু-সাই, করেনি কোনো ব্যবস্থা। অতএব, শেষ পর্যন্ত এই কুন্তা, হরিহর রায়ের মেয়ে, এই দুর্গা, সাহস করে পার হয়েছে আমাদের বাড়ির গেট। কাঁপা হাতে ফোনটি বাড়িয়ে ধরে, আরো কাঁপা স্বরে বলছে  “এট্টু, দুই মিনিট চাজ দিতে পারমু নি”? 

আমি বললাম “যা, চার্জে দে। দু মিনিট কেন? দুই ঘন্টা হলেও বা কি?”

এর নাম, আমি নিশ্চিত, বুনো-লতা। 

বন্য লতা’ই সে। বন্য লতা’ই এরা।

এ’ই দেবী। এরাই দেবী।


Sunday, May 9, 2021

কাশবালক আর ঘাসবালিকা, ভাই আর বোন তারা …

 কাশবালক আর ঘাসবালিকা, ভাই আর বোন তারা …


যাদের উপলক্ষ্য করে রচনাচেষ্টা - এই কবিতাগুলি, এরা এখন যৌবনের, কৈশোরের দোরগোড়ায়। তবু আজো পিতৃত্বের, মাতৃত্বের অনুভুতিকে যেন  ছুঁতে পারি এই রচনাচেষ্টাগুলিকে হাত রেখে।

প্রথমজাত হিসেবে অর্ক’কে ঘিরে রচনার সংখ্যাই বেশী হলেও এই প্রতিটি রচনা আদতে অর্ক র পুগি দুজনেরই । রচনাগুলির প্রায় প্রতিটিরই আবডালে প্রিয় কবি উইলিয়াম ব্লেকের উপস্থিতি অবলীল

কেননা ঈশ্বর নামের কোনো 'মিস্তিরি' তে একেবারেই না-বিশ্বাসী আমারো মর্মে, শিশুর জন্ম, অদ্যাপি, এক দৈব সংঘটন।

অর্ক’র জন্মের সময় আমি কলকাতায়। প্রায় ‘ দিন আনি দিন খাই’। হয়তো সেই সুবাদেই তার ভাগ্য হয়েছে আমার শহর করিমগঞ্জে ভূমিষ্ঠ হওয়ার।

জন্ম সংবাদ-প্রাপ্তি আর পুত্র সন্দর্শনের মধ্যে হপ্তা খানেকের ব্যবধান রয়েছে – রয়েছে কয়লাঘাটার রেল রিজার্ভেশন কাউন্টার, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস … নাইটসুপার আর সঙ্গী বলতে

অনুজপ্রতিম সব্যসাচী চক্রবর্তী (জয়) । … কবিতাচেষ্টা এবং দিনিলিপি-খাতার অক্ষরগুলি যেখানে তারিখহীন সেখানে আমিও অসহায় জানাতে, জানতে যে তারা কখন হয়েছিল লিখিত …



রচনাগুলি, পরে পাঠ করে মনেহলো যারা “জন্ম দেবে জন্ম দেবে” বলে পৃথিবীতে আসেনা তবু জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পরে নির্মাণের মায়ায়, তাদের কাছে এই লেখাগুলি রাখলে রাখতেও পারে কোনো অর্থ আর যাদের উপলক্ষ্য করে এই রচনাগুলি – তারাও, কৈশোরের, যৌবনের জ্বর নেমে এলে, হয়তো পেতে পারে কিছু সবুজতা এই পংক্তিগুলিকে ছুঁয়ে।





 

 অনেক সময় একই রচনাকেও লিখেছি, সামান্য পাল্টে – হয়তো একদিনের কিংবা এক দশকের ব্যবধানে …







অর্ক কিংবা মিশকিনের জন্ম কে উপলক্ষ্য করে লিখিত কিছু কিছু রচনা, পরে, কন্যা মাহি কিংবা পুগির জন্মের সময়ে আবার পড়েছিলাম। তখন তাদের কিছু কিছু অদল বদল করেছি। ইতোমধ্যে আমার নিজস্ব ‘সময়’ এর চালচিত্র অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। ‘দিন আনি দিন খাই’ থেকে মধ্যবিত্তদেরো উপরের দিকে আপনাকে ‘প্রতিষ্ঠা’ করেছি ঠিক যেভাবে চালিয়াৎ পথের লাথি খাওয়া পাথরকে ‘প্রতিষ্ঠা’ করে দেবতা বলে আর সেই ‘দেবতা’র ‘দোয়া’ বেচে চালায় পেট, পিঠ, গাড়ি …

কন্যাটির জন্ম এই বেঙ্গালোর শহরেই।






মেয়ে পুগিকে ঘিরে আরো অনেক কবিতাচেষ্টা রয়েছে – প্রকাশিত, অপ্রকাশিত তবে সেগুলি তার ‘মেষপালক’ পর্বের নয়। আরো একটু বড় হওয়ার পরের – দুষ্টামি পর্বের। তাই তাদের চরিত্র ভিন্ন আর সে কারণেই সেগুলিকে এওখানে রাখিনি। তাদের নিয়ে অন্য ভেলা ভাসাবো অন্য দীয়া জ্বালিয়ে …



পিডিএফ ডাউনলোড সূতো

Thursday, January 14, 2021

দুর্গাটি আর অপুটি

 দুর্গাটি আর অপুটি


দুর্গা’টি এসেছিল। সঙ্গে ‘অপু’টিও।

দুর্গা’টি বেঁচে উঠেছে আমবাগানের ঝড়-ঝাপটা কাটিয়ে। বেঁচে রয়েছে ‘করোনা’ পেরিয়ে ।

তবু সে ছেড়ে গিয়েছে ‘নিশ্চিন্দিপুর’। বিয়ে হয়ে চলে গিয়েছে জয়পুর। পয়লাপুর, লক্ষ্মীপুরের আশেপাশের গ্রামে ।

এখানে থাকতে তার ছিল লঙ্গাই আর কুশিয়ারা। এখন তার আছে ‘জিরি’ আর ‘চিরি’।

আছে তারও এক ‘দুর্গা’ -  তিন বছরের ‘বর্ষা’। কোলে এসেছে ‘অপু’ও। পাঁচ মাস তার বয়স।

       দুর্গা’টির নিজের ‘অপু ভাই’ ক্লাস ফোরে পড়া ,দুরন্ত । তবু দিদিকে কাছে পেয়ে যেন মিশে থাকতে চাইছে  সতেরো আঠারোর এই ‘দিদিটি’র আঁচলে।

   ‘সর্বজয়া’টি রান্নাবাড়ার কাজ করতেন আমাদের বাড়িতে। এই ছোট্ট দুর্গা মার সঙ্গে এসে কখনো ভাই সামলাতো। কখনো তার মাকে করতো সাহায্য। … সে আজ সাত-আট বছর আগেকার কথা । তখন এই ‘পুজা’ নামে দুর্গাটি ছিল ছিঁচকাঁদুনে। আদরে ,আহ্লাদে ভোলাতে চেষ্টা করতাম যখনই দেখতাম তার মন খারাপ। … কথাটি মনে রেখেছে সর্বজয়া আর দুর্গা টিও।

      দুর্গাটি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে বাপের বাড়ি । আবার ফিরে যাবে কাল-পরশু ।আজ এসেছিল দেখা করতে। বিকেলে। শীত-বিকালের ফুরিয়ে আসা আলোয় এদের দেখে কোলের টির গালে আঙুল ছুঁইয়ে আর বড়টিকে মজার কথা বলে, আসলে সমস্তের আবডালে দেখছিলাম এই হঠাৎ গিন্নি বাণী হয়ে ওঠা খুকিটিকে যাকে শেষবার দেখেছি বছর ছয়-সাত বছর আগে যখন সে তার কন্যাটির চেয়ে সামান্য বড়।

 ভাবছিলাম “অপরাজিত জীবন রহস্য” এভাবেও আপনাকে প্রকাশ করে , উদযাপন করে …

 এরা বাঁচুক ।

এরা ‘টিঁকে থাকা’র গণ্ডি ছেড়ে বেঁচে থাকবার আস্বাদ পাক কোনদিন।

এরাই “রূপসী বাংলা”।

 এরাই “পথের পাঁচালী”, “জন ক্রিস্টোফার”।

 এরাই “আমার সোনার বাংলা”।

 এদেরই জন্য আমি “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”।

 

২৯.১২.২০২০

করিমগঞ্জ

 

 

Sunday, November 29, 2020

দূরগামী আড্ডা-রাত গুলি

 দূরগামী আড্ডা-রাত গুলি

 


কি আর কহিব, সখা, মনেপড়ে দূরগামী আড্ডা-রাত গুলি।

খুলি গুহা, ম্যানড্রেক, নার্দা পামার হয়ে রাত

ঘুরে যায় ডিকেন্সের দিকে।

আরম্ভ-দৃশ্যে কেন “পিপ্‌” এর মাথাটি

উল্টো ঝুলিয়ে ছিল পলাতক দস্যু অথবা

এমিলি ব্রন্টির গদ্যে যৌনতার চাপা খড়ি রেখা

কিভাবে গ্রহন করলো সেকালের জনতা, ইংলিশ,

চালচিত্রে রাত বাড়ে। টুপটাপ ঝরছে শিশির

গুয়াহাটি-মালিগাঁও মেসে, কখনো পয়লাপুলে,

কখনো মোটর বাইকে কোনো নদীতীরে

“গ্লাস্‌ মেনেজারি” থেকে করিমগঞ্জ, সহসা সকালে

উপহার “জিমি পোর্টারের কথা পড়লেই মনে হয় যেন

তুই’ই তার খুব কাছাকাছি”, এখনো রেখেছি

গ্রন্থটি যত্ন করে, মর্মে আর বই-তাকে, আজো খুলে দেখি

নীলকালি লিখিত অক্ষরে জিরি, চিরি, কুশিয়ারা, বরাক এবং

আমাদের আড্ডা-রাত গুলি কি প্রবল শৌর্যে জেগে আছে।।

 

উৎসর্গঃ জোনাক, সিদ্ধার্থ

Tuesday, February 18, 2020

চিঠি, “বিদেশী” বন্ধুকে

চিঠি, “বিদেশী” বন্ধুকে


ভাই বাপ্পাদিত্য,
শেষ পর্যন্ত বাবা’র যোগ দেওয়া হলোনা এই বছর, আপনাদের অনুষ্ঠানে, মূলতঃ দ্রুত-পাসপোর্ট না পাওয়ার মূল্যে। অথচ যে দেশ থেকে আমন্ত্রণ এলো সেই দেশেই জন্ম আমার বাবার, আমার মা’র।  তাঁদের বাবার, মা’র। তাঁদেরো পূর্বজদের।   Assam Legislative Assembly - MLA 1937-46 ‘র ওয়েব পাতা (http://assamassembly.gov.in/mla-1937-46.html)খুললে দেখতে পাচ্ছি তার ৫২ তম নামটি ‘বাবু শিবেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস, হবিগঞ্জ নর্থ। - এই শিবেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস, হন, পিতামহ, আমার পিতার। কিন্তু ঠিক কোন সালে তিনি MLA হয়েছিলেন  বা কতো বৎসর ছিলেন ঐ পদে সেই সব তথ্য অদ্যাপি আমার অজানা।  অতঃপর উইকিপেডিয়াতে (https://en.wikipedia.org/wiki/1950_East_Pakistan_riots)  দেখতে পাচ্ছি  “On 11 March, Suresh Chandra Biswas, a Member of Legislative Assembly (M.L.A.) of East Bengal from Sylhet was arrested for addressing a public gathering where he protested against the arson on Hindu houses. Biswas was belabored, handcuffed and paraded through the streets and locked up. A charge of arson was framed against him and he was imprisoned. [38]” – এই সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাস আমার মাতামহ। অর্থাৎ তিনি, হন, পিতা আমার মাতার। অথচ এই মানুষদেরই একটি নদী মাত্র পার হতে দেওয়া হয়না, যায়না সরকারি অনুমতি ছাড়া, পাসপোর্ট ছাড়া। হয়না, কেননা, ভাষিক, জাতিক – সমূহ প্রকারের আগ্রাসনই মূলতঃ জীবনের অন্তর্গত চলিষ্ণুতার শত্রু।  এই মুহুর্তে ভারতবর্ষ নামক ভূখন্ডে, বলা উচিত খন্ডিত ভূখন্ডে ‘নাগরিকত্ব’ নিয়ে যে প্রহসন আরম্ভ হয়েছে, পুনরায়, এ’ও সেই আগ্রাসনের আরেক চেহারা – যে চেহারা আমরা দেখেছি ৪৭’এ, ষাটের দশকে, আশির দশকে আসামে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশে।


                                              বৃদ্ধ পিতামহ শিবেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসের পরিচয়ের কিছুটা পরে পেয়েছি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আত্নজীবনিতে। একই গ্রন্থে রয়েছে আমার পিতামহ শ্রী শক্তিকেশ বিশ্বাসের কথাও। সেই গ্রন্থেই রয়েছে মাতামহ সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাসের কথা। তাঁদের জীবৎকালের অনেকগুলি বছরই কেটেছে জেলে জেলে।  সুতরাং আমার পিতা শ্রী সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাস আর মাতা শ্রীমতী শিবানী বিশ্বাসের শোণিতে যে মিশে থাকবে প্রতিবাদী লোহিত কণিকা, জন্মসূত্রেই, তা’তে আর আশ্চর্য কি?
       আসামের বাঙ্গালীর যে ভাষা আন্দোলন তার ইতিহাস বিস্তৃত, বিচিত্র ও জটিল তবে তার অন্তর্গত দ্বন্দ্বের মূলসূত্র আর সমস্ত আগ্রাসনের অন্তর্গত সত্যেরই সহোদর।  এর ইতিহাস, এর বিশ্লেষণ – আমার মেধাক্ষমতার বাইরে। বাবা কিংবা মা নিজে এলে নিশ্চয় কিছু বলতে পারতেন। আমি শুধু বলার চেষ্টা করব বাবা-মা’র মুখে শোনা তাঁদের অভিজ্ঞতার, অংশ গ্রহনের কাহনটুকুই।


                     অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের জবানীতে “নতুন দেশে নতুন জিনিস, মানুষ নয়, জিনিস। নতুন জিনিসের নতুন নাম ‘উদ্বাস্ত’ ‘ – নিয়ে যখন সুকেশ রঞ্জন আর শিবাণীর পরিবার দুটি শিলচরে এসে ভারতীয় হল, সেই ৫০-৫১ সাল নাগাদ,  তখন দুটি পরিবারই আর নব্বই ভাগ ‘উদ্বাস্তু’ পরিবারের মতোই নিম্ন মধ্যবিত্ত। আমি দেখিনি আমার পিতামহ শক্তিকেশ বিশ্বাসকে। আমার বাবার বয়স যখন তেরো বৎসর তখনি গত হয়েছিলেন পিতামহ। পিতৃ বিয়োগের পরে যাঁর কাছে বাবা ফিরে পেয়েছেন সেই হৃত পিতৃস্নেহ তাঁরো নাম শিবেন্দ্র। শিবেন্দ্র চক্রবর্তী। গায়ক। গানের শিক্ষক। শিলচরে যিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘মহুয়া’ নামের সাংস্কৃতিক সংস্থা। সম্পর্ক বলতে এই শিবেন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন শ্যালক, অতি নামমাত্র সম্পর্কে, আমার বাবার পিতামহ  শিবেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসের। আর ছিলেন, আমার বাবার মা’র ভূমিকায়, বাবার পিসী , শিশিরকণা বিশ্বাস। বাল্য বিবাহের শিকার। স্বামীদ্বারা পরিত্যক্তা। বাপ-ভাই’এর সঙ্গে ‘দেশের কাজ’ করা এক আশ্চর্য মহিলা । … আমার বাব সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাসের জন্ম ১৯৩৯ সালে, মা শিবাণী বিশ্বাসের ১৯৪১ এ। সুতরাং ১৯৫২-৫৩ সালে তাঁদের বালক-বালিকা জীবনকে দাঁড় করিয়ে রেখে, সময় এবং অনুষঙ্গের প্রয়োজনে চলে আসা যাক ১৯৫৯ সালে। আসামের শিলচর শহরে। নিচু মতন টিলার উপরে ছড়িয়ে থাকা গুরুচরণ কলেজে। ১৯৫৯ সালে গুরুচরণ কলেজে ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি হয়েছেন সুকেশ। খুবই কম ভোটে সুকেশের কাছে হেরে গিয়েছেন শিবাণী। আগের বৎসর এই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন সুবিমল চৌধুরি। সুবিমল চৌধুরি আর সুকেশ রঞ্জন প্রতিবেশী এবং বন্ধু। এতদ্‌ভিন্ম তাঁদের দুই জনেরই রাজনৈতিক “মেন্টর” তখন শ্রী নরেশ চন্দ্র ভৌমিক। নরেশ চন্দ্র ভৌমিকের রাজনৈতিক ভাবধারার মূল সুরটি ছিল রাম মনোহত লোহিয়ার ‘সোসালিস্ট কংগ্রেসের” সুরে বাঁধা। পরবর্তীতে, আসামের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই কারাবরণ করেন শ্রী নরেশ চন্দ্র ভৌমিকও।  … এবার কল্পনায় এঁকে নিতে হবে একটি স্কেচ, শিলচর শহরের যার এক প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদি বরাক, ১৯৫৯- ৬০ সালে বরাকের বুকের ওপরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়নি কোনো কাঁচা বা পাকা ব্রিজ। “ওরিয়েন্টাল” নামের প্রেক্ষাগৃহের নাম তখন “ওরিয়েন্টাল টকিজ” … বরাকের ফেরিঘাটে ভিড়তে চেষ্টা নিচ্ছে নৌকা, “পানসী নাও” , পানসীতে ক’রে পার লাগতে চাইছেন মন্ত্রী সিদ্ধিনাথ শর্মা আর ফেরীঘাট ভরা জনতা, মূলতঃ ছাত্ররাই, মন্ত্রীর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে জুতো, দোলাচ্ছে কালো পতাকা, হাঁকছে শ্লোগান। পুলিশে মিলিটারিতে ছয়লাপ ফেরীঘাট। তথাপি তিলমাত্র ফাটল ধরছেনা এই অবলীল ব্যারীকেডে। বাধ্য হয়ে ফিরেযাচ্ছে মন্ত্রী মহোদয়ের পানসী। ফিরে যাচ্ছে কেননা বরাক উপত্যকার বঙ্গভাষী জনতা প্রতিবাদ করছে বিমলা প্রসাদ চালিহা’র আনা ভাষা ‘বিল’ এর – যে বিল ওসমীয়া ভাষাকে ঠুসে দিচ্ছে বাঙ্গালী জনতার মুখে ঠিক যেমন একদা ঘটেছিল পাকিস্তানে। - এই প্রতিবাদে উত্তাল জনতার মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি সুকেশ রঞ্জন এবং শিবাণী উভয়কেই। - অর্থাৎ, এইভাবেই, ছাত্র রাজনীতির সূত্রে সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাস আর শিবানী বিশ্বাসের জড়িয়ে পরা ষাটের দশকের বাঙ্গালীর ভাষা আন্দোলনে, অসমীয়া উগ্র জাতীয়তার বিপক্ষে। ছাত্রছাত্রীরা কালো পতাকার প্রতিবাদ জানিয়েছে আসামের তৎকালীন গভর্ণর শ্রীনাগেশকে।
                           আসামের যে অংশকে বলা হয় ‘আপার আসাম’,  সেখানে, এদ্দিনে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে ‘বঙ্গাল খেদা’র বেনামী ‘আন্দোলন’। ডিব্রগড় মেডিকেল কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ছয়জন বাঙ্গালী ছাত্রকে। সেই ছয় জন ছাত্রকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে স্থান দেওয়ার আর্জিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় কে  মেমোরেন্ডাম  দিতে কলকাতা হাজির হতে হয়েছে সবান্ধব সুকেশ রঞ্জনকে। কলকাতায় সুকেশ্রঞ্জন সাক্ষাৎ করলেন শ্রী ত্রিগুণা সেনের সঙ্গে। মূলতঃ শ্রীহট্টিয় এই শিক্ষাবীদ তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সহ্নেহ প্রশ্রয়ে তাঁদের লিখিত মেমোরেন্ডামটি পাঠ করলেন এবং স্বহস্থে পরিমার্জন করে দিলেন সেই মেমোরেন্ডাম। বাবার কথা’য় সস্নেহ প্রশ্রয় তাঁরা পেয়েছিলেন শ্রী বিধান চন্দ্র রায়ের কাছেও। সেই ছয় জন বাঙ্গালী ছাত্রকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করবার ব্যবস্থা করেছিলেন বিধান রায়।
বাঙ্গালো ছাত্রদের উপর এই নির্যাতন, আসামের বাঙ্গালী অধ্যুষিত অঞ্চলে অসমীয়া ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া – এ’ই সমস্ত উগ্র জাতীয়তাবাদী কীর্তি
মূলতঃ অনসমীয়া জনগনকে উৎখাত এবং হত্যা’র মাধ্যমে তাদের জমি-বাড়ি-মেহনত সমস্তকেই নিজেদের হতগত করাই ওই “আন্দোলন”এর কেন্দ্র, চাপ, পরিধি, ব্যাসার্ধ – সকলি। “খেদা” খেয়ে, জান হাতে করে এসেছে জনতা “লোয়ার আসাম”এ। শিলচরে, করিমগঞ্জে।  শিলচরে এঁদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে ‘শিলচর নর্ম্যাল কলেজ’, ‘গুরুচরণ কলেজ’ আর ‘অভয়াচরণ পাঠাশালা’য়।
সিদ্ধিনাথ শর্মা মহোদয়ের ‘পানসী’কে ফেরীঘাটে ভিড়তে না দেওয়া এই আন্দোলনের একটি সাফল্য তো বটেই। কিন্তু এ’র মূল্যে কারাবরণ করতে হয়েছিল অনেক ছাত্রনেতা, ছাত্রনেত্রী, আন্দোলনকারী সহ অনেককেই। তিনিদিন তিন রাত্রির কারাবাস জুটেছিল শ্রী সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাসেরও। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় শিলচর শহরের কেন্দ্রস্থিত পার্ক “গান্ধীবাগের” নিকটস্থল থেকে। প্রতিবাদ-শেষে বাড়িফেরা পথে শ্রীমতী শিবাণী বিশ্বাস ও তাঁর বান্ধবীদের তাড়া করেছিল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী।
শ্রী সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাস ও শ্রীমতী শিবাণী বিশ্বাসের কথায়ঃ “সেই সময়ের আগে কোনো ছাত্রসংঠন ছিল না। ভাষাসংগ্রামের প্রেক্ষিতেই “ছাত্র সমিতি” গঠন করা হয়। বিশেষ কোনো পার্টির এখানে উল্লেখ করা যাবেনা সকলে মিলেই এই আন্দোলন  গড়ে উঠেছিলো। মূলত  স্থানীয় আবেগটাই ছিল প্রধান অন্তর্বস্তু”। “ছাত্র সমিতি”র সেক্রেটারি ছিলেন সুকেশ্ রঞ্জন। শ্রীমতী শিবাণী ছিলেন “ছাত্র সমিতি”র ‘ভাইস্‌ প্রেসিডেন্ট”।  বরাক উপত্যকায় অসমীয়া ভাষা আইন আর ‘বঙ্গালখেদা’র বিপক্ষে প্রতিবাদের তীব্রতার বৃদ্ধির সমান্তরালে স্বাভাবিকভাবেই তীব্রতর হচ্ছিল  আগ্রাসন। পরিষ্কার হয়ে উঠছিল উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদের ‘নাজি’ চরিত্র। এই ভাবেই একদিন এসে পরেছিল সেই রক্তাক্ত দিন। ১৯ শে মে ১৯৬১। ১৯শে মে’ নামক ওয়েব পাতার থেকে উদ্ধৃত করছি ১৯ শে মে’স চুম্বক কথাঃ “... সেবার সারা পৃথিবী যখন বিশ্বকবির জন্মশতবর্ষ উদযাপন সমারোহে ব্যস্ত, তখন বরাক নদীর দুপারে চলছিল কবিগুরুর ভাষায় কথা বলার, গান গাইবার, জীবন সাধার অধিকার অর্জনের লড়াই। কবিপক্ষেই আসামের বরাক উপত্যকার তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরের রেল স্টেশনে পুলিসের গুলিতে জীবন আহুতি দিয়েছিল ১১ জন তরুণ তরুণী। রক্তদানের পুণ্যে অর্জিত হয়েছিল বরাক উপত্যকার তিনটি জেলার জন্যে সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি। সেদিন বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের লড়াই শুধুমাত্র বাঙালির লড়াই ছিল না। বাংলা ও বাঙালি ছিল অগ্রভাগে, কিন্তু লড়াই ছিল বহুত্বের স্বপক্ষে বহুভাষী মানুষের লড়াই। ১৯ মে’র গুলিচালনার প্রতিবাদ করে আসাম বিধানসভা থেকে প্রথম যিনি পদত্যাগ করেন, তিনি নন্দকিশোর সিংহ। ভাষিক পরিচয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি। শিলং শহরে ঐতিহাসিক মৌনমিছিল করেছিলেন খাসি পুরুষ রমণীরা। এই বহুত্বের চেতনাই উনিশের চেতনা। বহুভাষিক আসামে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকারের সংগ্রামই ছিল সেদিনের বাংলা ভাষা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। উগ্র জাতিদম্ভের বিরুদ্ধে বহুত্বের লড়াই ১৯৬১ সালের পর এগিয়ে গেছে ১৯৭২ সাল হয়ে ১৯৮৬ ও ১৯৯৫ সালেও। ১১ জন তরুণ তরুণীর রক্তচিহ্ন লাঞ্ছিত পথ ধরে শহীদত্বের পথে যোগ দিয়েছেন করিমগঞ্জে ১৯৭২ সালে বাচ্চু চক্রবর্তী ও ১৯৮৬ সালে জগন (জগন্ময় দেব) ও যীশু (দিব্যেন্দু দাস)। রক্তদানের একই ধারায় যুক্ত হয়েছেন ১৯৯৫ সালে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি ভাষার সংগ্রামে কলকলিঘাটে বীরাঙ্গনা সুদেষ্ণা সিনহা। আমাদের ইতিহাস ও ভূগোল পরস্পর দ্বন্দ্বযুদ্ধে মেতে আছে সেই কবে থেকে। ফলেই আমাদের গানে ছবিতে সাহিত্যে আমাদের জীবনধারায় এক চিরন্তন বিরহগাথা,এক অনিঃশেষ দীর্ঘশ্বাস। প্রত্যন্তের নিভৃতিতে একান্তে বেজে চলা আমাদের বাঁশির সুর এখনো বহির্বিশ্বে প্রায় অশ্রুতই ...”
১৯৬১’র ১৯ শে মে গুলি যে চলবেই তা সম্ভবতঃ নির্ধারিত হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।  শ্রীমতী শিবাণী বিশ্বাসের ভগ্নীপতি তখন আসাম পুলিশের “এস আর পি”।  সরকারী আবাসনে সস্ত্রীক তিনি বাস করেন, তখন, আসামের হাফলং নামের পাহাড়ি শহরে। ১৭ কিংবা ১৮ মে সেই ভগ্নীপতি এসে হাজির হলেন শিবাণীর পিতৃগৃহে। “দিদি সাংঘাতিক ভাবে অসুস্থ” – এই বয়ানে শ্যালিকাকে রাজি করালেন তাঁর সঙ্গে হাফলং আসতে। কাক ভোরের রেলগাড়িতে, তখন, পুলিশ বিভাগের যে বিশেষ “সেলুন” থাকতো তা’তে করে যাত্রা শুরু হল শিবাণী, তাঁর খুড়তুতো বোন ও ছোটভাই’এর, হাফলং  শহর অভিমুখে। বদরপুর জংশনে সেই সেলুনে সেই ‘জামাইবাবু’টি তাঁর নিজের ‘বড় সাহেব’ লালা বি কে দে’কে কে ডেকে এনে শ্যালক-শ্যালিকাদের সঙ্গে পরিচয় করানোয় আবডালে জানিয়ে দিলেন, যে, তাঁর শ্যালকাকে তিনি সড়িয়ে নিচ্ছেন ঘটনাস্থল থেকে …
     ১৯৬১সালের ১৯শে মে যখন ভিজে উঠলো বাঙ্গালীর তাজা রক্তে  শিবানী তখন হাফলঙ্গে। ২০ না’কি ২১ মে’তে সংবাদটি পৌঁছেছিল তাঁর কাছে। খবর পাওয়ামাত্রই তিনি চেপে বসেছিলেন শিলচরের ট্রেনে। শিলচরে নেমে সোজা চলে এসেছিলেন সরকারি হাসপাতালে যেখানে আহতদের চিকিৎসা চলছে, হতদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে মর্গে, হতাহতদের আত্মিয় পরিজনদের উপরে চলছে পুলিশি হেনস্থা। ক্রমে  কারফিউ ঘোষিত হলো শহরে। আর সেই কারফিউ’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ জানালেন গুরুচরণ কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শ্রী যোগেন্দ্র চৌধুরি।  কিন্তু এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জনতার, নেহাতই “আম্‌" যে জনতা, তার নিরস্ত্র কিন্তু স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিরোধে ‘নাজি’রাও ভীত হয়ে পরেছিল। ঈশ্বরের নিজস্ব সন্ততি যে সরকারি পুলিশ তারাও পুলিশি পোষাকে জনসমক্ষে আসতে সাহস করেনি অনেক দিন। হাটে বাজারে এসেছে গিয়েছে ‘সিভিল ড্রেস’এ।
 “ছাত্র সমিতি”র পক্ষ থেকে স্থির হলো যাওয়া হবে কলকাতা । সাক্ষাৎ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। প্রয়োজনে যেতে হবে দিল্লীতেও। বরাক উপত্যকা জুড়ে সে সম্মিলিত সংগ্রাম সমিতি গড়ে উঠেছিল তার এক মুখ্য চিন্তক ও নেতা ছিলেন শ্রী বিধুভূষণ চৌধুরী’। ‘যুগশক্তি’ নামের সাময়িকপত্রের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন শ্রীহট্টের শ্রীদিগেন্দ্রনাথ দেব ।১৯৪৬ সালে তাতে কর্মী হিসেবে যোগদান করলেন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা শিক্ষক বিধুভূষণ চৌধুরী। ১৯৪৭ থেকে, করিমগঞ্জে এই পত্রিকা লালিত হয়েছে বিধুভূষণ চৌধুরী’র দ্বারাই মূলতঃ। সবান্ধব সুকেশ রঞ্জন এসেছিলেন করিমগঞ্জ, সম্মিলিত সংগ্রাম সমিতির সঙ্গে আলোচনার নিমিত্ত। রাতিবাস, তাঁদের , হয়েছিল শ্রী বিধুভূষণ চৌধুরী’র গৃহে। শ্রী বিধুভূষণ চৌধুরী’র পুত্রেরাও সবাক ছিলেন এই আন্দোলনের করিমগঞ্জ মানচিত্রে। আমার বাবার সমসাময়িক ছিলেন সুজিৎ চৌধুরি। আমার সৌভাগ্য এই, যে, তাঁর মৃত্যু অবধি, তাঁর স্নেহসান্নিধ্য আমি পেয়েছি।
     এই সমস্ত পরিকল্পনা যখন চলছেসংগ্রামকারী ও সংগ্রাম-সমর্থকদের মধ্যে, তখন আপাত স্তব্ধ হয়ে থাকা আগ্রাসন যন্ত্র কিন্তু অন্দরে আয়োজন করছে বিপুল ঝড়ের যে ঝড় অচিরেই নেমে এলো, সমগ্র বরাক উপত্যকা জুড়ে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অবয়বে …
সেই ঝড়ের দিনরাত্রিগুলির কথা আর মনে আনতে চান না  শ্রী সুকেশ রঞ্জন বিশ্বাস,  না’ত তাঁর স্ত্রী শিবানী বিশ্বাস। সেই নির্মীত ধূলিঝড়ের আবডালে মাঠে নামলো গন্ধ মূষিকেরা। দৌড়ে এলো শৃগালের দল। নেমে এলো শকুনেরা।  সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা স্বাবাবিক নিয়মেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে অন্ধকারের প্রলেপ দিল জনচক্ষে। তবু কিছু মানুষের প্রাণ আর ত্যাগের মূল্যে অসমীয়া আগ্রাসন সাময়িক ব্যর্থ হল বরাক উপত্যকায়।
      আমার জ্ঞান হওয়ার পর বাবাকে দেখেছি বামপন্থী রাজনীতির কখনো সমর্থক, কখনো সক্রিয় ভূমিকায়। মা মূলতঃ সামাজিক সেবা মূলক কাজ আর তারই অঙ্গ হিসেবে নিজের বাংলা “মিডিয়াম” ইস্কুল নিয়ে আপনাকে আপনি ন্যস্ত হয়ে আছেন। - আপনাদের এই নিমন্ত্রণ পেয়ে যার পরনাই আনন্দিত বাবা, মা উভয়েই আর অন্তিমে পাসপোর্ট না পাওয়ায় সমান মর্মাহতও বটে। কিন্তু এ’ও তো সত্য, যে, বাংলা ভাষাকে কেন্দ্রে রেখে পৃথিবীময় যতো আন্দোলন, রক্তপাত – তাঁরাও যে এর শরিক এই কথা পৃথিবী ভোলেনি।

ধন্যবাদান্তে
সপ্তর্ষি বিশ্বাস, ১৮ই ফেব্রুয়ারী ২০২০
বেঙ্গালোর


ঘুম ঘর