কৃতজ্ঞতা পাতা
১।
গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো তন্নিমিত্ত কৃতজ্ঞতা চূর্নী – আমার
পত্নী, কন্যা ধিঙ্গি, পুত্র ভূর্ভুস্ব – এদের জানানো জানি
নিতান্তই বাতুলতা তবু সত্যের খাতিরে …। সে রকমই বংকু ঘোষ
নানান পর্যায়ে যাঁর পরামর্শ ছাড়া …। তাঁর ছাত্রী ছত্রিশ ব্রা
রিমিঝিমি উৎসাহ না দিলে …। গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো
তার জন্য ঠিকা ঝি পদ্মর মা, রান্ধা-বেটি হেটি, ডেলিভারি বয় গুলি
নানা দোকানের, মাছ-মাংস-শব্জি অলা,চাষা, মুদী,মুদ্দফরাস, মুচী, টেংকি সাফ
করা মেথর – নাহ ‘হরিজন’ – ইত্যাদির কোনো
ভূমিকা ছিলনা। গ্রন্থটি যে লেখা হলো, হতে পারলো
তন্নিমিত্ত সব কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য চূর্নী, ধিঙ্গি, ভূর্ভুস্ব, বংকু ঘোষ,
ছত্রিশ ব্রা রিমিঝিমি আর
আমার গগনচুম্বী স্পষ্ট প্রতিভার।
২।
হাওয়ায় বাতাসে হেঁটে একটি মুদ্রিত পাতা
একটি কবিতা নিয়ে আসে। পাঠ করে আনন্দিত
পাঠ করে বেদনার্ত হই। আমি ঋনী হই ওই
হাওয়ায় বাতাসে আসা কবিতার কাছে। কবিতা হে
তুমি কার কাছে ঋনী? কবির? তাহলে
কবি কার কাছে ঋনী? কার কার কাছে ঋনী
বৈজ্ঞানিক, কবি, শিল্পী এবং বিশিষ্ট প্রচ্ছদ ছাড়া
শাদামাটা হাড্ডি মাংস রক্তের
লোক? আমি ঋণী কার কাছে, কার কার
কাছে? আমি ঋনী আপেলের কাছে
১৬৬৫-৬৬ সালে যে একটি আপেল ঝরেছিল
বিলাতের একটি বাগানে – নিউটন ঋনী
সেই আপেলের কাছে, আপেল বাগানে যতো মালী
যতো দিন যতো চারা পুঁতেছিল, গাছে জল দিয়েছিল —
নিউটন ও সেই সূত্রে আমি
ঋনী সেই প্রত্যেকজন মালী আর মজুরের কাছে। পক্ষান্তরে
ঋণ নেই আদম-ইভের অন্য আপেলে কেননা
স্বর্গের কাছে কারো কোনো ঋণ নেই, কোনো ঋণ
কখনো ছিলনা, কেননা স্বর্গ নেই, নেই কোনো
স্বর্গীয় দেবী, দেব, ওমকার, ভূমা –
কখনো ছিলনা। আমার তোমার ঋণ
মণীন্দ্রর মুদীর দোকানে, ঋণ সুভাষের পান
সিগারেট বিড়ি তাড়ির দোকানে। রান্ধামাসী মাণিকের মা'র
হাতের রান্নায় আমি ঋনী, ঋনী তার রুগ্না হাতটির কাছে
জ্বরে পোড়া আমার কপাল – রান্ধামাসী মাণিকের মা
মা স্নান করতে গেলে জ্বরের কপালে তুমি
জলপট্টি না দিলে ...। ঋণ আমার রাস্তায়, পথে
প্রত্যেক ভিক্ষুকের কাছে প্রত্যহ বেড়ে যায়
চক্রবৃদ্ধি হারে। বাড়ে
কেননা আমার সুধী পূর্বতন পূর্বপুরুষেরা
এদের পূর্বতন পুরুষ আর মেয়েদের শুষে
হয় দালান নয় বাগান
অন্যথায় পুঁথি, জ্ঞানটান
আমাদের জন্য রেখে গেছে। যে অভুক্ত লোকটি "জামাই"
নামে যে খ্যাত, কারণ সে খেতো
সকল উৎসবে গিয়ে
অণিমন্ত্রিত গিলতো
“ত্রিশ জনের খোরাক একলাই” –
আমার ক্ষুন্নিবৃতি তার কাছে চিরন্তন ঋনী। এবং দপ্তরীরা, বিশেষত
ইকবালদা, গভর্নমেন্ট স্কুলে, ক্লাস সিক্সে ছেঁড়া বই
জোড়া দিয়ে যে আমার হাত, পিঠ
বাঁচিয়েছে দুর্বিজয় সিং স্যারের
বেত্রদন্ড থেকে। ঋণ আমার স্বপনকুমার
ইন্দ্রজাল কমিক্স, প্রসাদ, উলটোরথ ও
অদ্রীশ বর্ধনে। খবর কাগজ দেওয়া
প্রত্যেকজন দাদা,কাকু, লোকদের কাছে
ঋণ আছে তোমার, আমার, আপনার। যতো চাষা ধান রুয়ে
ক্রমে ক্রমে শুকিয়ে মরেছে আর
যতো চাষা সরকারের ঋণ
না মেটাতে পেরে
ঝুলে গেলো গাছডালে কিংবা কড়িকাঠে –
যতো হাত, বাহু, উরু, পায়ের গোড়ালি
আমার তোমার ঘরে টেবিল, চেয়ার, আলনা,
গ্যাসস্টোভ, বাহারী তৈজস – তাদের সবার ঋণ
শোধ নয়, লিখে রাখা
ফুরাবেনা এক কবি-শিল্পী জীবনে । ঋণ আছে
বাঁশঝাড়ে, অর্জুনের ডালে। ঋণ বারান্দার থেকে দেখা
পতিত জমিতে, মাঠে
সজিনার শাখা আর ফুলে। প্রতিটি বেশ্যা-বোন
মহীয়সী, রতিসূত্র-কোকশাস্ত্র থেকে
অনেক বিরাট সত্য
ক্ষুধা শিখিয়েছে। “ঋণস্বীকার পাতা” ছাপলে
এদের ঋণের কথা লিখবে কি তুমি? লিখবে কি
ক্রীতদাস ও রাইয়তের কথা
যাদের ঘামে ও রক্তে
“আভিজাত্য” শব্দ ভিজে আছে? প্রেসের সেসব কর্মী
তোমার পাতার পরে পাতা
বিষ্ঠা যারা মার্জনা করে
মুদ্রিত করেছে তোমাকে? আর যারা বাস্তবিক
প্রতিদিন বিষ্ঠা সাফ করে
তোমাকে, তোমার শিল্প, রুচি, সভ্যতাকে
জ্যান্ত রাখে, জ্যান্ত রাখছে রোজ?
যাদের “হরিজন” বলে ছাপ্পা মেরে দিয়ে
দায় সেড়ে, হাত ধুয়ে এসে
সংহত হয়েছো দর্শনে? হাওয়ায় বাতাসে হেঁটে
একটি মুদ্রিত পাতা
একটি কবিতা নয়
এসব বার্তা নিয়ে আসে।