প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...

Saturday, November 7, 2026

শরত-ইন্দু’র গাথা

শরত-ইন্দু’র গাথা

 [প্রকাশঃ সাহিত্য, হাইলাকান্দি]



১। জ্যোৎস্নাগাথা, শরত-ইন্দু’র …

“ সে, হয় এই সময়ের, শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক” —- এহেন বাক্য, অর্জন করে নিতে পারা, নিজের সমকালীন নোবেলবিজয়ীর কলম থেকে, যে কোনো উদীয়মান লেখকের আশ্রয়। জর্জ সিমোনো প্রসঙ্গে এই বাক্য এবং এমত বহু বাক্যেই যখন সোচ্চার ছিলেন আন্দ্রে জিদ, প্রায় সমকালেই বঙ্গদেশে আরেক সাহিত্যিকের অভিজ্ঞতা এই রকমঃ


না, রবীন্দ্রনাথ ও আন্দ্রে জিদ বা শরদিন্দু ও জর্জ সিমোনো নিয়ে কোনোরূপ তুলনামূলক আলোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের পাঠরুচি আমার অদ্যাপি দুর্বোধ্য কেননা তাঁর ঘোষিত অপছন্দ তালিকায় রয়েছে আনা কারেনিনা,  রয়েছেন বোদলেয়ার স্বয়ং। কিন্তু, ঘটনা দুটিকে পাশাপাশি রাখলে, প্রায় একই সময়ে, দুইটি দেশের বিদ্বৎসমাজে, “জনপ্রিয় সাহিত্য” বিষয়ে ধারণার দুস্তর ব্যবধানের একটি ইঙ্গিত কি মেলেনা? এতদ্‌ভিন্ন, শরদিন্দু’র সমান্তরালে সিমোনো কে হাজির করার আরো একটু হেতু এই, যে, উভয়েই সাহিত্য-বিশ্বে প্রবেশ করেছেন – অপরাধ, অপরাধ-মূলক কাহনের রাস্তা ধরে। 

                                  ফিরে আসি “জনপ্রিয় সাহিত্য” বিষয়ে ধারণার দুস্তর ব্যবধানের প্রসঙ্গে। এই ব্যবধানের অনেক হেতুগুলির একটি কি নিহিত নয় এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাতে, যে, আন্দ্রে জিদ-সিমোনো'র দেশ, ফ্রান্স, উপনিবেশ-প্রভু হিসাবে প্রতিষ্ঠির আর ভারতবর্ষ,তখনো,নিজেই উপনিবেশ, “প্রভুত্ব” দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? স্থান-কালের এই আবহ প্রয়োজনীয়, কেননা,  “জনপ্রিয় সাহিত্য” বা “পপুলার” সাহিত্য সম্পূর্ণ ভাবে না হলেও, তার যে অংশটি অপরাধ-কেন্দ্রিক কাহনের উপর নির্ভর এবং বিশেষত যা “গোয়েন্দা কাহিনী”, তার জন্ম ও বিকাশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, উপনিবেশ —- মূলত পুঁজি কেন্দ্রীক ব্যবস্থার বিস্তার এক বিশেষ ভূমিকা রাখে। আর এক্ষেত্রে, মনে রাখতেই হবে, প্রথমত, যে, রহস্যের কিনারা করতে চাওয়া, রহস্যের জট খুলতে সক্ষম এবং রহস্যভেদ করেছে এমন মানুষ সমাজে ছিল সততই।  তবু "গোয়েন্দা" এই বিশেষ চরিত্রটির জন্ম হয়েছে সময়ের এক বিশেষ গ্রন্থিতে, ইতিহাসের প্রয়োজনে আর প্রথম হাজিরার পর থেকেই, অদ্যাবধি কেবলি বদলে বদলে যাচ্ছে এই "মার্কামারা" " সত্যান্বেষী" চরিত্র। দ্বিতীয়ঃ সমস্ত “গোয়েন্দা কাহিনী”ই, হয়, “অপরাধ কাহিনী” তবে সমস্ত “অপরাধ কাহিনী”ই নয় “গোয়েন্দা কাহিনী”।

পো’র দুঁপে আর ডয়েলের হোমস্‌কে, আলোচনার সুবিধার্থে, গোয়েন্দা কাহনের সুবর্ণ যুগের অন্দরে নাহোক, আরম্ভ-রেখার স্থাপিত করলে যা দেখা যায়, তা হলো অদ্যকার ‘পাল্প-ফিকশনের’ জনক যে ‘penny-dreadfuls’, short novellas’ — এই ‘শস্তা’ ঘরানাটির বিপরীতেই কলিন্স, ডয়েল ও তাঁদের সমসাময়িকদের অবস্থান। ক্রমে, এই মঞ্চেই পদার্পন করবেন ক্রিস্টির পোয়ারো, পোয়ারো,মার্পল প্রমুখ। ‘এই মঞ্চে’ বলতে আমি বলতে চাইছি, যে, দুপেঁ'র উত্তরসূরী না হয়েও ‘penny-dreadfuls’, short novellas’, তৎকালে হাজির করেছিল বেশ কিছু ‘টিকিটিকি’র আর সেই সকল টিকিটিকি কাহনের লক্ষ্য ছিল, মূলতঃ, নাগরিক-শ্রমিক শ্রেণী। বিশেষ করে এই শ্রেণীর উঠতি বয়সীরা। এই নাগরিক শ্রমিক শ্রেণীর জন্ম, উপনিবেশ-প্রভু দের আপন দেশে এক রকম আর ভারতবর্ষের মতো উপনিবেশে আরেক রকম। বিস্তার ও গহনতর বিশ্লেষণে উৎসাহী পাঠিকা-পাঠককে, এই বিষয়ে সুমন্ত ব্যানার্জীর বই গুলি, বিশেষত “Crime and Urbanization: Calcutta in the Nineteenth Century”  গ্রন্থটি পাঠ নিতান্ত দরকারি।

                                         উপনিবেশ-প্রভুদের দেশে, আমাদের বটতলা-বই হেন গ্রন্থগুলির হাত ধরেই, আগমন গোয়েন্দা কাহন-সুবর্ন-যুগের। তবে সুবর্ণ-যুগ রহস্যভেদীরা “পেনি ড্রেডফুল” বা বটতলা-বই এর  ‘টিকটিকি’ নয়। বরং বলা ভালো ‘গিরগিটি’। তাদের বর্ণ বিচিত্র ও পরিবর্তনশীল। তারা মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত। তাদের কর্ম পরিসর এবং চালচিত্রও তা’ই। কেননা এই সকল কাহিনীর লক্ষ্য  নাগরিক-শ্রমিক শ্রেণী’র পরিবর্তে —- ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত আর উঠতি বুর্জোয়া’রা। পাঠক, লেখক, আলোচক Richard Bradford’এর মতে সুবর্ণ-সত্যান্বেষীরা যেন তাদের অভিজাত আর বুর্জোয়া পাঠককূলকে সতত জানান দিচ্ছিল, বকলমে, যে ‘we are a class above those who invite the scrutiny of policemen and we can deal with our own misdemeanors in a more dignified fashion.’ ক্রিস্টির পোয়ারো’ও ওই ‘dignified fashion’এরই সন্ততি তবে তার চিন্তা-ধরন শার্লক হোমসের নিপাট যুক্তি থেকে, সবজান্তা-গিরি থেকে ভিন্ন। পোয়রো, মার্পল – উভয়েরই বিচরণ মানবমন যেখানে নিতান্ত যুক্তি নয়, সেই অবচেতনে।

শরদিন্দু, অনেকাংশেই, ব্যোমকেশ-মানচিত্রে, সেই সুবর্ণ-যুগ গোয়েন্দা-গল্প লিখিয়েদের উত্তরসূরী। সুবর্ণ যুগে কোনান ডয়েল যেমন ঢাকা পরে গিয়েছিলেন হোমসের ছায়াতে যা তাঁকে বাধ্য করেছিল হোমসের বিলুপ্তি ঘটাতে ( এবং অব্যবহিত পরের পাঠক-তাড়নায় তাকে পুনর্জীবিত করতে), তেমনি শরদিন্দু, অদ্যাপি আচ্ছাদিত ব্যোমকেশ-ছায়াতে। নানান ভাষায় অনূদিত হওয়ার থেকে আরম্ভ করে “দূরদর্শন”, সেলুলয়েড হয়ে হালের ওয়েব-সিরিজেও ব্যোমকেশের প্রতিপত্তির তুলনায় শরদিন্দু-সাহিত্য-বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্র, নদী, মহাদেশ ইত্যাদির উপস্থিতি নিতান্ত নগণ্য। অথচ সেই সকল সাগর-নদীর ব্যাপ্তি, গহিন, সেই সকল দেশ-মহাদেশের স্থাপত্য —- শরদিন্দুর তথাকথিত “জনপ্রিয়” রচনাগুলির বহুলাংশের থেকেই নিবিড়তর। 

  সময়াভাব, দৈহিক অসুস্থতা বা যে কোনো কারনেই হোক, রবীন্দ্রনাথ শরদিন্দু-সাহিত্য না পড়লেও, ক্রমে, শরদিন্দু-অনুরাগী দলে ঢুকে যাচ্ছিলেন, গিয়েছিলেন,  “গুণমুগ্ধ মোহিতলাল মজুমদার”, “ বিনীত রাজশেখর বসু”, “ভবদীয় শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়”, রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রমথনাথ বিশী, “প্রীতিমুগ্ধ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়”, বলাই ( বনফুল), পরিমল ( গোস্বামী), সুকুমার সেন, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত —- প্রমুখ। কিন্তু শরদিন্দু’র সঙ্গে তাঁদের পত্রবিনিময়ের, একাধিক বার ময়নাতদন্ত-অন্তে, আমার অদ্যাপি রয়ে গিয়েছে সন্দেহ, যে, শরদিন্দু যেখানে সীমিত পরিসরে “রোমান্স” এর লেখক নন, শুধু স্বাদু ভাষারই পাচক-পরিবেশক নন, শরদিন্দু-সাহিত্যের সেই দ্বীপ গুলির দিকে, উধৃত গুণীজন দিকের দৃষ্টি পরেছিল কি আদৌ? অপরাধ সাহিত্য, গোয়েন্দা সাহিত্য বিষয়ে জ্ঞানী এবং উৎসাহী সুকুমার সেন লিখিত ভূমিকা, শরদিন্দু অমনিবাসের, ব্যোমকেশ খন্ডের একটিতে, যা পড়তে দারুন কিন্তু শরদিন্দু’র সর্বাত্মক মূল্যায়ন দূরস্থান, ব্যোমকেশ-কাহিনীরও বিশ্লেষণ, অনুধাবন আমি লক্ষ্য করিনি। অমনিবাসের ব্যোমকেশ-খন্ড দুইতে ভূমিকা প্রতুল চন্দ্র গুপ্তের। সে'ও অতি মজাদার একটি রচনা কিন্তু সেখানেও চিহ্ন নেই বাস্তবিক বিচার-বিশ্লেষণের।

                                                      আগেই বলেছি, যে, রহস্যের কিনারা করতে চাওয়া, রহস্যের জট খুলতে সক্ষম এমন মানুষও সমাজে ছিল সততই।  তবু "গোয়েন্দা" এই বিশেষ চরিত্রটির জন্ম হয়েছে সময়ের এক বিশেষ গ্রন্থিতেই। কিন্তু, এই ঘোষিত "সত্যান্বেষী" পদটি রাজকার্যে ও ক্রমে মনোরঞ্জনে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবার ঢের আগেই আমরা ইদিপাস কে দেখি রহস্যভেদীর ভূমিকায়। নিজ রাজ্যে নেমে আসা সহসা-দুর্ভিক্ষের হেতু জানতে এবং তার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ইদিপাস ক্রমে লিপ্ত আত্ম পরিচয়ের অনুসন্ধা্নে। পাঠিকা-পাঠকেরা জ্ঞাত আছেন, যে, স্যম্যন্তক মনি হরন রহস্য, কৃষ্ণকে ভেদ করতে হয়েছিল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের নিমিত্ত। আরব-রাতের সহস্র এক কাহিনীতে ছদ্মবেশী খলিফা —- সে'ও সত্যান্বেষী কিন্তু মার্কামারা নয়। এমন আরো অনেক অনেক উদাহরণই যায় হাজির করা। এই সমস্তই অপরাধ কাহিনী, অপরাধী সন্ধানের গল্প। এমন কি, আমার মতে, রামায়ন,মহাভারত,ইলিয়াদ থেকে  “ব্রাদার্স কার্মাজভ”, “আনা কারেনিনা”, “মাদাম বোভারি”, “উইদারিং হাইট্‌স্‌” – আদতে অপরাধ কাহিনীই। রবীন্দ্রনাথের  “ঘরে বাইরে”ও মূলতঃ এক বা একাধিক “অপরাধ কাহিনী”র সমন্বয়। এক বা একাধিক “অপরাধ”ই এদের কেন্দ্র, এদের ভ্রূণ।  তথাপি প্রতিষ্ঠিত পাঠাভ্যাসহেতু, অদ্যাপি, “অপরাধ কাহিনী” বলতে কিছু বিশেষ লক্ষণধর্মী কাহিনীই মার্কা-মারা হয়ে যায়, হয়ে গিয়েছে, “অপরাধ-গোয়েন্দা-থ্রিলার” ইত্যাদি সংজ্ঞায়। অথচ  আনা কারেনিনার জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই একটি অপরাধের, “ক্রাইমের” উদ্‌যাপন যার “পানিশ্‌মেন্ট” অন্তিমে আনার আত্মহত্যায়। —- বাংলা ভাষায় লিখিত দুটি শ্রেষ্ঠ “অপরাধ কাহিনী” অবশ্যই “কৃষ্ণকান্তের উইল” আর “বিষবৃক্ষ”। পরের সময়ে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের “রত্ন দ্বীপ”। এই সকল রচনায় ‘মার্কামারা গোয়েন্দা’র অনুপস্থিতিই কি তাদের এতাবৎ দূরে রাখে, রাখবার চেষ্টা নেয় ‘অপরাধ কাহনের’ মানচিত্র থেকে? না’কি এতাবৎ ‘অপরাধ কাহন’, তার বিস্তার ও গভীরতা সত্ত্বেও, নয় ‘সাহিত্য’ পদবাচ্য? —- আমি নিশ্চিত, যে, এই প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” বা “না” বলবার স্পষ্টতা তখনো ছিলনা। এখনো নেই। —- পাঠকের, আলোচকের। উদাহরণ হিসাবে সুকুমার সেন লিখিত ব্যোমকেশ-ভূমিকার অংশবিশেষ;

                                            এখানে লক্ষ্যনীয় এই, যে, যে দৃষ্টিতে সুকুমার সেন দেখেছেন অপরাধ কাহিনীকে, সেখানে কাল-স্থান অনুষঙ্গ, অনুপস্থিত। অনুপস্থিত কোনো স্পষ্ট সীমানা-রেখা, যার ভিত্তিতে “ব্রাদার্স কার্মাজভ” বা “কৃষ্ণকান্তের উইল” থেকে, “আদিম রিপু” অথবা “কহেন কবি কালিদাস” কে ভিন্ন জাতের বলা যেতে পারে। ওই বিভাজন-রেখাটি আদতে নেই। যা আছে, তা রচনার সাহিত্যগুন। সংহতি। এবং সাহিত্যগুনের নিরিখে তর-তম’র বিচার।  মিখাইন বাখতিনের The Dialogic Imagination রচনায় আছেঃ  “the criminal material itself is not essential …; । অপরাধ-কাহিনীর প্রকৃত ভূমিকা, সাহিত্যে-শিল্পে , এইখানেই, অপরাধকে আবহ করে নিয়ে, ধাপ করে নিয়ে, উত্তরণ– মানবের, সমাজের, সময়ের অথবা তারো পরের কোনো চক্রবালে।  মনেহয় এই সহজ সত্যটুকু অদ্যাবধি পাঠক, এমন কি বিদগ্ধ পাঠকেরও কাছে স্পষ্ট নয় । রহস্য-কাহিনীকে ‘ফর্ম’ হিসেবে ব্যবহার করে জীবন ও জগতের গহনতর সংকট, দ্বন্দ্ব, উত্তরন-পথের সন্ধান করবার কাজটির দিকে চোখ তাঁদের যায়নি এবং যার ফলে শরদিন্দু-সাহিত্যের মূল্যায়ন, প্রকৃত অর্থে, হয়নি। সুকুমার সেন, মনেহয়, শুধু বিদেশী-প্যারালাল পেলেই সন্তুষ্ট।

২।  ‘হেথা নয়, অন্য কোনখানে’

  ব্যোমকেশ-কাহন গুলি খুব সহজেই দুই ভাগ করা যায় করা যায় । একভাগে থাকে সেই সকল গল্প/উপন্যাস, যেগুলি, গোয়েন্দার বুদ্ধু-টুদ্ধি, প্লটের টুইস্ট – ইত্যাদি গুণে ভাস্বর। আরেক ভাগ, যেখানে ওই সমস্ত লক্ষনের সঙ্গে অথবা সেই সকল লক্ষন ভর করে তবু অন্তিমে আবহমাত্র করে, কাহিনী উড়ান দিয়েছে জীবনের, যাপনের মহত্তর, বৃহত্তর আলো বা অন্ধকারের দিকে। যেমন “অমৃতের মৃত্যু”। এই কাহন, অন্তিমে, অমৃত নামক যুবকের অদ্ভুত মৃত্যু ও কালো ঘোড়ার রহস্য-জট খুলে, অপরাধীকে শনাক্ত করা। কিন্তু এই কাহিনী আমাকে, এই সকল  “ডিটেকশন” “টুইস্ট” ইত্যাদি ডিঙ্গিয়ে নিয়ে যায় “উপনিবেশ”  শব্দের অন্তর্গত হিংস্র অন্ধকারে। জানায়, উপনিবেশ প্রভুরা স্রেফ নিজ নিজ বাণিজ্য-স্বার্থের প্রয়োজনে যেমন লিপ্ত হতে পারে ভয়ানক যুদ্ধে, বিশ্বযুদ্ধে, তেমনি যুদ্ধ-অন্তে, হারজিতের মূল্যে, মুনাফা-ভাগাভাগির অনুপাতটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া-মাত্র স্বেচ্ছায় ভুলে থাকে, কি কি বিষ, কত কত মারণাস্ত্র তারা ছড়িয়ে রেখেছে সারা বিশ্বে। কাহিনীর আরম্ভের দিকের এই অংশটিই  “অমৃতের মৃত্যু” কে এনে দিয়েছে ভিন্নতর ব্যক্তিত্বঃ

যুদ্ধকালে সৈন্যদের ব্যবহার করা অস্ত্র অথবা ব্যবহারের নিমিত্ত আমদানীকৃত অস্ত্রাগার, যুদ্ধান্তে নানা দেশেই, একই ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে অপরাধ। তৈরী করেছে অপরাধী। এখানে এসে জর্জ সিমোনোর দিনিলিপি থেকে এই অংশটি উদ্ধার করা মনেহয় প্রাসঙ্গিকঃ I read this passage from a piece in Newsweek of the 19th of September on Sydney Smith, Professor of Forensic Medicine at Edinburgh University – one of the founders of modern forensic medicine – at the end of his career: ‘After a lifetime spent in the study of murder and murderers, does Sir Sydney have a theory about the kind of person who kills? “In my recollection,” he writes, “they have been devoid of the characteristics they are commonly credited with, and [are] quite ordinary individuals such as you and me.”’ For thirty years I have tried to make it understood that there are no criminals.

অথচ “অমৃতের মৃত্যু” যেখানেই আলোচিত, সেখানেই স্পট-বাতি ওই  “কালো ঘোড়ার রহস্য” কে ঘিরে। তৃপ্তি, অপরাধ যার বা যাদের দ্বারা সংঘটিত হলো তাদেরই “ভিলেন” ভেবে নেওয়ায়। কিন্তু এই “ভিলেন” দিগের জন্ম-সূত্রও যে কাহিনীতেই বিধৃত তা, প্রতিষ্ঠিত পাঠাভ্যাস-হেতু যায় দৃষ্টি এড়িয়েই। সত্য এই, যে, ‘অপরাধী’ কোনো ভিনগ্রহী নয়। তাকে সাদা-কালোয় আঁকা যায়না। আর আঁকলে সে ছবি হতেপারে সাময়িক উত্তেজক কিন্তু অচিরেই ধরা পড়ে তার ফাঁকি। প্রকৃত প্রস্তাবে অপরাধ এবং অপরাধী দুই’ই স্ময় ও সমাজের দ্বারা সৃষ্ট। – এই কথাটি লক্ষ্য করি, বিশেষ করে “আদিম রিপু” উপন্যাসে যার আরম্ভটিঃ

                        দেশভাগ-হেন অঘটন যে নেহাৎই কোনো জিন্না বা নেহেরু ঘটাতে পারেনা, এ’ও যে মহাযুদ্ধের মতনই, পুঁজি-প্রভুদের দ্বারা নির্ণীত এই কথাটি, এখানে, তৎকালীন ও সমকালীন অনেকের মতোই শরদিন্দুও টের পান নি। তাই ভুলটুকু, আপাতত, বাদ দিয়েই আমাদের প্রবেশ করতে হবে কাহিনীতে। তবে এই “ভুল” একটি সূত্র, শরদিন্দু-মনোলোক বিশ্লেষণের। যথাস্থানে  এই সূত্রে আবার ফিরবো আমরা, কেননা মুসলমা-অসূয়া অবশ্যই শরদিন্দু-চরিত্রের একটি দিক। এই মুহুর্তে আমাদের পর্যবেক্ষন-বস্তু  “আদিম রিপু” উপন্যাসের আশ্চর্য চরিত্র  “বাঁটুল”। এই বাঁটুল অথবা বাঁটুল-হেন একটি শ্রেনীর মানুষ “গুন্ডা” হয়েওঠে ওই সময়ে। হয়ে ওঠে কেননা স্বাভাবিক উপার্জনের উপায়, দেশভাগে, দাঙ্গায়, তৎকালে, চূড়ান্ত অপ্রতুল আর সেই দসকল কারনেই অ-স্বাভাবিক উপার্জন-উপায়গুলির রমরমা। এই নতুন মানচিত্রে, নতুন ক্ষমতা-সমীকরনে, প্রতিষ্ঠাকামী, অর্থ ও প্রতিপত্তিবান মানুষদিগের উস্কানি এবং পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধ, সব রকমেরই, –  অবাধ ও অগাধ।এরাই  “বাঁটুল-গুন্ডা” দিগের পৃষ্ঠপোষক। তবে এই পৃষ্ঠপোষক শ্রেনীর মধ্যেও দল-ভাগ । একদল নব্য-বাবুদিগের মতো, যুদ্ধ-বাজারে টাকা করেছে। তারা এখন চায় সামাজিক প্রতিপত্তি। অন্য দল, এরা সাবেক অর্থ ও প্রতিপত্তিশালী। তারা তাদের দাপট টিঁকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। বাঁটুল যে একটি সময়ের ঐতিহাসিক সত্য এবং এরও যে মূল নিহিত পুঁজি-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থায় তা’ও যে স্পষ্টই ছিল শরদিন্দুর মর্মে, তা বলা যায় নিশ্চয় করে। এস্থানে শরদিন্দুর দিনলিপিতে যদি আবার উঁকি দিই,তাহলে দেখিঃ

                                   পুঁজিবাদ এবং সমাজবাদ দু’টি ধারনাকেই, তাদের অন্তর্গত উৎপাদন-বন্টন আর রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখলে, স্পষ্ট করে অনুধাবন করা যায়না। মিলিয়ে দেখেননি শরদিন্দুও। তবে, দু’টি ধারণার সাদা কথা, মোটা কথা – পুঁজিবাদ মানবের বিকাশের শত্রু আর সমাজবাদ মানব ও মানবিক গুনাবলীর সৃজনশীল বিকাশের পথ, এটি টের পেয়েছিলেন – তা বোঝা যায় এই দিনিলিপি-টুকরো গুলি থেকে।  শরদিন্দুর অবস্থান পুঁজিবাদের বিপক্ষেই। তথাপি, একটি প্রশ্ন থেকে যায়, পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ বিষয়ে, যেটুকু তাঁর দিনিলিপিতে, তারই ভিত্তিতেও কি এই কথা অনুধাবন অসম্ভব ছিল, যে, দেশ নামক, রাষ্ট্র নামক সংজ্ঞা গুলিও পুঁজিবাদের আর এই দেশভাগ, বিশ্বযুদ্ধ ও তা’ই। এই সুযোগে জিন্না-নেহেরু নিজ নিজ আখের গুছিয়ে নিয়েছেন শুধু? — ফিরে আসবো এই প্রশ্নে। আবার ফিরি “আদিম রিপু” উপন্যাসে।

                             সম্ভাব্য যে দুই দল এই সকল বাঁটুলদের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার কথা আগে বলেছি, “আদিম রিপু” র অনাদিবাবু তার দ্বিতীয় দলের ।  টাকা করে নিয়েছে  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজারে এবং টাকার জোরে, ক্রমে, এক রকমের সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।  এইবার দ্বিতীয় যুদ্ধের বাজারে চায় যথাসম্ভব আত্মসাৎ করে নিতে। বিশেষত  “উদ্বাস্তু” নামক “নতুন দেশের নতুন জিনিস” তাদের পক্ষে অতি সহজ ও সুখাদ্য। কাহিনীতে যুবতী শিউলী মজুমদার উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়ে। এখানে এ’ও লক্ষ্যনীয় যে, অতি সূক্ষ ভাবে “ডাবল” এর ধারনাকে এখানে ব্যবহার করেছেন শরদিন্দু। কেষ্টবাবু আদতে অনাদিবাবুরই আরেক সত্তা – যার হাতে কড়ি নেই। কিন্তু উভয়ে, একদা, একত্রেই করেছে সমস্ত কুকাজ। কাহিনীর কেন্দ্রে থাকা অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার হেতু’ও এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সামগ্রিক অসময় কেননা শিউলী বা তার পরিবার দরিদ্র উদ্বাস্তু না হলে, শিউলীর বাবা হয়তো অন্য রকম আচরণ করতো। “আদিম রিপু” র আরেকটি গহনতর ইঙ্গিত কাহিনী-নামে। আদিম রিপু। পাঠিকা-পাঠকদিগের মধ্যে যাঁদের দস্তয়ভিস্কির “বাদার্স কার্মাজভ” পড়া আছে, তাঁরা নিশ্চিত টের পাবেন, অন্তত সূত্রটুকু দেওয়ার পর, ঠিক কোনখানে “আদিম রিপু” উপন্যাস মনে আনে “ব্রাদার্স কার্মাজভ”। অন্যদের জন্য আরেকটু বিস্তারে বললে বলতে হয়, ব্রাদার্স কার্মাজভ’এ পিতাটির তিনটি পুত্র বৈধ, একটি অবৈধ। পিতাটি অনাদি হালদার-হেন খুনী বা ডাকাত না হলেও তারও অর্থাগম অন্ধকার পথেই  পিতার সঙ্গে জ্যেষ্ঠপুত্রের সংঘাত চূড়ান্তে যাওয়ার কেন্দ্রে রয়েছে একজন নারী। “আদিম রিপু”তে অনাদির দুই ভ্রাতুষ্পুত্র আর প্রভাত। ইভান কার্মাজভের মতোই কেষ্টবাবু টের পায় কে হত্যাকারী। আর প্রভাত, এই উপন্যাসে পার্শ্বত দিমিত্রি কার্মাজভ আর পার্শ্বত এলয়েশা। কাহিনীর অন্তিমে “এর চেয়ে আমাকেও ফাঁসি দিলেন না কেন ব্যোমকেশবাবু” তে তার উত্তরন দিমিত্রি থেকে এলয়েশায়। 

                                            কার্মাজভ ভ্রাতাদের যে জন অবৈধ, সেই স্মেরদিয়াকভকে পাওয়া যায় “অর্থম্‌ অনর্থম” এ। সে ফনী।  স্মেরদিয়াকভের মতনই সে’ও ছিল তুখোড় বুদ্ধির অধিকারী। অধিকারী ছিল বিদ্যারও। এবং অবশ্যই বিবেকেরও। ঠিক যে বিবেকের বশে স্মেরদিয়াকভের স্বীকারোক্তি-পত্র দেওয়া এবং আত্মহত্যা করা, ঠিক তেমনি ফনীও অন্তিমে, পরাজিত নিজ বিবেকের কাছে। এই একটি মাত্রা আর আরেকটি মাত্রা অনাথা ভগিনীর ভালবাসা তার অনাথ ভাইএর প্রতি। সত্যবতী চরিত্র এই কাহিনীতে আর সকল সত্যবতীর চেয়ে স্বতন্ত্র। এতোটাই স্বতন্ত্র, যে, পরবর্তী কাহন-গুলির ন্যাকা সত্যবতীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে আমাকে ধরে নিতে হয়েছে, যে, যে সত্যবতো ব্যোমকেশের পত্নী, তার জীবনে “অর্থম অনর্থম” হেন ঘটনায় ওই দুর্দান্ত মাতৃভূমিকা পালন করা অসম্ভব। “অর্থম অনর্থম” এর সত্যবতী যেন সেই রাত্রির কুন্তী, যখন পুত্রদের প্রাণ রক্ষার্থে, কুন্তী নিজেই, পরিকল্পিত ভাবে  হত্যা করে আর একজন মা’কে তার পঞ্চপুত্র-সহ। “অর্থম অনর্থম” এ সত্যবতী হত্যা করেনি, ঠিক। কিন্তু হত্যা, দেখেছে, শনাক্ত করেছে হত্যাকারীকে। সঙ্গে এ’ও টের পেয়েছে, যে, হত্যাকারী কোনো প্রমাণ রেখে যায়নি। বরং প্রমাণ একত্র করলে তার নিজ ভ্রাতা সুকুমারকেই মনে হবে হত্যাকারী। তৎক্ষণাৎ সে হয়ে ওঠে মা। সন্তানকে আগলে রাখবার স্বাভাবিক ইচ্ছা তাকে দান করে দুঃসাহস, যে দুঃসাহস এক রকমের trauma ও বটে। ফনী আর সত্যবতী এই কাহিনীতে হয়েওঠে মানব-সত্যের দুটি মেরু। এখানে এসেই “অর্থম অনর্থম” এর উত্তরণ বুদ্ধিদীপ্ত-গোয়েন্দা গল্প থেকে আবহমান মানবের কাহনে। 

                                     “চোরাবালি”, “চিত্রচোর”,”চিড়িয়াখানা” কাহিনীগুলিতে আমি লক্ষ্য করি সেই চেষ্টা যেখানে, পূর্বোল্লিখিত বাখতিন-উক্তির এই অংশ ““the criminal material itself is not essential”  , এই সকল কাহিনীতে যেন অপরাধ-ঘটনার ঘনঘটার মোড়কে মূলত মানব-মানবীর প্রেম সম্পর্কের অন্তর্গত যৌন,না-যৌন, অহং, পরিতাপ, মমতা – ইত্যাকার অনুভুতির রসায়ন-রহস্য নির্মাণ অথবা ভেদ করবারই চেষ্টা করেছেন শরদিন্দু। এই সকল কাহনে “ক্রিমিন্যাম মেটিরিয়েল” কে যথাসম্ভব আবহ হিসাবেই রাখতে চেয়েছেন লেখক। এই চেষ্টার অথবা সাধনার পূর্ণ ফসল “কহেন কবি কালিদাস” আর “বেনী সংহার”। দুটি রচনাতেই “রোমান্টিক” প্রেমের চলতি ধারনাকে ভেঙ্গে আবার গড়েছেন লেখক, রক্তে-মাংসে। মানব-মানবীর প্রেম সম্পর্কে কাম থাকে। থাকবেই। আবার কামজ আকর্ষন থেকেও জন্মাতে পারে প্রেম। কিন্তু কামই যখন সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে, তখনই ঘটে “বেণী সংহার”। তাহলে কি কামই আদি? কামই অন্ত? না। অন্তত অন্ত-কৈশোরের প্রেমানুভুতি কাম-সর্বস্ব নয়। তারই প্রমাণ “বেণী সংহার” উপন্যাসেরই ঝিল্লী-নিখিল অনুরাগ। “কহেন কবি কালিদাস” এ প্রেম, প্রেমে-কামে মাখামাখি। যাপন-পীড়িত মানুষের যেমন। তৎসঙ্গে যদি তারা হয় সেই শ্রেণীর প্রতিনিধি, শরদিন্দুর ভাষায় “যারা মেয়ে-মরদে গতর খাটিয়ে জীবিকা অর্জন করে”। আন্তোনিও গ্রামসী কি এদেরই বলেন নি “সাব-অল্টার্ন”? মোহিনী-ভুবন সেই শ্রেণীর মানুষ। তাদের অভাব, তাদের জিজীবিষা’র সুযোগ নিলো প্রাণহরি। প্রাণহরি সেই শ্রেণীর মানুষ, যাদের, আমরা দেখেছি, দিনলিপিতে শরদিন্দু সংজ্ঞা দিয়েছেন “দালাল” বলে। প্রকৃত প্রস্তাবে এই “দালাল” রা  পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীরই প্রতিনিধি। মোহিনী-ভুবনের দেহ-মন এক-করা, একাকার করা প্রেমের উপরে যখন নারী মাংসলোভীদের নজর টেনে আনলো প্রাণহরি, তখনই বাধলো সংঘাত আর এই সংঘাত-জনিত অপরাধ, রহস্যভেদ – যা’ই ঘটলো, সে সকলি, বাস্তবে, আবহমাত্র। আমরা দেখলাম দুটি আদিম-সুলভ মানব-মানবীর রক্তিম ভালবাসার চিরন্তন গাথার অভিনয়, সমসাময়িকের মঞ্চে, ভাষরেও। কিন্তু অপরাধ বা গোয়েন্দা কাহনের কে যে সংজ্ঞা আমরা দেখেছি সুকুমার সেনের কলমে, সেই সংজ্ঞা, সচেতন বা অবচেতনে নিয়ে কাহিনীগুলি পাঠ করলে, পাঠিকা-পাঠকের পক্ষে, আবহকেই কাহিনী বলে ভুল করবার পূর্ন যে সম্ভাবনা, তা’ই সম্পূর্ণ হয়েছে শরদিন্দুর মুগ্ধ-পাঠিকা-পাঠকের ক্ষেত্রেও। 

ব্যোমকেশ-মানচিত্রে আর বেশী সময় থাকবোনা। শুধু আরো কয়েকটি সূত্র, যে গুলির দ্বারা কাহিনীগুলি স্রেফ অপরাধ বা গোয়েন্দাগিরি কাহনের চেয়ে কিছু বেশী, ধরিয়ে দিয়ে চলে যাব ছোটোগল্পের শরদিন্দুতে। যেমন “মণিমন্ডন” গল্পটি, আমার কাছে, বলে চেস্টারটনের “ইনভিসিবল ম্যান” এর কথা’ই। এই সমাজ, এই ব্যবস্থা তার নিজের দরকারে একটি শ্রেণীকে করে রাখে, রেখেছে, অদৃশ্য। না’ত তারা এদের দেখতে চায় না’ত চায় আর কেউ দেখুক। অথচ এই সকল কুলি-মজুর-পিওন-মুদ্দফরাস ভিন্ন, হায়, বাবু-জীবন অচল। “অচিন পাখি” গল্পে অপত্য স্নেহের হেউঢেউ, গো পাঠিকা, হে পাঠক, টের পেতে হবে নতুনা একেও মনে হবে “জাস্ট এনাদার থ্রিলার”।

                              যে ব্যোমকেশ-কাহিনীটি আমাকে সবচেয়ে বেশী টানে, যেটা সর্বাধিক বার পড়েছি, তা “বিশুপাল বধ”। যা অসমাপ্ত তার প্রতি একটা ভিন্ন টান থাকে। থাকেই। উল্লেখ করতে  হয় “পথের কাঁটা”রও শুধুমাত্র ত্রাসের আবহটি নির্মাণে লেখকের কুশলতার নিমিত্ত নিজেই একটি ফর্ম। ত্রাসের এমন আবহ এলেন পো’র “ফল্‌ অফ দ্য হাউস অফ উষার” বা চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন কাহিনীগুলির আবহ কে মনে এনে দেয়। আর একটি মাত্র ব্যোমকেশ কাহিনীর কথা, অতি সংক্ষেপে, বলে নিয়ে  শেষ করবো ব্যোমকেশ-পর্ব।  কাহিনীর নাম “রক্তের দাগ”।  “রক্তের দাগ” কাহিনীর সত্যকাম-হেন চরিত্র বাংলা সাহিত্যে আর নেই। এই চরিত্রটি তার ঔজ্জ্বল্ল্যে, শয়তানিতে, আত্ম-বিশ্লেষণে, নাস্তির প্রাবল্যে আমার মনে এনে দেয় দস্তয়ভস্কির “ডেভিলস” বা “ডেমনস্‌” বা “পসেসডস”  উপন্যাসের এনার্কিস্ট চরিত্র Pyotr Stepanovich Verkhovensky কে। Pyotr  অন্ধ তার নিজস্ব এনার্কিস্ট তত্ত্ব তথা তার ব্যক্তিগত হিংস্রতার কুয়াশায় আর “রক্তের দাগ” এ সত্যকাম অন্ধ, কামে। উভয়েও এ’ও জানে, যে, তাদের নিজ নিজ হিংস্র-অন্ধকার, যাদের তারা মদত দিয়েই চলেছে, সজ্ঞানে, তা’ই একদিন তাদের মৃত্যু, আদতে অপমৃত্যু, ডেকে আনবে। তথাপি, সেই টানেই তাদের গতি – আত্মঘাতী গতি।  উভয়েই ইতিহাসের বিশেষ বাঁকের সন্ততি। Pyotr এর সময়ে রাশিয়ার সমাজ জারতন্ত্র বিক্ষত আবার প্রতিরোধ, যা উঠেছিল গড়ে, তা’ও জারের দ্বারা নিশ্চিহ্ন। পরিবর্তে একমাত্র খুনী বিদ্বেষ কে সম্বল করে একদল ছেলেমেয়ে নিজেদের ঘোষনা করে বসে এনার্কিস্ট। তুখোড় Pyotr  স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধে দেখতে পায় নিজেকেও এবং ক্রমে তাদের নেতা হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে ভারতবর্ষ তার তথাকথিত স্বাধীনতার টিকিট পাওয়ার পরে, যুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গা, বেকারত্ব, কালোবাজারী, ক্ষমতার খেয়োখেয়ি’র কালে, এই সত্যকাম পঁচিশ বছরের এক যুবক, যে জানে যে সে বেজন্মা, সে জানে যে এই বেজন্মা-সত্য বিষয়ে তার মাতামহ, মাতা এবং নিয়ম-মাফিক পিতাটিও অবগত। কিন্তু মাতাহমের অগাধ সম্পত্তির লোভ এবং বাইরে কোঁচার পত্তন অক্ষুণ্ণ রাখতে সকলেই পালন করে চলেছে যে যার ভূমিকা। – এই সকল ‘জানা’ একটি ধীমান, অনুভুতিবান ছেলের কাছে জীবন ও জগৎ কে নিতান্ত এক কুৎসিত ইয়ার্কি ভেবে নেওয়া এবং নিজের আচার আচরনে, প্রতি মুহুর্তে, সমাজ, প্রতিষ্ঠা, সম্মান – ইত্যাদির চরম বিপক্ষে গিয়ে, অনাচার-দ্বারা নিজের প্রতিবাদ প্রকাশ স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক। এই অর্থে সে’ও এনার্কিস্ট। তবে এখানে বলে রাখা উচিত, যে, দস্তয়ভিস্কির “পসেসডস” বা “ডেভিলস”, আমার অতি প্রিয় উপন্যাস হওয়া সত্ব্বেও, এখানে দস্তয়ভস্কি এনার্কিস্টদের যে চিত্র এঁকেছেন তার অনেকটাই ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত নয়। দস্তয়ভস্কির একদা বন্ধু আলেকজেন্দার হেজার্ন, প্রথম যুগের এনার্কিস্ট। তাঁর বিষয়ে এবং তাঁর সঙ্গে দস্তয়ভস্কির স্মপর্কের অবনতি ও মতান্তর বিষয়ে সামান্য অবগত হলেই “ডেভিলস/পসেসডস” এ বর্ণিত ‘এনার্কিস্ট’ ধারনার ফাঁকটুকু ধরা যায়। 

                              ফিরে আসি সত্যকামে। যাই তার বেজন্মাত্ব’র ইতিহাসে। কি দেখা যায় সেখানে? দেখাযায় জমিদারী-উদ্‌বৃত্ত বা জমিদারের সাগরেদি, মহুরীগিরি – ইত্যাদি দ্বারা কামানো বিত্তকে পুঁজি করে একদল, ১৯০০ র প্রথমে বা ১৮০০’র শেষে, ক্রমে নামছে ব্যবসায়। কল কারখানা’র দিকে যাচ্ছেনা তারা। উপনিবেশে সেই পথ, দেশীদের জন্য সহজ ছিলনা। তারা টাকা ঢালছে ব্যবসায়, ট্রেড-এ। অর্থাৎ শরদিন্দু’র ভাষায় যারা দালাল, তেমনি এক দালাল এই সত্যকামের মাতামহ। এই আঙুল ফুলে কলাগাছ শ্রেণী তাদের সাবেক আদর্শ, অভ্যাস কে পার হয়ে এসে নাগরিক হচ্ছে অথচ নাগরিকতার সঙ্গে মানাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ-সূত্রে নানা দেশের সামরিক লোকজন, নানা পদের, আনাগোনার আরম্ভ, সাহেবী ক্লাব ইত্যাদিতে এদের এবং নেটিভ এই সকল দালাল শ্রেণীর নিমিত্ত দরজা সদ্য খুলেছে। এই হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে ওই দালাল শ্রেণীটির সন্ততি-প্রজন্ম। তারই প্রনিধি, সুচিত্রা। হয়ে পড়লো গর্ভবতী। যদিও সাহেবী বা নাগরিকতার আলিখাল্লা চাপিয়েছে সকলেই, উপরে, অন্দরের নির্বাহ, যথারীতি রক্ষণশীল। “সিঙল মম” – এই সকল নব্য টাকাওলাদের দুরূহতম দুঃস্বপ্নেরও বাইরে। ফলে সুচিত্রার পিতা, ব্যবসায়ী রমাকান্ত চৌধুরী, তার কর্মচারী, দরিদ্র ঊষাপতি কে কিনে নিলেন সুচিত্রার পতি এবং তার গর্ভ-গত সন্ততির পিতা হিসাবে। – এ’ও সময়ের খ্যামটা নাচেরই একটি স্তর, একটি ছবি। – এই দু’টি বিন্দুতেই ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাহিনী – এই পুঁজি ব্যবস্থা কিভাবে, জীবনের, যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে স্থাপনের মূল্যে বিকৃত, বিনষ্ট করে দেয় মানবিক সম্পর্ক – এর প্রথম নিদর্শন সুচিত্রা-উষাপতি দাম্পত্য ও তার অন্তর্গত অসুস্থতা। এই অসুস্থ সম্পর্ককে “বিষবৃক্ষ” ধরে নিলে, সত্যকাম তারই বিষফল। – এ’ই কাহিনী। বাকীটুকু, খুন, খুনীর ধরা পড়া না-পড়া, ব্যোমকেশের “অবজার্ভেশন” – ইত্যাদি ইত্যাদি, আবহ, ওই বিষফল ও বিষবৃক্ষটির বিভীষিকাকে বর্নণা করতে। চরিত্রটির মতনই তার প্রবেশও, কাহিনীতে, শরদিন্দুর অন্যান্য কাহিনীই শুধু নয়, অদ্যাপি দুনিয়া-সাহিত্যেরও একটি বিস্ময়কর দৃশ্য। গো পাঠিকা, হে পাঠক, অনুরোধ করবো আরেকবার অংশটি পড়ে দেখতে যেখানে “ যে লোকটি দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে‌, তাহাকে দেখিয়া সহসা কিশোরবয়স্ক মনে হয়। বেশি লম্বা নয়‌, ছিপছিপে পাতলা গড়ন‌, গৌরবর্ণ সুশ্ৰী মুখে অল্প গোঁফের রেখা। বেশবাস পরিপাটি‌, পায়ে হরিণের চামড়ার জুতা হইতে গায়ে স্বচ্ছ মলমলের পাঞ্জাবি সমস্তাই অনবদ্য।”

এই প্রতিটি কাহিনী-শেষেই পাঠিকা-পাঠক মর্মে করুণাধারার হেউঢেউ নেমে আসে, তথাকথিত অর্থে যে অপরাধী, তাকে ঘিরেই। তাকে ঘিরেই লেখকের সমবেদনাও টের পাওয়া যায়। “আদিম রিপু” র প্রভাত, “কহেন কবি কালিদাস” এ ভুবন, “রক্তের দাগ” এ ঊষাপতি [ এবং অবশ্যই খুন হওয়া সত্যকাম] —- এদের হত্যাকারী-মুখের আবডাল থেকে আর্ত, বেদনাপীড়িত মুখগুলির আবিষ্কারই কাহিনীগুলির অন্তর্গত সফলতা। ব্যোমকেশ-চর্চা এখানেই শেষ করে এইবার যাত্রা শরদিন্দুর তথাকথিত “ঐতিহাসিক” পর্বের দিকে যেতে যেতে একটি কথা’ই বলে রাখি৷ যে, আমার মতে, শরদিন্দু-প্রতিভার অংশ-মাত্র উদ্ঘাটিত তাঁর ব্যোমকেশ’এ, কেননা অতি অল্পসংখ্যক ব্যোমকেশ-গল্পই সক্ষম হয়েছে, মনোরঞ্জন-গন্ডি পার হয়ে “আদিম রিপু” বা “কহেন কবি কালিদাস” হেন মানবের অন্তর্গত মহানীলাকাশ উদঘাটনে। 


৩। “বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে”

ইতিহাসের সতীত্ব রক্ষার দায়,ইতিহাস-ভিত্তিক গল্প-বলিয়ের নেই। তবে ঐতিহাসিক সংগতি টুকু রক্ষা করবার প্রয়োজন রয়ে গিয়েছে। একই কথা খাটে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প-কথকদের ক্ষেত্রেও। রচনা-বিশ্বে, বিদেশে, “যুদ্ধ ও শান্তি”, “টেল্‌ অফ টু সিটিজ”, “কুয়ো ভা দিস” অথবা কিছুটা ভিন্ন স্বাদের “গন্‌ উইথ দ্য উইন্ড” বা “লাস্ট ফর লাইফ” বা পরবর্তী সময়ে “নেম অফ দ্য রোজ” অথবা ইতিহাসের মোড় ঘুরে যাওয়াকে আবহে রেখে “লে মিসারেবল” এবং এই দেশে, ভাষায় “দুর্গেশনন্দিনী”, “ রাজসিংহ” —- ইত্যাদিতে ঐতিহাসিক উপাদানের সঙ্গে লেখক-কল্পনার মিশ্রণ কে আদর্শ [ বিজ্ঞান-ভিত্তিক রচনাতে যেমন রে ব্র‍্যাডবেরী, আইজাক আসিমোভ, ফিলিপ কে ডিক —- প্রমুখ। ] মেনে নিলে, শরদিন্দুর ইতিহাস-ভিত্তিক রচনাগুলি যে ঐতিহাসিক সংহতি রক্ষা করেছে, তা বলা যায় নির্ভয়ে। তবে ইতিহাসের পটভূমি বেছে নেওয়ার আবডালে কিছু প্রশ্ন থেকে যায় যার আলোচনা, করেছি, রচনার অন্তম পর্বে।

                            সমগ্র “যুদ্ধ ও শান্তি”, তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গের সফলতা ও সৌন্দর্যের সাপেক্ষে, প্রকৃত পাঠিকা-পাঠক মানসে, খোদিত করতে চায়, না নেপোলিয়নের জীবন, না'ত ঘটনার ঘনঘটা। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই সমস্তের মূল্যে টলস্টয় প্রতিষ্ঠা করতে চান এক মহানীলাকাশ, যা নেপোলিয়ন,  আলেকজান্ডার ইত্যাদির চেয়ে অনেক অনেক অনেক উঁচু। ডক্টর জিভাগো, ম্যানশেভিক-বলশেভিক রাজনীতি তে উপলক্ষ্য করে জানাতে চান মানবিক মমত্বের সেই প্রদীপটির কথা, যা অন্তরে জ্বলে না উঠলে, মানবের সমস্ত সদিচ্ছাই অন্তিমে, রক্তাক্ত রণ-ময়দান, হিংস্র গৃহযুদ্ধ। যেমন ইতিহাসকে পটভূমি করে মানবের অন্তর্গত রূপলিপ্সা ও তজ্জনিত সংকট বংকিমের উপজীব্য, প্রায় সর্বত্র। – যদিও ভাষা অতি মনোরম, সাবলীল- ছবিল, তথাপি শরদিন্দুর মার্কামারা “ঐতিহাসিক” উপন্যাস, “কালের মন্দিরা” থেকে “গৌড় মল্লার” হয়ে “তুঙ্গভদ্রার তীরে” – অতি মুন্সিয়ানায়, যা বলে, তা নিতান্ত গল্প, ক্ষুদ্র অর্থে “রোমান্স”। গ্রন্থগুলি বারবার পড়তে ভালো লাগে কিন্তু কোনো-পাঠেই উঠে আসেনা তেমন কোনো ছবি কিংবা বার্তা, যা, স্থান-কালের গন্ডি ধরে যেতে যেতে সহসা মানবের অন্তর্গত মহানীলাকাশে উড্ডীন। অথচ এই গুলিই শরদিন্দু-সাহিত্য বিচারের আরেক বাজার চলতি নিক্তি।

যে একটি রচনায় শরদিন্দু ইতিহাসের চালচিত্র ব্যবহার করেও অন্যত্র উড্ডীন তা  “মরু ও সঙ্ঘ”। প্রথমেই উল্লেখ করছি শরদিন্দুকে লিখিত মোহিতলাল মজুমদারের একটি পত্রের অংশঃ


 স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, যে, মোহিতলাল – রোমান্স, ডিটেকটিভ গল্প – সমস্ত মিলিয়ে, গুলিয়ে ফেলেছেন। গুলিয়ে ফেলেছেন, কেননা তিনি এই সমস্ত কিছুকেই দেখছেন নেহাৎ  “recreation” , যেন বা টেনিস-পিংপং-গলফ – হিসাবে। তবে নিতান্ত  “recreation” রচনা, সে যতোই উত্তম হোক, তা যে দ্বিতীয়বার পাঠের দাবী আনেনা – এ কথাটি সত্য। আবার তুলেছেন “potboiler” রচনার প্রসঙ্গ। – অর্থাৎ কিছুরই গহনে যাননি পত্রলেখক। ফলে “মরু ও সঙ্ঘ” র যা নগণ্য কথা তা’ই তাঁর চোখে পড়েছে ঠিক যেমন কাহিনীটিকে ভর করে নানা রকমের যৌন আবেদন-দৃশ্যের সুযোগটিই দেখেছেন চিত্র পরিচালক নবেন্দু ঘোষ, ১৯৮৮ সালে, এই কাহিনীটিকে বিকৃত করে “তৃষাগ্নি” চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময়। কিন্তু এই কাহিনী আমার মনে এনে দেয় আনাতোলে ফ্রাঁসের উপন্যাস “থেঈ” [Thaïs ], বিভূতিভূষণের “মেঘমল্লার”, কমলকুমারের “মতিলাল পাদরী”। 

 “মরু ও সঙ্ঘ” তে সঙ্ঘারাম, বৌদ্ধ ধর্ম – সকলই নেহাত আবহ। আদত সংঘাত জড়ত্বের সঙ্গে জীবত্বের। আবার জীবত্ব’র, জীবন-শক্তির অন্দরেও দ্বন্দ্ব তার নিজ স্বাভাবিকতাকে নিয়ে। মতিলাল পাদরীকে গ্রাম্য মেয়েমানুষ ফুলল বলেছিল “পাদরী মানুষ বৈ ত অন্য লও”। আমি বলি মানুষ বৈ ত অন্য নও। শুনি গল্পের অন্তে মতিলাল পাদলী বলছে “আমি সত্যই ক্রিশ্চান নাই গো বাপ্‌”। আর এখানেই মতিলাল পাদরী “ভক্তি ছিল না, ছিল ভীরুতা”র সত্যে দাঁড় হয়ে, পাদরী থেকে, মূর্তি থেকে হয়েওঠে মানুষ। পক্ষান্তরে না-মানুষ থেকে যাওয়ার সাধনাই “মরু ও সঙ্ঘ” তে উচন্ডের। তথাপি অন্দরে তার জৈবিক কলকব্জা চায় ভিন্ন কিছু। সচেতন ভাবে সেই সকল অবচেতন চাওয়া কে দমিয়ে রাখতে গিয়ে সে হয়েওঠে হিংস্র। তাই  “প্রথম দিন হইতেই ক্ষুদ্র মানবিক ইতির প্রতি ভিক্ষু উচণ্ডের মনে একটা বিমুখতা জন্মিয়াছিল। ভিক্ষুর মনে ভেদজ্ঞান থাকিতে নাই; কিন্তু ভিক্ষু উচণ্ড নির্বাণকে কাছে টানিয়া লইলেন, ইতিকে দূরে দূরে রাখিলেন। নির্বাণ ধর্ম-বিষয়ে শিক্ষা পাইতে লাগিল, ইতি মরুবিহারিণী প্রকৃতিকন্যা হইয়া রহিল। ইতির দেহে যখন প্রথম যৌবন-লক্ষণ প্রকাশ পাইল, সবাগ্রে উচণ্ডই তাহা লক্ষ্য করিলেন। তাঁহার বিমুখতা গভীর আক্রোশে পরিণত হইল; ভিক্ষুর নিপীড়িত ব্যর্থ যৌবন যেন ইতির মূর্তি ধরিয়া নিরন্তর তাঁহাকে কশাঘাত করিতে লাগিল। জর্জরিত উচণ্ডের মস্তিষ্কে সঙ্গীতের ধ্রুবপদের ন্যায় কেবল ধ্বনিত হইতে লাগিল— মার প্রবেশ করিয়াছে! মার প্রবেশ করিয়াছে!” – কিন্তু এ যে ‘মার’ নয়, এ যে মতিলাল পাদরীর গেঁয়ো গীর্জায় এসে আশ্রয় নেওয়া যুবতী ভামরের কামনার মতোই সত্য। বরং “মার্‌” কে আমরা দেখি বিভূতিভূষণের “মেঘমল্লার” এ।  সাধু-রূপ “সুরদাস” উরফ্‌ “গুণাঢ্য” যে দেবী সরস্বতীকে মানবী দেহে বন্দী করে, চায় আপন রক্ষিতা রূপে ধরে রাখতে, তা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। তাই “মার্‌”। কিন্তু ইতি আর নির্বানের টান, পরস্পরের প্রতি, “মার্‌” নয়। নয় নেহাৎ যৌন আকর্ষণও। তাই “ নির্বাণ (কেন্দ্র চরিত্র)  যতই কঠোরভাবে নিজেকে নিগৃহীত করিয়া সঙ্ঘ-ধর্মে আত্মনিয়োগ করিতেছে, তাঁহার (ভিক্ষু উচণ্ডের) অন্তরে সংশয় ও দ্বন্দ্ব ততই মাথা তুলিতেছে।”  কিন্তু মানুষ বৈ ত অন্য নও, এই সত্য থেকে পলাতক-জনের অনুভুতি ভিন্ন। “নির্বাণকে সঙ্ঘের শাসনে আবদ্ধ করিয়াও তাঁহার অভীষ্ট সিদ্ধ হইল না— ইতি ও নির্বাণের মধ্যস্থিত আকর্ষণ-রজ্জু দূরত্বের ফলে দৃঢ়তর হইল মাত্র। কুশাগ্রবৎ সূক্ষ্ম ঈর্ষা ক্রমশ কণ্টক হইয়া উচণ্ডকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া তুলিল। আপন অজ্ঞাতে নির্বাণকে তিনি নিবিড়ভাবে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিলেন।”  এই ঘৃণার মধ্যে সত্য কতোটুকু আর নিজ কাম বাসনাকে নিজের কাছেই ঢেকে রাখবার প্রয়াস কতটুকু? এই ঘৃণা মনে আনে Esmeralda র প্রতি সে সকল মহাজনদিগের ঘৃণা যারা এই রূপসীর দেহ ভোগ করতে হয়েছিল ব্যর্থ। এই যৌন ঈর্ষাই ঘৃণা থেকে ক্রোধ হয়ে, অবশেষে “ The Hunchback of Notre-Dame”, এ, ডেকে আনে Esmeralda’র মৃত্যু। পক্ষান্তরে Quasimodo’র প্রেম সজল করে পাঠিকা-পাঠক কে। “মরু ও সঙ্ঘ” তেও দেখি, সমস্ত ঘৃণা,ক্রোধ, বাধার পরপারেঃ “ তির্যক কাক-জ্যোৎস্না কক্ষের মসৃণ ভূমির উপর প্রতিফলিত হইতেছে। সেই অস্পষ্ট আলোকে … ইতি একটি উচ্চ পীঠিকার উপর বসিয়া আছে; আর, বেদীমূলে প্রণতি-রত উপাসকের ন্যায় নির্বাণ নতদেহে তাহার জানুর উপর মস্তক রাখিয়া স্থির হইয়া আছে। ইতির কটি হইতে ঊর্ধ্বাঙ্গ কেবল বিস্রস্ত কেশজাল দিয়া আবৃত; শুভ্র মর্মরে রচিত মূর্তির ন্যায় তাহার যৌবন-কঠিন দেহ সগর্বে উন্নত হইয়া আছে; আর দুই চক্ষু হইতে বিজয়িনীর নির্বোধ উল্লাস ও অশ্রু একসঙ্গে ক্ষরিত হইয়া পড়িতেছে।”  সঙ্ঘ থেকে বিতাড়িত হওয়ার মূল্যে অর্জিত হল নির্বান-ইতি’র মানবত্ব। যেন স্বর্গের উদ্যান থেকে সত্যের উদ্যানে এলো ঈভ-আদম। বলা চলে “মৃৎপ্রদীপ” গল্পের কথাও যেখানে  লিচ্ছবি, সোমদত্তা, প্রেম, যুদ্ধ – ইত্যাদিতে নয়, কাহিনীর সাফল্য-চাবিটি এক সামান্য মাটির প্রদীপ কে কল্পনাপ্রতিভায় অমরত্ব দান। শিল্পের আধুনিকতা, আমার বিচারে, এখানেই। এখানে এসে মনে আসে এলিয়টঃ “I have borrowed lines from him, in the attempt to reproduce, or rather to arouse in the reader’s mind the memory, of some Dantesque scene, and thus establish a relationship between the medieval inferno and modern life.” – ওই the medieval তার বিস্তার, তার অন্ধকার নিয়ে পুঁজি-সভ্যতার সন্ততি এই “আধুনিক” যাপনে অনুপস্থিত। তাকেই modern life এর সঙ্গে জুড়ে দিয়ে, আমাদের ধূসর, দিনগত যাপনকে বিস্তারিত করে দেওয়া – তাই আধুনিকতা। তা’ই করেছেন জেমস্‌ জয়েস, মার্সেল প্রুস্ত। সংখ্যায় অতি অল্প হলেও শরদিন্দুতে এই প্রয়াস ও সাফল্য রয়েছে। কিন্তু কোনোভাবে ওই সকল মৃৎপ্রদীপ-হেন সূত্র গুলি এড়িয়ে গেছে পাঠিকা-পাঠক চোখ।

                      “চুয়াচন্দন” গল্পটিও আমাকে মুগ্ধ করে, মূলত, নবদ্বীপের নিমাই’ও যে একজন মানুষই,  শ্রীচৈতন্য হওয়ার পূর্বে বা পরেও, তার প্রতিষ্ঠা-হেতু। মানব কে মহামানব বানানো সততই সহজ। কিন্তু মহামানব ও যে মানবই, তা তর্ক-যুক্তি’তে না গিয়ে, “কৃষ্ণচরিত্র” হেন কচকচানি ছাড়াই, প্রকাশ করা কঠিন এবং এর অবস্থান, পুরাণের বিপরীত মুখে, আধুনিক। 

৪। “নৃমুন্ডের হেঁয়ালি”

The mountain কবিতায় Robert Frost লিখলেনঃ

“‘I don’t suppose the water’s changed at all. You and I know enough to know it’s warm Compared with cold, and cold compared with warm

But all the fun’s in how you say a thing.’”

আর, এইসঙ্গে লেখা হয়ে গেল আধুনিকতার আরেকটা সংজ্ঞাঃ “all the fun’s in how you say a thing.” —- কি বলা হলো —- তা জরুরি, তার চেয়েও জরুরি বলা হলো কিভাবে। বলার কথাটি, কাহিনীটি, হতেই পারে চসার কিংবা চন্ডীদাসের। কিন্তু বলার রকমটি যদি, অদ্যাপি হয় চসার কিংবা চন্ডীদাস, তাহলে, বিষয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থাকা রোবো-গণিকা হলেও, তা অচল। ভাষাকে উদাহরণ হিসাবে নিলে, বিষয়ের, বিষয়কে প্রকাশের প্রয়োজনে, অদ্যাপি তথাকথিত সাধু বাংলা যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা পাঠিকা-পাঠকের সঙ্গে সেতু নির্মাণে সফল, সামান্য লক্ষ্য করলেই টের পাওয়া যাবে, যে, তাঁদের ভঙ্গি—- না বংকিম, না'ত বিদ্যাসাগর। যথা শরদিন্দু নিজে, যথা নীরদ চন্দ্র চৌধুরী। বিষয়বস্তু নিরিখে, অপ্রাকৃত কাহিনীকে উদাহরণ ধরলে,  Le Fanu আর Henry James উভয়েই লিখেছেন অতিপ্রাকৃত কাহিনি, কিন্তু সামান্য সচেতন পাঠিকা-পাঠকের দৃষ্টিতে ফারাক ধরা পড়ে সহজেই। ওই ফারাক কাল আর স্থান জনিত। 

অতিপ্রাকৃত কাহিনি বিস্তর লিখেছেন শরদিন্দুও আর প্রায় প্রতিটি রচনাই, তাদের ভাষায়, কথনভঙ্গিতে, যেহেতু অদ্যাপি মনোহর, সুতরাং কালোত্তীর্ণ। অতএব আধুনিক। অতিপ্রাকৃত কাহনের সাফল্য চাবিকাঠি, প্রথমত, তার আবহ নির্মাণে। সেখানেও শরদিন্দু সফল। “শূন্য তবু শূন্য নয়” হেন নিতান্ত আজগুবি গল্পও টানা পড়ে যেতে হয় ওই আবহের টানে। বরদার গল্প গুলিও। কিন্তু অপ্রাকৃতের তুলনায় মনস্তাত্ত্বিক গরমিল ভিত্তিক গল্প গুলির মধ্যেই রয়েছে সেই রচনা গুলি, যারা নিতান্ত মনোহারিত্বর চক্রবাল পার হয়ে গিয়েছে কিংবা চেষ্টা নিয়েছে পার হয়ে যাওয়ার। যেমন “টিকটিকির ডিম”। এ যেন লেডি ম্যাকবেথের হাতের সেই রক্তদাগ, ঘ্রাণ —- যার থেকে মুক্তি দিতে অক্ষম আরব দেশের সমূহ গোলাপ, তাদের বর্ণে,গন্ধে। এখানে টিকটিকির শ্রাদ্ধ করে সতত কাল্পনিক টিকিটিকি-ডিম দেখা থেকে কথকের মুক্তি পাওয়া, ইয়ার্কি। প্রাণ কে নাশ করবার পাপবোধ আর সঙ্গে প্রানীটির প্রতি ঘৃণা —- মিলেমিশে যে মনোরোগ তা'ই কাহিনীর অন্তর্গত কথা। আরেক ইঙ্গিত, এই গল্পে, এই যে, আকর্ষণ শুধু ভালবাসার ফল নয়। ভীতি আর ঘৃণাও জন্ম দিতে পারে আকর্ষণের —- যে আকর্ষণে কথক ধাবিত হয় টিকটিকি-টির দিকে এবং বিনাশ ঘটায়। পক্ষান্তরে বিনাশ বা প্রাণনাশের কেন্দ্রে যে শুধু রাগ বা ঘৃণা নয়, প্রেম-ভালোবাসা ও যে বিনাশী শক্তি, তার একটি উদাহরণ ব্রাউনিং'এর “পরফেরিয়ার প্রেমিক”। —- এই দুটি উপপাদ্য কে পাশাপাশি রাখলে যেন আঁকা হয়ে যায় মানব মনের অন্তর্গত গুহা গুলির অন্ধকারের কিছুটা ইঙ্গিত। “অন্ধকারে”  গল্পটিও নয় অতিপ্রাকৃত।  এখানেও বাইরের অন্ধকারের সঙ্গে মানবমনের অন্ধকার-কল্পনা মিলেমিশে৷ আদ্যন্ত একটি পরিবেশকেই বুনে তোলা শুধু। বুননের ছত্রে ছত্রে যেন শুনতে পাই ফ্রস্টের স্বরঃ “all the fun’s in how you say a thing.” —- এই সব গুলি গল্প রাখা হয়েছে অমনিবাসের ৫ম খন্ডে এবং বলা হয়েছে এগুলি অলৌকিক ও হাস্য রসের গল্প। কিন্তু দন্তরুচি, টুথ-ব্রাশ, গ্যাঁড়া,লম্পট,ঝি, ভাল-বাসা৷ সেকালিনী ইত্যাদি —- না’ত অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত, না হাস্যরসের। যেমন, সেকালিনী —- আপাতভাবে হাল্কাচালে বলা এক মিলনান্ত কাহিনী। কিন্তু এই গল্পটি আদতে ঢেকে রাখে এক দগদগে ঘা, যে ঘা “প্রাগৈতিহাসিক”, যে ঘা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মাণিকের পাঁচী ভিখারিনী তার পা’য়ের ঘা'টি টিঁকিয়ে রেখেছিল তা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহের নিমিত্ত আর “সেকালিনী” র মধ্যবিত্ত বাড়ির বয়ঃসন্ধি-মগ্না শৈল, নিজের গা'য়ে নিজে ক্ষত করল, তাতে ঘা হতে দিল। জীইয়ে রাখল ঘা। কেন? কেননা আদতে শৈলও ভিখারিনীই। তার মন যে পুরুষে মজেছিল তার ঘরনি হওয়ার পথে বাধা ছিল গ্রাম-সমাজ, তার সেকেলে পিতা। ফলে তাকে নিতে হল এই পন্থা, না-সাড়া ক্ষত রাস্তা করে দিল ডাক্তার-প্রেমিককে মঞ্চে নিয়ে আসার। এই গল্পের অন্দরের ওই ঘা, ওই আদিম রিপু, ওই প্রাগৈতিহাসিক কে শনাক্ত না করতে পারলে পাঠিকা-পাঠক এর সঙ্গে “দাদার কীর্তি” হেন স্রেফ মজাদার গপ্পের তফাত করতে পারবেন না। আরেকটি অনন্য গল্প “গ্যাঁড়া”। এই গল্প পাঠান্তে কার হাসি পায় আমি জানিনা। “ গ্যাঁড়া” পাঠান্তে আমার মনে আসে Karl  Marx এর Economic and Philosophic Manuscripts of 1844 এর কথাগুলিঃ “ Money is the supreme good, therefore its possessor is good. Money, besides, saves me the trouble of being dishonest: I am therefore presumed honest… Money is the pimp between man’s need and the object, between his life and his means of life… 

I am not ugly, for the effect of ugliness—its deterrent power—is nullified by money.”  মনেপড়ে, কেননা, এই অতি ক্ষুদ্র কলেবর এই কাহিনিতে আমরা দেখি চেহারা, চালচলন দেখে যে যুবককে সম্পন্ন গৃহস্বামী তাকে “আপনি” না “তুমি” সম্বোধন করবেন, এই দ্বন্দ্বে পড়েযান, লোকটি নিজে তার নাম “গ্যাঁড়া” বলা সত্ত্বেও, “ভদ্রঘরের” ছেলেকে এমন আজব নামে ডাকা যায় কিনা নিতে ভাবিত হন, সেই গৃহস্বামীই, এই তথ্য জানতে পারামাত্র, যে, এ এসেছে তাঁরই বাড়ির উৎসবে, খাজা বানানোর নিমিত্ত, পলকে তাকে “তুমি” সম্বোধন করেন, গ্যাঁড়া বলে ডাকেন নির্দ্বিধায়।  কেননা, যেহেতু “Money is the supreme good”, তারই নিক্তিতে নির্ণীত মানুষের মূল্য৷ অতএব গৃহস্বামীটির ব্যক্তিত্ব গ্যাঁড়ার তুলনাই কম হলেই বা কি? money নামক pimp এর সাহায্যে তিনি খাজা-বানানো গ্যাঁড়ার চেয়ে, সামাজিক নিক্তিতেও ঢের উপরে। কাজেই, তাঁরই বাড়িতে গতর খেটে দু পয়সা উপার্জন করতে আসা গ্যাঁড়ার নাম একটা থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি? —- মধ্যবিত্ত চরিত্রকে এই গল্পে বা “ঝি” তে, রীতিমতো চাবকে দিয়েছেন লেখক। আর যেহেতু, ওই সকল লোকই আবার তাঁর পাঠিকা-পাঠকও, এদের সঙ্গেই লেখকের দৈনন্দিন ওঠা-বসা, ফলত চপেটাঘাত কে, এই সকল ক্ষেত্রে, মুচকি হাসি দিয়ে পরিবেশন করেছেন লেখক।




৫। বন্দিশ্‌ বনাম ঠুমরী


বন্দিশ, ঠুমরী দুই-ই শিল্পীর প্রতিভাকে প্রকাশ করে। শিল্পীর ক্ষমতা বলে, বৈচিত্রে, উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন কন্ঠে পরিগ্রহ করে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তথাপি বন্দিশ তার নাম আর নিয়মেই পার হয়না কিছু কিছু লক্ষ্মণরেখা। পক্ষান্তরে ঠুমরী’র চলন নির্বিঘ্ন। গোয়েন্দা কাহিনী,  ঐতিহাসিক কাহিনী, প্রেম উপাখ্যান —- এই গুলিও যেন বন্দিশ আর শরদিন্দুর ক্ষেত্রে, তাঁর এই বন্দিশ গুলিই বেশী পঠিত, আলোচিত। কিন্তু যে সকল কাহিনির নিমিত্ত, আমার ভাবনায়, শরদিন্দু বাংলা ভাষার অন্যতম লেখকদের একজন, সেই সবগুলি রচনাই ঠুমরী। গো পাঠিকা, হে পাঠক, আশা করি বুঝতে পেরেছেন, যে, “বন্দিশ” কে সহজ অর্থে একটি বাঁধা-ছক গিরিজা দেবীর হাল্কা চালে বলা একটি কথায়।  

                       “ব্যোমকেশ”, “ঐতিহাসিক”, “ রোমান্স” —- ইত্যাদি সংজ্ঞার বাইরে। এই কাহিনি গুলির মধ্যে যদি কোনো সংশ্রব থাকেই, তাহলে তা এই, যে, প্রতিটি কাহিনিই, কোনো না কোনো ভাবে, অপরাধ না হোক, মানবমনের সেই উপত্যকা-জাত, যেখানে, যে কোনো মানুষেরই, পরিস্থিতি সাপেক্ষে, জন্মায়,জন্মাতে পারে, বিষবৃক্ষ, যেখানে বাস করে কাম, কামনা, লোভ… “আদিম রিপু”, রিপু গুলি। তবে তাদের প্রকাশ, এই সকল রচনায়, অন্তঃসলিলা। এই গল্প সকল অমনিবাসের ৭ম খন্ডে। ৭ম খন্ডে “বিদ্রোহী’’ গল্পটি যেমন। কোনো প্রচলিত প্রথা, সমাজেরই হোক আর পরিবার অথবা ব্যক্তিরই হোক, তার দ্বারা পীড়িত হ'তে হ'তে, অকস্মাৎ তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েওঠাই বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহও ঘোষিত হতে পারে ব্যক্তি কিংবা সমষ্টির দ্বারা। হতে পারে ব্যক্তির একক বিদ্রোহ, হতে পারে একটি সমষ্টির মুখপাত্র হয়ে একজনের যুদ্ধ ঘোষনা। শরদিন্দুর বিদ্রোহী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবক, দেবব্রত একাই করেছিল যুদ্ধ ঘোষনা।  করেছিল তথাকথিত সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে। অথচ সামাজিক রীতিনীতির ভণ্ডামি গুলি, তারই মতন যারা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত এবং যুবক, যাদের পক্ষে দেবব্রতর মতনই, সেসবের অসারতা টের পাওয়াই ছিল উচিত, উচিত ছিল দেনব্রতকে, অন্তত আদর্শগত সমর্থন জোগানো। কিন্তু, বাস্তবে দেখিঃ “তাহার বুদ্ধির এমন একটা কুণ্ঠাহীন অনাবৃত নগ্নতা ছিল যে আমাদের চোখে তাহা অশ্লীল দুর্নীতির রূপান্তর বলিয়া মনে হইত। আমরা বাঙ্গালী জাতি অনাবশ্যক তর্ক করিতে পশ্চাৎপদ, এ অপবাদ কেহ কখনও দিতে পারে নাই; কিন্তু দেবব্রতের সঙ্গে তর্ক বাধিলে আমরা কেমন নিস্তেজ হইয়া পড়িতাম, তর্কে আর রুচি থাকিত না। তাহার তর্ক করিবার রীতি দেখিয়াই আমাদের অত্যন্ত বিরক্তি বোধ হইত। ধর্মনীতি, সমাজতত্ত্ব, ঋষিবাক্য কিছুই সে স্বীকার করিত না, কেবল বুদ্ধির জবরদস্তি দ্বারা সকলকে কাবু করিবার চেষ্টা করিত।’’ অর্থাৎ তার কাছে “যুক্তি” ছিল। এবং সত্যই যে ছিল তার নমুনা, কথকের বকলমে লেখক যেমন দিয়েছেন তার কিয়দংশ এইরূপঃ

“একবার কি একটা আলোচনার প্রসঙ্গে দাদা বলিতেছিলেন যে, বিবাহ নামক সংস্কারটাই মনুষ্য সমাজকে দৃঢ়ভাবে বাঁধিয়া রাখিয়াছে..।  দেবব্রত..  বলিল, বিবাহ জিনিসটার স্বকীয় মূল্য কি?

দাদা বলিলেন,...  বিবাহ আমাদের মহামূল্য সম্পদ, কারণ সমাজকে সে প্রেমের বন্ধনে বেঁধে রেখেছে।

“প্রেমের বন্ধন কোথা থেকে এল? বিবাহের সঙ্গে প্রেমের সম্বন্ধ কি?..  যদি বুঝিয়ে দিতে পারেন তো ভাল হয়।’

দাদা রুষ্টমুখে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, তা যদি নাও থাকে, তবু সমাজের বন্ধন হিসাবে বিবাহের মূল্য কমে না।” দেনব্রত “কিন্তু তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একটা কৃত্রিম বন্ধন দিয়ে সমাজকে বেঁধে রাখা কি সঙ্গত?.. যে বন্ধনে স্ত্রী-পুরুষ স্বেচ্ছায় পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধরা দেয় না, সে বন্ধন কৃত্রিম নয় তো কি?

দাদা চটিয়া উঠিলেন। ধৈর্যচ্যুতি ঘটিলে তাঁহার মুখে কোনও কথা বাধে না, তিনি মোটা গলায় চিৎকার করিয়া বলিলেন, বিবাহ কৃত্রিম বন্ধন! অর্থাৎ তোমার পূর্বপুরুষদের বিবাহকেও তুমি পবিত্র বলে মনে কর না?

দেবব্রত মুষ্টি পাকাইয়া গর্জন করিয়া উঠিল, না, স্বীকার করি না—

অপবিত্র ও কর-পরশ   

সঙ্গে ওর হৃদয় নহিলে।   

মনে কি ভেবেছ বঁধু, ও হাসি এতই মধু   

প্রেম না দিলেও চলে শুধু হাসি দিলে।

স্তম্ভিত হইয়া গেলাম।..  দাদাও গুম হইয়া গেলেন, এত বড় ব্রহ্মাস্ত্র যে ব্যর্থ হইয়া যাইবে, ইহা তিনি প্রত্যাশা করেন নাই।” .. “ আমি এতক্ষণ চুপ করিয়াছিলাম, এবার খুব শান্তভাবে বলিলাম, দেবব্রত, তোমাকে আমি একটা প্রশ্ন করতে পারি কি?

পার।

বিবাহকে তুমি যখন সত্য বন্ধন বলে স্বীকার কর না, তখন স্ত্রীপুরুষের অবৈধ মিলনেও তোমার কোনও আপত্তি নেই?

দেবব্রত বলিল, কিছুই না। আর আপত্তি করলেই বা শুনছে কে?

তাহলে কুস্থানে যেতেও তোমার কোনও নৈতিক বাধা নেই?

কুস্থান?—ও! দেবব্রত হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল, দাদা একদিক থেকে কোণঠাসা করবার চেষ্টা করেছিলেন, তুমি আর এক পথ ধরেছ। না, যাকে তুমি কুস্থান বলছ সেখানে যেতে আমার কোনও বাধা নেই।

আমি তীক্ষ্ণস্বরে বলিলাম, তবে যাও না কেন?

রুচি নেই বলে।

অর্থাৎ রুচি থাকলে যেতে?

আলবৎ যেতুম, একশবার যেতুম।

ও! তাহলে আমার আর কিছু বলবার নেই।

দেবব্রত হাসিতে হাসিতে বলিল, বলবার তোমার কোনও কালেই কিছু ছিল না, কেবল কুস্থানের ভয় দেখিয়ে আমাকে কাৎ করবার চেষ্টায় ছিলে।”  —- এ'ই দেবব্রত।  এ'ই বিদ্রোহী। ১৯৪১ সালের পক্ষে শুধু নয়, দেবব্রত তথা দেবব্রত-স্রষ্টা’র এই সকল ভাবনা-বিষয়ে, হালের মধ্যবিত্ত “শিক্ষিত” সমাজও যে, কাফে কিংবা বারে নয়, অন্দরে,অন্তরে কতোদূর সহনশীল, তা তর্ক সাপেক্ষ। তবে কাহিনি ভরকেন্দ্র এখানে নয়। কাহিনীর ভরকেন্দ্র, এই সকল যুক্তিতর্কের থেকে অনেক অনেক দূরে, যেখানে 

“... ষোল বৎসর দেবব্রতকে দেখি নাই। এতদিনে তাহার বয়স চল্লিশ পার হইয়া গেল। কেমন আছে, কোথায় আছে জানি না, হয়তো সেই পুরাতন বাড়িতেই বন্ধুহীন আত্মীয়হীন ভাবে বাস করিতেছে।…  সেই শ্রাবণ-সন্ধ্যায় সমস্ত বুদ্ধির অহঙ্কার বিসর্জন দিয়া আমাদের সহানুভূতি প্রার্থনা করিতে আসিয়াছিল। কিংবা—কিন্তু আর কি হইতে পারে?

 সেদিন..  প্রশ্রয় আমরা দিই নাই; তাহাকে অশেষভাবে লাঞ্ছিত করিয়া..  অপমান করিয়াছিলাম। অন্যায় করিয়াছিলাম, এমন কথাও বুকে হাত দিয়া বলিতে পারি না। তবু আজ এই ক্ষান্তবর্ষণ সন্ধ্যায় তাহার সেদিনকার পীড়িত মুখখানা মনে পড়িয়া মনটা অন্যায়ভাবে ব্যথিত হইয়া উঠিতেছে।

এখন তাহারা কেমন আছে—কে জানে, আছে কিনা তাই বা কে জানে!” —- পাঠিকা-পাঠকদিগের যাঁরা গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন “সেই শ্রাবণসন্ধ্যা” র বৃত্তান্ত আর যাঁদের গল্পটি পড়া নেই, তাঁদের বলব পড়ে দেখতে। —- আমার মর্মে খোদিত হয়ে আছে বাইরের সকলের কাছে বিদ্রোহী, কারও ধার-না-ধারা, তার্কিক যুবকের সেই একলা, বিষাদী মুখ —-যে প্রশ্রয় চায়, আশা করে সহানুভূতি নাহোক, সহমর্মিতা। তথাপি তা প্রকাশে সে অক্ষম। হয়তো বয়স ছিল তার বৈরী। —- বয়স বৈরী ছিল কথকজনেরো এবং সততাও। সততার অভাবে, যুবা-সুলভ দর্পে, দেবব্রত সম্বন্ধে সহানুভূতি সত্ত্বেও, কথকজন দলের বিপক্ষে দাঁড়াতে হলো ব্যর্থ। তাই, যৌবনের জোয়ার নেমে গেলে, বয়স যখন আর বৈরী নয়, বরং অভিজ্ঞতা, তখন সে, কথকজন, সজল হয়। কেননা সে টের পায়, হয়ত বা তারও কল্পনা-চোখে ভেসেওঠে বাইরের সকলের কাছে বিদ্রোহী, কারও ধার-না-ধারা, তার্কিক যুবকের সেই একলা, বিষাদী মুখ —-যে প্রশ্রয় চায়, আশা করে সহানুভূতি নাহোক, সহমর্মিতা। মানুষের, মানবের ওই বেদনার্ত মুখটি আর তা দর্শনে করুনা-সজল দ্রষ্টা —- এ'ই কি নয় শিল্পের আদি ও অন্তিম সত্য? বিশেষত আধুনিক শিল্প? জন-নিয়মে জয়ের সংজ্ঞায় বিজয়ী রামের গাথা থেকে মেঘনাদের পরাজয়-গাথা যে মহত্ত্বর, তা'ই প্রতিষ্ঠা করবার নিমিত্ত, মধুসূদন কি নন সতত আধুনিক? 

“একূল ওকূল”, “পিছুডাক”, “স্মর-গরল”, “শাদা পৃথিবী”, “স্বাধীনতার রস”, “যুধিষ্ঠিরের স্বর্গ”, “বড় ঘরের কথা”,“গীতা”, “ঘড়িদাসের গুপ্তকথা”, “সাক্ষী”, “পতিতার পত্র”,“মানবী”, “রমণীর মন’” —- এই প্রত্যেকটি গল্পই উন্মোচন করে, “মানুষের মৃত্যু হলে” তারপরেও যে “মানব” থেকেযায়, তার অন্তর্গত আধো-অন্ধকারের কোনো না কোনো সত্যকে। 

“একূল ওকূল” গল্প, জীবনের, যাপনের আরো অনেক মাত্রার সঙ্গে উন্মোচন করে এই মাত্রাটিও, যে, যে কোনো সম্পর্ক, মাতৃত্ব-পিতৃত্ব সহ, নয় পাষাণে খোদিত। সব সম্পর্কই, অন্তিমে, নিয়ন্ত্রিত পারিপার্শ্বিকের দ্বারা আর পারিপার্শ্বিক কদাপি সময় স্থান-কাল বিচ্যুত। তবে, এই সকলেরও উর্ধে গল্পটি তখুনি উড়ান দেয় যখন বেজে ওঠে, এই কথাগুলি, সেই সাধুচরণের কন্ঠেইঃ “ সংসারে আমার অধিকার নেই। একটু থামিয়া বলিলেন, প্রথম যেদিন সংসার ছেড়ে গিয়েছিলুম, সেদিন ভুল করেছিলুম; আবার যেদিন ফিরে এলুম, সেদিন তার চেয়ে বড় ভুল করলুম। ভুলে ভুলেই জীবনটা কেটে গেল, সত্যিকার পথ চিনে নিতে পারলুম না—ললাট-লিখন।” —- এখানেই নিতান্ত সুবিধাবাদী, কর্তব্য-পলাতক সাধুচরণের জন্য, পাঠিকা-পাঠক মর্মে, নেমে আসে করুণাধারা।


৬। “মানুষের মৃত্যু হলে”


“মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব

থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে

আরো ভালো— আরো স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার

পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ

কতো দূর অগ্রসর হ’য়ে গেল জেনে নিতে আসে”। —- জীবনানন্দ লিখিত প্রবাদপ্রতিম এই পংক্তি গুলি, আমার কাছে, শিল্পের,সাহিত্যেরও একটি সংজ্ঞা। “ আজকের মানুষ” “আরো ভালো— আরো স্থির দিকনির্ণয়ের’’ প্রয়োজনে, অতীতের যে সকল শিল্প-শিল্পীর কাছে, অতীতের চিন্তাবিদদের মুষ্টিমেয়দের কাছে যেমন, যায়, যেতে বাধ্য হয় এবং ফিরে আসতে সক্ষম হয়, যাত্রার নতুন পথের নির্দেশ নিয়ে, তাঁরা এবং তাঁদের সেই সৃষ্টি গুলিই শাশ্বত ও আধুনিক।  সংখ্যায় প্রচুর না হলেও, তেমন বেশ কিছু রচনা যে আমরা পেয়েছি শরদিন্দুর কাছে, পাঠিকা-পাঠক, এই সত্যকে মেনে নিয়ে এবার উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করব শরদিন্দু ‘মানুষ’টির মনোলোকে।

প্রথমেই পাঠিকা-পাঠককে পড়ে দেখতে বলি, অমনিবাসের দ্বাদশ খন্ডে “ফারমান” নামক গদ্যটি, যেটি’ত মূল প্রকাশকাল ১৯৫৩ সাল২৫ এপ্রিল। স্থান “দেশ” পত্রিকা। এখানে ইতিহাসের সূত্র নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন শরদিন্দু কিন্তু, যেহেতু ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক চলন বিষয়ে তাঁর ছিলনা কোনো ধারনা, ফলত তিনি লিখে বসেন:

ভাষায় নিহিত মুসলমান-অসূয়া যদি চোখে না’ও পরে তাহলেও ক্ষতি নেই। “শান্ত বেশে” অথবা উগ্র বেশে বড় কথা নয়। আদত কথা ইসলাম ধর্ম কেন প্রবেশ করলো দক্ষিণে? অথবা শুধুমাত্র বৃটিশ শাসনের নিমিত্তই  কি  কৃশ্চান ধর্ম, ভারতে বিস্তার পেয়েছিল? ইরোড ভেঙ্কটপ্পা রামাসামি (17 সেপ্টেম্বর 1879 - 24 ডিসেম্বর 1973), যিনি ইতিহাসে  “পেরিয়ার (Periyar) নামে খ্যাত, যিনি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে জাতপাত বিরোশী আন্দোলনের পথিকৃৎ তাঁর মত কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নঃ “When Periyar talks about Islam, he rarely refers to the theological aspects of it, but more on what he believed could be its social impact. He argues that Islam is an antidote to the malady of Hinduism that degraded the lower castes and the untouchables. He says “I am not an agent of Islam nor do I preach Islam”, but he advocates conversion to this religion only to fight “the devilish, dangerous and cruel snake of Brahminism and Hinduism or at least to escape from the effect of its poison” (Ramasamy 2004, p. 16). Periyar believed that if all Dravidians followed Islam “there would not be a caste or community called the Brahmins” because, according to him, only Islam transcended caste whereas other religions adjusted to it।” [ সূত্র Freedom from God: Periyar and Religion,  লেখক Karthick Ram Manoharan, Centre for Studies in Social Sciences, Calcutta (CSSSC), Kolkata ] – শরদিন্দু কদাপি ব্রাহ্মণ্যবাদ-পীড়িত হিন্দুধর্মের এই চেহারাটির উল্লেখ করেন নি, না তাঁর এই বা অন্য গদ্যে, না’ত তাঁর গল্প-উপন্যাসে। সোমনাথ মন্দির বা আরো অনেক মন্দিরই তৎকালে এবং পরেও, আক্রান্ত হয়েছে বিত্তলিপ্সু আক্রমণকারীদের দ্বারা কেননা ওই ব্রাহ্মণ্যবাদ-পীড়িত হিন্দুধর্মের কারণেই, মন্দিরগুলি ছিল এবং এখনো, হয়, রাজা-মহারাজাদের কৃষ্ণ-সম্পদ নিরাপদ রাখবার স্থান। কিন্তু শরদিন্দুর “দূষিত” শব্দটি, লুন্ঠনের কার্য-কারন সম্পর্ক থেকে চলে যায়, অতি ক্ষুদ্র ধর্মান্ধতার দিকে। – আশ্চর্য এই, যে, ১৯৪৮ সালে যিনি পুঁজিবাদ-সমাজবাদ বিষয়ে টীকা লিখছেন, তিনিই, ১৯৫৩ তে এসে লিখে যাচ্ছেন এই সকল নিতান্ত অর্বাচীন কথাগুলি! কি এমন ঘটে গিয়েছিল ১৯৪৮ আর ১৯৫৩’র মধ্যে? যদিও ১৯৪৮ এ’ও দেখিঃ

গান্ধী-হত্যা যে উগ্র-হিন্দুত্ববাদীদেরই কর্ম, তা তৎকালেও কি সর্বজনজ্ঞাত ছিলনা? জিন্না হত হননি। দীর্ঘদিন রোগভোগের অন্তে মৃত্যু হয়েছিল জিন্নার। শরদিন্দুর তুলসীদাসের দোঁহাটি এখানে উদ্ধার করবার অর্থ কি এই, যে, জিন্নার মৃত্যুতে কেউ রোদন করেনি? নাকি গুলি খেয়ে, মুহুর্তে মৃত্যু ( না, গান্ধীর মৃত্যুও মুহুর্তে হয়নি) পুণ্যফল আর রোগভোগ-অন্তে মৃত্যু পাপের শাস্তি? কি পাপ? ভারত-ভাগ? ওইটি যদি পাপ হয়, তবে সেই পাপে প্রথম ও প্রধানত সাভারকার ও হিন্দু মহাসভা এবং তৎসঙ্গে নেহেরু, মাউন্টবেটেন থেকে আরো অনেক অনেক মহামানবের দায় রয়ে গিয়েছে – যদিও পাপের বীজটি পুঁজিবাদ। 

এক সপ্তাহের মধ্যেই লিখিত এই অংশঃ


ভারতের দাবী? নিজাম চেয়েছিলেন হয় স্বাধীন হায়দ্রাবাদ অন্যথায় পাকিস্তানের অংশ হতে। স্বেচ্ছায়। সেখানে ভারতের দাবীটি ঠিক কি এবং কিভাবে ন্যায্য? এখানে এসে মনে আসতে বাধ্য কাশ্মীর বিষয়ে “ভারতের দাবী”র কথাও। – এই সকল “এন্ট্রি”র ঠিক দশ দিনের মধ্যেই সেই “এনড়ি” গুলি, পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ বিষয়ে, যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি দেবাশিসদার, কবি ও লেখক দেবাশিসদা তরফদারের, সঙ্গে। দেবাশিসদার কথাটি এখানে তুলে দিলাম, দেবাশিসদার অনুমতি নিয়েইঃ “জিন্নাকে একলা দোষী করে গান্ধী হত্যার পেছনের আদর্শকে এড়িয়ে কথা বলাটা একচক্ষু দৃষ্টিভঙ্গী। শরদিন্দু এত ইতিহাস জানতেন আর এটা কি জানতেন না যে জিন্নার দুজাতি তত্ত্বের আগেই দুই জাতি তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন সভারকার ( এঁর নাম গান্ধী হত্যা মামলায় জড়িয়েছিল) । একচক্ষু লোকেরা বলবেন সাভারকর একদা জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী ছিলেন। বেশ, সে সময় জিন্নাও জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন, গান্ধীর সহযোগী ছিলেন, হিন্দু মুসলমান ঐক্যের দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। ১৯২০ এ তিনি কংগ্রেস ছাড়েন এই কারণে যে তিনি

 নরম পন্থী নেতা ছিলেন। তিনি গান্ধীর খিলাফত আন্দোলনের সমর্থন দেওয়ার বিরোধ করেছিলেন কারণ মুসলিম হলেও ধর্মীয় গোঁড়ামির তিনি কট্টর বিরোধী ছিলেন। আরো আছে। ১৯২o র দশকে সাভার্কর যখন ইংরেজের কাছে মাফী চাইছেন, তখন জিন্না লড়ছেন ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিয়ে। এই ঐতিহাসিক সত্য না জানার কথা নয়। তবু কেন, আম " ভদ্রলোক " শ্রেনীর মত শরদিন্দু ও একতরফা জিন্নাকেই এত ঘৃণা করলেন। সভরকারের মৃত্যুতে নিশ্চয় অমন উক্তি করতেন না। এটা একচক্ষু বৌদ্ধিকতা।”

শরদিন্দুর দিনলিপি, পত্রাদি ও অন্যান্য গদ্য কয়েকবার এবং ইদানীং আরেকবার পাঠান্তে এ’ই মনে হয়, যে, পুঁজিবাদ-সমাজবাদ ইত্যাদি ধারনা গুলি তাঁর মর্মে খোদিত হতে পারেনি। অদ্যকার উগ্র হিন্দুদের তুলনায় হয়তো শরদিন্দুর হিন্দুপ্রীতি হিংস্র নয়, ‘হয়তো’ কেন, বাস্তবিকই হিংস্র নয়, তবে নয় মুসলমান-অসূয়াহীন। ইতিহাসকে তিনি বিকৃত করেন নি, ঠিক, কিন্তু ইতিহাসের এমন সকল অধ্যায় নিয়ে, অতি অন্তঃসলিলা অসূয়াকে ব্যক্ত করেছেন ঠিকই। এবং এ’ও অপরাধ আর সুকুমার সেন অথবা প্রতুল গুপ্ত’হেন পল্লবগ্রাহী শরদিন্দু আলোচনায় এ সকল আবিষ্কৃত, উন্মুক্ত হওয়ার কথা নয়। তাই হয়নি। কিন্তু “মানুষ” থেকে “মানব” এ উত্তরনের প্রশ্নে, শরদিন্দু নিয়ে সার্বিক ও গভীর চিন্তন, মূল্যায়ন প্রয়োজন।

আমার এই রচনা তার একটি রূপরেখামাত্র।



সপ্তর্ষি বিশ্বাস

৩০ জুন ২০২৪

বেঙ্গালোর


ঘুম ঘর