“এই মৃত্যু উপত্যকা…”
সপ্তর্ষি বিশ্বাস
১। HAMLET: Denmark's a prison., Act II, Scene 2
রাত। প্রধান এক মহানগরীর বস্তি-রাত। রাত তরুণী না হলেও হয়তো নয় মধ্যরাতও। মুসলমান অটোচালকজন ফিরেছে তার খোলি তে। হয়তো ডিউটি-ড্রেস ছেড়ে, হাতমুখ ধুয়ে বসেছে খেতে। বিবিজন এনে রাখছে যা’ই রেঁধেছে। তৃপ্তি করে খেতে আরম্ভ করলো অটোচালকজন। তৃপ্তি আজ সামান্য বেশিই দম্পতির। বিবিজন কালই বলেছে “ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।
কাদের পাশে?
তার আদমী জানে।
গো পাঠিকা, হে পাঠক আপনাদের সুবিধার্থে বলিঃ তারা মানে দূর দূর থেকে আসা মানুষ গুলি।
বস্তি-খোলির খুপরি জানলায় দাঁড়িয়ে বিবিজন আবার বলেঃ “আহা, বাচ্চা বাচা ছেলেমেয়ে গুলি, দিনের পরে দিন ওই মাঠে, রাস্তায় বসে আছে শুধু মাত্র তাদের হক পাওয়ার অধিকারের জন্য। পড়েলিখে তারা সব। তারা পরীক্ষা দিয়েছে পড়েশুনে। আর সরকার কি করলো? ওদের পড়ালেখা, কোশিস —- সব নিয়ে জুয়া খেলে দিলো। সওয়াল পত্র দিলো লিক করে। ফেল করিয়ে দিলো যাকেতাকে।…”।
এই বিবিজন, এই অটোচালকজনের বিবিজান-জন পড়েলিখে নয় যে অর্থে পড়েলিখে আমি আপনি। ডিগ্রিধারী। তবু সে বলে, সে'ই বলেঃ “আমাদের কি হবে? বাচ্চে তো আমাদেরো আছে। আমরাও পাঠাচ্ছি ইশকুলে। মগর এই হলে ওদেরই কি ভবিষ্য? কি ভবিষ্য তোমার আমার? কি ভবিষ্য আমাদের মতো মজুর মজদূর মজবুর দের? —- তাও আবার পুলিশ ওই জবাব চাইতে আসা, হক মাঙতে আসা ছেলেমেয়ে বুড়াদের বাচ্চাদের ধরে ধরে পিটছে, আঁসু আনা গ্যাস ছাড়ছে। কাল যে করে হোক ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। অতো মানুষ কে পেট ভরে খাওয়ানোর মতো রুপেয়া পয়সা আমার তোমার নেই। কিন্তু আমরা যতোজন কে পারি একদিন দুইদিন হলেও খাওয়াব। হয়তো আমাদের মতো আরো অনেকে..”।
কথাগুলি পতিজনেরও।
অদ্য সে গিয়েছিল। সকালের রুজিরোজগার থেকে রিক্সামালিকের দৈনিক ভাড়ার টাকা দিয়ে বাকি পয়সায় সে কিনেছে খাবারদাবার। গেছে ওই অবস্থান ধর্মঘটে। হকের লড়াই লড়বার ভাই বহনদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে তার কিনে আনা খাওয়া দাওয়া।
তাদের বাচ্চাদুটি ঘুমাচ্ছে এখন। আদমি টি বলছে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা। বলছে এইভাবে তারাও হতে পারছে এই হকের লড়াইতে শামিল। বিবিটিরও হচ্ছে আহ্লাদ। কেজানে এই অবস্থান ধর্মঘট সফল হবে কতোদূর, আদৌ সরকার কিছু করবে নাকি গুলি কামান চালিয়ে দেবে ওদেরই উপর। সে যাইহোক দেখা যাবে। তবু তৃপ্তি এই, যে, শামিল হওয়া গেছে ওই লড়াইয়ে। স্বার্থান্ধ সুবিধাব্ধ দিগের দলে যে তারা নয়, সেটুকু অন্তত গেছে প্রমাণ করা।
ঠিক তখুনি খোলি-দরজায় ঠকঠক ঠকাঠক যেন ভেঙ্গেই ফেলবে।
পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি হয় পলকে। আদমীজন এঁটো হাতেই উঠে গিয়ে খোলে দরজা।
পুলিশ। দরজায়। ভিড় পুলিশ ঘিরে। তাকাতাকি ঝাঁকাঝাকি অন্য অন্য খোলিজানলায়, খোলিবারান্দায়।
“শালে, আতংকবাদী”।
মুহুর্তে ভিড় হাল্কা হতে চায়। ভীত কৌতুহলে মিশে যেতে চায় নিরাপদ তাকাতাকি ঝাঁকাঝাকিতে।
কিন্তু নিরাপদ কি তাকাতাকি ঝাঁকাঝাকিও?
“চল শালে। আতংকবাদীয়ো কো খানা খিলাতা। চল, হাম তুঝে খিলাতা হুঁ…”।
স্থান দিল্লী। কাল সাল ২০২৬।
গো পাঠিকা, হে পাঠক এইবার আরেকটি দৃশ্যে উড়ান।
দৃশ্যঃ জেলখানা। অন্ধকার আইসোলেশন সেল। ওই ছোট্ট লোহার খাঁচায় হাড়কাঁপানো শীতে বৃদ্ধ পুরুষমানুষটির কয়েকদিন কাটবার পরে একদিন সেলের দরজা খুলে গেলো। বাত্তি জ্বলে উঠল, আর দরজার মুখে এসে দাঁড়ালো বৃদ্ধের পক্ষের উকিল, যে উকিল সরকারই নিযুক্ত করেছিল, বৃদ্ধের পক্ষে, বিচারকালে।
উকিল তাকালো বৃদ্ধের দিকে।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আর ছুঁড়ে দিলো পাল্টা চাউনি ।
যদিও বৃদ্ধের পরনে জরাজীর্ণ পোশাক, শীতে পুড়ছে শরীর, পেট পুড়ছে ক্ষুধায় —তদসত্ত্বেও শান্ত ব্যঙ্গাত্মক মস্তিতে উকিলকে, যে উকিল অভিজাতও বটে, তাকে বল্লো “কী খবর?”
“আমি আপনার রায় নিয়ে এসেছি,” উকিল বল্লো। ব্রিফকেস থেকে এক টুকরো কাগজও বার করে আনলো উকিলটি।
“আমার কোনো আগ্রহ নেই,” বৃদ্ধ বল্লো। “আমি জানি এটা আমার মৃত্যুদন্ডের চিঠি। আর আমার স্ত্রী?”
“আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রেও মৃত্যদন্ডই । আপিল করা যাবে না।”
“বেশ,” নিস্পৃহ উত্তর দিলো বৃদ্ধ।
“তবে আপনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন,” উকিল উবাচ।
“ফুহরারের কাছে?”
“হ্যাঁ, ফুহরারের কাছে।”
“না, ধন্যবাদ।”
“তাহলে আপনি কি মরতে চান?”
বুড়া হাসলো।
“আপনার কি ভয় লাগছে না?”
বুড়া হাসলো।
এই প্রথমবার উকিলটি তার মক্কেলের মুখের দিকে সামান্য হলেও কৌতুহল নিয়ে তাকালো। তারপর বল্লো “সেক্ষেত্রে, আমি নিজেই আবেদনপত্রটি জমা দেব।”
“অথচ প্রথমে তো আপনিই আমার মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলেন!”
“নিয়মটা এমনই। মৃত্যুদণ্ডের পর প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হয়। এটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।”
“আপনার দায়িত্ব। বুঝলাম। ঠিক যেমন আমার হয়ে আইনি লড়াই করাটা আপনার দায়িত্ব ছিল। তবে আমার মনে হয় না আপনার ওই আবেদনে খুব একটা কাজ হবে, তাই ওটা নিয়ে আর মাথা না ঘামানোই ভালো।"
"আপনি যা-ই বলুন না কেন, আমি ওটা জমা দেবই।"
"আপনাকে তো আর আটকানো যাবে না বলে মনে হচ্ছে।"
সামান্য থেমে উকিল পুনরায় "আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি—কী কারণে আপনি এমনটা করলেন?"
"কীসের কথা বলছেন?"
বুড়া শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো পরিপাটি উকিলটির দিকে না তাকিয়েই।
"ওই পোস্টকার্ডগুলো লেখার কথা বলছি। ওগুলোতে কোনো লাভই হয়নি, উল্টে এখন এর জন্য আপনাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে।"
"কারণ আমি বোকা। কারণ এর চেয়ে ভালো কোনো বুদ্ধি, প্রতিরোধের প্রতিবাদের কোনো উপায় আমার মাথায় আসেনি। কারণ আমি ভেবেছিলাম—আপনার ভাষায় বলতে গেলে—ওগুলোর মাধ্যমে হয়তো কোনো কাজ হবে। ঠিক এই কারণেই কাজটি করেগেছি আমরা দুইজনে।"
"আর এখন কি আপনার কোনো অনুশোচনা হচ্ছে না? এমন একটা মূর্খামির জন্য প্রাণ দিতে হচ্ছে বলে কি খারাপ লাগছে না?"
বুড়া এবার তাকালো উকিলের দিকে। তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি।
"অন্তত আমি নিজের সততাটুকু তো বজায় রেখেছিলাম," বল্লো বুড়া। "আমি, আমি আর আমার স্ত্রী আমাদের চারদিকে ঘটে যাওয়া বদমাইশিতে অংশ নিইনি। নিজেদের মতো করে প্রতিবাদে, প্রতিরোধে অংশ নিয়েছিলাম”।
চুপচাপ বসে থাকা বুড়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর বল্লো উকিল "আমাকে বলতেই হচ্ছে, আমার যে সহকর্মী আপনার স্ত্রীর হয়ে মামলা লড়েছিলেন, তিনি ঠিকই বলেছিলেন—আপনারা দুজনেই পাগল।"
কাল, এই দৃশ্যে, ১৯৪৩। স্থান জার্মানির Plötzensee জেলখানা।
এই দৃশ্যটিও প্রথম দৃশ্য অর্থাৎ মুসলমান অটোচালকজন ও তার স্ত্রীর মতোই, অক্ষর থেকে রক্তে মাংসে নয়, রক্তমাংস থেকে অক্ষরে চিত্রিত। ২০২৬ এর দৃশ্যটি অবলীল অভিনীত হতে পারতো এবং হয়েওছে ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালে প্রায় সারা বিশ্বে, প্রতিটি নাজি অধ্যুষিত তল্লাটে। ১৯৪৩ এর দৃশ্যটি ২০২৬ এও অভিনীত হচ্ছে, হতে থাকবে। কিন্তু কতোদিন? আরো কতো যুগ? আগ্রাসী ফ্যাসিবাদের দমনপীড়ন সত্যের সমান্তরালে প্রতিরোধ প্রতিবাদের সত্য দুটি দৃশ্যেই স্পষ্ট প্রতিভাত।
গ্রন্থটি পাঠ আরম্ভ মাত্র বোধ করতে থাকি এক অন্য রকমের অস্বস্তি। যেহেতু কাহিনীকেন্দ্রে নাজি জার্মানি, উন্মত্ত বিশ্বযুদ্ধ ফলে অস্বস্তি আশ্চর্য নয়। আশ্চর্য অন্যত্র। ২য় বিশ্বযুদ্ধের আবহে এবং বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা আর চরিত্র নির্ভর উপন্যাস হলেও কেন ২০২৬ সালে গ্রন্থটি পড়তে আরম্ভ করেই মনেহয় ঠিক একই আবহে, একই দমবন্ধ তে রয়েছি এই ২০২৬ সালেও?
এর প্রধান হেতুটি হয়তো এই, যে, যে সময়ের ছায়ায় বসে গ্রন্থটি পাঠ করেছি, লিখতে বসেছি গ্রন্থটি নিয়ে – এ এক ফ্যাসিবাদ আক্তান্র সময় আর বহু দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা এই গ্রন্থটিরও একটি মূল মাত্রা ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদের স্বরূপ। ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র ত্রাস নয়, ত্রাসের সাম্রাজ্য নয়। ফ্যাসিবাদ আদতে এক রাজনৈতিক কর্মসূচি যার মূল স্তম্ভগুলি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও তার মাধ্যমে বলপ্রয়োগ, জনতার চিন্তাকে মতাদর্শগত নেতৃত্বের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জনতার সম্মতি অর্জন, অস্ত্র হিসাবে জাতীয়তাবাদের ব্যবহার, সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিশ্চিত করতে সুশীল সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সময়ে পুঁজিবাদী শাসনের পুনর্গঠন। গ্রামসির এই আবিষ্কার গুলির প্রতিটি অক্ষরের উদাহরণ গ্রন্থটিতে হাজির শতভাগ। হাজির নিপুন শৈল্পিক দক্ষতায়। গো পাঠিকা, হে পাঠক, আসুন পাঠ করি এই অংশটি, মূল জার্মান থেকে Michael Hofmann এর ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে অঙ্গীকরণ চেষ্টা বর্তমান লেখকের। পাত্রেরা যুদ্ধমাঠ থেকে পাওয়া পত্রে একমাত্র পুত্রের হত হওয়ার সংবাদ সদ্য পাওয়া কোয়াঙ্গেল আর তার প্রতিবেশী, চাকরি থেকে ছাঁটাই হওয়া এবং অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে না যাওয়া বর্কহাউসেন।
“বর্কহাউসেন প্রবল আবেগে বলে চলে “হাজার হাজার মানুষ বীরের মতো প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে আর তাই ফরাসিরা এত দ্রুত আত্মসমর্পণ করেছে। সেজন্যেই আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ আজও বেঁচে আছি। একজন বাবা হিসেবে এমন আত্মত্যাগের জন্য তোমার গর্ব হওয়া উচিত কোয়াঙ্গেল!”
কোয়াঙ্গেল পালটা প্রশ্ন করে, “তা তোমার ছেলেদের কি যুদ্ধ করতে যাওয়ার মতো বয়স হয়নি?”
বর্কহাউসেন ক্ষুণ্ণ হয়। বলে: “তুমি তো সব ভালো করেই জানো কোয়াঙ্গেল! তবে বোমা বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো ঘটনায় যদি ওরা সবাই একসঙ্গে মারাও যেত, তবুও আমি ওদের নিয়ে গর্বই করতাম। কি বিশ্বাস হচ্ছে না, কোয়াঙ্গেল?”
কোয়াঙ্গেল জবাব দেয়না, জবাবের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত বোরখাউসেন নিজেই বলে “একবার ভেবে দেখো কোয়াঙ্গেল—প্রথমে সুদেতেনল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া আর অস্ট্রিয়া; আর এখন পোল্যান্ড ও ফ্রান্স—আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হতে চলেছি অচিরেই। এর কাছে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যুতে কীই-বা আসে যায়! আমরা তো ধনী!” এবার অস্বাভাবিক দ্রুততায় কোয়াঙ্গেল জবাব দেয় “আর সেই সম্পত্তি দিয়ে আমরা কী করব? খেয়ে ফেলব? ধনী হলে কি আমার ঘুম ভালো হবে? এত বড় ধনী হয়ে যদি কারখানায় যাওয়া বন্ধ করে দিই, তবে সারাদিন কী করব? না বোরখাউসেন, আমি ধনী হতে চাই না—আর এমনভাবে তো একেবারেই না। ওই ধরনের সম্পদের মূল্য একটা মানুষের লাশের চেয়েও কম!”
এই অংশ টুকু বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় গ্রামসি আবিষ্কৃত ফ্যাসিবাদের সূত্রগুলির হাজিরা।
১। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও তার মাধ্যমে বলপ্রয়োগ —- যেভাবে যুবকদের, কর্মক্ষম দের জোর করে যুদ্ধে সৈনিক,শরিক করলো নাজিরা।
২। জনতার চিন্তাকে মতাদর্শগত নেতৃত্বের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে জনতার সম্মতি অর্জন, অস্ত্র হিসাবে জাতীয়তাবাদের ব্যবহার — বর্কহাউসেন লোকটির নাজি ও হিটলার ভক্তি। আর সব দেশ লুঠ করে, খুনাখুনি করে, নিজের দেশেরও অসংখ্য জান খুইয়ে দিয়ে জাতির বড়লোক হওয়ার বেদবাক্যে আস্থা।
গো পাঠিকা, হে পাঠক এখানে এসে রাম রাজত্ব ও আচ্ছে দিন আসছে'র প্রতিশ্রুতি ও তাতে ভকতদিগের আস্থার কথা মনে এলে, সেই দোষ কি নিতান্ত আমার? আমারই মনের?
যদিও আবহ অপর, স্থান-কাল ভিন্ন, তথাপি জাতীয়তাবাদের এই হেজিমনি পুঁজিবাদের, ফ্যাসিবাদের কি বিভৎস অস্ত্র তা স্পষ্ট জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাসে, বিশেষত “সাইক্লপস” অধ্যায়ে, যেখানে অন্তিমে এই হন্তারক জাতীয়তাবাদ কে একচক্ষু রাক্ষস সাইক্লপের সাথে মিলিয়েছেন জয়েস। সাইক্লপস অধ্যায়ের আরম্ভে আলোচ্য উপন্যাস Every man dies alone এর বর্কহাউসেন হেন পাব্লিক জমা হয়েছে শস্তা শুঁড়িখানায়। অধ্যায়ের অন্তে উগ্র জাতীয়তাবাদ নামের একচক্ষু রাক্ষস কে বিয়ার বাক্স ছুঁড়ে মারে লিওপোল্ড ব্লুম। তবে তার চেয়েও বেশি চিত্তাকর্ষক ও চিন্তা উদ্রেককারী তার আগের অংশ যেখানে চলছে আড্ডা। দিশী দারুর সঙ্গে, দিশী দারুর মতো বইছে জাতীয়তাবাদের ঘোলা জল।
Every man dies alone এর আরেকটি বিশেষ মাত্রা প্রতিরোধ। প্রতিবাদে অংশ নেওয়া। এখানে এসেও ইউলিসিস উপন্যাসের সাইক্লপস অধ্যায়ই মনে আসে। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের অর্বাচীন ও হিংস্র প্রলাপে ক্ষেপে যায় সাদাসিধা ব্লুম। যা হাতের সামনে পায় তা'ই ছুঁড়ে মারে ওই লোকগুলির দিকে। কিন্তু কেন? কি আশায়? এই প্রতীকী আক্রমনে সে কি সত্যই পারবে হোমারের ওডিসিয়াসের মতো গেলে দিতে ওই রাক্ষসের চোখ? না। ব্লুমও তা জানে। তবু ছুঁড়ে মারে প্রতিবাদের, প্রতিরোধের প্রতীক। কেন? ফিরে যেতে হয় Every man dies alone এ যেখানে বুড়া কোয়াঙ্গেল তার আর তার স্ত্রীর নাজি বিরোধী প্রতিরোধ-চেষ্টা, যা তাদের মৃত্যুদন্ডের হেতু, সেই মৃত্যুদন্ডাজ্ঞার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে সরকারি উকিল কেঃ “ কারণ আমি বোকা। কারণ এর চেয়ে ভালো কোনো বুদ্ধি, প্রতিরোধের প্রতিবাদের কোনো উপায় আমার মাথায় আসেনি। কারণ আমি ভেবেছিলাম—আপনার ভাষায় বলতে গেলে—ওগুলোর মাধ্যমে হয়তো কোনো কাজ হবে। ঠিক এই কারণেই কাজটি করেগেছি”।…।
আরম্ভেই এক ত্রাসের ইঙ্গিতঃ “মহিলা ডাকহরকরা ইভা ক্লুগ মন্থর পায়ে ‘ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ বাড়ির সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠছে। সারাদিনের দীর্ঘ ঘোরাঘোরিতে সে ক্লান্ত; সেই সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে ক্লান্তি আরো গাঢ় হচ্ছে কেননা সে জানে তার ব্যাগে এমন একটি চিঠি রয়েছে যে রকমের চিঠি পৌঁছে দেওয়াকে সে ঘৃণা করে। আজকের চিঠিটি আবার তার নিজেরই প্রতিবেশী দোতলায় বসবাসকারী কোয়াঙ্গেল দম্পতিকে পৌঁছে দিতে হবে”। — কি আছে এই চিঠিতে? কি থাকা সম্ভব? কৌতুহলের থেকে বেশী ত্রাস কেননা গ্রন্থটির আবহ জানা ছিল, জানা আছে আমাহেন অনেক পাঠিকা পাঠকেরই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বার্লিনে কি আর সংবাদ আনতে পারে চিঠি? হয় ফ্যাসিবাদী দের দ্বারা রটানো কোনো ভুল খবর যথাঃ “RUSSIA WAS ARMING FOR A SURPRISE ATTACK ON GERMANY” আর নাহলে তৎকালে পত্র, যুদ্ধমাঠ থেকে আসতো শুধুই মৃত্যুখবর নিয়ে। তাজা তরুণ তরুনীদের অপমৃত্যু খবর, যে অপমৃত্যুতে তাদেরকে ধরে নিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে দেশপ্রেমের নাম করে, নাম লেখানো হয়েছে সেনা দলে – ভয় দেখিয়ে। অতএব যুদ্ধমাঠ থেকে আসা টাইপ করে ঠিকানা লেখা পত্রে, প্রাপক যেখানে মাতা-পিতা যুদ্ধমাঠে যাওয়া এক যুবকের – তাতে ঠিক কি সম্বাদ থাকতে পারে তা মহিলা ডাকহরকরা ইভা ক্লুগ টের পেতে পারে। টের পাই আমরাও। পত্রটি নিয়ে ইভা ক্লুগের সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসবার আবডালে অঙ্কিত হতে থাকে ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ ফ্ল্যাট বাড়িটি ও তার আবহ। আশ্চর্য, এই আবহের সঙ্গে বিন্দুমাত্র ফারাক নেই অধুনাদিনের মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত আবাসন গুলির। ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ ফ্ল্যাট বাড়িতে অন্য অনেকের সঙ্গে বাস করে এক ইহুদী বৃদ্ধা। বাস করে নাকি ভীতিতে, ত্রাসকে যাপন করে প্রতি মুহুর্তে? ঠিক যেমন রাম মন্দির দাঙ্গাকালে হিন্দু পাড়ার দুই একঘর মুসলমান কিংবা হালে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা ঘিরে উন্মত্ত ডামাডোল কালে নানান ফ্ল্যাটে বাস করা দুটি তিনটি মুসলমান পরিবার। ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ ফ্ল্যাট বাড়ির তোরণে নাজি পতাকার মতোই গেরুয়া পতাকা ওঠেনি কি রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা কালে নানান আবাসনের তোরণে? আদতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সাম্রাজ্যবাদ যেমন অন্য চেহারা নিলো তারই নিয়মে যুদ্ধও আর মাঠে থাকলো না। হানা দিলো অন্দরে। ঘরে ঘরে।
মহিলা ডাকহরকরা ইভা’র, তখনকার এবং এখনকার আর দশজন আম জনতার মতোই, ছিলোনা কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু স্রেফ একজন মানুষী হওয়ার মূল্যে সে টের পেয়েছিলো, যে “গুলি খেয়ে মরার নিমিত্ত সন্ততির জন্ম দেওয়া হয়না”। এই গ্রন্থের প্রতিটি সচেতন চরিত্রই সাধারণ। তারা রাজনীতির নয়। রাজনীতি বোঝেনা। কিন্তু শুধুমাত্র মানুষ-মানুষী হওয়ার মূল্যে এটা টের পায়, যে, হিটলার ‘ফুয়েরার’ না। ‘নেতা’ না। কারোরই নেতা না হিটলার, কারোরই নেতা নয় ফ্যাসিবাদ। — এই অনুভবে থিতু হওয়ার নিমিত্ত খুব বেশী কিছু নয়, যুদ্ধ প্রস্তুতি পর্বে কোয়াঙ্গেলের ছোট কাঠের কাজের ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই ছিল কোয়াঙ্গেল দম্পতীর কাছে যথেষ্ট। অতঃপর টানা চার বছরের বেকারত্ব। পরে ১৯৩৪ সালে কোয়াঙ্গেল এক আসবাবপত্রের কারখানায় ফোরম্যানের চাকরি। এই অভিজ্ঞতা, এই রকমের অভিজ্ঞতাই তখনকার সাধারণ অভিজ্ঞতা। পুঁজি-বাজার দখল নিমিত্ত যুদ্ধ এবং যুদ্ধহেতু অর্থনৈতিক মন্দা থেকে আরম্ভ করে ভয় দেখিয়ে সেনা বাহিনীতে জুতে দেওয়া — সচল সমর্থদের, তরুন তরুনীদের, যুবক যুবতীদের —- একদিকে। অন্যদিকে নিয়ে যাদের দ্বারা এই যুদ্ধ ব্যবস্থার, এই পুঁজি ব্যবস্থার কোনো মুনাফা নেই, তাদের নিঃশেষ করে দেওয়া। কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে। — সেই সময়ের একমাত্র বাস্তব।
সেই সময়ের?
এই অভিজ্ঞতা নয় কি এই সময়েরও?
অবশ্যই। সেই কালে ইহুদী নিধনান্তে আচ্ছে দিন আনবার প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে এই মুহুর্তে রাম রাজত্বের প্রতিশ্রুতি।
ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ ফ্ল্যাট বাড়ি’র বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে নাজি সর্দার, রয়েছে নাজিত্বের ধ্বজা ধরা অকর্মণ্য, রয়েছে নাজিবাদ ফ্যাসিবাদ কে আমর্ম প্রত্যাখ্যান করা রিটায়ার্ড হাকিম, রয়েছে কোয়াঙ্গেল দম্পতী, ইভা ক্লুগ, রয়েছে যুবা ও বালিক নাজি বাহিনীর যাউবা ও বালকগণ। কেউ-ই নেই মস্তিতে। আমর্ম নাজিত্ব-ফ্যাসিত্ব কে প্রত্যাখ্যান করা, হিটলারের “পার্টি” তে নাম না-লেখানো বা নাম কাটিয়ে আসা মানুষেরা, ইহুদীরা তো ভীতই। নাজিত্বের ধ্বজার নিচে দাঁড়িয়ে নিজেদের ধান্দা, আখের গোছানোর লোক গুলিও কি আছে মস্তিতে? না। এরাও ভীত। ভীত কারণ রাষ্ট্রের সন্ত্রাসের ভোল পাল্টাতে পারে যে কোনো মুহুর্তে। যে কোনো সুবিধাভোগী জান নিকলে নিতে পারে অন্য সুবিধাভোগীর।
২। “ … Then they came for me, And there was no one left, To speak out for me” – Martin Niemöller
আদতে, ত্রাসের, রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা লালিত, চালিত সন্ত্রাসের কারণ আর চেহারা-কাঠাম সতত সর্বত্র এক। একই। আপাত ভাবে সেগুলিকে রাষ্ট্র হাজির করে একেকটি মোড়ক দিয়ে। কিন্তু অন্দরে উৎপাদন আর বন্টনের মধ্যে ক্যাপিটালিজমের সহজাত যে দ্বন্দ্ব তার উপর যখন নিয়ন্ত্রণ হারায় কিংবা হারিয়ে ফেলবার সম্ভাবনা লক্ষ্য করে শাসক শ্রেণী তখনই নামিয়ে আনে ত্রাস। জনতার উপরে সন্ত্রাস। ইন্দিরা গান্ধীর ইমার্জেন্সি আমলে, ইন্দিরা-সিদ্ধার্থ রায় - জ্যোতি বসুর নকশাল ছাপ্পার আবডালে লাগামছাড়া যুবখুনের আমলে ছিলাম নিতান্তই শিশু। তথাপি হয়তো যদি বাসিন্দা না হতাম প্রত্যন্ত মফস্বলের, নগরে বন্দরে বসত হলে শিশুচোখেও কি পড়তো না রক্তছিঁটা?
আসামের প্রত্যন্ত মফস্বলের এক ন্যালাখেপা বর্ডার শহর। সম্বল দুটি পাঁচটি ইস্কুল কলেজ, একটি হাসপাতাল, দুই তিনটি ব্যাংক আর শুধু তেমন কিছু অফিস কাছারি — যেগুলি নাহলে রাষ্ট্র ট্যাক্স পায়না — শুধু সেগুলিই। আর অবশ্যই থানা পুলিশ। বর্ডারটাউন হওয়ার সুবাদে উপরি পাওনা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। উৎসব বলতে দুর্গাপূজা, ঈদ, বরদিন। উদযাপন বলতে দুটি নদী –-- লঙ্গাই, কুশিয়ারা। এই সহজ সরল যাপনছবির আবডালে অবশ্যই ছিল হিংসা,দলাদলি, জাতাজাতি, হাফপ্যান্টরাও ছিল ঘাপটি মেরে। তবু মিলাদ মেহফিলের নিমন্ত্রণ সাইকেল রিক্সায় মাইক লাগিয়ে জানানো যেতো পাড়ায় পাড়ায়, নিরাপদে। বিজয়া সম্মেলনের নাটকে অভিনয় করতো মুসলমান দাদারাও, আসতো সরস্বতী পূজায়। প্রতি বচ্ছর যিশু আগমনের প্রাক্কালে বাড়ি বাড়ি এসে যিশু মহিমা, গান, যিশু-বই দিয়ে যেতো লোকাল গীর্জার পাদ্রী, সদলে।
প্রথম ত্রাসের অভিজ্ঞতা, আমার, ১৯৮৪ সালে। ইন্দিরা নিধনের বদলার নামে শিখ বিরোধী দাঙ্গা ছড়ালো দেশ জুড়ে। উগ্রপন্থী শব্দের আবডালে Ethnic cleansing আদতে চলছিল পাঞ্জাবে, মনিপুর, নাগাল্যান্ড — প্রায় সর্বত্র। সরাসরি না হলেও পত্রপত্রিকায়, বাবাজ্যাঠাদের আলোচনার থেকে ছিটকে আসা বাক্যাংশে টের পাচ্ছিলাম চাপ। টেনশন। টের পেলেও সমস্তটা বুঝবার কথা নয় ছয়ের কোঠায় পড়ার বয়সে। তার ফলে ভয় ভয় ছিল আরো বেশি। ইন্দিরা নিধন খবর প্রথম নিয়ে এল থমথম। আমাদের শহরে একমাত্র পাঞ্জাবের মানুষ এক ব্যাংক ম্যানেজার। এই মানুষটিকে কেউ বা কারা দিলো বাঁচিয়ে। তাকে খুঁজে পেলোনা দাঙ্গা-উৎসুক গুন্ডারা। তাদের রাগ গিয়ে পড়লো “কমিনিস্ট” দের উপর। “মারো শালাদের…”। হ্যাঁ, আমার বাবা ঘোষিত কমিনিস্ট। ফলে ডরভয় আরো বেশি ঘিরলো। ইতিমধ্যে পাশের শহরে, সেন্ট্রাল ইস্কুলের বাস আটকে পাঞ্জাবি বাচ্চাদের ধরে পেটানো হয়েগেছে। সম্ভবত কারফিউ হয়েছিল শিলচরে। — সেই প্রথম কারফিউ, ১৪৪ ধারা, Ethnic cleansing শব্দগুলি কাগজ থেকে, অক্ষর থেকে রক্ত মাংসের অবয়ব নিতে আরম্ভ করলো মগজে। এও যেন টের পাওয়া গেলো “দাঙ্গা” থামাতে কিংবা “উগ্রপন্থী” দমন হেন “মহান” কারন বশতও যদি হয়, তাহলেও কারফিউ, ১৪৪ ধারা — ত্রাস। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। আবছা হলেও “কেন স্বায়ত্তশাসন চাওয়ার অর্থ সন্ত্রাসবাদ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদ”, “কেন স্বাধীন দেশের মিলিটারি, পুলিশ এই দেশেরই মানুষকে মারবে” হেন প্রশ্ন দানা বাঁধতে আরম্ভও করেনি কি নিজেদের অজান্তেই?
অতঃপর ১৯৮৬ সাল। দেখলাম ত্রাসের, সন্ত্রাসের নগ্ন চেহারা নিজের চামড়াচোখে।
এই পর্বে সন্ত্রাসের প্রচ্ছদে ভাষা। ভাষিক আগ্রাসন। অসমীয়া উভ্র জাতীয়তাবাদ — শাসকদলের মদতপুষ্ট, গেরুয়া- হাফপ্যান্টের যোগসাজশ হৃষ্ট। তবে ভাষা, সততই প্রতীক। আগ্রাসনের প্রতীকমাত্র। নিজেদের শোষক-মুখ শুধু শাসকের মলাটে ঢেকে ফেলা অনেক ক্ষেত্রেই পুঁজিবাদের অত্যন্ত জরুরি অস্ত্র। পুব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে জনসম্পদ সমস্তই আদতে পশ্চিম পাকিস্তানের — এই মূলকথা টিকে পুব পাকিস্তানের জনতার কপালে লিখে দেওয়ারই পরোক্ষ পন্থা তাদের উপরে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা চাপানো। ঠিক যেমন প্রতিটি রাজ্যই আদতে দিল্লির উপনিবেশ তা'ই প্রতিষ্ঠা করতে হিন্দি চাপানো। একই ভাবে বরাক উপত্যকা মূলত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কেনা গোলাম — জাহির করবার দরকারে অনসমীয়া প্রধান বরাক উপত্যকায় অসমীয়া ভাষা চাপানোর দীর্ঘ চেষ্টা শাসকদলের। তারই ফসল আসাম চুক্তি যার মূল কথাগুলি এইঃ
১। নাগরিকত্বের সময়সীমা: ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চের পর যারা অসমে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২। ভোটার তালিকা: ভোটার তালিকা থেকে বিদেশি নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়া।
৩। সীমান্ত নিরাপত্তা: আরও অবৈধ অভিবাসন রোধে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে সুদৃঢ় করা।
৪। সাংবিধানিক সুরক্ষা (ধারা ৬): অসমীয়া জনগণের সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও সামাজিক সত্তার সুরক্ষা।
৫। অর্থনৈতিক উন্নয়ন: অসমের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ।
সরল কথায় CAA/NRC র পূর্বসুরী এই অসম চুক্তি মূলত চায় বেগার খাটা লেবার — যাদের ভোটাধিকার নাই, যারা নেই-ই কাগজে পত্রে। কিন্তু তারা রয়েছে রক্তমাংসে। তাদের শ্রমে ফায়দামন্ডিত হচ্ছে পুঁজি।
এই চুক্তি ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারত সরকার, আসাম সরকার এবং আসাম আন্দোলনের, যে আন্দোলন আদতে উগ্র জাতীয়তাবাদের, নেতৃবৃন্দ—মূলত ‘অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ (AASU) ও ‘অল আসাম গণ সংগ্রাম পরিষদ’ (AAGSP)—এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় তাতেই প্রবিবাদে ফেটে পড়ে অনসমীয়া অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা। ১৯৮৬ র ২১ এ জুলাই উগ্র জাতীয়তাবাদী মুখ্যমন্ত্রী, অসম গণ পরিষদের, করিমগঞ্জ এ আসাকে ধিক্কার জানাতে জমায়েত, তাতে চল্লো গুলি। গেলো দুটি জান। আর সঙ্গে সঙ্গে নেমে এলো ক্রেকডাউন। কারফিউ। ধরপাকড়। ঠিক সত্তর দশকের ইন্দিরা - সিদ্ধার্থ রায় — জ্যোতি বসু কায়দায় অথবা পাঞ্জাবে Ethnic cleansing কালে পুনঃ সিদ্ধার্থ রায়ের কায়দায় চল্লো ধড়-পাকড়। চল্লো অত্যাচার, যথারীতি যুব সমাজের, ছাত্র সমাজের উপরেই। নিস্তার পেলোনা গায়ে গতরে বাড়ন্ত কিশোর কিশোরীরাও। যত্রতত্র পালাতে লাগলো যাদের পালানোর সংস্থান ছিল, তারা। বাকিরা রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হলো। ঘরে ভয়, ভয়-ভয়। বাইরে ত্রাস। হাটবাজারের নিমিত্ত ঘন্টা দুই তিন কারফিউ উঠে গেলে রাস্তায় নামা চেনা পরিচিত মুখ গুলিও ভয়ের, সন্দেহের মুখোশে যেন “ ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মতো, ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে —
“মশালের আলোয় ছায়ায় তাদের মুখে বিভীষিকার উল্কি পরানো”। রাষ্ট্র-সন্ত্রাসের একটি দিক নির্যাতন। তুলে নিয়ে যাওয়া। আতকা করে কারোর গায়েব করে দেওয়া। অনতিকাল পরেই লাশের ভেসেওঠা অথবা পরে থাকা মাঠে ময়দানে। বিশেষ জনগোষ্ঠীর তল্লাটে হঠাৎই মধ্যরাত্রে অগ্নিকান্ড কিংবা বুলডোজারের হানা। – এ’ই রাষ্ট্র। সমান্তরালে নির্মিত হতে থাকে সন্দেহের, ভীতির কুয়াশা। এই সন্দেহ পরস্পরকে প্রতিবেশীকে সহকর্মী সহপাঠী কে। কেউ কিছু বলছেনা কাউকে। কেউ কেউ কিছু বললে, বলে ফেললে — সে বলায় বেফাঁস কিছু — যেমন ১৯৮৬ সালের জুলাই মাস কে উদাহরণ নিলে বরাক উপত্যকায় অগপ সরকার কিংবা অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদ বিষয়ে কিছু — যে শুনলো, যারা শুনলো সকলে প্রত্যেকে শুনিনি-শুনিনি ভেক ধরে চলে যায়। কারফিউ-রাত্রি ধরে চলে যায় পুলিশ-গাড়ি, আর্মি ট্রাক। অন্দর থেকে বুক কাঁপে। কখনো গাড়ি থামবার আওয়াজ কানে এলে কান খাড়া।
কেন থামলো?
পুলিশ ঢুকলো কার বাড়িতে ?
ঢুকলো কাউকে তুলে নিতে নাকি ঢুকলো কোনো চুকলিখোরের কাছ থেকে পেটের খবর নিতে?
কে চুকলিখোর?
কে নয় চুকলিখোর?
কেউ ই কি আদতে চুকলিখোর?
৯০ সালের ত্রাসের চেহারা গেলো বদলে। রাষ্ট্রীয় ত্রাস গাঁটছড়া বাঁধলো, বেশিরভাগ রাজ্যেই, ধর্মীয় ত্রাসের সঙ্গে। রাষ্ট্র হয় রক্ষক পুঁজি আর পুঁজিপতির। তা'ই রাষ্ট্রের সংজ্ঞা। ৯০ এ পুঁজি নিচ্ছে নিও লিবারেলি মোড়। একদল পুঁজিপতি টের পেয়ে গেছে এই মোড় ঘুরবে কোন দিকে। ফলে বহুক্ষেত্রে সরাসরি, প্রকাশ্যে তারা দাঁড়িয়ে গেছে ধর্মীয় সন্ত্রাসের কিনারে। অতএব তাদের আজ্ঞাপালনকারী রাষ্ট্রও হাতে হাত মিলিয়ে চালাচ্ছে হিন্দু-সন্ত্রাস নাহলে মদত দিচ্ছে গেরুয়া সন্ত্রাসে। লালকৃষ্ণ আদবানীর রথ চলেছে দাঙ্গা ছড়াতে ছড়াতে।
ঢেউ আছড়ে পরেছে আমাদের প্রত্যন্ত মফস্বলে, তার কিনারের হবু নগর শিলচরে। সেই সময়ই আমার ভর্তি হওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আর না-গেরুয়া বলে, ছাত্ররাজনীতিতে প্রকাশ্য বামপন্থী বাম বলে র্যাগিং এর নামে অকথ্য মার খাওয়া।
র্যাগিং পিরিয়ডেও লক্ষ্য করলাম ধর্মের প্রতাপ, জাতের প্রতাপ। উত্তর দক্ষিন দুই ভারতেরই জাত বিদ্বেষ — আপার বনাম লোয়ার। মুসলমান বিদ্বেষে উত্তর আর উত্তরপূর্ব সর্বাগ্রে। আমরা যারা র্যাগিং-শিকার তাদের মধ্যে র্যাগিং ভীতি তো আছেই, নিজেদের মধ্যেও ভীতি — জাতের, জাতির। রথ সহ আদবানি যখন আটক হলো, ছড়ালো দাঙ্গা। সেই সকল দাঙ্গায় করিমগঞ্জ শিলচর হাইলাকান্দিতে গেরুয়া সন্ত্রাসে রাষ্ট্র স্পষ্ট শরিক। রাষ্ট্রের এই গেরুয়া ভূমিকার আগ্রাসী রূপ দেখা গেলো ৯২ সালে। বাবরি মশজিদ ধ্বংসের ডাকে এবং তার বাস্তবায়নে। দাঙ্গা এবার দাউদাউ। সারা দেশে। করিমগঞ্জ শিলচর হাইলাকান্দিতে।
এই সকল দাঙ্গাও যে রাষ্ট্রেরই, রাষ্ট্র যন্ত্রেরই নির্মাণ, সমস্ত দাঙ্গাই যে পুঁজির, পুঁজিপতি র নানা রকম অভীষ্ট সিদ্ধি নিমিত্ত — এই সত্য বহু আলোচিত, বহু ব্যাখ্যিত। তাই বিস্তারে না গিয়ে উদাহরণ হিসাবে শুধু বলি ইহুদি নিধন যজ্ঞের কথা, বলি জায়নিস্ট দিগের দিনগত গাজা গণহত্যার কথা।
৯২ এ'ও সেই কারফিউ। সেই আর্মিগাড়ি, ফ্লেগমার্চ, ভীতি, সন্দেহ। কি চায় আর্মি গাড়ি? দাঙ্গা থামানো? দাঙ্গা সম্ভাবনার বিনাশ? নাকি দাঙ্গায় গেরুরা-জিত নিশ্চিত করা? শনাক্ত করা সেই সকল ব্যক্তিকে, সংগঠন কে যারা আদতেই অসাম্প্রদায়িক — সামাজিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে? এরাই তো পরে হয়ে উঠতে পারে সর্বাত্মক গেরুয়া রাজনীতির প্রতিবন্ধক। ফলে চিনে নাও। দাও কোমর ভেঙ্গে। –--- একদিকে রাষ্ট্রের এই ভূমিকা, আরেকদিকে দাঙ্গা আর দাঙ্গা-রাজনীতির খাতে বিক্রি হয়ে যাওয়া মগজহীন খুলিদিগের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভীতি। যে ভীতি পূর্ন রূপ পেলো ২০০২ সালে, গোধারা গণখুনে, যে গণখুনের দামে গেরুয়া সন্ত্রাসই হয়ে গেলো রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র পরিকল্পিত আঘাত হানলো, জনতাকে, ২০১৯-২০ তে,CAA/NRC র মোড়কে। CAA/NRC নিয়ে, তার আদত ধান্দা নিয়ে, দেশবাসীর প্রতিক্রিয়া ও তার প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় অবদমনের, সন্ত্রাসের বিষয়ে নতুন করে কিছু বলবার নেই। বলবার কথা ৮, যে, সেই যা ৮৬ তে আবছা টের পেয়েছিলাম, তারই বিভৎসতম ছবি দেখা যেতে লাগলো ২০১৪ সাল থেকে। রাষ্ট্রের চরত দের দ্বারা তুলে নিয়ে যাওয়া রাষ্টের, পুঁজিতন্ত্রের কাছে যে, যারাই বিপজ্জনক তাকে, তাদেরকে। আতকা করে কারোর গায়েব হয়ে যাওয়া। লাশের ভেসেওঠা। বিশেষ জনগোষ্ঠীর তল্লাটে আগুন। ইত্যাদি। এর সমান্তরালে সন্দেহের, ভীতির কুয়াশা। এই সন্দেহ পরস্পরকে প্রতিবেশীকে সহকর্মী সহপাঠী কে। কেউ কিছু বলছেনা কাউকে। কেউ কেউ কিছু বললে, বলে ফেললে — সে বলায় বেফাঁস কিছু — জাতীয়তাবাদ বিষয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ প্রকাশ— যে শুনলো, যারা শুনলো তাদের এক দেড়জন শুনিনি-শুনিনি ভেক ধরে যদিবা চলে যায়, ঢের বেশিজন গলা মিলায় রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের সপক্ষে। দরকার পড়েনা কারফিউ ঘোষণারো। রাত্রি ধরে চলে যায় পুলিশ গাড়ি, আর্মি গাড়ি। অন্দর থেকে বুক কাঁপে। কখনো গাড়ি থামবার আওয়াজ কানে এলে কান খাড়া।
কেন থামলো?
কার বাড়িতে ঢুকলো?
ঢুকলো কাকে তুলে নিতে নাকি ঢুকলো কোনো চুকলিখোরের কাছ থেকে পেটের খবর নিতে? কে চুকলিখোর?
কে নয় চুকলিখোর?
কেউ-ই কিয়াদতে চুকলিখোর?
CAA/NRC, দাঙ্গার প্রতিপক্ষে যারা সোচ্চার তাদের তো বটেই যাদেরই রাষ্ট্র সন্দেহ করছে গেরুয়া বিরোধী বলে অথবা যাদের উপরে তাদের নজর সম্পূর্ণ ভিন্ন কারনে, হতে পারে সে নজর স্রেফ ব্যক্তিগত, কোনো নেতার, কোনো মন্ত্রীর, অফিসারের তাকেই, তাদেরকেই নিয়ে যাচ্ছে তুলে।
এখান থেকে ১৯৩৪ এ তাকালে দেখা যায় গেস্টাপো-ভীতিতে পলাতক এই লোকটিকে, শোনা যায় এই বাক্যালাপঃ
“তুমি গেস্টাপোদের বানানো বিবৃতিতে সই করলে ? এতে তুমি বাঁচিয়ে দিলে ওই মানুষটিকে যে চালাচ্ছে প্রতিরোধ চেষ্টা। তুমি সত্যই তোমার সাহসী। আমার মনে হয় না দশজনের মধ্যে একজনও এমন কাজ করার মতো সাহস বা মানসিকতা রাখত। তবে যদি তারা তোমাকে ধরে ফেলে, তাহলে বিপদ।—ওই বিবৃতি এখন ঝুলছে তোমার মাথার ওপর ঝুলছে”। বলে মহিলা।
পালাতে থাকা পুরুষটি কিছুটা আশ্বস্ত। সে বলে, “তুমি যদি আমার পাশে থাকো, সাহায্য করো, তাহলে তারা আমাকে কখনোই খুঁজে পাবে না!”
কিন্তু মহিলাকে দেখা গেলো চিন্তিত। মহিলা বল্লোঃ “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তারা কেন তোমাকে ছেড়ে দিল … ছেড়ে দিয়া তারা হয়তো তোমার ওপর নজর রাখছিল, যাতে তুমিই তাদের অন্য কারও কাছে নিয়ে যাও…”। তারপর পুরুষটির কানে ফিসফিস করে বলল: “আমি এখন আধঘণ্টার জন্য বাইরে যাচ্ছি, হ্যান্সেন; বাইরে কোথাও কোনো গুপ্তচর লুকিয়ে আছে কি না, তা একবার দেখে আসব। আর তুমি—তুমি কি এখানে চুপচাপ একা থাকতে পারবে?” মহিলার মর্মে তখন কায়া নিচ্ছে সেই ভয়াবহ স্মৃতি—যখন একবার তারা তার ফ্ল্যাট থেকে, তার জীবন থেকে এক ব্যক্তিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল।”
৩। “‘Mother! The Führer will murder your sons too..”
“মহিলা ডাকহরকরা ইভা ক্লুগ মন্থর পায়ে ‘ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ বাড়ির সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠছে। সারাদিনের দীর্ঘ ঘোরাঘোরিতে সে ক্লান্ত; সেই সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে ক্লান্তি আরো গাঢ় হচ্ছে কেননা সে জানে তার ব্যাগে এমন একটি চিঠি রয়েছে যে রকমের চিঠি পৌঁছে দেওয়াকে সে ঘৃণা করে। আজকের চিঠিটি আবার তার নিজেরই প্রতিবেশী দোতলায় বসবাসকারী কোয়াঙ্গেল দম্পতিকে পৌঁছে দিতে হবে”। … অতঃপর চিঠিটি পৌঁছেছিল। চিঠিতে ছিল কোয়াঙ্গেল দম্পতীর পুত্র হননের সম্বাদ। তারপর দিনগুলি রাতগুলি, প্রতিটি দিন, প্রত্যেকটি রাত্রি যেন দশক, যেন শতকের মতো কেটে গেছে। শুধু কোয়াঙ্গেল দম্পতির কিংবা
‘ইয়াবলোনস্কি স্ট্রাসে ৫৫’ বাড়ির কিংবা তার আশেপাশের মানুষজনেরই নয়, বার্লিনের, সারা বিশ্বের। যুদ্ধমাঠে, না-যুদ্ধ মাঠে, ঘরে, ঘরে ঘরে, দেশে দেশে ঘটেগেছে সংখ্যার অতীত হনন।
কিন্তু শুধু কি হনন? শুধু কি নাজিত্বের, ফ্যাসিত্বের আগ্রাসন ও জয়?
তা নয়।
তা নয় কারন তা হতে পারেনা।
বিজ্ঞানের সত্য বলে ক্রিয়ার সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ায় কথা। সমাজ বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ধারাও দ্বান্দ্বিকতার কথা। আগ্রাসনের প্রতিপক্ষে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ, প্রতিবাদ। গড়ে ওঠে ব্যারিকেড। প্রকাশ্যে, আবডালে। সারা বিশ্বে। তার কাছেই তো অন্তিমে পরাস্ত হতে হয়, হতে হবে পুঁজিবাদকে, পুঁজিবাদের পূঁজ ফ্যাসিবাদকে। অবশ্যই সচেতন সংহত প্রতিরোধ যা বিদ্রোহ হয়ে ক্রমে বিপ্লবে রূপান্তরিত হতে পারে একমাত্র সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে। এই সামগ্রিক উত্থান, আদতে কোয়ান্টিটির দ্বারা কোয়ালিটির পরিবর্তন। বিদ্যুতের কিংবা অন্য চুম্বক টুকরার সহবাসে লোহার চুম্বক হয়ে যাওয়ার আবডালে তার আনবিক গঠনের, আনবিক গতির পরিমাণগত পরিবর্তনে লোহা টুকরার গুনগত পরিবর্তন। খন্ড খন্ড প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গুলিও একই ভাবে একত্র সংহত হলেই, পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটে যায়। তা'ই আনে গুণগত পরিবর্তন, জনতার। — এ যেমন প্রমাণিত সত্য, খন্ড খন্ড মিলে পুরো হয়ে উঠবার, পার্ট টু হোল, তেমনি পুরো থেকে খন্ডকে, টুকরো কে, হোল থেকে পার্টে যাওয়াও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদেরই আরেক সূত্র, আরেক সত্য। এই সত্যেই উদযাপন প্রতিটি খন্ড খন্ড ছোট ছোট তবু আন্তরিক প্রতিরোধে প্রতিবাদে যেমন প্রতিরোধ আমরা দেখেছি পূর্বে আলোচিত জেমস জয়েসের ইউলিসিসের সাইক্লপস অধ্যায়ে।
পুত্রের হনন খবরের পরে, কয়েক রবিবার পরে এক রবিবারে অটো কোয়াঙ্গেল ঘোষণা করলো “আজকের এই রবিবার আগের আর কোনো রবিবারের মতো না । আগের রবিবারের মতো রবিবার গুলি চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।”
বল্লো। উঠে দাঁড়াল এবং ঘর থেকে বার হতে গেল। কিন্তু আজ তার পত্নী তাকে গত কয়েকদিনের মতো রহস্যময় ভাবে বেরিয়ে যেতে দিল না। তার পিছু পিছু গেল। আটকালো পতীকে।
দুইজনে একত্র ফিরলো কোঠায়।
অটো সোফায় তার নির্দিষ্ট জায়গায় বসে পড়লে তার পত্নী অ্যানাও বসলো তার কিনারে।
সে-ও তার পাশে গিয়ে বসল।
“যদি কেউ কলিং বেল বাজায়, অ্যানা, আমি না বলা পর্যন্ত দরজা খুলো না...”।
“আরে ছাড়ো তো অটো, এমন সময়ে কে আবার বেল বাজাতে আসবে? আজ আমাকে তুমি সব বলো। খুলে বলো”।
“আমি তোমাকে বলব, অ্যানা,” অটো তার স্বভাববিরুদ্ধ নম্র স্বরে উত্তর দিল। “কিন্তু তুমি যদি আমাকে চাপ দাও, তবে আমার কাজটা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।” সে তার হাতটা ছুঁল—এমন এক মানুষের হাত, যার পক্ষে নিজের মনের কথা প্রকাশ করা সবসময়ই কঠিন ছিল। “আমি তোমাকে চাপ দেব না, অটো,” শান্ত স্বরে বলল অ্যানা “তুমি সময় নাও।”
কিন্তু অটো কথা বলতে শুরু করল তখুনি। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে সে কথা বলে গেল—ধীর, সংক্ষিপ্ত ও অত্যন্ত ভেবেচিন্তে বলা সব বাক্য; আর প্রতিটি বাক্যের শেষে—যেন সেটাই ছিল তার শেষ কথা—সে মুখটা অনমনীয়, শক্ত।
শুনলো অ্যানা।
গত কিছুদিন ধরে অটোর রহস্যময় আচরণ দেখে, দেখে দেখে অ্যানা ভেবেছিল অটো নিশ্চিত ভাবছে
বড় কোনো কাজের কথা ভাবছে (এবং তা নিয়ে ভীতও ছিল অ্যানা): ফিউরারকে হত্যার চেষ্টা, অথবা অন্ততপক্ষে পার্টি ও তার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয় সংগ্রাম।
পরিবর্তে অটো যা বলছে…। অ্যানার ভাবনায় এ যে নিতান্তই সামান্য। হাস্যকরও কি?
ফিউরার ও নাৎসি পার্টির বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা কিছু পোস্টকার্ড—সহনাগরিকদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে—এটুকুই।
এই কার্ডগুলি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পাঠানো হবেনা, পোস্টারের মতো দেয়ালেও সাঁটিয়েও দেওয়া নয়, শুধু ভিড়ের, জনসমাগমের কোনো জায়গায়, আবাসনে, সুপার মার্কেট ইত্যাদির সিঁড়িতে ফেলে রেখে আসা। এরপর সেগুলির ভাগ্যে কী ঘটবে—কে সেগুলি কুড়িয়ে নেবে, কোথায় যে সেগুলি স্রেফ পায়ের নিচে পিষ্ট হবে কিংবা ছিঁড়ে ফেলা হবে—কেজানে।
যুদ্ধের এই পরোক্ষ পদ্ধতিতে অ্যানার মন সায় দিলোনা। সে সক্রিয় কিছু চেয়েছিল, এমন কিছু করতে চেয়েছিল যার ফলাফল নিজের চোখে দেখা যায়!
কিন্তু কথা শেষ করার পর কোয়াঙ্গেল আত্মমগ্ন। নিজের সঙ্গেই যেন এক নীরব দ্বন্দ্বে লিপ্ত।
অ্যানা উঠে দাঁড়াল এবং কোনো শব্দ শোনা যায় কি না, তা বুঝবার জন্য দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ফিরে এসে টেবিলক্লথটি আবার সরিয়ে ভাঁজ করল এবং সাবধানে একটি চেয়ারের পিঠের ওপর ঝুলিয়ে রাখল। অটো উঠে পুরনো মেহগনি কাঠের আলমারিটির কাছে গেল, পকেট থেকে চাবির গোছা বের করল এবং সেটি খুলল। তখুনি অ্যানা, যদিও তার স্বরে কুন্ঠা ছিল তবু সে বলল, “অটো, তুমি যে কাজটা করতে চাইছ, সেটা কি অতি নগণ্য একটি প্রয়াস নয়?”
ঘাঁটাঘাঁটি থামিয়ে, ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই অটো স্ত্রীর দিকে মুখ ফেরাল।
“কাজটা বড় হোক বা ছোট, আনা,যদি ওরা এই ব্যাপার টের পেয়ে যায়, হাহলে তার মাশুল দিতে হবে আমাদের জীবন দিয়ে...”।
অটোর কথাগুলির মধ্যে এবং তার গভীর, অতলস্পর্শী ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এমন এক জোরালো বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল যে আনা শিউরে উঠল। মুহূর্তে সে স্পষ্ট দেখলো ধূসর, পাথুরে কারাগারের আঙিনা আর প্রস্তুত হয়ে থাকা গিলোটিন—ভোরের আবছা আলোয় যার ইস্পাত ছিল ম্লান,নিস্তেজ; যেন এক নীরব হুংকার।
আনা কোয়াঙ্গেল অনুভব করল তার শরীর কাঁপছে। তারপর সে আবার অটোর দিকে তাকাল। হয়তো ও ঠিকই বলছে: কাজটা বড় হোক বা ছোট, নিজের জীবনের চেয়ে বড় ঝুঁকি আর কী-ই বা হতে পারে? প্রত্যেকেই নিজের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে, কিন্তু আদত কথাটি হলো—তুমি প্রতিরোধ গড়ে তুলছ।
অটো কোয়াঙ্গেল তখনও নিঃশব্দে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে। যেন সে আনার গহনের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করছে । পলকে অটো উজ্জ্বল। বল্লো “তবে ওরা অত সহজে আমাদের ধরতে পারবে না। ওরা যদি ধূর্ত হয়, আমরাও হতে পারি ধূর্ত! ধূর্ত আর সতর্ক। সতর্ক থাকতে হবে, আনা, সবসময় সজাগ থাকতে হবে—যতদিন আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব, ততদিনই আমাদের কাজের প্রভাব বজায় থাকবে। অকালে প্রাণ দিয়ে কোনো লাভ নেই। আমরা বাঁচতে চাই, ওদের পতন যখন ঘটবে তখন আমরা বেঁচে থাকতে চাই। আমরা বলতে চাইব, ‘আমরাও ওই প্রতিরোধে ছিলাম আনা!’”
গো পাঠিকা, হে পাঠক, ‘আমরাও ওই প্রতিরোধে ছিলাম’’ এর আরেক অর্থ কি এ'ই নয়, যে,
অন্তত আমি নিজের সততাটুকু তো বজায় রেখেছিলাম.. আমাদের চারদিকে ঘটে যাওয়া বদমাইশিতে অংশ নিইনি”? … এইভাবে লিখিত হয়েছিল তাদের প্রথম কার্ডের প্রথম বাক্যটি ‘মা! ফুয়েরার আমার সন্তানকে খুন করেছে।’ বাক্যটি উচ্চারণ করলো অটো আর শোনামাত্র শিউরে উঠল আনা। ওটোর বলার মধ্যে ছিল এক গভীর বিষাদ, এক অন্ধকার আর এক অটল সংকল্প। ঠিক সেই মুহূর্তে আনা টের পেলো যে, এই প্রথম বাক্যটিই ওটোর যুদ্ধ ঘোষণার এক চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ—আর এই যুদ্ধের অর্থঃ একদিকে তারা দুইজন—দরিদ্র, সাধারণ ও নগণ্য শ্রমিক, যাদের অস্তিত্ব কেবল দুই একটি কথার জোরেই মুছে ফেলা সম্ভব; আর অন্যদিকে ফুয়েরার, নাৎসি পার্টি এবং তাদের সমস্ত ক্ষমতা ও প্রতাপসহ সেই বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্র, যার পেছনে রয়েছে জার্মান জনগণের তিন-চতুর্থাংশ বা এমনকি চার-পঞ্চমাংশ মানুষ।
ওটো তখন প্রথম বাক্যের তৃতীয় শব্দটিতে। অসীম ধৈর্যে সে ‘ফুয়েরার’ (Führer) শব্দটির বড় হাতের ‘F’ অক্ষরটি আঁকছে।
তাদের সন্তানের হত্যা দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা, সেই যুদ্ধের প্রথম পোস্টকার্ডটি তাকে নিয়েই লেখা হচ্ছে—এটাই তো যথার্থ। একসময় তাদের একটি ছেলে ছিল; ফুয়েরার তাকে হত্যা করেছে; আর এখন তারা পোস্টকার্ড লিখছে। তাদের জীবনে এক নতুন অধ্যায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কিছুই বদলায়নি। কোয়াঙ্গেল দম্পতির চারপাশটা একদম শান্ত। কিন্তু ভেতরে সবকিছুই বদলে গেছে, তারা এখন এক যুদ্ধে লিপ্ত...।
লিখিত হলো দ্বিতীয় বাক্যট৮। ‘মা! ফুয়েরার তোমার ছেলেদেরও খুন করবে; পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে সন্তান শূন্য না করা পর্যন্ত এরা থামবে না।’
৪। “ O bella ciao, bella ciao, bella ciao ciao ciao, And if I die as a partisan You have to bury me”
মূল কাহিনী এগিয়ে চলে অটো আর আনার সঙ্গে সঙ্গে। চলে প্রতিরোধের পোস্টকার্ড ছড়িয়ে দিতে দিতে। সমান্তরালে চলে অন্য চরিত্ররা নিজ নিজ কাহন নিয়ে। কাহিনীতে হানা দেয় পুলিশ, গেস্টাপো, রাষ্ট্র। দেখি অটো-আনার নিহত পুত্রের বাগদত্তাকে, তার প্রতিবাদ ইচ্ছাকে, দেখি তার জিজীবিষাকে। দেখি বিধবা হেটি হাবারলেকে যার প্রথম স্বামী ছিল কমিউনিস্ট পার্টির একজন সাধারণ কর্মকর্তা আর সেই কারনে ১৯৩৪ সালের প্রথম দিকেই গেস্টাপোর দ্বারা ক্যাম্পে বন্দী। বন্দী স্বামীর আর কোনো খবরই পায়নি হেটি হাবারলেকে। পরে এসেছিল ছেঁড়া ও নোংরা জিনিসপত্র ভর্তি একটি পার্সেল আর পার্সেলটির উপরে ছিল ওরানিয়েনবার্গের রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জারি করা একটি মৃত্যু সনদ, যেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা ছিল: নিউমোনিয়া। পরে, মুক্তি পাওয়া অন্য বন্দীদের কাছ থেকে হেটি হাবারলেকে জেনেছিল ওরানিয়েনবার্গ এবং নিকটবর্তী স্যাক্সেনহাউসেনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে “নিউমোনিয়া” বলতে ঠিক কী বোঝানো হতো।
“ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা” এই সকল চরিত্রদিগের আবহ এবং তাদের অন্তর্লোকের উন্মোচন মনে আনে দস্তয়েভস্কিকে। মনে আনে মেক্সিম গোর্কিকেও। অটো কোয়াঙ্গেল কখনো যেন ইডিয়ট, প্রিন্স মিশকিন। আনা কোয়াঙ্গেল মা। পাভেলের মা। ম্যাক্সিম গোর্কির মা। ঘটনা আর চরিত্রের ঠাস বুনন এই উপন্যাসের কথন ভঙ্গিতে, ফর্মে, মিশে আছে থ্রিলারের টেকনিক। মিশে আছে অন্তর্বস্তুর, কন্টেন্টের দরকারেই। বিস্তৃত তবে কুশলী বর্নন পুলিশ এবং গেস্টাপো বিভাগের কর্মপদ্ধতির, তরিকার। এই থাকাও অন্তর্বস্তুর টানেই। রাষ্ট্রের আগ্রাসন কে অনুধাবন করা অসম্ভব তার আগ্রাসী কলকব্জা গুলিকে অনুধাবন না করলে। অসম্ভব টের পাওয়া, যে, ব্যাংকার থেকে গেস্টাপোর দুই পয়সার খোচর, খবরি — সকলে মিলে কিভাবে টিঁকিয়ে রাখে পুঁজিবাদকে, ফ্যাসিবাদকে। পুঁজিবাদের, ফ্যাসিবাদের আরেকটি সত্য এ'ও, যে, তাদের সর্বাত্মক আগ্রাসনে অংশ নেওয়া অনেক তুচ্ছ পেরেকও যেমন তাদের “সব চেয়ে বড়লোক দেশ” “আচ্ছে দিন” ইত্যাকার হেজিমনিতে নিজেদের ডুবিয়ে দিয়ে নিজেদেরই ভেবে বসে একেকজন হিটলার তেমনি বহু পেরেক, স্ক্রু, বল্টু বাধ্য হয় সেঁটে থাকতে এই যন্ত্রে, স্রেফ জান বাঁচিয়ে রাখবার নিমিত্ত। পুলিশ, গেস্টাপো চরিত্রগুলি এইহেতু এই উপন্যাসে দাবী করে প্রণিধান। দাবী করে প্রণিধান শুধুমাত্র যুদ্ধকালীন বা ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালীন বলে নয়, জার্মানি বলেও নয়। দাবী করে প্রণিধান কেননা এখানে উন্মোচিত হয় স্থানকালের গন্ডি পার হওয়া পুঁজিবাদের, ফ্যাসিবাদের যবনিকা।
পাঠিকা-পাঠক কে গ্রন্থটি পড়ে দেখবার অনুরোধান্তে আবাত চলে আসি মূল কাহিনীতে যা এগিয়ে চলে অটো আর আনার সঙ্গে সঙ্গে। চলে প্রতিরোধের পোস্টকার্ড ছড়িয়ে দিতে দিতে। ছড়ানো পোস্টকার্ড গুলির কিছু কিছু, ক্রমে, পৌঁছাতে থাকে পুলিশের হাতে, গেস্টাপোর হাতে। আরম্ভ হয় তদন্ত। ছানবিন।
গো পাঠিকা, হে পাঠক, আমি ভাবি সেই পোস্টকার্ড গুলির কথা যেগুলি পুলিশ-গেস্টাপো কিংবা খোচর নয়, গিয়ে পরেছিল আদত আম পাব্লিকের হাতে, আদত আম পাব্লিকের কারো কারো হাতে। ভাবি, সেই সকল লক্ষ্যভেদী পোস্টকার্ড গুলি কি টলিয়ে দেয়নি, দিতে পারেনি একজন আম পাব্লিককেও? অন্তত আরো একজন অটো, আরো একজন আনা কি, নিজের মতো করে, নিজেদের মতো করে শরিক হয়ে যায়নি প্রতিরোধে? নিশ্চয়ই হয়েছিল। নতুবা নিম্নের এই ব্যক্তিগত / ক্ষুদ্র-গোষ্ঠীর প্রতিরোধ ( Individual / Micro-Resistance) তালিকাটিতে এরা কারা?
এইবারে উৎসাহী পাঠিকা-পাঠকদিগের নিমিত্ত তালিকা, তৎকালীন সম্মিলিত প্রতিরোধ প্রচেষ্টা গুলিরঃ
বিশ্বযুদ্ধ এক সময় থেমে গেলো।
কেন?
উপরোল্লিখিত প্রতিরোধের ভূমিকা থাকলেও সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ অন্তর্দ্বন্দ্বে বিখন্ড না হলে এবং অন্তিমে রেড আর্মি মিত্রশক্তিতে যোগ না দিলে তখুনি, তখনো – থামতো কি ওই যুদ্ধ?
অক্ষশক্তি তথাকথিত অর্থে পরাজিত হলো।
সাম্রাজ্যবাদ খোলস পাল্টালো।
নানা দেশে মাথা তুল্লো পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে লড়াই। তার মধ্যে সামগ্রিক ভাবে পুঁজিবাদ কে উৎখাত নিমিত্ত লড়াই গুলিও ক্রমে জোরালো। যেমন চীন, ইন্দোনেশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন্স ইত্যাদি। কিন্তু অন্তিমে সত্য এ'ও, যে, দুই দশকের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন দেশে যেমন চীন, ইন্দোনেশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন্স ইত্যাদিতে পুঁজিবাদের উৎখাত নিমিত্ত ঘটে যাওয়া বিপ্লব গুলিকে ব্যর্থ, বিনষ্ট করতে সম্মিলিত হলো পুঁজিবাদের নতুন অক্ষ। জায়নিস্ট হেন দক্ষিণপন্থীরা, নিও নাজিরা ক্রমে পুঁজিপতি দিগের সঙ্গেই আঁতাতবদ্ধ হতে আরম্ভ করলো পুঁজিবাদ বিরোধী যে কোনো রকমের উত্থানকে সমূলে বিনষ্টির তাগিদে।
তাহলে কি ধরে নিতে হবে ব্যক্তির, ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর তথা সংহত বৃহৎ প্রতিরোধ চেষ্টার সমস্তই গেলো বিফলে?
এখানে হাজির করাই যায় নানান দর্শন, ছুঁড়ে দেওয়া যায়, আধলা ইঁটের মতো নানান বিদেশি-দেশি নাম, নামাবলী। পরিবর্তে আমি এখানে হাজির করছি ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরীর “সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরে” ( পুনশ্চ প্রকাশনা) থেকে দুটি উদ্ধৃতি। তার আগে বলে নিই, যে, এই ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী “একজন রাজনৈতিক কর্মী। লেখকের পিতা প্রয়াত প্রদ্যোৎ রায়চৌধুরী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র ধারায় বিপ্লবী ছিলেন এবং সেই কারণে, যুগান্তর দলের সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে, দণ্ডিত করে এবং আন্দামানে নির্বাসিত করে ১৯৩৪ সালে। ব্রিটিশউত্তর ভারতে একই অভিযোগে কারারুদ্ধ হন ১৯৪৮ সালে এবং ১৯৬২ সালে। তখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পুত্র ভারতজ্যোতি, “সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরে’র লেখক, গ্রেফতার হন ১৯৭৩ সালে একই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে; তখন তিনি সিপিআই(এম এল)-এর পঃবঃ-বিহার সীমান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ ভারতে লেখকের পিতা গ্রেফতার হয়েছিলেন : বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৩৪)-এ। স্বাধীন ভারতে লেখক গ্রেফতার হয়েছিলেন বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৭১)-এ”। সত্তরের দশকে সক্রিয় এই মানুষটি ২০০৯ সালে যখন ফিরে দেখছেন, অবশ্যই বস্তুবাদী বিশ্লেষণে, নিজের ও দেশের অতীত কে, তখন তাঁকে অনুভব করতে হচ্ছে “ কোনো বিদ্রোহই ভুল নয়। ভুল তার শত্রু নির্বাচনে, বন্ধু স্থিরীকরণে, কর্মকৌশলে এবং সময় নির্বাচনে। ভুল তার ব্যাপক সাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার প্রচেষ্টায়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা ভুল এড়াবো এবং সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাবো একদিন,— যদি আদৌ সম্পূর্ণ সঠিক বলে কিছু থাকে”। আবার এ'ও লিখছেন অথবা লিখতে বাধ্য হচ্ছেন “সত্তরকে ইতিহাসের পাতা থেকে ছিড়ে দেখার বাসনা, অলস সময়ের ক্ষণেক আগুন পোহানোর অভিলাষ যুক্ত। আর, সত্তরকে দূরে রাখার সচেতন প্রয়াস ভণ্ড মননশীলতার পণ্ড প্রচেষ্টা মাত্র”। লিখতে বাধ্য হচ্ছেন কেননা তিনি ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের পথিক। ফলে নস্টালজিয়ার আগুনে ঝলসে ফার্ম-চিকেন কে সদ্য শিকার করা হরিন মাংস বলে চালিয়ে দিয়ে আত্মমৈথুন তাঁর রাস্তা নয়।
একই কথা আমাকেও, ভারতজ্যোতির থেকে অনেক অনেক দূরের অবস্থানে থেকেও অনুভব করতে হয় Every man dies alone গ্রন্থটি পাঠ করতে করতে। গ্রন্থটির সফলতাও এখানেই। প্রকৃত শিল্প এক জীবন্ত যাত্রা। মনেপড়ে যায় জীবনানন্দ, যথারীতি। “ আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন” ( মকরসংক্রান্তির রাতে, সাতটি তারার তিমির)। অতীতের শিল্প অথবা অতীতকে নিয়ে শিল্প যদি বর্তমানের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শিল্প আদতে মৃত আর শিল্প তখনই শুধু জীয়ন্ত হতে পারে যখন তার প্রস্থানবিন্দু প্রোথিত সময়ে, সমাজে। Every man dies alone প্রতি মুহুর্তে প্রশ্ন করে বর্তমান কে। বাধ্য করে সমসাময়িকের মূল্যায়ন-চেষ্টায়। সামগ্রিক সমসাময়িকের। শিল্প যার একটি অংশমাত্র। বিশ্বযুদ্ধ কালীন Individual / Micro-Resistance এর, অটো ও আনা কোয়েঙ্গলের প্রতিরোধের এবং সমান্তরালে বৃহত্তর প্রতিরোধ চেষ্টা গুলির পাশাপাশি সমসাময়িক প্রতিরোধ গুলি — NRC-CAA থেকে কৃষক আন্দোলন হয়ে যন্তরমন্তর জমায়েত — আমার মর্মে আসে, ফিরে আসে।
এই প্রতিরোধ প্রতিবাদ গুলি কি সফল? এই প্রতিরোধ প্রতিবাদ গুলি কি ব্যর্থ?
— এর উত্তর এক হ্যাঁ কিংবা না তে দেওয়া অসম্ভব এবং অনুচিত। Micro-Resistance থেকে Macro-Resistance — যতোক্ষণ না প্রকৃত সর্বহারা শ্রেণির দ্বারা চালিত হবে, যে চালনার স্ফুলিঙ্গে থাকবে সর্বহারার ভ্যানগার্ড দল — ততোক্ষণ এই সকল প্রতিবাদ বড়জোর রুখে দিতে পারে, সাময়িক, একটি দুইটি চুক্তি, দেড় দুইটি ধারা — আইনের, সংবিধানের। খুব বেশি হলে জারের শাসনের পরিবর্তে তারই পেটোয়া সরকারের গঠন হতে পারে। কিন্তু তাতে পুঁজিবাদের বিনাশ, শ্রেণীর বিনাশ, উৎপাদন সম্পর্কে বিপ্লব ঘটেনা, ঘটতে পারেনা। এই সত্য এঙ্গেলসের Anti-Dühring থেকে লেনিনের The State and Revolution এ স্পষ্ট প্রমাণিত। তা'ই ফিরে প্রমাণ হয় বিশ্বযুদ্ধ কালীন Micro-Resistance থেকে Macro-Resistance গুলির ইতিহাসে, প্রমাণিত হয় NRC-CAA থেকে কৃষক আন্দোলন হয়ে যন্তরমন্তর জমায়েত এর বিশ্লেষণে।
প্রমাণ হয়। কিন্তু কি?
এই প্রতিরোধ প্রতিবাদ গুলি কি সফল?
এই প্রতিরোধ প্রতিবাদ গুলি কি ব্যর্থ?
উত্তরে, ভারতজ্যোতির কথাগুলিকে সামান্য অদলবদল করে বলা যায় — কোনো প্রতিবাদ, প্রতিরোধই ভুল নয়, অসফল নয় । ভুল তার শত্রু নির্বাচনে, বন্ধু স্থিরীকরণে, কর্মকৌশলে এবং সময় নির্বাচনে। ভুল তার ব্যাপক সাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার প্রচেষ্টায়। ভুল থেকে, অসফলতা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা ভুল এড়াবো, বিফল এড়াবো এবং সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাবো একদিন,— যদি আদৌ সম্পূর্ণ সঠিক বলে কিছু থাকে”।
৫। “each of them would die alone” …?
ফিরে যাই সেই বিচার কিংবা বিচারের নামে প্রহহনের কক্ষে যেখানে শেষবারের মতো কোয়াঙ্গেল দম্পতীকে দেখা যাবে একত্র। শোনা যাবে তাদের বাক্যালাপ। কারারুদ্ধ হওয়ার পরের প্রথম সাক্ষাৎ। এই জীবন ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে শেষ সাক্ষাৎ।
“হ্যাঁ, তারা দুইজনই মারা গেছে। মারা গেছে, তাই তারা শান্তিতে আছে। তাদের আর কোনো যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি।”
“হ্যাঁ!” কিছু সময় চুপের পর আনা বলল।
“হ্যাঁ। যতোদিন কোনো খবর পায়নি ততোদিন সে তার কার্লির জন্য খুব ভীত ছিল। কিন্তু এখন সে শান্তিতে আছে।”
আনা অনেকক্ষণ চুপ , ওটো কোয়াঙ্গেলও।
চুপ ছিঁড়ে আনা মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল, “ওদের দুজনকেই কি—মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?”
“না, “গ্রেপ্তারের সময় পাওয়া একটি আঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কার্ল মারা গেছে।”
“আর ট্রুডেল?”
“সে আত্মহত্যা করেছে,” অটো কোয়াঙ্গেল দ্রুত বলল। “সে পাঁচতলার রেলিং থেকে ঝাঁপ দিয়ে। ঘটনাস্থলেই, পলকেই মৃত্যু হয়েছে। কোনো কষ্ট পায়নি।”
“এটা নিশ্চয়ই সেই রাতেই ঘটেছে,” আনা কোয়াঙ্গেল বলে, “যখন পুরো জেলখানা জুড়ে হুলুস্থুল চলছিল! আমার মনে আছে, কী ভয়ঙ্কর ছিল, অটো!” আর সে আবার দুহাতে মুখ ঢাকল।… আবার চুপ। চুপের অন্দরে যেন নিজেকে মানিয়ে নিলো আনা। বল্লো “তোমার তো মনে হয় ওরা আমাদের একসঙ্গে মরতে দেবে, তাই না, অটো?”
“আমি জানি না,” অটো কোয়াঙ্গেল বল্লো উত্তরে। অটো আনাকে মিথ্যা বলতে চায়নি, কিন্তু মনে মনে অটো নিশ্চিত ছিল যে তাদের প্রত্যেকেই একা মরবে। একা একাই একা মরবে। “each of them would die alone”।
— এবং বাস্তবেও ঘটেছিল তা’ই। ঘটে যাচ্ছে তা’ই। অদ্যাপি।
বাস্তব শব্দটির একটি ভিন্ন অর্থও রয়ে গেছে এখানে।
একটি অবশ্যই রূপকার্থে। পুঁজিবাদের খোলস, মুখোশ যতোই পাল্টাক – নিও লিবারেল থেকে গ্লোবালাইজেশন থেকে যা খুশি হয়ে যাক, তার থাবায় মানুষের, আম-মানুষের, আদতে এই বিশ্ব, এই চরাচর, চরাচরের সকল ঘাস, পাতা, পাখি, পাহার, নদী, সমুদ্র, খনি, খনিজ, আকাশ, মহাকাশ – যে আম মানুষের জন্মগত অধিকার, সম্পদ – তারা এভাবেই একা, একা একা মরবে – যেমন মরেছেন স্টান স্বামী, মরেছেন, মরছেন সংখ্যার অতীত মানুষ, যেমন জেলের অন্দরে মরছে, প্রত্যহ উমর খালিদ, উমর খালিদ হেন অসংখ্য। বাস্তব কথাটির আরেকটি অর্থ তথ্যগত, ইতিহাসগত সত্য।
Every Man Dies Alone উপন্যাসটি বার্লিন-নিবাসী এলিস ও অটো হ্যাম্পেল দম্পতির সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত। তাঁরা ছিলেন স্বল্পশিক্ষিত ও শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ এবং এর আগে তাঁদের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস ছিল না। যুদ্ধের শুরুর দিকে এলিসের ভাই নিহত হওয়ার পর, এই দম্পতি প্রায় তিন বছর ধরে এক প্রচার-অভিযান চালান যা বার্লিন পুলিশকে হতভম্ব ও ক্ষিপ্ত করে তোলে; শেষ পর্যন্ত পুলিশ এই মামলার দায়িত্ব গেস্টাপোর (নাৎসি গোপন পুলিশ) হাতে তুলে দেয়।
হ্যাম্পেল দম্পতির এই অভিযানের ধরন ছিল অত্যন্ত সাধারণ: তাঁরা বার্লিনজুড়ে শত শত পোস্টকার্ড ফেলে আসতেন, যাতে আইন অমান্য করবার উৎসাহ থাকতো। কেননা আইন বলতে নাজি আইন। যা প্রকাশ্য প্রহসন। থাকতো কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের আহ্বান – কেননা কর্ম মানেই যুদ্ধকে, নাজিবাদকে কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করা।
জনতার কাছে বিশেষ আবেদন জানাতেন 'উইন্টার ফান্ড' বা “শীতকালীন তহবিল” এ অনুদান না দেওয়ার কেননা 'উইন্টার ফান্ড ছিল মূলত নাৎসিদের চাপিয়ে দেওয়া এক ভুয়া দাতব্য কার্যক্রম, যার আবডালে আদতে যুদ্ধের খরচ জোগানো হতো।
অনেক কার্ডই দ্রুত পুলিশের হাতে জমা পড়েছিল, কিন্তু হ্যাম্পেল দম্পতি এতটাই ব্যাপকভাবে পুরো শহরে কার্ডগুলি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং এতটাই সফলভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন যে, গেস্টাপো ও নাৎসি পুলিশের অন্যান্য বাহিনী ধরে নিয়েছিল যে তারা কোনো বিশাল ও সুসংগঠিত গোপন প্রতিরোধ সংগঠনের মোকাবিলা করছে।
লেখক হ্যান্স ফালাডাকে হ্যাম্পেল দম্পতির সেই গেস্টাপো ফাইলটি দিয়েছিলেন তাঁর কবি-বন্ধু জোহানেস আর. বেচার; যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব জার্মানিতে সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারে বেচার কার্যত সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। নাৎসিদের মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ফালাডা কোনোমতে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন (সাধারণত ওই হাসপাতালে পাঠানো মানেই ছিল মৃত্যুদণ্ড); তবে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর মাদক ও মদ্যপানের সমস্যা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যুদ্ধের শেষে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
তাঁকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় জোহানেস আর. বেচার তাঁকে হ্যাম্পেল দম্পতির গেস্টাপো ফাইলটি দেন এবং পরামর্শ দেন যেন তিনি এটিকে উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
ফালাডা মাত্র ২৪ দিনে বইটি লিখেছিলেন, কিন্তু এর প্রকাশনা দেখে যাওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
হ্যাঁ, তাঁর কাহিনীর চরিত্রদিগের মতনই তাঁর মৃত্যুও একা, একা একা। “each of them would die alone”।
কিন্তু আদতেই একা কি?
যদি হ্যান্স ফালাডা এবং হ্যাম্পেল দম্পতি একা’ই হতেন এবং মৃত্যুই হয়ে থাকতো তাঁদের তাহলে ক্রেন ও কিভাবে, অদ্যাপি তাঁরা আম-মানসে জীয়ন্ত? কেন তাঁদের কাহন খুলে বসলেই টের পেতে হয় যে, সেই একই ত্রাসের বিশ্বে অদ্যাপি আমাদের বসবাস?
টের পেতে হয় এ’ও, যে, প্রতিরোধ ভিন্ন, প্রতিরোধকে পুঁজিবাদের সামগ্রিক উচ্ছেদের নিমিত্ত যূথবদ্ধ প্রতিবাদের দিকে গমন ভিন্ন গত্যন্তর নেই আর।
১৫-অগাস্ট-২০২৬
বেঙ্গালোর

