প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...

Sunday, January 11, 2026

যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে জীবনানন্দ দাশ অথবা জীবনানন্দ দাশের রক্তে যুদ্ধ আর বাণিজ্যের …

 যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে  জীবনানন্দ দাশ অথবা জীবনানন্দ দাশের রক্তে যুদ্ধ আর বাণিজ্যের




ভার্জিলের 'এনিড' এর আরম্ভ পংক্তি , John D Long এর অনুবাদেঃ  “Arms, and the man I sing, who, forc'd by fate” … যুদ্ধ আর বাণিজ্য, বাণিজ্য আর যুদ্ধ –আর  “War developed earlier than peace; the way in which certain economic relations such as wage labour, machinery ... develop earlier, owing to war and in the armies …” – রক্ত যুদ্ধে। যে রক্ত যুদ্ধে তার পত্তন বাণিজ্যে। কাজেই যুদ্ধের আগেও যুদ্ধ। যুদ্ধের পরেও যুদ্ধ। যতো দিন বাণিজ্য, ততোদিনই যুদ্ধ। যুদ্ধের অছিলা কক্ষনো হেলেন, কখনো সীতা, কখনো পাঞ্চালী। উদ্দেশ্য এক। একই। বাণিজ্য। দখল। গাজা। মণিপুর। গুজরাট। ভেনিজুয়েলা। হেলেন নিমিত্ত। হেলেন তো অন্তিমে চোখ আর চুলের সংকেতে, মেধাবিনী”। তাকে ঘিরে মস্তি মারছে, মারবে  “দেশ আর বিদেশের পুরুষেরা”। আপাতত যথেষ্ট লুঠ হয়েছে।  এখন কিছুদিন “যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে” …। কারা? যাদের নিমিত্ত হলো যুদ্ধ। সেই বনিকেরা আর তাদের পালিত সারমেয়দল – যারা রাজা , যারা শাসক। ভিন্নার্থে এই “যূথচারী কয়েকটি নারী” কি নয় মৃত্যুও? অগুনতি সৈনিকের? উভয় দলের সৈন্যের? ট্রয়ের সংখ্যাতীত, গাজার, মণিপুরের, গুজরাটের সংখ্যাতীত নিতান্ত সাধারনের? তারো তো আর কোনোদিন “ যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে। প্রগাঢ় চুম্বন ক্রমে টানিতেছে তাহাদের”। এই চুম্বন ধ্বংসের, মৃত্যুর, মড়কের। তাই বাসা-ঘরে “ তুলোর বালিশে মাথা রেখে আর মানবীয় ঘুমে
স্বাদ নেই”। এই সকল মৃত, মৃতপ্রায় দের কাছে “যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়ারি রৌদ্রের দিন
শেষ হ’য়ে গেছে সব”। – এই পংক্তিতেও যুদ্ধ আর বাণিজ্য পাশাপাশি। একসঙ্গে, এক শ্বাসে উপস্থিত, মার্ক্সের পরে, আমার পাঠবৃত্তে, একমাত্র জীবনানন্দে। যুদ্ধ আর বাণিজ্যই যে মানবের তথাকথিত নিয়তি’রও নিয়তি, তা আমাকে টের পেতে হয়েছে, হচ্ছে, হবে যাপন অভিজ্ঞতার মূল্যে। এ’ও টের পেতে হয়েছে, যে “War developed earlier than peace; the way in which certain economic relations such as wage labour, machinery etc. develop earlier, owing to war and in the armies etc., than in the interior of bourgeois society. The relation of productive force and relations of exchange also especially vivid in the army.” [ Karl Marx. Grundrisse Foundations of the Critique of Political Economy ] ... রইলো সে সকল জীবনানন্দ-কবিতা'র কিছু কিছু এখানে যারা যুদ্ধ আর বাণিজ্যের, বাণিজ্য আর শ্রেণীর, শ্রেণী আর শ্রেণী চেতনার, শ্ত্রনী চেতনা আর শ্রেণী সংগ্রামের জীববনান্দীয় আলোড়নে আন্দোলিত ...



গোধূলি সন্ধির নৃত্য

দরদালানের ভিড়—পৃথিবীর শেষে
যেইখানে প’ড়ে আছে– শব্দহীন— ভাঙা—
সেইখানে উঁচু-উঁচু হরিতকী গাছের পিছনে
হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল— রাঙা—

চুপে-চুপে ভুলে যায়— জ্যোৎস্নায়।
পিপুলের গাছে ব’সে পেঁচা শুধু একা
চেয়ে দ্যাখে; সোনার বলের মতো সূর্য আর
রুপার ডিবের মতে চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা।

হরিতকী শাখাদের নিচে যেন হীরের স্ফুলিঙ্গ
আর স্ফটিকের মতো শাদা জলের উল্লাস;
নৃমুণ্ডের আবছায়া— নিস্তব্ধতা—
বাদামী পাতার ঘ্রাণ— মধুকূপী ঘাস।

কয়েকটি নারী যেন ঈশ্বরীর মতো:
পুরুষ তাদের: কৃতকর্ম নবীন;
খোঁপার ভিতরে চুলে: নরকের নবজাত মেঘ,
পায়ের ভঙ্গির নিচে হঙকঙের তৃণ।

সেখানে গোপন জল ম্লান হ’য়ে হীরে হয় ফের,
পাতাদের উৎসরণে কোনো শব্দ নাই;
তবু তা’রা টের পায় কামানের স্থবির গর্জনে
বিনষ্ট হতেছে সাংহাই।

সেইখানে যূথচারী কয়েকটি নারী
ঘনিষ্ঠ চাঁদের নিচে চোখ আর চুলের সংকেতে

মেধাবিনী; দেশ আর বিদেশের পুরুষেরা
যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে।

প্রগাঢ় চুম্বন ক্রমে টানিতেছে তাহাদের
তুলোর বালিশে মাথা রেখে আর মানবীয় ঘুমে
স্বাদ নেই; এই নিচু পৃথিবীর মাঠের তরঙ্গ দিয়ে
ওই চূর্ণ ভূখণ্ডের বাতাসে— বরুণে
ক্রূর পথ নিয়ে যায় হরিতকী বনে— জ্যোৎস্নায়।
যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়ারি রৌদ্রের দিন
শেষ হ’য়ে গেছে সব; বিনুনিতে নরকের নির্বচন মেঘ,
পায়ের ভঙ্গির নিচে বৃশ্চিক— কর্কট— তুলা— মীন।

—-


সুচেতনা


সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ
বিকেলের নক্ষত্রের কাছে;
সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।
এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা
সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।

আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ
পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,
দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে;
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।

কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে
দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়;
সেই শস্য অগণন মানুষের শব;
শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়াসের মতো আমাদেরো প্রাণ
মূক করে রাখে; তবু চারিদকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।

সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে – এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;
সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;
এ বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;–
প্রায় তত দূর ভালো মানবসমাজ
আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে
গড়ে দেব আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।

মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়–
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।

আবহমান

পৃথিবী এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম।
সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হ’য়ে যেন আসে;
যদিও আকাশ সিন্ধু ভ’রে গেল অগ্নির উল্লাসে;
যেমন যখন বিকেলবেলা কাটা হয় খেতের গোধূম
চিলের কান্নার মতো শব্দ ক’রে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের ঘুম
গাঢ় ক’রে দিয়ে যায়। —এইবার কুয়াশায় যাত্রা সকলের।
সমুদ্রের রোল থেকে একটি আবেগ নিয়ে কেউ
নদীর তরঙ্গে— ক্রমে— তুষারের স্তূপে তার ঢেউ

একবার টের পাবে— দ্বিতীয় বারের
সময় আসার আগে নিজেকেই পাবে না সে টের
এইখানে সময়কে যতদূর দেখা যায় চোখে
নির্জন খেতের দিকে চেয়ে দেখি দাঁড়ায়েছে অভিভূত চাষা;
এখনো চালাতে আছে পৃথিবীর প্রথম তামাশা
সকল সময় পান ক’রে ফেলে জলের মতন এক ঢোঁকে;
অঘ্রাণের বিকেলের কমলা আলোকে
নিড়ানো খেতের কাজ ক’রে যায় ধীরে;
একটি পাখির মতো ডিনামাইটের ’পরে ব’সে।
পৃথিবীর মহত্তর অভিজ্ঞতা নিজের মনের মুদ্রাদোষে
নষ্ট হ’য়ে খ’সে যায় চারিদিকে আমিষ তিমিরে;
সোনালি সূর্যের সাথে মিশে গিয়ে মানুষটা আছে পিছু ফিরে।

ভোরের স্ফটিক রৌদ্রে নগরী মলিন হ’য়ে আসে।
মানুষের উৎসাহের কাছ থেকে শুরু হ’লো মানুষের বৃত্তি আদায়।
যদি কেউ কানাকড়ি দিতে পারে বুকের উপরে হাত রেখে
তবে সে প্রেতের মতো ভেসে গিয়ে সিংহদরজায়
আঘাত হানিতে গিয়ে মিশে যায় অন্ধকার বিম্বের মতন।
অভিভূত হ’য়ে আছে— চেয়ে দ্যাখো— বেদনার নিজের নিয়ম।

নেউলধূসর নদী আপনার কাজ বুঝে প্রবাহিত হয়;
জলপাই-অরণ্যের ওই পারে পাহাড়ের মেধাবী নীলিমা;
ওই দিকে সৃষ্টি যেন উষ্ণ স্থির প্রেমের বিষয়;
প্রিয়ের হাতের মতো লেগে আছে ঘড়ির সময় ভুলে গিয়ে
আকাশের প্রসারিত হাতের ভিতরে।

সেই আদি অরণির যুগ থেকে শুরু ক’রে আজ
অনেক মনীষা, প্রেম, নিমীল ফসলরাশি ঘরে

এসে গেছে মানুষের বেদনা ও সংবেদনাময়।
পৃথিবীর রাজপথে— রক্তপথে— অন্ধকার অববাহিকায়
এখনো মানুষ তবু খোঁড়া ঠ্যাঙে তৈমুরের মতো বার হয়।
তাহার পায়ের নিচে তৃণের নিকটে তৃণ মূক অপেক্ষায়;
তাহার মাথার ’পরে সূর্য, স্বাতী, সরমার ভিড়;
এদের নৃত্যের রোলে অবহিত হ’য়ে থেকে ক্রমে একদিন
কবে তার ক্ষুদ্র হেমন্তের বেলা হবে নিসর্গের চেয়েও প্রবীণ?

চেয়েছে মাটির দিকে— ভূগর্ভে তেলের দিকে
সমস্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অবিরল যারা,
মাথার উপরে চেয়ে দেখেছে এবার;
দূরবীনে কিমাকার সিংহের সাড়া
পাওয়া যায় শরতের নির্মেঘ রাতে।
বুকের উপরে হাত রেখে দেয় তা’রা।
যদিও গিয়েছে ঢের ক্যারাভান ম’রে,
মশালের কেরোসিনে মানুষেরা অনেক পাহারা
দিয়ে গেছে তেল, সোনা, কয়লা ও রমণীকে চেয়ে;
চিরদিন এই সব হৃদয় ও রুধিরের ধারা।
মাটিও আশ্চর্য সত্য। ডান হাত অন্ধকারে ফেলে
নক্ষত্রও প্রামাণিক; পরলোক রেখেছে সে জ্বেলে;
অনৃত সে আমাদের মৃত্যুকে ছাড়া।


মোমের আলোয় আজ গ্রন্থের কাছে ব’সে— অথবা ভোরের বেলা নদীর ভিতরে
আমরা যতটা দূর চ’লে যাই— চেয়ে দেখি আরো-কিছু আছে তারপরে।
অনির্দিষ্ট আকাশের পানে উড়ে হরিয়াল আমারো বিবরে
ছায়া ফেলে। ঘুরোনো সিঁড়ির পথ বেয়ে যারা উঠে যায় ধবল মিনারে,
কিংবা যারা ঘুমন্তের মতো জেগে পায়চারি করে সিংহদ্বারে,
অথবা যে-সব থাম সমীচীন মিস্ত্রির হাত থেকে উঠে গেছে বিদ্যুতের তারে,
তাহারা ছবির মতো পরিতৃপ্ত বিবেকের রেখায় রয়েছে অনিমেষ।

হয়তো অনেক এগিয়ে তা’রা দেখে গেছে মানুষের পরম আয়ুর পারে শেষ
জলের রঙের মতো স্বচ্ছ রোদে একটিও বোল্‌তার নেই অবলেশ।

তাই তা’রা লোষ্ট্রের মতন স্তব্ধ। আমাদেরো জীবনের লিপ্ত অভিধানে
বৰ্জাইস অক্ষরে লেখা আছে অন্ধকার দলিলের মানে।
সৃষ্টির ভিতরে তবু কিছুই সুদীর্ঘতম নয়— এই জ্ঞানে
লোকসানী বাজারের বাক্সের আতাফল মারীগুটিকার মতো পেকে
নিজের বীজের তরে জোর ক’রে সূর্যকে নিয়ে আসে ডেকে।
অকৃত্রিম নীল আলো খেলা করে ঢের আগে মৃত প্রেমিকের শব থেকে।

একটি আলোক নিয়ে ব’সে থাকা চিরদিন;
নদীর জলের মতো স্বচ্ছ এক প্রত্যাশাকে নিয়ে;
সে-সবের দিন শেষ হ’য়ে গেছে
এখন সৃষ্টির মনে— অথবা মনীষীদের প্রাণের ভিতরে।
সৃষ্টি আমাদের শত শতাব্দীর সাথে ওঠে বেড়ে।
একদিন ছিলো যাহা অরণ্যের রোদে— বালুচরে,
সে আজ নিজেকে চেনে মানুষের হৃদয়ের প্রতিভাকে নেড়ে।
আমরা জটিল ঢের হ’য়ে গেছি— বহুদিন পুরাতন গ্রহে বেঁচে থেকে।
যদি কেউ বলে এসে: ‘এই সেই নারী,
একে তুমি চেয়েছিলে; এই সেই বিশুদ্ধ সমাজ—’
তবুও দর্পণে অগ্নি দেখে কবে ফুরায়ে গিয়েছে কার কাজ?

আমাদের মৃত্যু নেই আজ আর,
যদিও অনেক মৃত্যুপরম্পরা ছিলো ইতিহাসে;
বিস্তৃত প্রাসাদে তারা দেয়ালের অব্‌লঙ ছবি;
নানারূপ ক্ষতি ক্ষয়ে নানা দিকে ম’রে গেছি— মনে পড়ে বটে
এই সব ছবি দেখে; বন্দীর মতন তবু নিস্তব্ধ পটে
নেই কোনো দেবদত্ত, উদয়ন, চিত্রসেনী স্থানু।
এক দরজায় ঢুকে বহিষ্কৃত হ’য়ে গেছে অন্য এক দুয়ারের দিকে
অমেয় আলোয় হেঁটে তা’রা সব।

(আমাদের পূর্বপুরুষেরা কোন্ বাতাসের শব্দ শুনেছিলো;
তারপর হয়েছিলো পাথরের মতন নীরব?)
আমাদের মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
কাচের গেলাসে জলে উজ্জ্বল শফরী;
সমুদ্রের দিবারৌদ্রে আরক্তিম হাঙরের মতো;
তারপর অন্য গ্রহ নক্ষত্রেরা আমাদের ঘড়ির ভিতরে
যা হয়েছে, যা হতেছে, অথবা যা হবে সব এক সাথে প্রচারিত করে।
সৃষ্টির নাড়ীর ’পরে হাত রেখে টের পাওয়া যায়
অসম্ভব বেদনার সাথে মিশে র’য়ে গেছে অমোঘ আমোদ;
তবু তা’রা করেনাকো পরস্পরের ঋণশোধ।


—-

রিস্টওয়াচ 

কামানের ক্ষোভে চূর্ণ হয়ে
আজ রাতে ঢের মেঘ হিম হয়ে আছে দিকে দিকে!
পাহাড়ের নিচে–তাহাদের কারু কারু মণিবন্ধে ঘড়ি
সময়ের কাঁটা হয়তো বা ধীর ধীরে ঘুরাতেছে;
চাঁদের আলোর নিচে এই সব অদ্ভুত প্রহরী
কিছুক্ষণ কথা কবে–
হৃদয়যন্ত্রের যেন প্রীত আকাঙ্ক্ষার মতো ন’ড়ে,
সমুজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো গিলে।
জলপাই পল্লবের তলে ঝরা বিন্দু বিন্দু শিশিরের রাশি
দূর সমুদ্রের শব্দ
শাদা চাদরের মতো–জনহীন–বাতাসের ধ্বনি
দু-এক মুহূর্ত আরো ইহাদের গড়িবে জীবনী।
স্তিমিত–স্তিমিত আরো ক’রে দিয়ে ধীরে
ইহারা উঠিবে জেগে অফুরন্ত রৌদ্রের অনন্ত তিমিরে।



ক্ষেতে প্রান্তরে


ঢের সম্রাটের রাজ্যে বাস ক'রে জীব 

অবশেষে একদিন দেখেছে দু-তিন ধনু দূরে 

কোথাও সম্রাট নেই, তবুও বিপ্লবী নেই, চাষা 

বলদের নিঃশব্দতা ক্ষেতের দুপুরে।

বাংলার প্রান্তরের অপরাহ্ন এসে 

নদীর খাড়িতে মিশে ধীরে 

বেবিলন লণ্ডনের জন্ম, মৃত্যু হলে– 

তবুও রয়েছে পিছু ফিরে। 

বিকেল এমন ব'লে একটি কামিন এইখানে 

দেখা দিতে এলো তার কামিনীর কাছে– 

মানবের মরণের পরে তার মমির গহ্বর 

এক মাইল রৌদ্রে প'ড়ে আছে।


আবার বিকেলবেলা নিভে যায় নদীর খাড়িতে; 

একটি কৃষক শুধু ক্ষেতের ভিতরে 

তার বলদের সাথে সারাদিন কাজ ক'রে গেছে;

        শতাব্দী তীক্ষ্ম হয়ে পড়ে। 

সমস্ত গাছের দীর্ঘ ছায়া 

বাংলার প্রান্তরে পড়েছে; 

এ দিকের দিনমান--এ যুগের মতো 

          শেষ হ'য়ে গেছে, 

না জেনে কৃষক চোত-বোশেখের সন্ধ্যার বিলম্বনে প'ড়ে 

চেয়ে দেখে থেমে আছে তবুও বিকাল; 

ঊনিশশো বেয়াল্লিশ বলে মনে হয় 

তবুও কি ঊনিশশো বিয়াল্লিশ সাল।


কোথাও শান্তির কথা নেই তার, উদ্দীপ্তিও নেই; 

একদিন মৃত্যু হবে, জন্ম হয়েছে; 

সূর্য উদয়ের সাথে এসেছিলো ক্ষেতে; 

সূর্যাস্তের সাথে চলে গেছে। 

সূর্য উঠবে জেনে স্থির হয়ে ঘুমায়ে রয়েছে। 

            আজ রাতে শিশিরের জল 

প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি নিয়ে খেলা করে; 

            কৃষাণের বিবর্ণ লাঙ্গল,

ফালে ওপড়ানো সব অন্ধকার ঢিবি,

পোয়াটাক মাইলের মতন জগৎ

সারাদিন অন্তহীন কাজ ক'রে নিরুৎকীর্ণ মাঠে 

পড়ে আছে সৎ কি অসৎ।


অনেক রক্তের ধ্বকে অন্ধ হয়ে তারপর জীব 

     এইখানে তবুও পায়নি কোনো ত্রাণ; 

          বৈশাখের মাঠের ফাটলে 

          এখানে পৃথিবী অসমান। 

               আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। 

কেবল খড়ের স্তুপ প'ড়ে আছে দুই-তিন মাইল, 

          তবু তা সোনার মতো নয়; 

কেবল কাস্তের শব্দ পৃথিবীর কামানকে ভুলে 

          করুণ, নিরীহ, নিরাশ্রয়। 

               আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। 

জলপিপি চ'লে গেলে বিকেলের নদী কান পেতে 

               নিজের জলের সুর শোনে; 

            জীবাণুর থেকে আজ কৃষক, মানুষ 

            জেগেছে কি হেতুহীন সম্প্রসারণে– 

               ভ্রান্তিবিলাসে নীল আচ্ছন্ন সাগরে? 

চৈত্য, ক্রুশ, নাইন্টিথ্রি ও সোভিয়েট শ্রুতি-প্রতিশ্রুতি 

যুগান্তের ইতিহাস, অর্থ দিয়ে কূলহীন সেই মহাসাগরে প্রাণ 

চিনে-চিনে হয়তো বা নচিকেতা প্রচেতার চেয়ে অনিমেষে 

           প্রথম ও অন্তিম মানুষের প্রিয় প্রতিমান
          হয়ে যায় স্বাভাবিক জনমানবের সূর্যালোকে।

—-

প্রতীতি

বাতাবীলেবুর পাতা উড়ে যায় হাওয়ায়–প্রান্তরে–
সার্সিতে ধীরে-ধীরে জলতরঙ্গের শব্দ বাজে;
একমুঠো উড়ন্ত ধূলোয় আজ সময়ের আস্ফোট রয়েছে;
না হলে কিছুই নেই লবেজান লড়ায়ে জাহাজে।
বাইরে রৌদ্রের ঋতু বছরের মতো আজ ফুরায়ে গিয়েছে;
হোক না তা; প্রকৃতি নিজের মনোভাব নিয়ে অতীব প্রবীণ;
হিসেব বিষণ্ণ সত্য র’য়ে গেছে তার;
এবং নির্মল ভিটামিন।
সময় উচ্ছিন্ন হ’য়ে কেটে গেলে আমাদের পুরোনো প্রহের
জীবনস্পন্দন তার রূপ নিতে দেরি ক’রে ফেলে–
জেনে নিয়ে যে যাহার স্বজনের কাজ করে না কি–
পরার্থের কথা ভেবে ভালো লেগে গেলে।
মানুষেরই ভয়াবহ স্বাভাবিকতার সুর পৃথিবী ঘুরায়;
মাটির তরঙ্গ তার দু পায়ের নিচে
আধোমুখে ধ্ব’সে যায়–চারিদিকে কামাতুর ব্যাক্তিরা বলে :
এ রকম রিপু চরিতার্থ ক’রে বেঁচে থাকা মিছে।
কোথাও নবীন আশা র’য়ে গেছে ভেবে
নীলিমার অনুকল্পে আজ যারা সয়েছে বিমান–
কোনো এক তনুবাত শিখরের প্রশান্তির পথে
মানুষের ভবিষ্যৎ নেই–এই জ্ঞান
পেয়ে গেছে; চারিদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন নেশন পড়ে আছে :
সময় কাটায়ে গেছে মোহ ঘোচাবার
আশা নিয়ে মঞ্জুভাষা, দোরিয়ান গ্রীস,
চীনের দেয়াল, পীঠ, পেপিরাস, কারারা-পেপার।
তাহারা মরেনি তবু–ফেনশীর্ষ সাগরের ডুবুরির মতো
চোখ বুজে অন্ধকার থেকে কথা-কাহিনীর দেশে উঠে আসে;
যত যুগ কেটে যায় চেয়ে দেখে সাগরের নীল মুরুভূমি
মিশে আছে নীলিমার সীমাহীন ভ্রান্তিবিলাসে।
ক্ষতবিক্ষত জীব মর্মস্পর্শে এলে গেলে–তবুও হেঁয়ালি;
অবশেষে মানবের স্বাভাবিক সূর্যালোকে গিয়ে
উত্তীর্ণ হয়েছে ভেবে–ঊনিশশো বিয়াল্লিশ সাল।
‘তেতাল্লিশ’ পঞ্চাশের দিগন্তরে পড়েছে বিছিয়ে।
মাটির নিঃশেষ সত্য দিয়ে গড়া হয়েছিলো মানুষের শরীরের ধুলো :
তবুও হৃদয় তার অধিক গভীরভাবে হ’তে চায় সৎ;
ভাষা তার জ্ঞান চায়, জ্ঞান তার প্রেম–ঢের সমুদ্রের বালি
পাতালের কালি ঝেড়ে হ’য়ে পড়ে বিষণ্ণ, মহৎ। 

—---

রাত্রির কোরাস

এখন সে কতো রাত;
এখন অনেক লোক দেশ-মহাদেশের সব নগরীর গুঞ্জরণ হ’তে
ঘুমের ভিতরে গিয়ে ছুটি চায়।
পরস্পরের পাশে নগরীর ঘ্রাণের মতন
নগরী ছড়ায়ে আছে।
কোনো ঘুম নিঃসাড় মৃত্যুর নামান্তর।
অনেকেরই ঘুম
জেগে থাকা।
নগরীর রাত্রি কোনো হৃদয়ের প্রেয়সীর মতো হ’তে গিয়ে
নটীরও মতন তবু নয়–
প্রেম নেই–প্রেমব্যসনেরও দিন শেষ হয়ে গেছে;
একটি অমেয় সিঁড়ি মাটির উপর থেকে নক্ষত্রের
আকাশে উঠেছে;
উঠে ভেঙে গেছে।
কোথাও মহান কিছু নেই আর তারপর।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণের প্রয়াস রয়ে গেছে;
তুচ্ছ নদী-সমুদ্রের চোরাগলি ঘিরে
র’য়ে গেছে মাইন, ম্যাগ্নেটিক মাইন, অনন্ত কন্‌ভয়–
মানবিকদের ক্লান্ত সাঁকো;
এর চেয়ে মহীয়ান আজ কিছু নেই জেনে নিয়ে
আমাদের প্রাণের উত্তরণ আসে নাকো।
সূর্য অনেক দিন জ্ব’লে গেছে মিশরের মতো নীলিমায়।
নক্ষত্র অনেক দিন জেগে আছে চীন, কুরুবর্ষের আকাশে।
তারপর ঢের যুগ কেটে গেলে পর
পরস্পরের কাছে মানুষ সফল হতে গিয়ে এক অস্পষ্ট রাত্রির
অন্তর্যামী যাত্রীদের মতো
জীবনের মানে বার ক’রে তবু জীবনের নিকট ব্যাহত
হ’য়ে আরো চেতনার ব্যথায় চলেছে।
মাঝে মাঝে থেমে চেয়ে দেখে
মাটির উপর থেকে মানুষের আকাশে প্রয়াণ
হ’লো তাই মানুষের ইতিহাসবিবর্ণ হৃদয়
নগরে নগরে গ্রামে নিষ্প্রদীপ হয়।
হেমন্তের রাতের আকাশে আজ কোনো তারা নেই।
নগরীর–পৃথিবীর মানুষের চোখ থেকে ঘুম
তবুও কেবলি ভেঙে যায়
স্‌প্লিন্টারের অনন্ত নক্ষত্রে।
পশ্চিমে প্রেতের মতন ইউরোপ;
পূব দিকে প্রেতায়িত এশিয়ার মাথা;
আফ্রিকার দেবতাত্মা জন্তুর মতন ঘনঘটাচ্ছন্নতা;
ইয়াঙ্কির লেন-দেন ডলারে প্রত্যয়–
এই সব মৃত হাত তবে
নব নব ইতিহার-উন্মেষের না কি?–
ভেবে কারু রক্তে স্থির প্রীতি নেই–নেই–
অগণন তাপী সাধারণ প্রাচী অবাচীর উদীচীর মতন একাকী
আজ নেই–কোথাও দিৎসা নেই–জেনে
তবু রাত্রিকরোজ্জ্বল সমুদ্রের পাখি। 

=====  

সময়ের কাছে  

সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি।
সেই সব একদিন হয়তো বা কোনো এক সমুদ্রের পারে
আজকের পরিচিত কোনো নীল আভার পাহাড়ে
অন্ধকারে হাড়কঙ্করের মতো শুয়ে
নিজের আয়ুর দিন তবুও গণনা করে যায় চিরদিন–
নীলিমার কাছ থেকে ঢের দূরে সরে গিয়ে,
সূর্যের আলোর থেকে অন্তর্হিত হয়ে;
পেপিরাসে–সেদিন প্রিন্টিং প্রেসে কিছু নেই আর;
প্রাচীন চীনের শেষে নবতম শতাব্দীর চীন
সেদিন হারিয়ে গেছে। 

আজকে মানুষ আমি তবুও তো–সৃষ্টির হৃদয়ে
হৈমন্তিক স্পন্দনের পথে ফসল;
আর এই মানবের আগামী কঙ্কাল;
আর নব–
নব-নব মানবের তরে
কেবলি অপেক্ষাতুর হয়ে পথ চিনে নেওয়া–
চিনে নিতে চাওয়া;
আর সে চলার পথে বাধা দিয়ে অন্নের সমাপ্তিহীন ক্ষুধা;
(কেন এই ক্ষুধা–
কেনই বা সমাপ্তিহীন!)
যারা সব পেয়ে গেছে তাদের উচ্ছিষ্ট,
যারা কিছু পায় নাই তাদের জঞ্জাল;
আমি এই সব।

সময়ের সমুদ্রের পারে
কালকের ভোরে আর আজকের অন্ধকারে
সাগরের বড়ো শাদা পাখির মতন
দুইটি ছড়ানো ডানা বুকে নিয়ে কেউ
কোথাও উচ্ছল প্রাণশিখা
জ্বালায়ে সাহস সাধ স্বপ আছে–ভাবে।
ভেবে নিক–যৌবনের জোবন্ত প্রতীক : তার জয়!
প্রৌঢ়তার দিকে তবু পৃথিবীর জ্ঞানের বয়স
অগ্রসর হয়ে কোন আলোকের পাখিকে দেখেছে?–
জয়, তার জয়, যুগে-যুগে তার জয়!–
ডোডো পাখি নয়।

মানুষেরা বারবার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে;
নব নব ইতিহাসসৈকতে ভিড়েছে;
তবুও কোথাও সেই অনির্বচনীয়
স্বপনের সফলতা–নবীনতা–শুভ্র মানবিকতার ভোর?
নচিকেতা জরাথ্রুস্ট্র লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী
হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?
অন্ধকারে ইতিহাসপুরুষের সপ্রতিভ আঘাতের মতো মনে হয়
যতই শান্তিতে স্থির হ’য়ে যেতে চাই;
কোথাও আঘাত ছাড়া–তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।
হে কালপুরুষ তারা, অনন্ত দ্বন্দের কোলে উঠে যেতে হবে
কেবলি গতির গুণগান গেয়ে–সৈকত ছেড়েছি এই স্বচ্ছন্দ উৎসবে :
নতুন তরঙ্গে রৌদ্রে বিপ্লবে মিলনসূর্যে মানবিক রণ
ক্রমেই নিস্তেজ হয় ক্রমেই গভীর হয় মানবিক জাতীয় মিলন?
নব নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ জয় ক’রে মানুষের চেতনার দিন
অমেয় চিন্তায় খ্যাত হয়ে তবু ইতিহাসভুবনে নবীন
হবে না কি মানবকে চিনে–তবু প্রতিটি ব্যক্তির ষাট বসন্তের তরে!
সেই সুনিবিড় উদ্বোধনে– ‘আছে আছে আছে’ এই বোধির ভিতরে
চলেছে নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি, মানুষের বিষয় হৃদয়;–
জয়, অস্তসূর্য, জয়, অলখ অরুণোদয়, জয়।’ 

==== 

তবু

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী

মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে

উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার

বছরে বয়সী আমি;

বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে

চ’লে যেতে দেখে- তবু- অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা ক’রে

এখানে তোমার কাছে দাঁড়ায়ে রয়েছি;

আজ ভোরে বাংলার তেরোশো চুয়ান্ন সাল এই

কোথাও নদীর জলে নিজেকে গণনা ক’রে নিতে ভুলে গিয়ে

আগামী লোকের দিকে অগ্রসর হয়ে যায়; আমি

তবুও নিজেকে রোধ ক’রে আজ থেমে যেতে চাই

তোমার জ্যোতির কাছে; আড়াই হাজার

বছর তা-হলে আজ এই-খানে শেষ হয়ে গেছে।


এই সব দিনরাত্রি 


মনে হয় এর চেয়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ভালো।

এইখানে

পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ-অশান্ত কিনারা দেশে

এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে।

তাদের সম্রাট নেই, সেনাপতি নেই;

তাদের হৃদয়ে কোনও সভাপতি নেই;

শরীর বিবশ হ’লে অবশেষে ট্রেড-ইউনিয়নের

কংগ্রেসের মতো কোনও আশা-হতাশার

কোলাহল নেই। 

অনেক শ্রমিক আছে এইখানে।

আরও ঢের লোক আছে

সঠিক শ্রমিক নয় তারা।

স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝ’রে

এরা তবু মৃত নয়; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে।

নামগুলো কুশ্রী নয়, পৃথিবীর চেনা-জানা নাম এই সব।

আমরা অনেক দিন এ-সব নামের সাথে পরিচিত; তবু,

গৃহ নীড় নির্দেশ সকলই হারায়ে ফেলে ওরা

জানে না কোথায় গেলে মানুষের সমাজের পারিশ্রমিকের

মতন নির্দিষ্ট কোনও শ্রমের বিধান পাওয়া যাবে;

জানে না কোথায় গেলে জল তেল খাদ্য পাওয়া যাবে;

অথবা কোথায় মুক্ত পরিচ্ছন্ন বাতাসের সিন্ধুতীর আছে। 

মেডিকেল ক্যাম্বেলের বেলগাছিয়ার

যাদবপুরের বেড, কাঁচড়াপাড়ার বেড সব মিলে কতগুলো সব?

ওরা নয়- সহসা ওদের হয়ে আমি

কাউকে শুধায়ে কোনও ঠিক-মতো জবাব পাই নি।

বেড আছে, বেশি নেই- সকলের প্রয়োজনে নেই।

যাদের আস্তানা ঘর তল্পিতল্পা নেই

হাসপাতালের বেড হয়তো তাদের তরে নয়।

বটতলা মুচিপাড়া তালতলা জোড়াসাঁকো- আরও ঢের ব্যর্থ অন্ধকারে

যারা ফুটপাত ধ’রে অথবা ট্রামের লাইন মাড়িয়ে চলছে

তাদের আকাশ কোন্ দিকে?

জানু ভেঙে প’ড়ে গেলে হাত কিছু ক্ষণ আশাশীল

হয়ে কিছু চায়- কিছু খোঁজে;

এ ছাড়া আকাশ আর নেই।

তাদের আকাশ

সর্বদাই ফুটপাতে;

মাঝে-মাঝে অ্যাম্বুলেন্স-গাড়ির ভিতরে

রণক্লান্ত নাবিকেরা ঘরে

ফিরে আসে

যেন এক অসীম আকাশে। 

এ-রকম ভাবে চ’লে দিন যদি রাত হয়, রাত যদি হয়ে যায় দিন,

পদচিহ্নময় পথ হয় যদি দিকচিহ্নহীন,

কেবলই পাথুরেঘাটা নিমতলা চিৎপুর-

খালের এ-পার ও-পার রাজাবাজারের অস্পষ্ট নির্দেশে

হাঘরে হাভাতেদের তবে

অনেক বেডের প্রয়োজন;

বিশ্রামের প্রয়োজন আছে;

বিচিত্র মৃত্যুর আগে শান্তির কিছুটা প্রয়োজন।

হাসপাতালের জন্যে যাহাদের অমূল্য দাদন,

কিংবা যারা মরণের আগে মৃতদের

জাতি-ধর্ম-নির্বিচারে সকলকে- সব তুচ্ছতম আর্তকেও

শরীরের সান্ত্বনা এনে দিতে চায়,

কিংবা যারা এই সব মৃত্যু রোধ ক’রে এক সাহসী পৃথিবী

সুবাতাস সমুজ্জ্বল সমাজ চেয়েছে-

তাদের ও তাদের প্রতিভা প্রেম সংকল্পকে ধন্যবাদ দিয়ে

মানুষকে ধন্যবাদ দিয়ে যেতে হয়।

মানুষের অনিঃশেষ কাজ চিন্তা কথা

রক্তের নদীর মতো ভেসে গেলে, তার পর, তবু, এক অমূল্য মুগ্ধতা

অধিকার ক’রে নিয়ে ক্রমেই নির্মল হ’তে পারে। 

ইতিহাস অর্ধসত্যে কামাচ্ছন্ন এখনও কালের কিনারায়;

তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে; মানুষের মন

জানে জীবনের মানে: সকলের ভালো ক’রে জীবনযাপন।

কিন্তু সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ।

চারি দিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড়- অলীক প্রয়াণ।

মন্বন্তর শেষ হ’লে পুনরায় নব-মন্বন্তর;

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল;

মানুষের লালসার শেষ নেই;

উত্তেজনা ছাড়া কোনও দিন ঋতু ক্ষণ

অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ

অপরের মুখ ম্লান ক’রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ

নেই। কেবলই আসন থেকে বড়ো, নবতর

সিংহাসনে যাওয়া ছাড়া গতি নেই কোনও।

মানুষের দুঃখ কষ্ট মিথ্যা নিষ্ফলতা বেড়ে যায়। 

মনে পড়ে কবে এক রাত্রির স্বপ্নের ভিতরে

শুনেছি একটি কুষ্ঠকলঙ্কিত নারী

কেমন আশ্চর্য গান গায়;

বোবা কালা পাগল মিনসে এক অপরূপ বেহালা বাজায়;

গানের ঝংকারে যেন সে-এক একান্ত শ্যাম দেবদারু-গাছে

রাত্রির বর্ণের মতো কালো-কালো শিকারী বেড়াল

প্রেম নিবেদন করে আলোর রঙের মতো অগণন পাখিদের কাছে;

ঝর্ ঝর্ ঝর্

সারা রাত শ্রাবণের নির্গলিত ক্লেদ-রক্ত বৃষ্টির ভিতর

এ-পৃথিবী ঘুম স্বপ্ন রুদ্ধশ্বাস

শঠতা রিরংসা মৃত্যু নিয়ে

কেমন প্রমত্ত কালো গণিকার উল্লোল সংগীতে

মুখের ব্যাদান সাধ দুর্দান্ত গণিকালয়- নরক শ্মশান হ’ল সব।

জেগে উঠে আমাদের আজকের পৃথিবীকে এ-রকম ভাবে অনুভব

আমিও করেছি রোজ সকালের আলোর ভিতরে

বিকেলে- রাত্রির পথে হেঁটে;

দেখেছি রাজনীগন্ধা নারীর শরীর অন্ন মুখে দিতে গিয়ে

আমরা অঙ্গার রক্ত: শতাব্দীর অন্তহীন আগুনের ভিতরে দাঁড়িয়ে। 

এ-আগুন এত রক্ত মধ্যযুগ দেখেছে কখনও?

তবুও সকল কাল শতাব্দীকে হিসেব-নিকেশ ক’রে আজ

শুভ কাজ সূচনার আগে এই পৃথিবীর মানবহৃদয়

স্নিগ্ধ হয়- বীতশোক হয়?

মানুষের সব গুণ শান্ত নীলিমার মতো ভালো?

দীনতা: অন্তিম গুণ, অন্তহীন নক্ষত্রের আলো।


উত্তর সাময়িকী

আকাশের থেকে আলো নিভে যায় ব’লে মনে হয়।
আবার একটি দিন আমাদের মৃগতৃষ্ণার মতো পৃথিবীতে
শেষ হয়ে গেল তবে;— শহরের ট্রাম
উত্তেজিত হয়ে উঠে সহজেই ভবিতব্যতার
যাত্রীদের বুকে নিয়ে কোন্‌ এক নিরুদ্দেশ কুড়োতে চলেছে।
এই দিকে পায়দলদের ভিড়—অই দিকে টর্চের মশালে বার—বার
যে যার নিজের নামে সকলের চেরে আগে নিজের নিকটে
পরিচিত;— ব্যক্তির মতন নিঃসহায়;
জনতাকে অবিকল অমঙ্গল সমুদ্রের মতো মনে ক’রে
যে যার নিজের কাছে নিবারিত দ্বীপের মতন
হয়ে পড়ে অভিমানে—ক্ষমাহীন কঠিন আবেগে।

সে মুহূর্ত কেটে যায়; ভালোবাসা চায় না কি মানুষ নিজের
পৃথিবীর মানুষের? শহরে রাত্রির পথে হেঁটে যেতে যেতে
কোথাও ট্রাফিক থেকে উৎসারিত অবিরল ফাঁস
নাগপাশ খুলে ফেলে কিছুক্ষণ থেমে থেমে এ রকম কথা
মনে হয় অনেকেরই;—
আত্মসমাহিতিকূট ঘুমায়ে গিয়েছে হৃদয়ের!
তবু কোনো পথ নেই এখনো অনেক দিন, নেই।
একটি বিরাট যুদ্ধ শেষ হয়ে নিভে গেছে প্রায়।
আমাদের আধো-চেনা কোনো-এক পুরোনো পৃথিবী
নেই আর। আমাদের মনে চোখে প্রচারিত নতুন পৃথিবী
আসে নি তো।
এই দুই দিগন্তের থেকে সময়ের
তাড়া খেয়ে পলাতক অনেক পুরুষ—নারী পথে
ফুটপাতে মাঠে জীপে ব্যারাকে হোটেলে অলিগলির উত্তেজে
কমিটি-মিটিঙে ক্লাবে অন্ধকারে অনর্গল ইচ্ছার ঔরসে
সঞ্চারিত উৎসবের খোঁজে আজো সূর্যের বদলে
দ্বিতীয় সূর্যকে বুঝি শুধু অন্ন, শক্তি, অর্থ, শুধু মানবীর
মাংসের নিকটে এসে ভিক্ষা করে। সারাদিন— অনেক গভীর
রাতের নক্ষত্র ক্লান্ত হয়ে থাকে তাদের বিলোল কাকলীতে।
সকল নেশন আজ এই এক বিলোড়িত মহা-নেশনের
কুয়াশায় মুখ ঢেকে যে যার দ্বীপের কাছে তবু
সত্য থেকে— শতাব্দীর রাক্ষসী বেলায়
দ্বৈপ-আত্মা-অন্ধকার এক-একটি বিমুখ নেশন।

শীত আর বীতশোক পৃথিবীর মাঝখানে আজ
দাঁড়ায়ে এ জীবনের কতগুলো পরিচিত সত্ত্বশূন্য কথা—
যেমন নারীর প্রেম, নদীর জলের বীথি, সারসের আশ্চর্য ক্রেঙ্কার
নীলিমায়, দীনতায় যেই জ্ঞান, জ্ঞানের ভিতর থেকে যেই
ভালোবাসা; মানুষের কাছে মানুষের স্বাভাবিক
দাবীর আশ্চর্য বিশুদ্ধতা; যুগের নিকটে ঋণ, মনবিনিময়,
এবং নতুন জননীতিকের কথা— আরো স্মরণীয় কাজ
সকলের সুস্থতার— হৃদয়ের কিরিণের দাবী করে; আর অদূরের
বিজ্ঞানের আলাদা সজীব গভীরতা;
তেমন বিজ্ঞান যাহা নিজের প্রতিভা দিয়ে জেনে সেবকের
হাত দিব্য আলোকিত ক’রে দেয়— সকল সাধের
কারণ-কর্দম-ফেণা প্রিয়তর অভিষেকে স্নিগ্ধ ক’রে দিতে;—
এই সব অনুভব ক’রে নিয়ে সপ্রতিভ হতে হবে না কি।
রাত্রির চলার পথে এক তিল অধিক নবীন
সম্মুখীন— অবহিত আলোকবর্ষের নক্ষত্রেরা
জেগে আছে। কথা ভেবে আমাদের বহিরাশ্রয়িতা
মানবস্বভাবস্পর্শে আরো ঋত— অন্তর্দীপ্ত হয়।

সময়ের তীরে

নিচে হতাহত সৈন্যদের ভিড় পেরিয়ে,

মাথার ওপর অগণন নক্ষত্রের আকাশের দিকে তাকিয়ে,

কোনো দূর সমুদ্রের বাতাসের স্পর্শ মুখে রেখে,

আমার শরীরের ভিতর অনাদি সৃষ্টির রক্তের গুঞ্জরণ শুনে,

কোথায় শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম আমি।

সেখানে মাতাল সেনানায়কেরা

মদকে নারীর মতো ব্যবহার করছে,

নারীকে জলের মতো;

তাদের হৃদয়ের থেকে উত্থিত সৃষ্টিবিসারী গানে

নতুন সমুদ্রের পারে নক্ষত্রের নগ্নলোক সৃষ্টি হচ্ছে যেন;

কোথাও কোনো মানবিক নগর বন্দর মিনার খিলান নেই আর;

এক দিকে বালিপ্রলেপী মরুভূমি হু-হু করছে;

আর এক দিকে ঘাসের প্রান্তর ছড়িয়ে আছে-

আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যের মতো অপার অন্ধকারে মাইলের পর মাইল।


শুধু বাতাস উড়ে আসছেঃ

স্থলিত নিহত মনুষ্যত্বের শেষ সীমানাকে

সময়সেতুগুলোকে বিলীন ক’রে দেবার জন্যে,

উচ্ছ্রিত শববাহকের মূর্তিতে।

শুধু বাতাসের প্রেতচারণ

অমৃতলোকের অপস্রিয়মান নক্ষত্রযান-আলোর সন্ধানে।

পাখি নেই,—সেই পাখির কঙ্কালের গুঞ্জরণ;

কোনো গাছ নেই,—সেই তুঁতের পল্লবের ভিতর থেকে

অন্ধ অন্ধকার তুষারপিচ্ছিল এক শোণ নদীর নির্দেশে।


সেখানে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো, নারি,

অবাক হলাম না।

হতবাক হবার কী আছে?

তুমি যে মর্ত্যনারকী ধাতুর সংঘর্ষ থেকে জেগে উঠেছ নীল

স্বর্গীয় শিখার মতো;

সকল সময় স্থান অনুভবলোক অধিকার ক’রে সে তো থাকবে

এইখানেই,

আজ আমাদের এই কঠিন পৃথিবীতে।


কোথাও মিনারে তুমি নেই আজ আর

জানালার সোনালি নীল কমলা সবুজ কাচের দিগন্তে;

কোথাও বনচ্ছবির ভিতরে নেই;

শাদা সাধারণ নিঃসঙ্কোচ রৌদ্রের ভিতরে তুমি নেই আজ।

অথবা ঝর্ণার জলে

মিশরী শঙ্খরেখাসর্পিল সাগরীয় সমুৎসুকতায়

তুমি আজ সূর্যজলস্ফুলিঙ্গের আত্মা-মুখরিত নও আর।

তোমাকে আমেরিকার কংগ্রেস-ভবনে দেখতে চেয়েছিলাম,

কিংবা ভারতের; অথবা ক্রেমলিনে কি বেতসতম্বী সূর্যশিখার কোনো স্থানে আছে

যার মানে পবিত্রতা শান্তি শক্তি শুভ্রতা—সকলের জন্যে!

নিঃসীম শুন্যে শুন্যের সংঘর্ষে স্বতরুৎসারা নীলিমার মতো

কোনো রাষ্ট্র কি নেই আজ আর

কোনো নগরী নেই

সৃষ্টির মরালীকে যা বহন ক’রে চলেছে মধু বাতাসে

নক্ষত্রে—লোক থেকে সূর্যলোকান্তরে!


ডানে বাঁয়ে ওপরে নিচে সময়ের

জ্বলন্ত তিমিরের ভিতর তোমাকে পেয়েছি।

শুনেছি বিরাট শ্বেতপক্ষিসূর্যের

ডানার উড্ডীন কলরোল;

আগুনের মহান পরিধি গান ক’রে উঠছে।







ঘুম ঘর