প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...

Tuesday, June 10, 2014

‘পরান আমার ব।ইরাম্‌ ব।ইরাম্‌‌ করে …’





পরান আমার ব।ইরাম্‌ ব।ইরাম্‌‌ করে …’

১।
‘অসময়ে বাঁশি বাজায় কে’রে
  পরান আমার ব।ইরাম্‌ ব।ইরাম্‌‌ করে …’

আমাদের যা কিছু সবই রয়ে গেছে এক নদীর ওপারে। আমাদের গান, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভালোলাগা, ভালোবাসা ... এমন কি আমাদের অস্তিত্বও।
না, সে কোনো প্রতীকের ‘নদী’ নয়। সে নদী রক্তের। রক্ত মাংসের।
বাইরাম্‌ বাইরাম্‌ করে’ বলতেন দিদিভাই। বাবার পিসী। বলতেন ত্রিপুরার মানুষরা খুব রসিক হয়। আমার ঠাকুর্দার একটু দূরের সম্পর্কের মামা শিবেন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন ত্রিপুরার। গ্রাম সরাইল। সে প্রথমে পাকিস্তান। পরে বাংলাদেশ। আমরা তাঁকে বলতাম ‘বাবু’। দিদিভাই বলতেন বাবু’র প্রসঙ্গে। আমার ছোটোবেলায়।  দুপুরের খাওয়া শেষ হলেই আরম্ভ হতো প্রশ্নঃ ‘ অ দিদিভাই, বিকাল কুন্‌ সময় অইব?” দিদিভাই বলতেন ‘অইব অইব, এট্টূ ফরে অইব। অখন এট্টু ঘুমাই থাকো …’ তারপরেই বলতেন ‘বিকাল অইলেই মন টায় খালি বাইরম্‌ বাইরম্‌ করে, না’নি…।‘ বলতেন ‘বাইরাম বাইরাম্‌ – ইতা ত্রিফুরার কথা। মামায় কইতা…’
এই শব্দ ‘বাইরম্‌ বাইরম্‌’, আহা, কতোদিন হারিয়ে গিয়েছিল । যদিও পঞ্চাশ সালের দিকে নদী পার হয়ে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দিদিভাই, বাবু, আমার ঠাকুর্দা, আমার বাবা – তখন বালক – এসেছিলেন এই পারে তবু শব্দগুলি, গানগুলি, ভাষার সুরেলা টান গুলি – হবিগঞ্জের মানুষের কথার – ফেলে এসেছিলেন ঐ পারেই। আমার বাবার উচ্চারনে সেই টান্‌ টুকু  এখনো রয়েছে। কিন্তু আমাদের নেই। আমার বাবার প্রজন্মের মানুষ যখন আর থাকবেনা এই পারে থাকবেনা ঐ উচ্চারনের ঐ বিশেষ ‘টান্‌’ গুলি – সিলেটি টান্‌, হবিগঞ্জি টান্‌…
আব্দুল আলম’কে মনে পড়ে কারো? মনে আছে? না থাকাই স্বাভাবিক। আব্বাস উদ্দিন পরের জীবন এপার বাংলায় কাটালেও কতোজনের আজ তাঁকে মনে আছে?  হ্যাঁ, মনে আছে নকলনবীশদের কেননা ওঁদের কথাকে, সুরকে বিকৃত করেই ত ওরা ‘দোহার’ দেয়। বাউলের আলখাল্লা গা’য়ে সিনেমায় নেচে বাউলের অপমান করে। আর শ্রোতারাও ওদেরি উদ্দাম ‘ফক্‌’ এ ‘ফাক্‌ড্‌’ হয়ে ভুলে যায় কথা। ভুলে যায় কাহিনী। ভুলে যায় সুর …
আব্দুল আলিমের কন্ঠে  ‘অসময়ে বাঁশি বাজায় কে’রে
  পরান আমার বাইরাম্‌ বাইরাম্‌ করে …’ – গানটি শোনামাত্র ফিরে এলো প্রথম শৈশবের সেই দুপুর। সপ্‌ড়ি গাছে ঢাকা পুকুরপার। ঐ পারে কলা গাছের সার। বড় বড় কচু গাছ। ... মনে এলো ঐ মানুষ দুইটিকে। বাবু আর দিদিভাই। আবহে আরো অসংখ্য মুখ। আরো অসংখ্য স্মৃতি ... সবই ফিরে এলো নদীটির ঐপারে ফেলে আসা ঐ ‘বাইরম্‌ বাইরম্‌’ শব্দে ...
টের পেলাম, আবারো টের পেলাম নিজের বন্দীত্বকে। জানলাম আজো অস্তিত্বের অতলে কে একজন যেন এইসব সাংসারিক সফলতায়, সাচ্ছ্বল্যে তৃপ্ত নয়। সে’ও মাঝে মাঝে শুনতে পায় দূরাগত এক বাঁশরীধ্বনি। তার পরান ‘বাইরাম্‌ বাইরাম্‌’ করে ...।
২।
‘মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে ...’


অফিসে যেতে এক ঘন্টা। ফিরে আসতে দুই ঘন্টা। অফিসের বাসে। কোনো কোনোদিন বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পরি। আমার স্টপেজ এলে কেউ না কেউ উঠিয়ে দেয়। সামান্য হেঁটেই এই নগরীতে আমার আশ্রয়স্থল – আমার ‘ফ্ল্যাট্‌’। তা’তে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত আটটা বেজে যায়। কোনো কোনোদিন ঢোকামাত্র এতোটাই ক্লান্ত লাগে যে ছয় বছরের খুকির আদুরে দৌরাত্মও যেন ভালোলাগেনা। যে সমস্ত রাতে ঘুম হয়না তার পরের দিনের বাড়ি ফেরা গুলো আরো ক্লান্তিকর। শরীর ক্লান্ত। তা’ও জানি ঘুম আসবে না। বাড়িতে একজন বয়স্ক মানুষ অসুস্থ। তাঁর কথাও মাথায় ঘোরে। পরের দিনের কাজগুলি, অফিসের, তাদেরো পারিনা মন থেকে ঠেলে ফেলতে। পড়ে শেষ করতে না পারা বই, বইগুলি – সে’ও আরেক দুশ্চিন্তার মতো …
আজো তেমনি একটি ক্লান্তিকর সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। ফিরে এসে পেছনের ব্যালকনীর অন্ধকারে বসে হঠাৎই চালিয়ে দিয়েছিলাম গান। কি বাজাচ্ছি না দেখেই। বেজে উঠলেন আব্দুল আলীম। ‘অসময়ে বাঁসি বাজায় কে’ … ‘হলদিয়া পাখি, সোনারি বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে’ …’প্রেমের মরা জলে ডুবে না…’ … ‘ডোবে না’ নয়, ‘ডুবে না’। ঐ খানেই শিকড়ের টান্‌। প্রাণের হেউ ঢেউ। আমরা বাঙ্গালী। আমরা ‘কইলকাত্তাইয়া’ নই। আমরা ‘ডোবে’ কে বল ‘ডুবে’। ‘পানা পুকুর’ কে বলি ‘ডুবা’ … ডাহুক’কে বলি ‘ডাউক’ … আব্দুল আলীমও তা’ই বলেন, আব্বাস উদ্দিনও। নির্মলেন্দু কিছুদূর বলেছিলেন। তাঁর পুত্র বাংলার গানকে করে দিলো ‘কইলকাত্তাইয়া’ গান। আবুল আলীম গেয়ে ওঠেন ‘নাইয়া রে নাউয়ের বাদাম তুইল্লা কুন্‌ দেশে যাও চইল্লা’ … উৎপলেন্দু গায় ‘নায়া রে নাও’এর বাদাম তুইলা কোন্‌ দেশে যাও চইলা’ … ঐ একটিমাত্র ‘ল’ অক্ষরে মাত্রা ভাঙ্গে। ছন্দ ডোবে। আমাদের কাছে। আমাদের কানে। কেননা আমাদের যা কিছু সবই রয়ে গেছে এক নদীর ওপারে। আমাদের গান, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভালোলাগা, ভালোবাসা ... এমন কি আমাদের অস্তিত্বও।
না, সে কোনো প্রতীকের ‘নদী’ নয়। সে নদী রক্তের। রক্ত মাংসের।
উৎপল বসু’র লেখার কায়দা কানুন থেকে বিষয় কিছুই আমার ভালো লাগেনা সবচেয়ে খারাপ লাগে তাঁর সবচেয়ে হিট্‌ বই ‘পুরী সিরিজ’। তবু ঐ ‘পুরী সিরিজে’র একটি লেখা বার বার মনেপড়েঃ
‘তারপর ঘাসের জঙ্গলে পড়ে আছে তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি।
...
তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি হারিয়েছ বাদাম পাহাড়ে।
আমার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা আমি হারিয়েছি বাদামপাহাড়ে।‘
... ঐ চিত্রকল্প যেন আমায় বলে সেই ভিটেটির কথা যা ছেড়ে, নদী পার হয়ে এপারে এসেছিলেন বাবু, দিদিভাই, আমার ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, আমার বাবা – তখন বালক... যেন মনেহয় ঐ বাড়ির পেছনের নদীর পারের ঘাসের জঙ্গলে আজো পরে আছে আমার বাবার বালকবেলার একটি চটি... যেন আমার গোটা অতীত, ঐতিহ্য সমস্তই হারিয়ে গিয়েছে ঐ বাদাম পাহাড়ে ...

গান চল্লো। অন্ধকার বারান্দায় জ্বলে গেলো সিগারেট। দূরে কোথায় জোনাকির মতো জ্বলে উঠলো স্মৃতি। রাত আটটা থেকে রাত্রি বারোটা বেজে গেলো। ধুমিয়ে পরলো সবাই। আমি টের পেলাম এক অবগাহন। টের পেলাম অবসাদের থেকে মুক্তি। হ্যাঁ, গানে গানে ... গানে গানেই ছিন্ন হলো অবসাদের, পরিশ্রমের, বিষাদের বন্ধন। কাগজ কলম টেনে নিয়ে বসে পড়লাম লিখতে...

আহ্‌ মৃত্যু, তোমাকে ভয় করি। আমি কোনো ভন্ডামী নির্মীত নাগরিক সন্ত নই। আমার পূর্বজন্মে, পরজন্মে  বিশ্বাস নেই। তাই মরে যেতে ইচ্ছা করেনা। তবু মনেহয় যদি মৃত্যু আবহে বাজতে থাকে গান তাহলে হয়তো মৃত্যুও হতে পারে সহনীয় ...

৩।
"My words fly up, my thoughts remain below:
         Words without thoughts never to heaven go.".


উদ্ধৃতি শেক্ষপীর থেকে। হেম্‌লেটের পাপী খুল্লতাত’র উচ্চারন। আবার একই নাটকের আরম্ভে শব্দের নিষ্প্রাণতায় হেমলেট নিজেও বলেছিলেনwords words words...

হ্যাঁ, শব্দ। শব্দই প্রাণ পেলে ব্রহ্ম আর প্রাণ প্রতিষ্ঠা নাহলে হালের ‘জীবনমুখী’ ...
“অসময়ে বাঁশি বাজায় কে রে
পরান আমার বাইরাম্‌ বাইরাম্‌ করে
আমি কহিতে না’রি সহিতে না’রি জ্বালা
জ্বালা সহেনা আমার অন্তরে

আমি একেত অবলা বালা সহেনা বিরহ জ্বালা...”
বেশ ত চলছিল। হঠাৎই আব্দুল আলীম গেয়ে ওঠেনঃ
“যখন আমি ঘুমে থাকি তুমারে স্বপনে দেখি
নিদ্রাভঙ্গ হয় আচম্বিতে...”
“আচম্বিতে”! আহ্‌, “আচম্বিতে” আমার চোখেও ভেসে উঠলো ময়লা ধুতি পাঞ্জাবী পরনে, রোগা মানুষটি। মুখে খোঁচা খোঁচা না কামানো দাড়ি।  আমার শিশু চোখ তাঁর বয়স তখন আন্দাজ না করতে পারলেও আজ মনেহয় অন্ততঃ পঞ্চাশ ত তখন হবেই।
শিলচরে মামাবাড়ি গেছি। দুই বিলেতবাসি মামা এসেছেন। আমি পাঠশালার শেষের দিতে তখন। মামাদের দেখতে এসেছে আরো মামা-মাসিরা। আমার দাদু, সুরেশ বিশ্বাস, তখন নেই। তাঁর দুই ছোটোভাই আছেন। সোনাদাদু আর ছোটোদাদু। দিদিমা আছেন তখনো। শিলচরে। অম্বিকাপট্টির বাড়িতে। সম-অসম বয়সী মামাত মাসতুতো ভাইবোনেদের সঙ্গে হৈ হৈ করে যাচ্ছে দিন। শীতের সকালগুলির উজ্জ্বলতা যেন আজো ছুঁয়ে যায় গালে...
তেমনি এক সকালে দেখা গেলো তাঁকে। সামনের বারান্দার এক প্রান্তে। মোড়ায় বসা। ময়লা ধুতি পাঞ্জাবীর সঙ্গে মিলিয়ে আধময়লা চাদর। মামারা তাঁকে নিয়ে মস্করা করছে। দুই দাদুও করছেন। এরি মধ্যে চা আসছে। মানুষটি চা খাচ্ছেন...
একটু দেখে টেখে আমি চলে গেছি আমার খেলায়। ভেতর বাড়িতে। একটু পরেই আবার সামনে এসে দেখি মানুষটি নেই।
দুপুরে খেতে বসা হয়েছে একসঙ্গে। সব বড়রা একদিকে। কচিকাঁচাতা পাক্‌ঘরের অন্য দিকে। বড়দের আলোচনা থেকে যা উদ্ধার করা গিয়েছিল তা এই, যে, ইনিও আমার দাদু। মানে আমার মাতামহের কি রকমের ভাই। দীর্ঘদিন বিপত্নীক। আগে থেকেই নাকি ছিলেন ভবঘুরে ধরনের। পত্নী বিয়োগের পর আরো বেশী ভবঘুরে। কোথায় থাকেন, কখন আসেন, কখন যান্‌ জানা যায়না। তাঁর ঐ ‘আচম্বিতে’ যাওয়া আসা’র জন্য আমার মা-মাসি-মামা’রা, আমার দাদুদের দেওয়া নামে, তাঁকে ডাকত ‘আচম্বিত কাকা’ বলে ...
সেই যে হঠাৎ করে এসে হঠাৎ করে চলে গিয়েছিলেন মানুষটা সেই আমার তাঁকে প্রথম আর শেষ দেখা। পরে, মাঝে মাঝে মনে হতো আছেন কি মানুষটা? কোথায় আছেন? কিভাবে আছেন? কোন্‌ মাঠে, কোন্‌ ভিড়ের বাসে, নাকি ট্রেইনে চেপে চলেছেন ‘আচম্বিতে’ ...
তাঁর মৃত্যু সংবাদ কখনো শুনেছিলাম মা’র মুখে। আজ মনেহয়। কিন্তু মনে হতোনা, কিছুতেই না, ঐ রকমের একটি অপূর্ব মানুষও যেতেন আমার মর্ম থেকে হারিয়ে যদিনা আজ আব্দুল আলীম গেয়েব উঠতেনঃ ‘“যখন আমি ঘুমে থাকি তুমারে স্বপনে দেখি
নিদ্রাভঙ্গ হয় আচম্বিতে...”
... এই গানতো আগেও কতোই শুনেছি। কিন্তু কই মনে আসেনিত  আচম্বিত্‌দাদু’র কথাটা ... তাহলে সেইসব দিনে কি আবুক আলীমের ‘words’ ছিল মৃত? তাতে ছিলনা কি ‘thoughts’? তাহলে আজ কিকরে সেই শব্দগুলো প্রাণ পেয়ে ডানা মেলে দিলো স্বর্গের দিকে? ...।

টের পেলাম আমার মর্মেই প্রাণ ছিলোনা বহুদিন তাই বহুদিন শুনেও আমি উড়ে যেতে পারিনি ঐ শব্দদের সঙ্গে।
আজ পারলাম। আজ হয়ত মানুষের প্রকৃত দেবতা এসে নিঃশব্দে বসেছিলেন আমার কিনারে। বারান্দায়। অন্ধকারে ...

৪।
‘নাইয়ারে নাউ’এর বাদাম তুইল্লা কুন্‌ দূরে যাও চইল্লা
অচেনা সায়রের মাঝি সেইকথা যাও বইল্লা’


‘নাইয়ারে নাউ’এর বাদাম তুইল্লা কুন্‌ দূরে যাও চইল্লা
অচেনা সায়রের মাঝি সেইকথা যাও বইল্লা’
নাইয়ারে ভাটির দেশে যাও যুদি তুমি হিজলতলীর হাটে
সেথায় আমার ভাইজান থাকে আমার কথা কইয় তাকে...’

গেয়ে যান আব্দুল আলীম। ‘আচম্বিতে’ ধাক্কা লাগে। ... এই গানতো আগেও কতোই শুনেছি। কিন্তু কই লাগেনিত এমন ‘ধাক্কা’। তাহলে সেইসব দিনে কি আবুক আলীমের ‘words’ ছিল মৃত? তাতে ছিলনা কি ‘thoughts’? তাহলে আজ কিকরে সেই শব্দগুলো প্রাণ পেয়ে ডানা মেলে দিলো স্বর্গের দিকে? ...।

টের পেলাম আমার মর্মেই প্রাণ ছিলোনা বহুদিন তাই বহুদিন শুনেও আমি উড়ে যেতে পারিনি ঐ শব্দদের সঙ্গে।
আজ পারলাম। আজ হয়ত মানুষের প্রকৃত দেবতা এসে নিঃশব্দে বসেছিলেন আমার কিনারে। বারান্দায়। অন্ধকারে ...তাই আজ খালি ধাক্কা লাগছে...শব্দে শব্দে হাহাকার করে উঠছে প্রান। ‘হিজলতলীর হাট’। আহ্‌ ‘হিজল’ কি মনোরম শব্দ। যেন জীবনানন্দের, ‘রূপসী বাংলা’র সারাৎসার এই শব্দে। যেন ‘সহজ পাঠ’এ নন্দলালের আঁকা প্রতিটি ছবির ইশারা – ‘হিজলতলীর হাট’ ... আমাদের যা কিছু সবই রয়ে গেছে এক নদীর ওপারে। আমাদের গান, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভালোলাগা, ভালোবাসা ... এমন কি আমাদের অস্তিত্বও।
না, সে কোনো প্রতীকের ‘নদী’ নয়। সে নদী রক্তের। রক্ত মাংসের।
ওই নদীর ঐ পারে রয়েগেছে ‘হিজলতলীর হাট’। রয়েগেছে ‘ঘন মেঘ বলে ঋ, দিন বড় বিশ্রী’। বই ছাপা হয়েছে এই পারে। রেকর্ড বেরিয়েছে এইপারে। কিন্তু আমাদের কাছে আর ফিরে আসেনি আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার খালিপায়ে ‘হিজলতলীর হাট’এ যাওয়ার শৈশব... কালো, মস্ত ছাতা নিয়ে ‘বিশ্রী’ দিনে মেঘের কন্ঠে ‘ঋ’কার উচ্চারনের বাস্তব ...
মনেপড়ে বালকবেলার কথা ...কারেন্ট্‌ চলে যাওয়া মানেই ছুটি। পড়াশোনা নেই। মা বা বাবা হ্যারিকেন, মোমবাতি জোগাড় করে জ্বালিয়ে দিলেও পড়ানোর উদ্দীপনা যেন কমে যেতো ওদেরো। কখনো জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতো ঘর, বারান্দা ... কখনো বাদ্‌লার বাতাস এসে উড়িয়ে নিতো দরজার, জানালার পর্দ্দা ... কখনো, পেছনের বারান্দায় গিয়ে বসতাম খালের পাড়ে ... কখনো সামনের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতাম কখন ঝন্‌ ঝনাৎ শব্দ তুলতে তুলতে চলে যাবে একটা দুটো রিক্সা, সাইকেল ...
                      বয়ঃসন্ধির থেকে কৈশোরের দিকে যেতে যেতে ঐ কারেন্ট চলে যাওয়া আত্মপ্রকাশ করলো আরেক অবয়বে ... ব্যাটারী চালিত রেডিও’র নব্‌ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে গান শোনা ... মনেপড়ে ঐ ভাবে, নব্‌ ঘোরাতে ঘোরাতেই একদিন শুনেছিলাম, অশোকতরু’র কন্ঠেঃ ‘যদি প্রেম দিলেনা প্রাণে ... কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে ... কেন তারার মালা গাঁথা, কেন ফুলের শয়ন পাতা... কেন দখিন হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে ...’ কতোদিন এমন হয়েছে যে কারেন্ট নেই এই অছিলায় ফিরিয়ে দিয়েছি মাষ্টার মশাইকে ... কোনো কোনো দিন ঐ অছিলায় মাষ্টার মশাই নিজেই চলে গেছেন ...আর কারেন্ট না থাকার রাত্রিটি ডাল পালা মেলে ছড়িয়ে যেতে যেতে পার হয়ে গেছে ঘড়িতে ধরা বাঁধা সময়ের চক্রবাল ...
                       একদিন, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের দিকে, নামলো বৃষ্টি, ছুটলো বাতাস ... যথারীতি চলে গেলো কারেন্ট ... বৃষ্টি হলো সারারাত ... টিনের চালে ঝরে গেলো বৃষ্টি, উড়ে আসা পাতা, ডালপালা ... ভরে উঠলো নদী, খাল, বিল ... সন্ধ্যায় ঘন্টা খানেকের জন্য কারেন্ট এসেই আবার নেই ... বৃষ্টি’র যমজ যে আলস্যে সেই আলস্যে সারাদিন যাইনি কোথাও ... তখন ইস্কুলের শেষ দিক ... যাওয়া মানে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাওয়া মফস্বল শহরের কেন্দ্রে, মফস্বলি পার্কে ...
       সন্ধ্যা ক্রমে রাত্রি হয়ে গেলো। আবার বাতাস বইল। আবার বৃষ্টি নামলো। তবু আমার বিছানার মাথার দিকের জানালাটা বন্ধ করলাম না ... জানালার বাইরে গোঁসাই দের বাগানের বড় বড় আশ্‌ শ্যাওড়া’র গাছ ... তার অন্ধকার পাতার আড়ালে অন্ধকার আকাশ ...  দূরের বাতাসে সেই আশ্‌ শ্যাওড়া’র ডালপালা সড়ে যাচ্ছে, বেড়িয়ে পরছে আরেকটুকরো আকাশের অন্ধকার ... আমাদের বাড়ির পেছনের খালও জলে ভরে গিয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে উঠোন, পেছনের বারান্দার সিঁড়ি ... সিঁড়িতে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিচ্ছে ঢেউ ... হায়, আমার সন্ততিরা বঞ্চিত মর্মের ঐ সব অলৌকিক অভিযান থেকে ... এরা ফলাট্‌’এ বেড়ে উঠছে ... হায়, ফলাটে বেড়ে উঠে মানুষ হওয়া যায় কি প্রকৃত? যেমন মানুষ অপু, দুর্গা, জাঁ ক্রিস্তফ্‌, প্রিন্স্‌ মিশ্‌কিন বা নিতান্ত ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র শশী ডাক্তার? ... জানিনা। জানতে চাইনা। আমি ভুলে যেতে চাই, ভুলে থাকতে চাই আমার এই ফলাট্‌ জীবন, এই আইটি বাস্তবতা ... আমি টের পাই আমি হেরে গেছি, টের পাই আমি চাই বা না চাই আমার যাপন হয়ে গেছে নাগরিক ... আমার দুঃখুগুলো, সত্যজিত রায়ের ‘অরণ্যের দিন রাত্রি’র সৌমিত্র চাটুজ্জের দুঃখু ... সাঁওতাল পরগণার পরিবর্তে অফিসের পাট্টি’তে নাহয় উইক্‌-এন্ড টিরিপে গোয়া’য় গিয়ে নয়তো কোনো রিসর্ট’এ গিয়ে মাল খেয়ে উথ্‌লে ওঠে ... আর তখন ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকি ‘ হইতে ছিলাম গারিবলডি ... হইয়া গেলাম আইটি প্রো ...’ ... আর ঐ সময় আমার মুখটা যে ঠিক, টলষ্টয়ের ‘ইম্প এন্ড্‌ দ্য পীসেন্ট্‌স্‌’ ব্র্যাডের সেই হঠাৎ টাকা হওয়া মাতাল চাষীটির মতোই হয়ে ওঠে সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ আর নেই ...
     আমি মরে গেছি। সন্দেহ নেই। আমার সন্তানদের আমি ছিন্নমূল করেছি। তাদের কোনো জন্মভূমি, জন্মস্থান নেই ...জানি ... তথাপি মাঝে মাঝে মনেপড়ে সেই কারেন্ট না থাকা রাত্রি, সেই আষাঢ়ের, শ্রাবণের ... আমাদের বাড়ির পেছনের খাল জলে ভরে গিয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে উঠোন, পেছনের বারান্দার সিঁড়ি ... সিঁড়িতে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিচ্ছে ঢেউ ... আর ঐ বিষ্টি-বাদ্‌লার রাত্রে ছোট্ট খেয়া নৌকা দিয়ে কারা যেন চলেছে কোথায় ... তারা গান গাইছে ‘ নাইয়া’রে নাও’এর বাদাম তুইল্লা কুন্‌ দেশে যাও চইল্লা ...’ মনেপড়ে সেই তারাপদ’কে যে এমনি নৌকা’র থেকে ভেসে আসা গানের টানে পেছনে ফেলে সমস্ত সুখের হাতছানি,ঝাঁপিয়ে পরেছিল জলে, সাঁতরে গিয়ে উঠেছিল ঐ নৌকায় ...
এমনি আরেক কারেন্ট না থাকা সন্ধ্যায় শক্তিকাকু, কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, আর বাবার দাবা খেলা গিয়েছিল বন্ধ হয়ে। মোম নেই। একটাই লন্ঠন ঠিক আছে। সেটা মা নিয়ে গেছেভ পাক্‌ ঘরে। আমি সামনের বারান্দায় বসেছি। অন্ধকারে। বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে। হঠাৎই শক্তিকাকু গেয়ে উঠলোঃ ‘নাইয়ারে নাউ’এর বাদাম তুইল্লা কুন্‌ দূরে যাও চইল্লা’
শক্তিকাকু নেই বহুদিন। তবু গানটা আছে। আব্দুল আলীমের কন্ঠে আছে। আছে শক্তি কাকুর সুরেলা কন্ঠে গাওয়া দুইছত্র।
আর বাকীটা? বাকীটাও আছে। আছে ঐ নদীর ঐ পারে  যেখানে আমাদের যা কিছু সবই রয়ে গেছে...
 আমাদের গান, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভালোলাগা, ভালোবাসা ... এমন কি আমাদের অস্তিত্বও।
না, সে কোনো প্রতীকের ‘নদী’ নয়। সে নদী রক্তের। রক্ত মাংসের ...।



ঘুম ঘর