প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...

Thursday, March 24, 2016

রূপনারানের কূলে




রূপনারানের কূলে

“রূপক, সিগারেট…” – বল্লাম। কাকে বল্লাম? রূপককে না নিজেকে? ঠিক টের পেলাম না। মধ্যরাত্রে একবার জেগেছিলাম। শেষ সিগারেটটা পুড়িয়েছি তখনই। ঘুমের ভিতরেও সেই খেয়াল ছিল। কাজেই ঘুম ভাঙ্গামাত্র “রূপক, সিগারেট…” …
অধুনা, হয় সন ২০১৬। পরমেশ্বরের অশেষ কৃপায় – আমি এবং রূপক – অর্থাৎ আমরা দুই ভাই সিগারেট ধরেছিলাম সেই সন ১৯৮৮-৮৯ তে। অতঃপর সিগারেট সঞ্চয় ও সংগ্রহের দায়িত্ব ক্রমে রূপকেই বর্তায়। অতএব আধো ঘুমের আধোচেতনার থেকে “রূপক, সিগারেট…” বলে উঠবার মর্মে – ‘থাকলে দে, না থাকলে কিনে আন্‌” – ইঙ্গিতসহ উচ্চারণ বেনো জলের অবাধ গতি থেকেও স্বাভাবিক।
বল্লাম  “রূপক, সিগারেট…” –। তারপরেও চোখ বুজে রইলাম কিছুক্ষণ। তথাপি রূপকের সাড়াশব্দ না পেয়ে চোখ খুললাম। খুলতে বাধ হলাম। যদিও বলা হয় মর্মের গতি দেহের গতির চেয়ে বহু বহু বহু দ্রুত তথাপি দেহের চোখ খুলে গেলেও মর্মের চোখ খুল্লোনা তখনো। চোখ খোলামাত্র আশা করেছিলাম দেখবো মশারি। পায়ের দিকে জানালা। জানালায় সুপারী গাছের কোমর। টুলরো আকাশ। চোখ খুলে স্বাভাবিক ছিল দেখা একটি কাটের আলমারি। পাল্লার দুই তৃতীয়াংশে কাঁচ। একটা কাঠের টেবিলে ছড়ানো বই,খাতা, কলম। চারমিনার সিগারেটের খালি বাক্সের নাভি উপ্‌ড়ে বানানো এস্‌-ট্রে...
...
পরিবর্তে দেখলাম হাল্কা বাদামি পর্দা উড়ছে বাতাসে। দেখলাম ডালা ভেজানো লেপ্‌টপ্‌। কাঠের লেপ্‌টপ্‌দানীতে। খালি, হাল্কা রূপালী প্যাকেট – ক্লাসিক আল্ট্রা মাইল্ড সিগারেটের – খালি। দেখলাম বাতাসে দোল খাওয়া পর্দার ফাঁক দিয়ে হর্ম্যচূড়া... বোঝা গেলোনা কখন, কিভাবে এসে পড়লাম এই অচেনা, অজানা দেশে,খাটে,বিছানায়, হর্ম্যে। বুঝলাম না রূপকও সময় বুঝে কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো...
কেটে যেতে লাগলো সময়। মুহুর্ত্ত। মিনিট...
তারপর ক্রমে জেগে উঠলো মর্মচোখও। জানলাম “এ জগৎ / স্বপ্ন নয় ।/ রক্তের অক্ষরে দেখিলাম / আপনার রূপ …”… মুখোমুখি হলাম, পুনরায়, সেই কঠিন সত্যের, যে, আমার অতীত, আমার শৈশব, কৈশোর সমস্তই রয়ে গেছে অন্য এক দ্বীপে, আরেক চক্রবালে – রয়েগেছে আমার নদী,নাভি,গৃহ,ঠিকানা,চারমিনার,মানচিত্র, এল্‌কোহল, নিকোটিন...স-ব। এই আরেক চক্রবালে, আরেক দিগন্তে –চাকরি, খেতাব,গ্লেমার,মদ,মেয়ে মানুষ, পরিবার,ফ্লেট বাড়ি, ক্লাসিক আল্ট্রা মাইল্ড ইত্যাদি সহ আমি এক উদ্বাস্তুমাত্র যেমন উদ্বাস্তু ছিলেন আমার ঠাকুর্দা – পাকিস্তান ঘোষনার পর। যেমন উদ্বাস্তু হয়েছিল অসংখ্য বাঙ্গালী আসামে ‘বঙ্গালখেদা’র দিনে। যেমন অদ্যাপি – মহুর্মুহু – উদ্বাস্তু হয়ে যাচ্ছে কোন দেশ বা কোনো জাতির মানুষ রাজাদের ‘নীতি’ সাপেক্ষে ...জানলাম আমার অতীত, আমার শৈশব, কৈশোর সমস্তই রয়ে গেছে যে অন্য এক দ্বীপে, আরেক চক্রবালে সে দ্বীপে আসলে আর নেই কিছুই ‘আমার’ বলে। নেই আমার নৌকা সেই দ্বীপে ফিরে যাওয়ার। আসলে নেই সেই দ্বীপও আর ...




ঘুম ঘর