অবগাহনঃম্যাগ্রে-কাহন
সপ্তর্ষি বিশ্বাস
১। কেন ম্যাগ্রে?
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আবডালে যে অভাব, অভাববোধ তা নৈমিত্তিক প্রয়োজন-জাত। প্রায় একই নৈমিত্তিক প্রয়োজনে মানব-কল্পনা একদা জন্ম দিয়েছে ঈশ্বরের। স্রষ্টার বা রক্ষাকর্তার যে ধারনা ছিল টোটেমে তা'ই এক বিশেষ সময়ে আকার নিল বিশেষ ঈশ্বরের, ধর্মের, ধর্ম সম্প্রদায়ের। অর্থাৎ কল্পনাও নিখাদ নয়। প্রয়োজনের সঙ্গে সে বাঁধা, সূতো নয়, রীতিমতো শিকলে। রহস্যের কিনারা করতে চাওয়া, রহস্যের জট খুলতে সক্ষম এমন মানুষও সমাজে ছিল সততই। তবু "গোয়েন্দা" এই বিশেষ চরিত্রটির জন্ম হয়েছে সময়ের এক বিশেষ গ্রন্থিতেই। এই ঘোষিত "সত্যান্বেষী" পদটি রাজকার্যে ও ক্রমে মনোরঞ্জনে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবার ঢের আগেই আমরা ইদিপাস কে দেখি রহস্যভেদীর ভূমিকায়। নিজ রাজ্যে নেমে আসা সহসা-হাহাকারের নিষ্পত্তির সূত্র আবিষ্কার নিমিত্ত আরম্ভ হয়ে ইদিপাসের এই অনুসন্ধান,ক্রমে, ইদিপাসের আত্ম-সন্ধান হয়ে দুটি "এটেম্পট টু মার্ডার" এবং একটি "সেল্ফ ডিফেন্স মার্ডার" রহস্য, করে উন্মোচিত। স্যম্যন্তক মনি হরন রহস্য কৃষ্ণকে ভেদ করতে হয়েছিল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের নিমিত্ত। আরব-রাতের সহস্র এক কাহিনীতে ছদ্মবেশী খলিফা —- সে'ও সত্যান্বেষী কিন্তু মার্কামারা নয়। এমন আরো অনেক অনেক উদাহরণই যায় হাজির করা। রামায়ন,মহাভারত,ইলিয়াদ থেকে “ব্রাদার্স কার্মাজভ”, “আনা কারেনিনা”, “মাদাম বোভারি”, “উইদারিং হাইট্স্” ইত্যাদি। এমন কি “ঘরে বাইরে”ও মূলতঃ এক বা একাধিক “অপরাধ কাহিনী”র সমন্বয়। এক বা একাধিক “অপরাধ”ই এদের কেন্দ্র, এদের ভ্রূণ। তথাপি প্রতিষ্ঠিত পাঠাভ্যাসহেতু, অদ্যাপি, “অপরাধ কাহিনী” বলতে পো’র দুঁপী-কাহন, কোনান ডয়েলের হোমস্, ক্রিস্টির প্রায় সমূহ রচনা থেকে হালের Kaoru Takamura’র রচনাকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেওয়া হয় অপরাধ-কাহিনী বলে। অথচ আনা কারেনিনার জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই একটি অপরাধের, “ক্রাইমের” উদ্যাপন যার “পানিশ্মেন্ট” অন্তিমে আনার আত্মহত্যায়। সন্দীপের “ক্রাইমের” সঙ্গে নিজেকে যদি না জড়িয়ে ফেলতো বিমলা তাহলে কি নিখিলেশকে পেতে হতো তার অন্তিম “পানিশমেন্ট”? অথবা বিমলা-সন্দীপের “ক্রাইম” কে দেখেও অহং কিংবা অভিমানে এড়িয়ে থাকবার যে প্রবণতা নিখিলেশের তা’ই কি নয় তার নিজের “ক্রাইম”?
বাংলা ভাষায় লিখিত দুটি শ্রেষ্ঠ “অপরাধ কাহিনী” অবশ্যই “কৃষ্ণকান্তের উইল” আর “বিষবৃক্ষ”। পরের সময়ে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের “রত্ন দ্বীপ”। এই সকল রচনায় ‘মার্কামারা গোয়েন্দা’র অনুপস্থিতিই কি তাদের এতাবৎ দূরে রাখে, রাখবার চেষ্টা নেয় ‘অপরাধ কাহনের’ মানচিত্র থেকে? না’কি এতাবৎ ‘অপরাধ কাহন’, তার বিস্তার ও গভীরতা সত্ত্বেও, নয় ‘সাহিত্য’ পদবাচ্য? প্রশ্ন, এ’ও তোলা যায়, যে, যদিও তাদের পাকে পাকে বেঁধে রেখেছে ‘অপরাধ’ তবুও কেন ‘মার্কামারা গোয়েন্দা’ অনুপস্থিত ছিল ওই রচনাগুলিতে?
মার্কামারা গোয়েন্দার জন্ম বৃত্তান্ত ও বিবর্তনের ইতিহাস বর্তমান রচনা-চেষ্টার উপজীব্য নয়। তাই আর বিস্তারে যাবোনা। যতোটুকু লিখেছি তা শুধু এই দু’টি কথাকে সপ্রমাণ করতে, প্রথমত, রহস্যের কিনারা করতে চাওয়া, রহস্যের জট খুলতে সক্ষম এমন মানুষও সমাজে ছিল সততই। তবু "গোয়েন্দা" এই বিশেষ চরিত্রটির জন্ম হয়েছে সময়ের এক বিশেষ গ্রন্থিতে, ইতিহাসের প্রয়োজনে আর প্রথম হাজিরার পর থেকেই, অদ্যাবধি কেবলি বদলে বদলে যাচ্ছে এই "মার্কামারা" " সত্যান্বেষী" চরিত্র। দ্বিতীয়ঃ সমস্ত “গোয়েন্দা কাহিনী”ই, হয়, “অপরাধ কাহিনী” তবে সমস্ত “অপরাধ কাহিনী”ই নয় “গোয়েন্দা কাহিনী”।
যদিও উইলকি কলিন্সের “The Moonstone” কে T. S. Eliot বলেছেন ‘the first, the longest, and the best of modern English detective novels …a genre that was invented by Collins and not by Poe’ আর Dorothy L Sayers এবং G. K. Chesterton উভয়েই পোষন করেছেন সহমত, তবু পো’র দুঁপী আর ডয়েলের হোমস্কে, আলোচনার সুবিধার্থে, গোয়েন্দা কাহনের সুবর্ণ যুগের অন্দরে নাহোক, আরম্ভ-রেখার স্থাপিত করলে যা দেখা যায় তা হলো অদ্যকার ‘পাল্প-ফিকশনের’ জনক যে ‘penny-dreadfuls’, short novellas’ — এই ‘শস্তা’ ঘরানাটির বিপরীতেই কলিন্স, ডয়েল ও তাঁদের সমসাময়িকদের অবস্থান। ক্রমে এই মঞ্চেই পদার্পন করবেন ক্রিস্টির পোয়রো, পোয়রো’ই শুধু। ক্রিস্টি-সৃষ্ট অপর ‘মার্কা-মারা’ গোয়েন্দারা নয়। ‘এই মঞ্চে’ বলতে আমি বলতে চাইছি, যে, দুঁপীর উত্তরসূরী না হয়েও ‘penny-dreadfuls’, short novellas’, তৎকালে হাজির করেছিল বেশ কিছু ‘টিকিটিকি’র আর সেই সকল টিকিটিকি কাহনের লক্ষ্য ছিল, মূলতঃ, নাগরিক-শ্রমিক শ্রেণী। বিশেষ করে এই শ্রেণীর উঠতি বয়সীরা। পক্ষান্তরে সুবর্ণ-যুগ রহস্যভেদীরা ‘টিকটিকি’ নয়। বরং বলা ভালো ‘গিরগিটি’। তারা মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত। তাদের কর্ম পরিসর বিংবা চালচিত্রও তা’ই। কেননা এই সকল কাহিনীর লক্ষ্য নাগরিক-শ্রমিক শ্রেণী’র পরিবর্তে ছিল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত আর উঠতি বুর্জোয়া’রা। পাঠক, লেখক, আলোচক Richard Bradford’এর মতে সুবর্ণ-সত্যান্বেষীরা যেন তাদের অভিজাত আর বুর্জোয়া পাঠককূলকে সতত জানান দচ্ছিল, বকলমে, যে ‘we are a class above those who invite the scrutiny of policemen and we can deal with our own misdemeanors in a more dignified fashion.’ ক্রিস্টির পোয়রো’ও ওই ‘dignified fashion’এরই সন্ততি। তবে, ক্রমে, আগাথা’ই সৃষ্টি করলেন মিস মার্পলহেন, ‘জাতে’ অভিজাত হলেও, বাস্তবে মধ্যবিত্ত এবং পোয়রোর তুলনায় ঢের কম ‘dignified’ আর ঢের বেশী রক্ত-মাংসের, চরিত্র। এ’ও সত্য, যে, ক্রিস্টির ‘পোয়রো’ও দুঁপী আর হোমসের ‘অতি-মানব’ ইমেজ কে অনেকদূরই ভেঙ্গে দিয়েছিল। মিস্ লেমনের সকৌতুক উপস্থিতি ও প্রয়োজনে তদন্তে অংশগ্রহনের আবডালে, অন্ততঃ মিস্ লেমনের দিক থেকে, পোয়রোর প্রতি আকর্ষন অনেকটাই স্পষ্ট। আর ওই স্পষ্টতাকে নিঃশব্দ প্রশ্রয় দেওয়ার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত পোয়রোর মানুষ-মুখ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি অর্থাৎ ১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ এর দশকগুলিকে কেন যে গোয়েন্দা-কাহিনীর সুবর্ন যুগ বলা হয়, অদ্যাপি তার কোনো মনোমতো ব্যাখ্যা না পেয়েছি কোথাও না’ত নিজের কোনো অনুমানের উপর ভরসা করতে পেরেছি, পারছি। যথাস্থানে অবশ্যই ব্যক্ত করবো আমার সুবর্ন-যুগ সংজ্ঞা।
তবে আগাথা’কে নিয়ে আমার সমস্যা অন্যত্র। পাঠে, পুনর্পাঠে আমার মনে হয়েছে, যে, আগাথা বিশ্বাস করতেন না যে, ‘অপরাধ’ এবং ‘অপরাধী’ দুয়েরই শ্রষ্টা আদতে তার স্থান, তার কাল। একজন হত্যাকারী কে যে ‘ভিলেন’ হতেই হবে তেমন কোনো গুহালিপি নেই, ছিলোওনা কোনোদিন। যদি থাকতো তাহলে মহাকবি WILLIAM BLAKE এর ১৭৯৪ সালে লিখিত London কবিতাটি পাঠ করতে করতে এই ২০২০ সালেও আমার মনে আসতো না ১৮৬২ সালের লন্ডন-ছবি যার আঁকিয়ে দস্তভস্কি (Winter Notes on Summer Impressions) আর এই দুটি পাঠ মনে এনে দিতোনা ১৮৪২ থেকে ১৮৪৪ সালের মধ্যে লিখিত Friedrich Engels এর The Condition of the Working Class in England গ্রন্থের The Great Towns অংশ । এই রচনাত্রয়ীকে একত্রে স্মরণ করবার মূলে দারিদ্রের অপরূপ-নির্মম বর্ণনা’ই শুধু নয়। কিন্তু আমার চিন্তার সূত্রটি এই, যে, ব্লেইক – স্বপ্নাদেশ পাওয়া সাধক-কবি, এঞ্জেল্স্, এক বস্তুবাদী তথা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে বিশ্বাসী এক বিপ্লবীজন আর দস্তয়ভস্কি, এনার্কিজমের ধ্যান ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত না হতেপারা এবং সেন্ট্ সাইমনি ‘সমাজতন্ত্র’ আর রাশিয়ান ‘অর্থডক্স’ চার্চের ‘ঈশ্বর’এর মাঝামাঝি পিষ্ট হতে থাকা একজন দার্শনিক অথচ তিনজনেই –দেখছেন একই সত্য, প্রকাশও করছেন একই রকমের মর্মন্তুদ চীৎকারে, অভিশাপে। গর্জে উঠছেন “এ আমার, এ তোমার পাপ”বলে …। … শুধু একটি ক্ষেত্রেই এঞ্জেলস্ অপর দুই মহাপ্রাণ থেকে আলাদা যেখানে এঞ্জেলস্ চিনে নিতে পারছেন, যে, এই বাইবেলী ‘Baal’ টি মূলতঃ আর কিছু নয় – পুঁজিবাদের নগ্নতম স্বরূপ। - আগাথার চরিত্রদের ৯৯ ভাগ “ওয়েল-টু-ডু” হলেও তারা সকলেই পুঁজিবাদের সন্ততি এবং সেই ইংল্যান্ড তথা লন্ডনের সন্ততি যার আক্রান্ত স্বরূপটি দেখে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন ওই তিন শ্রস্টাজন।
তথাপিও আগাথা ক্রিস্টি বা পিডি জেম্স আমার পছন্দের। কিন্তু অন্তিমে সুবর্ন-যুগ গোয়েন্দা, গোয়েন্দা-কাহন সত্যই, শখের ‘গোয়েন্দা’র যারা অকারনেই অতি বেশী মাত্রায় ‘সত্যান্বেষী’, তারা প্রকৃত প্রস্তাবেই ‘a class above those who invite the scrutiny of policemen’ এবং তারা ‘more dignified’। সুবর্ন-যুগ গোয়েন্দা, গোয়েন্দা-কাহন আদতে এক রকমের রূপকথা’ই যেন। … হয়তো বিশ্বযুদ্ধ-প্রাক পৃথিবীর মানচিত্রে বসে পাঠ করলে এমনটা না’ও মনে হতে পারতো।
কিন্তু অদ্য " সময়-অক্ষের যে বিন্দুতে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে, এমন কি লেখকের পক্ষেও একটি চরিত্রের কিংবা মানবিক অনুভুতির পূর্ণতার কাহন অভিব্যক্ত করা অসম্ভব কেননা চালচিত্রেই নেই সেই পূর্ণতা। ক্লাসিক প্রেম-কাহিনীহেন প্রীতি, দুই জন মানব মানবীর মধ্যে, গল্পের খাতিরেও কতোদূর সম্ভব? কতোদিন সম্ভব। হয়তো তাদের প্রেমের বা পরিণয়ের প্রথম দশ মাস। কিন্তু তারপরেই চলে আসে, আসতে বাধ্য হয় আরেক রকমের কাহিনী যেখানে তারা, ক্রমে, দিনগত বিরক্তিতে, যাপনের চাপে, জীবিকার তাপে পুড়তে পুড়তে অপ্রেমের দিকে যায়। এটি ছিল গত শতাব্দীর শেষের যাপন। তার সাহিত্য। এরও পরে, যখন কেন্দ্র চরিত্রেরা হয়তো পঞ্চাশ ছুঁয়েছে, তখন, মহিলাটির প্রতি আকর্ষন হারাচ্ছে পুরুষটি। সে কামনা করছে অন্য নারী, অপর যাপন। তা’তে সে সক্ষম হোক বা না হোক কাহিনীর মহিলাটি। হয়, হতে থাকে ঈর্ষান্বিত। এই সরব বা নীরব সংঘাতে অসহায় অংশ নিতে বাধ্য হয় সন্ততিরা। এটি কাহিনীর তৃতীয় অধ্যায় আর আমরা এখন দন্ডিত এই তৃতীয় অধ্যায়টিতেই।
স্থান-কালের যে বিন্দুতে অদ্য আমরা দন্ডিত সেখানে একজন নিতান্ত সাধারণ মানুষ, যা’কে বলা হয় ‘আম্ জনতা’, তাকেও অনুভব করতে হচ্ছে, টের পেতে হচ্ছে এমন সমস্ত তরঙ্গকে, নোইমিত্তিক, মর্মে যা অর্ধ শতাব্দি আগেও ছিল এক জন আম-জনতার পক্ষে অকল্পনীয়। পক্ষান্তরে শতাব্দি আগের এক জন আম-জনতার মর্মে যে সকল প্রশ্নের উদয় হয়েছিল, হতো বা হওয়া সম্বব ছিল, সেই প্রশ্নগুলির উওর, নিজের মতন করে তখন পাওয়া গেলেও সেই সকল উত্তর আজ, প্রকৃত অর্থেই, নিশ্চিহ্ন।
এর একটি এবং প্রধান হেতু এই, যে, স্থান-কালের যে বিন্দুতে অদ্য আমরা দন্ডিত সেখানে,সমাজে, সমাজের কেন্দ্রে কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রটান নেই। কোনো আদর্শ, কোনো ধর্ম, কোনো প্রীতি নেই। পরিবর্তে মাথা আকাশে তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিপুলাকৃতির ‘কোম্পানি’, ‘মাল্টি ন্যাশনাল’, যন্ত্রে দিয়ে গড়া, প্রাকৃত ডাইনোসরের চেয়ে হাজারগুন উঁচু, জন্তু যেনবা। ওই যন্ত্রের ছোট ছোট নাট-বল্টু হয়ে যাওয়াই জীবিকা। ওই জীবিকার নির্বাহই যাপন। আর যাপনের মর্মে ওই জন্তুগুলির প্রতি ভীতিই জীবন। এই ভীতির তাড়নায় জন্ম নেয়, গহনে, এক রকমের অসহায় আত্নানুসন্ধান। ওই অসহায় আত্নানুসন্ধানে একটি গ্রন্থের কাছে সে যা চায় তা এক চাবি-গর্ত। চাবি-গর্ত প্রতিবেশীর শয্যাকক্ষের, হল-ঘরের…। চাবি গর্তে চোখ রেখে সে চায় মিলিয়ে নিতে, চায় দেখে নিতে, যে তার পারিপার্শ্ব, তারই মতো যন্ত্রনার, হীনমন্যতার, লোভের, অক্ষমতার শিকার কি’না। তার অস্তিত্বের কেন্দ্রে যা সদা জাগ্রত, তা, তার নিরাপত্তাহীনতার বোধ। অতএব আনাতোলে ফ্রান্সের মতো শান্ত, সুস্থিত সাহিত্যকর্ম, অদ্য, অসম্ভব”।
এই কথাগুলি বলেছিলেন সিমোনো। ১৯৫৫ সালের গ্রীষ্মে। একটি সাক্ষাৎকারে। প্যারীস-রিভিউ পত্রে “আর্ট অফ ফিকশন” নামে যে সাক্ষাৎকার-মালা প্রকাশিত, তা’তে, সিমোনোর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন Carvel Collins। ইংরেজি থেকে বাংলায় আমি যা করেছি, তা, ভাবানুবাদ। পাঠককে অনুরোধ করবো মূল সাক্ষাৎকারটি পড়ে দেখতে।*১
সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃত অংশ থেকে স্পষ্টই বলা যায়, যে, সিমোনো তাদের কথা কিংবা তাদের প্রতি কিছুই বলছেন না, যাদের কে সুবর্ণ যুগের শখের গোয়েন্দারা অভয় দিয়ে বলেছিলঃ ‘we are a class above those who invite the scrutiny of policemen and we can deal with our own misdemeanors in a more dignified fashion.’ ফলতঃ আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়না, যে, সিমোনো যদি কোনো ‘গোয়েন্দা’র আমদানী করেন, তাহলে তার পক্ষে ‘শখের সত্যান্বেষী’ হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই বাস্তবে আমরা যখন দেখি তাঁর গোয়েন্দা ‘শখে’ গোয়েন্দা হয়নি, তার চাকরি, তার জীবিকা তাকে ‘গোয়েন্দা’ বানিয়ে দিয়েছে। বাধ্য করেছে প্রতিবেশীর শয্যাকক্ষের, হল-ঘরের চাবি-ফুটোতে চোখ রাখতে, তখন এই দাহ্য সময়ের সন্ততি হিসাবে, আমি অন্ততঃ অনেক বেশী আশ্বস্ত বোধ করি, পোয়রো বা মার্পলের চেয়ে, ইন্সপেক্টার জুল্স্ ম্যাগ্রে’র সান্নিধ্যে।
এই গুগুল-উইকি যুগে অনর্থক তথ্য, এই সকল রচনায়, গুঁজে দেওয়ার অর্থ হয়না। তাই “ম্যাগ্রে” চরিত্রের মোটা-সুত্র গুলি , গো পাঠিকা,হে পাঠক, অনুরোধ করি দেখে নিতে এই উইকি-সূতো থেকেঃ
https://en.wikipedia.org/wiki/Jules_Maigret
২। কে ম্যাগ্রে?
সিমোনো’ও সন্তান এই “অদ্ভুত আঁধার” ঘেরা সময়েরই। তেমনি তাঁর গোয়েন্দা ম্যাগ্রেও।ম্যাগ্রে কাহিনীতে “অপরাধ” আদতে আবহমাত্র। ঠিক যেমন ‘নরক’, তার প্রতিটি স্তর, সেই প্রতিটি স্তরের বাসিন্দারা, পাপী, তাদের পাপ এবং অন্তিমে স্বর্গ সমস্তই আবহমাত্র। দান্তের। তাই নরকের পথ ধরে হেঁটে গেলেও এই যাত্রা-বৃত্তান্তের নামটি “স্বর্গীয় মিলন গাথা” কেননা নরক যাতনা দেখেও দান্তের মর্ম হচ্ছেনা অন্ধকার। বরং এই সকল ‘পাপী’দের প্রতি করুণার ভরে উঠভছে তাঁর মন। তিনি তাদের দোষ-গুন-পাপ-পুণ্যের মাপ নিচ্ছেন না, এমন কি নিজের মনেও। মর্মগত করুণায় জারিত অক্ষরে কেবলই লিখে রাখছেন সেই সকল কাহিনী আর তাই অন্তিমে পাঠককে অনুভব করতে হচ্ছে, যে, যাকে ‘পাপী’ বলা হচ্ছে, যাদেরকে ‘পাপী’ বলা হচ্ছে তারা আদতে ‘মানুষ’ শব্দের অন্তর্গত রিপু আর তার ‘মানুষ’ নামক জীবেদের দ্বারা নির্মীত ‘সমাজ’ ও ‘ব্যবস্থা’র কাছে অসহায় । ওই অসহায়তার অশ্রুতেই দান্তের নরক যাত্রা এমন স্বর্গীয়, এই অশ্রুতে সিক্ত বলেই দস্তয়েভস্কির ‘পাপী’ রা ‘পাপী’ নয় – তারা, তাঁর নিজের কথাতেই “গ্রেট্ সিনার”। এই অনুকম্পাতেই ফ্লবেয়ারের চরিত্রেরা সজল করে পাঠককে।
যেহেতু সিমোনো’ও সন্তান এই “অদ্ভুত আঁধার” ঘেরা সময়েরই তাই নরকের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলে গিয়েছেন জর্জ সিমোনো’ও, ইন্সপেক্টার ম্যাগ্রের বকলমে। তাঁরো চালচিত্রে সার সার অসহায় মুখ। কারোর মুখে উল্কি লোভের, কারোর কামনার, কেউ শিকার নিতান্তই মুহুর্তের উন্মাদনার। এদের কেউ হত, কেউ হত্যাকারী। তাদের কাউকেই তথাকথিত দোষ-গুন-পাপ-পুণ্যের মাপে ‘বিচার’ করছেন না – জর্জ সিমোনো নিজে, না’ত তাঁর রচিত চরিত্র ইন্সপেকটর জুলস্ ম্যাগ্রে। “আমি লিখি, যে সকল অপরাধের কথা, সেই গুলি হয়তো আমি নিজেই সংঘটিত করতাম। কেননা আমরা যে সময়ের সন্ততি তা’তে ওই সকল অপরাধ করাই স্বাভাবিক। আমি, সৌভাগ্য বশে, জীবিকা নির্বাহের ভিন্ন পন্থা পেয়ে যাওয়ায় আমাকে হাতে কলমে করতে হয়নি অপরাধগুলি। তবে আমি এদের চিনি। এদের জানি। … আমার লেখায় অভিজাতদের মর্মকথা নেই কেননা আমার কোনো ব্যাঙ্কার-হেন অভিজাত ব্যক্তির সঙ্গে বসে ওমলেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই।“ বলেন সিমোনো। মনে আসে জীবনানন্দ দাশের পংক্তিঃ “আমরা দন্ডিত হয়ে জীবনের শোভা দেখে যাই / মহাপুরুষের বাণী চারিদিকে কিলবিল করে”। টের পেতে হয় ”মানুষের তাই হল যা হবার নয়” …
জুলস্ ম্যাগ্রের গ্রামীণ শৈশবের অনেক কথা’ই জানা যায় নানান কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে। জানা যায় ডাক্তারী পড়া হলোনা পিতৃবিয়োগের কারণে। মাতৃহীন বালকটি ছিল গ্রাম-গীর্জার কয়ার-বয়। এক হিতৈষীজন, পিতৃ বিয়োগের পরে যুবক ম্যাগ্রেকে, ঢুকিয়ে দিয়েছিল পুলিশের চাকরিতে। সম্ভবতঃ ‘কনেস্টবল’ পদেই কেননা কথাত কথায় জানা যায়, যে, চাকরীর প্রথম যুগে জুলস্ ম্যাগ্রেকে ডিউটি দিতে হতো বাস স্টপে, শপিং মল্ এ। না, কোনো ক্ষোভ বা হতাশা নিয়ে এইগুলি বলেন না ম্যাগ্রে। ওই সকল ‘দেখা’, মানুষকে, কখনো চাবি-গর্তে চোখ রেখে, কখনো মার্সেল প্রুস্তহেন ‘স্টেয়ার’ এ, যুবক ম্যাগ্রেকে শিক্ষা দিয়েছে মানব চরিত্রের অলীগলী বিষয়ে। আরো নিবিড় করে ম্যাগ্রে’কে জানিয়ে দিয়ে গেছেন সিমোনো তাঁর ‘MAIGRET’S MEMOIRS’ গ্রন্থে যেখানে স্বয়ং সিমোনো একটি চরিত্র। এমন আশ্চর্য্য স্মৃতিকথা, কাল্পনিক চরিত্রের, বিশেষতঃ রহস্য-সন্ধানী চরিত্রের, আমি এতাবৎ পাইনি আর। “ More than a year later, I received another invitation, written this time on one of our fingerprint cards. ‘Georges Simenon has the honor of inviting you to the Anthropometrical Ball, which will be held at the Boule Blanche to celebrate the launching of his detective stories’. Sim had turned into Simenon. More precisely, feeling himself now fully adult, perhaps, he had resumed his real name.” এই ছদ্ম স্মৃতিকথার অনেকগুলি মাত্রার একটি, অবশ্যই, ‘জর্জ সিমোনো’ নামধেয় চরিত্রটির আবডালে সমসাময়িক রহস্য-লেখক, রহস্য-সাহিত্যের আলোচনা। বিশ্লেষণ। উদ্ধৃত অংশে ‘জর্জ সিমোনো’ চরিত্রকে নিয়ে ম্যাগ্রের মস্করার সুর নিশ্চিত এড়ায়নি পাঠক-চোখ।
‘MAIGRET’S MEMOIRS’ গ্রন্থে অন্য বা সমস্ত ম্যাগ্রে-কাহিনীতে এবং ম্যাগ্রে কিংবা তাঁর যে উপন্যাস গুলি মার্কামারা গোয়েন্দা,পুলিশ কেন্দ্রিক নয়, তাতেও সিমোনো সমসাময়িক সমাজ ছাড়াও সমসাময়িক রহস্য-লেখক, রহস্য-সাহিত্যের আলোচনা,বিশ্লেষণ রয়েছে মিশে। এইবার দৃকপাত করাযাক সিমোনো পরবর্তী সময়ের এক ঔপন্যাসিক-নাট্যকারে লিখিত একটি রহস্য উপন্যাসের অংশ বিশেষে। এই গ্রন্থের লেখক Friedrich Dürrenmatt কে বলা হয়ে থাকে সুইস্-সিমোনো। এতদ্ভিন্ন এই উপন্যাস The Pledge এর সঙ্গে ‘MAIGRET’S MEMOIRS’ এর আরেকটি মিল, এই, যে, এখানেও এক গোয়েন্দা-কাহন-লেখকের সঙ্গে এক বাস্তব ( অবশ্যই লেখক নির্মীত) গোয়েন্দা-পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যেই নিহিত কাহিনীর একাধিক মাত্রা। এই তাঁর The Pledge রহস্য কাহিনীর সফল লেখককে মুখোমুখি হতে হয় এক তথাকথিত অর্থে ‘অসফল’ পুলিশ অফিসারের দ্বারা আক্রান্ত হয় এইভাবেঃ “ since the politicians have shown themselves to be so criminally inept . . . People hope the police at least will know how to put the world in order,.. every reader and every taxpayer has a right to his heroes and his happy ending, and it’s our job to deliver that—I mean ours as policemen, just as much as it’s your job as writers. No, what really bothers me about your novels is the story line, the plot. There the lying just takes over, it’s shameless. You set up your stories logically, like a chess game…”
এই দাবা-ছক রহস্য-গল্পই রহস্য কাহনের সুবর্নযুগের বৈশিষ্ট। তার জন্মদাগ। ক্রমে সেই দাগ আবারে বিস্তার নিয়েছে, হয়েছে গভীরতর। শেষ পর্যন্ত ওই ছকেই ভিতরেই, তাঁদের অনবদ্য রচনাগুলিকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়েও, বলতেই হয় যে আগাথা ক্রিস্টি’র বুনে দেওয়া দাবা-ছক ধরেই, উলম্ব রেখায়, এগিয়েছিলেন মার্জোরি অ্যালিংহাম, অ্যান্থনি বার্কলে, ডরোথি এল. সেয়ার্স এবং মাইকেল ইনেস, এস.এস. ভ্যান ডাইন, জন ডিকসন কার বা এলিরি কুইন। যদিও এস.এস. ভ্যান ডাইন, জন ডিকসন কার , এলিরি কুইনরা বিলেতের নয়, ছিলেন আমেরিকার।
সুবর্ণ-যুগ-প্রসিদ্ধ কাহিনীগুলি মূলতঃ ‘শখের গোয়েন্দা’ দের কাজ কারবার। চমকদার প্লটের সন্ধান। যুক্তি (?),সূত্র এবং সম্ভাব্য সমাধানের ক্রমানুসারে ‘শখেরগোয়েন্দা’ অন্ততঃ প্রথম এক-দেড়শো পৃষ্ঠা খরচ করেন। অন্তিম একশো পাতা এবং তারো শেষ পনেরো পাতায় রহস্যের সমাধান। এই দাবা-ছকে মনস্তত্ত্ব আর চরিত্রায়ন, ‘গোয়েন্দা’র শুধু নয়, অন্যান্য চরিত্রেরো, এনেছিলেন আগাথা ক্রিস্টি। উল্লিখিত বাকি লেখক/ লেখিকারাও তা ব্যবহার করে ‘শখের গোয়েন্দা’দেরো শার্ক হোমসের রক্তাল্পতা থেকে উদ্ধার করেছেন, যথাসাধ্য। কিন্তু ওই দাবা-ছক তাঁরা ভাঙতে পারেননি। এখানেই The Pledge এর পুলিশ-গোয়েন্দার স্বাভাবিক ক্ষোভঃ ‘ This fantasy drives me crazy. You can’t come to grips with reality by logic alone. Granted, we of the police are forced to proceed logically, scientifically; but there is so much interference, so many factors mess up our clear schemes, that success in our business very often amounts to no more than professional luck and pure chance working in our favor. Or against us. But in your novels, chance plays no part, and if something looks like chance, it’s made out to be some kind of fate or providence; the truth gets thrown to the wolves, which in your case are the dramatic rules. Get rid of them, for God’s sake”.
এই ক্ষোভ যুগের ক্ষোভ। ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর স্বপ্নভঙ্গের ক্ষোভ। সৎ-অসতের মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যার প্রতিফলন, স্বর্ন-যুগোত্তর লেখক/লেখিকা দের মধ্যে দেখাযায় স্পষ্ট। অদ্যাপি। এই প্রতিফলন যে সতত সচেতন তা’ও যেমন সত্য নয় তেমনি সর্বৈব অসত্যও নয়। চৈনিক কিন্তু আমেরিকা প্রবাসী Qiu Xiaolong এর অপরাধ কাহনে চীনে, মার্ক্সবাদের তথা মাও-মতামতের প্রায়োগিক দিক গুলির সমালোচনা দীক্ষিত পাঠিকা/পাঠকের নজর এড়ায় না। এই তালিকায় আরো অনেক নাম, অনেক কথা যুক্ত হতে পারে। এই রচনার পরিসরে তা সম্ভব নয়। এই রচনার কেন্দ্রে যিনি, লেখক জর্জ সিমোনো আর তাঁর যমজ ‘ইন্সপেক্টার ম্যাগ্রে’, এঁরাই, আদতে, অপরাধ সাহিত্যে এই ধারাটির প্রবর্তক বল্লে হয়তো ভুল হবেনা খুব। তাই ফিরে যাই ‘MAIGRET’S MEMOIRS’ এ যার ২য় অধ্যায়টি “In which it is argued that the naked truth is often unconvincing and that dressed-up truths may seem more real than life” । সেই অধ্যায়টি থেকেঃ “Tell someone a story, any story. If you don’t dress it up, it’ll seem incredible, artificial. Dress it up, and it’ll seem more real than life.” কথক এখানে ‘জর্জ সিমোনো’ নামের লেখক চরিত্রটি। . “The whole problem is to make something more real than life. Well, I’ve done that! I’ve made you more real than life.” শুনে ম্যাগ্রে সাহেবের প্রতিক্রিয়াঃ “ I remained speechless. For a moment I could find nothing to say, poor unreal policeman that I was’ এখানে এসে মনে আসতেই পারে পিরান্দেলোর নাটক ‘ছয় চরিত্রের খোঁজ নাট্যকারের নিমিত্ত’ যেখানে বাস্তবিক ‘বাস্তব’ আর বানানো ‘বাস্তবের’ সংঘাত একটি মাত্রা।
এখন সময় হয়েছে আরেক শতকের এক চিন্তা-দানবের কয়েকটি কথা পড়ে নেওয়ার, পাঠকের সঙ্গে, একত্রে “A philosopher produces ideas, a poet poems, a clergyman sermons, a professor compendia and so on. A criminal produces crimes. … The criminal produces not only crimes but also criminal law, and with this also the professor who gives lectures on criminal law and in addition to this the inevitable compendium in which this same professor throws his lectures onto the general market as “commodities. This brings with it augmentation of national wealth, quite apart from the personal enjoyment…” কথাগুলি যে কার্ল মার্ক্সের তা’ও অবিদিত নয় দীক্ষিত পাঠিকা/পাঠকের। এই “onto the general market as “commodities” কথাটি সিমোনো উচ্চারণ করছেন না কিন্তু দেখিয়ে দিচ্ছেন commodity বানানোর ‘সাহিত্যিক’ প্রক্রিয়াটি।
জর্জ সিমোনো’ নামের লেখক চরিত্রটি বলে চলেঃ “Follow me carefully, Chief Inspector…In a real investigation there are fifty of you, if not more, busy hunting for the criminal. You and your inspectors aren’t alone on the trail. The regular police and the gendarmerie of the whole country are on the alert. They are busy in railroad stations and ports and at frontiers. Not to mention the informers, let alone all the amateurs who offer a hand. Just try, in the two hundred or two hundred and fifty pages of a novel, to give a tolerably faithful picture of that swarming activity! A three-decker novel wouldn’t be long enough, and the reader would lose heart after a few chapters, mixing up everything, confusing everything. …It’s you yourself, as you know very well.’
যেন দাবা-ছক গোয়েন্দা-কাহনের ক্ষতগুলি দেখিয়ে দিচ্ছেন সিমোনো দেখিয়ে দিচ্ছেন, কেন, অন্তিমে তাঁর ‘ম্যাগ্রে’ও নয় একক-হিরোঃ I’m quite aware that a chief inspector from the Police Judiciaire, the head of a special squad, doesn’t roam the streets in person to interview concierges and wine merchants। I’m quite aware, too, that, apart from exceptional cases, you don’t spend your nights tramping around in the rain through empty streets waiting for some window to light up or some door to open.” এই বৈজ্ঞানিক (দ্বান্দ্বিক) বস্তুবাদের উন্মোচন এবং উদ্যাপন, সূক্ষাতিসূক্ষ ভাবে, সিমোনোর, শুধু ম্যাগ্রে-কাহন নয়, অন্যান্য উপন্যাসেও উদ্ভাসিত। একই কথা বলা চলে পূর্বোল্লিখিত Friedrich Dürrenmatt এর রচনা বিষয়েও।
তাঁর প্যারীস-রিভিউ সাক্ষাৎকারে সিমোনো বলেনঃ I call "commercial" every work, not only in literature but in music and painting and sculpture — any art — which is done for such-and-such a public or for a certain kind of publication or for a particular collection. Of course, in commercial writing there are different grades. You may have things which are very cheap and some very good. The books of the month, for example, are commercial writing; but some of them are almost perfectly done, almost works of art. Not completely, but almost. And the same with certain magazine pieces; some of them are wonderful. But very seldom can they be works of art, because a work of art can't be done for the purpose of pleasing a certain group of readers.
মার্ক্স থেকে উদ্ধৃত অংশটির সঙ্গে সিমোনো আর ডুরেনম্যাট’এর ‘গল্পচ্ছলে’ বলা এবং সাক্ষাৎকারে বলা কথাগুলিকে পাশাপাশি দাঁড় করালে এ’কি স্পষ্ট হয়না, যে, সিমোনো আর ডুরেনম্যাট নিজেরাও মার্ক্স বর্ণিত ‘অপরাধ-বাণিজ্যে’ অংশ নিয়ে, যেহেতু তাঁদেরো রচনার উপজীব্য ‘অপরাধ’ ও তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তবু, ভিন্ন আঙ্গিকে প্রতিধ্বনি তুলছেন কার্ল মার্ক্সেরই? চিনিয়ে দিতে চাইছেন ‘অপরাধ-বাণিজ্যে’র পুঁজিবাদী অন্তর্বস্তুকে? শুনতে পাচ্ছিনা কি তাঁদের আত্মসমালোচনা? দেখতে কি পাচ্ছিনা সেই প্রক্রিয়াটি, যা মার্ক্স বলেছেনঃ The criminal produces not only crimes but also criminal law, and with this also the professor who gives lectures on criminal law… ইত্যাদি?
৩। অনুধাবনঃম্যাগ্রে-কাহন
তিন খন্ড ‘পুঁজি’ প্রকাশের পরে মার্ক্সের নোট, দিনলিপি ইত্যাদি ঘেঁটে, একত্র করে যে গ্রন্থ, যাকে ‘৪র্থ খন্ড পুঁজি’ বলা হয়ে থাকে, সেখানে এ’ও বলছেন মার্ক্সঃ “The criminal moreover produces the whole of the police and of criminal justice, constables, judges, hangmen, juries, etc.; and all these different lines of business, which form equally many categories of the social division of labour, develop different capacities of the human spirit, create new needs and new ways of satisfying them. Torture alone has given rise to the most ingenious mechanical inventions, and employed many honourable craftsmen in the production of its instruments.” এই “Torture” কিভাবে সামগ্রিক ভাবে ছায়া ফেলে তার বিশ্লেষণ মিশেল ফুকোতে নিবিড়তর। এর কারণ, নিশ্চয়ই ফুকো’র সময়কাল, যে কালে পাঠ বা তথ্যান্বেষন, আজকের মতো ‘মাউস-ক্লিকে’ না হলেও, সহজতর হয়েছিল মার্ক্সের আমল থেকে। তথাপি সংগৃহীত সমকালীন তথ্যের ভিত্তিতে মার্ক্স বলেন, সূত্রকারে, অপরাধীর সামাজিক ও সাহিত্য-ক্ষেত্রের ভূমিকাওঃ “The criminal produces an impression, partly moral and partly tragic, as the case may be, and in this way renders a “service” by arousing the moral and aesthetic feelings of the public. He produces not only compendia on Criminal Law, not only penal codes and along with them legislators in this field, but also art, belles-lettres, novels, and even tragedies, as not only Müllner’s Schuld and Schiller’s Räuber show, but also [Sophocles’] Oedipus and [Shakespeare’s] Richard the Third.” ম্যাগ্রে’র রহস্য-সন্ধান যাত্রার প্রতিটিতে “an impression, partly moral and partly tragic” এই চেহারাটি অথবা চেহারাগুলি ফিরে আসে বার বার। যে লোকটি ছিল কপর্দক-শূন্য তাকে, তার দারিদ্রের নিমিত্ত ত্যাগ করলো যে মহিলা তার চাহিদা কিন্তু খুব বেশী ছিলনা। সে চেয়েছিল ‘সরকারি চাকরীর’ নিরাপত্তা যে নিরাপত্তা জর্জ সমোনোর জননীও সন্ধান করতে গিয়ে, পতি বিয়োগের পরে, স্রেফ সরকারী ( রেলের ) চাকুরে বলে একজন কে বিয়ে করে বসলেন এবং এর মূল্যে দুটি জীবনই হয়ে উঠলো দুর্বিষহ। … গল্পের মহিলাটি দরিদ্র স্বামীকে ছেড়ে যাকে বিয়ে করলো সে’ও ‘বড়লোক’ তো নয়ই তবে প্রাক্তন স্বামীটির চেয়ে সামান্য বেশী আয় তার। এখানেই Dürrenmatt কথিত, স্বর্ণ-যুগের ‘ in your novels, chance plays no part’ কে ভেঙ্গে, সিমোনোর গল্পে, সেই প্রাক্তন স্বামীটি হঠাৎই ফুলে ফেঁপে ওঠে টাকায়, ডলারে আর আশ্চর্য এই, যে, তার ঝকঝকে অফিস, দেখে, প্রাক্তন বৌ, তার ছোটো, নগণ্য, নিম্ন মধ্যবিত্ত কোঠা থেকে। দেখে দিনের পরে দিন। তারপর একদিন…। তারপর একদিন ঘটে যায় একটি হত্যাকান্ড। অসুস্থলে আসেন ইন্সপেক্টার ম্যাগ্রে আর উন্মোচিত হতে থাকে একের পরে এক partly moral and partly tragic মানুষ, পরিস্থিতি।
ম্যাগ্রে-কাহনগুলি খুব গভীর অনুধাবন না করলেও, সহজেই যে গুলি দেখতে পাওয়া যায়, তা কুশীলবদের শ্রেণী চরিত্র। তাদের মিল সুবর্ণ-যুগ কাহনগুলির সঙ্গে যতো না তার চেয়ে ঢের বেশী সেই ‘penny-dreadfuls’, short novellas’ এর কুশীলবদের সঙ্গে এবং তা কোনো তত্ত্বতাড়িত কারণে নয়। ইতিহাস যখন পুঁজিবাদের দিকে পাশ ফিরছিল তার আদিলগ্নে, শুধু ক্রাইম-লেখক কেন, সমাজের দ্বারা গৃহীত কবি-লেখকদের সিংহভাগই, হয় অভিজাত নয়তো আভিজাত্যকে ত্যাগ করা মানুষেরা। ত্যাগ, আভিজাত্যকে, কেউ ত্যাগ করেছেন বাধ্য হয়ে। কেউ প্রতিবাদ হিসাবে। এই সময়-বৃত্তেরই আশে পাশে রয়ে গিয়েছেন চার্লস ডিকেন্স বা দস্তয়ভস্কিদের মতো ঊনজনেরা। আর ইতিহাসের পুঁজিবাদের দিকে পাশ ফিরবার এই প্রক্রিয়াতেই গড়ে উঠেছিল, অবশ্যই, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মেই, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এরা না অভিজাত, না বুর্জোয়া। এরাই পেটি-বুর্জোয়া। এদের কথা’ই আমরা শুনেছি, পূর্বাহ্নে, সিমোনোর সাক্ষাৎকারে। ফলে, স্বভাবিকভাবেই, সিমোনো’র আবহের চরিত্রেরা নয় কোনান ডয়েলের ‘Illustrious Client’হেন। এরা ছোটো ছোটো মানুষ। কেউ কেরানি, কেই ছোট ব্যবসাদার, কেই মজুর, কেউ ভিখারী, কেউ অভিজাত থেকে বুর্জোয়া-পথে হাঁটবার পথিক। এরা, বুর্জোয়া আইনে, হয়তো কেউ ‘অপরাধী’ হিসাবে দাগী, কেউ ওই ‘অপরাধী’দের ‘শিকার’, তথাপি, অন্তিমে এরা সকলেই শিকার, এই পুঁজি-কেন্দ্রিক সময়ের, সভ্যতার। এদের কাহন আর তার আবডালে পুঁজিবাদের স্বরূপ উদ্ঘাটনই সিমোনো, তাঁর ম্যাগ্রে।
ম্যাগ্রে কাহিনীতে “অপরাধ” আদতে আবহমাত্র। সেই আবহের জট ছাড়াতে ছাড়াতে সিমোনো আমাদের কখনো নিয়ে দাঁড় করান সেই “বিপন্ন বিস্ময়” এর মুখোমুখি যেখানে বাল্য বান্ধবকে প্রায় কুড়ি বছরের ব্যবধানে ভবঘুরে, দিন মজুর তথাপি প্রশান্তিময় যাপনে সহসা আবিষ্কার করে অধুনা ‘স্টিংকিং রিচ’ অপর বান্ধবের ঈর্ষা হয়ে ওঠে এমনই প্রবল যে, বন্ধুটিকে সে অনুসরন করে এবং খুন করে অবশেষে। এরা একদা একই মেয়েকে ভালবেসেছিল এবং তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় তাদের হাতে হত হয়েছিল মেয়েটি। তার পরে তাদের “জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার”। কিন্তু এক বন্ধু, এক প্রেমিক অদ্যাপি সেই অন্ধকারের আবর্ত ছেড়ে বার হয়ে আসতে পারেনি বলে সুন্দরী পত্নী, অগাধ অর্থ, অবাধ মদ্য সত্বেও সে এক মুহুর্তে, টেরপায় একদিন, যখন নিতান্ত ‘chance’ তাকে এনে দাঁড় করায় কুড়ি বছর আগের অপর বন্ধুটির মুখোমুখি যার চোখে চোখ রাখামাত্র সে বোঝে, যে, ঐ বন্ধুটিও তাকে চিনেছে কিন্তু ওই ‘চেনা’ শুধু মগজ-কোষের দ্বারা। ওই চোখাচোখিতে, চেনাতে অপর বন্ধুজনের কোনো রাগ নেই, দ্বেষ নেই, অভিমান, অহংকার, সাহায্য প্রার্থনা … কিচ্ছু নেই। তখনই ওই বিত্তবান-জন স্থির করে …। কি? তা সিমোনো-পাঠক জানেন। যাঁরা সিমোনো পাঠে প্রবৃত্ত হবেন এই রচনা-পাঠান্তে, জানবেন। আমার মনেপড়েঃ
“ বধূ শুয়েছিলো পাশে— শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো— জ্যোৎস্নায়– তবু সে দেখিল
কোন্ ভূত? “
সুন্দরী পত্নী, অগাধ অর্থ, অবাধ মদ্য সত্বেও ব্যর্থ হয় দাম্পত্য, বিফল সমস্ত উপার্জন।
“জানি— তবু জানি
নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ– নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়” …
পক্ষান্তরে অন্য বন্ধুজন, যেন বা টলস্টয়ের সেই ফাদার সিয়ের্গি, সেই সমস্ত কে পার হয়ে অবলীলায় ভবঘুরে, দিনমজুর। হায়, তথাপি তার ঐশ্বর্য, শান্তির, স্বস্তির, ঢের ঢের বেশী। তার জানালায় প্লেটোর প্রেত, প্রতি রাত্রে এসে বলেনাঃ 'What then?' মোটা অর্থে কি বলা যায় না যে, এই গল্প আদতে কুঠার হানে পুঁজিবাদের শিকড়ে? বলেনা’কি পুঁজি, যা অসৎ উপায়ে আহৃত অর্থ, ‘উদ্বৃত্ত’ শব্দের মোড়কে ঢাকা, তা কতোটা শূন্য, কতোটা হিংস্র? শুধুমাত্র হত্যাকারীটি আমীর-জন আর হত আম্ থেকেও অধম, প্রায় ভিক্ষুক, বলেই নয়, এই কাহিনী জানান দেয়, যে, আমীর-জন’টিকে এই হিংস্রতার মোড়কটি দিয়েছে তার বুর্জোয়া পারিপার্শ্ব।
এইভাবেই সিমোনো তোলেন মার্ক্সের নিবিড় প্রতিধ্বনি যা নিবিষ্ঠ-পাঠ ভিন্ন অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। অনুধাবন করা অসম্ভব, ‘শিল্প’ শব্দটির ক্ষুদ্র সংজ্ঞা, যা বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সচেতনতা থেকে পলায়নপর, তা থেকে বার হয়ে না এলে। আবার একই সঙ্গে সিমোনো দস্তয়ভস্কির প্রকৃত উত্তরসূরী হিসেবে চিহ্নিত করেন আপনাকে আর এখানে এসেই আমার মনে হয়, যে, ‘অপরাধ/গোয়েন্দা কাহিনী”র প্রকৃত সংজ্ঞাটি আদতে, ক্রিস্টিয় ২য় শতকে Apuleius (এপুলিয়াস্ ? ) খাড়া করে গিয়েছেন তাঁর ল্যাটিন ভাষায় লেখা ( রোমান) কাহন “The Golden Ass” এ, যার প্রসঙ্গ, দস্তয়েভস্কি-সাহিত্যের স্বরূপ উন্মোচনের কালে বারংবার উল্লেখ করেছেন বাখতিন। বর্তমান রচনার প্রাসঙ্গিক সারকথা, বাখতিনের The Dialogic Imagination থেকে, এই, যেঃ “the criminal material itself is not essential for Apuleius;what matters are the everyday secrets of private life that lay bare human nature – that is, everything that can only be spied and eavesdropped”
পাঠক, আবারো সেই সাক্ষাৎকারে বলা সিমোনোর কথাগুলিঃ ‘ people are afraid of the big organization in which they are just a little part, for them reading certain novels is a little like looking through the key-hole to know what the neighbor is doing and thinking — does he have the same inferiority complex, the same vices, the same temptations? ‘
তাই ম্যাগ্রে’কে ‘সুপারম্যান’ তো দূরস্থান, ‘সত্যান্বেষী’ করেও গড়েন না সিমোনো। সত্যের মুখোমুখি হতে ম্যাগ্রে ভীত কেননা ম্যাগ্রে জানে, তার যাপন অভিজ্ঞতা থেকেই, যে, সত্য, এই সময়ের, আদতে এক বিপুল মিথ্যা যা এই ব্যবস্থার দ্বারা নির্মীত। প্রতিটি সত্যের আবডালে রয়েছে যে মুখগুলি তারা অসৎ নয়। অসহায়। তাদেরই মতন অসহায় ম্যাগ্রে নিজেও। তার জীবিকার কাছে। তার ‘চাকরি’র কাছে। তাই, প্রায় প্রতিটি কাহিনীতেই, দেখি, ম্যাগ্রের বিষণ্ণতা গাঢ় হয়ে উঠছে যতো সে এগিয়ে যাচ্ছে তথাকথিত ‘সমাধানের’ দিকে। দেখি, অন্তিমে, সে ‘তৃষা হরিয়ে’ প্রাণ ভরাতে, ফিরে যায় তার ছোট ফ্ল্যাটে যেখানে বসে আছে মাদাম ম্যাগ্রে, তার অপেক্ষায়।
মাদাম ম্যাগ্রে এবং আরো আনুষঙ্গিক খুঁটিনাটি, ম্যাগ্রের ব্যক্তিগত যাপনের, ম্যাগ্রেকে অন্য মাত্রা, শুধুমাত্র তাকে ‘রক্ত মাংসের’ করে দেখানোর কাজটিই যে করে এমন নয়। এদের ভূমিকা বৃহত্তর। এরা ম্যাগ্রে নামের ‘আইডিয়া’টির একটি মৌলিক উপাদান।
৪। ম্যাগ্রে-পুলিশ, পুলিশ-ম্যাগ্রে
' পুলিশ, তুমি যতোই মারো / বেতন তোমার একশো বারো' —- এই পংক্তিগুলি বাংলার জনতার মুখে মুখে যখন ফিরেছিল তার কয়েক দশক আগেই ১৯৪৭ এর ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে গিয়েছে। আজ সেই স্লোগান কে পার হয়ে বয়ে গিয়েছে আরো আরো দশক। কিন্তু পুলিশী সন্ত্রাস, বাংলা, ভারতবর্ষ এমন কি সারা পৃথিবী জুড়ে বেড়েইছে শুধু, বাড়ছেই শুধু। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পূঁজ যতই হচ্ছে গাঢ়তর, হবে গাঢ়তর, পুলিশী সন্ত্রাস, ফৌজি অত্যাচার বাড়বেই শুধু। ফৌজ, ফৌজি'র জনমানসে মানবায়ন, বস্তুতঃ মহা-মানবায়নের, কাজটি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল বহু আগেই। পুলিশের জনমানসে মানবায়ন, সেই তুলনায়, হালের প্রয়াস তবে এর ইতিহাসও দশক-পুরনো। পুলিশ-মানবায়নের এই প্রকল্পে পুলিশের ব্যক্তিজীবনকে অতিনাটকীয় ভাবে হাজির করা একটি প্রক্রিয়া যা বিশ্ব-ব্যাপৃত।
পুলিশ-মানবায়নের এই প্রথম পর্য্যায়ে পুলিশ ছিল সত্যবাদী, কর্তব্য পরায়ণ, শিষ্টের পালনে সদা নিরত। একই সঙ্গে সে আদর্শ পতি, পিতা, ভ্রাতা। 'শোলে'র 'ঠাকুরে'র উদাহরণ নিলে, পুলিশ আদর্শ পিতামহ তথা কৃষক শ্রেণীর রক্ষাকর্তাও। কিন্তু খোলা বাজার যখন 'নিও লিবারেলিজম' এর রূপ পরিগ্রহ করলো তখন দেখা গেলো পুলিশ, মূলতঃ পুলিশের ক্রাইম শাখা, পুলিশ-গোয়েন্দা আর আদর্শ পতি, পিতা, ভ্রাতা –--- আদতে 'আদর্শ' –--- রইলোনা কিছুরই। পক্ষান্তরে তার যাপনের আবডালে অপরাধীর মতো কিংবা অপরাধীদের দ্বারা আক্রান্তদের মতোই, পুলিশবাবুটিও মনো রোগগ্রস্থ।
পুঁজিবাদের 'নিও লিবারেল' অবয়বটি যারা খাড়া করেছে, তারা, যেহেতু ধূর্ততর, ফলে, তারাই ঘটালো গোয়েন্দা/পুলিশ চরিত্রের এই বিবর্তন। বিবর্তন নাকি বিপ্লব? কেননা এই পরিবর্তন প্রায় রাতারাতি। কয়েক বছরের মধ্যে। এটি ঘটানোর আবডালে তারা চাইলো আম জনতাকে বলতে, যে, দেখো হে, মনোরোগ কেন কোনো রোগই কোনো ব্যাপার না। "দেখলেনা, সিনেমার, গল্পের ওই পুলিশটিও খুনীটির মতোই অসুস্থ তবু সে খুন করেনা। তার মনোবল, তার দর্শন তাকে দেয়না অপরাধী হতে। অথচ সে'ও হতেই পারতো অপরাধী কারন সে'ও তো ওই একই আর্থ-সামাজিক শ্রেণীরই, খুনীটি যে শ্রেণীর। সুতরাং 'অপরাধী' ব্যাপারটাই আলাদা। অপরাধ, অপরাধী নির্মাণে সমাজের, পারিপার্শ্বিকের কোনো ভূমিকা'ত নেই'ই, এমন কি, দেখলে না, গোয়েন্দা-পুলিশটিরও ছিল ওই একই অসুখ, যা খুনীর। কিন্তু দেখলে তো, সে তার সব হতাশার বিপরীতে আশ্রয় নেয় তার কাজে। হ্যাঁ, সেজন্য সে হয়তো'ওয়ার্কোহোলিক' কিন্তু তা হোক না। খুনী হওয়া থেকেত 'ওয়ার্কোহোলিক' হওয়া ঢের ভাল।… " হ্যাঁ, 'ওয়ার্কোহোলিক' হওয়া, মজুরের, নিশ্চয়ই খুবই ভাল তার মালিক মহাশয়ের নিমিত্ত। রাষ্ট্র নামক যন্ত্রের নিমিত্ত।
এমনি আরো অনেক 'রেফারেন্সের' মধ্যে প্রধান আরেকটি "দেখলে তো, সিনেমার, গল্পের ওই পুলিশটিও খুনীটির মতোই অসুস্থ তবু সে কিভাবে, ডিভোর্সের পরেও, প্রাক্তন স্ত্রীকে ক্ষতি করা তো দূরস্থান, বরং সেই এক্স-শাশুড়ির চিকিৎসা-খরচ… অর্থাৎ, হালে গোয়েন্দা-পুলিশের পারিবারিক জীবন কে ব্যবহার করা হচ্ছে সিমোনোর মাদাম ম্যাগ্রে বা ম্যাগ্রের যাপনকে কাহিনীতে ব্যবহার করার ঠিক বিপরীত উদ্দেশ্যে।
সিমোনের রচনায় ম্যাগ্রের ব্যক্তিগত যাপনের খুঁটিনাটি মূলতঃ পুঁজিবাদ-আক্রান্ত সমসাময়িক যাপনের এক এন্টিথিসিস। গোয়েন্দা-যাপনে যেমন, ব্যক্তিগত যাপনেও তেমনি, ম্যাগ্রে না সুপারম্যান, না'ত 'আদর্শ'। না'ত সে বৌ-তাড়ানো 'ওয়ার্কোহোলিক'। সে নয় মনোরোগীও। একই কথাগুলি সত্য মাদাম ম্যাগ্রের ক্ষেত্রেও। নিতান্ত গৃহবধূ এই মহিলা, যেহেতু নিঃসন্তান তাই প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অপত্যস্নেহও ধাবিত, তাঁর সামান্য খাপছাড়া পতিটির দিকেই।
ঠিক কি জীবন, কি রকমের যাপন চেয়েছিল ম্যাগ্রে তার হদিশ মিলবে চাকরি থেকে ম্যাগ্রের অবসর নেওয়ার পরের পর্বে। গো পাঠিকা, হে পাঠক, যাই সেখানে, গ্রামে, লোয়ার নামের নদীর ধারে,এক জুলাই-সকালে। ম্যাগ্রে দম্পতীর ছোটো বাড়িটিতে ছোট্ট বাদান। নিচু দেওয়ালে ঘেরা। সাদা, ধোয়া দেওয়ালগুলি। স্প্যালিয়ার ফলের গাছে ঢাকা বাগানে রয়েছে ফুলগাছ। ম্যাগ্রে দম্পতীর উভয়েই জলসিঞ্চন করে থাকেন এই সকল ফুলগাছে। আছে লেটুস আর তরমুজের গাছও। সেই সাদা-ধোয়া দেয়ালগুলো থেকে, ফুল, ফুলগাছ, ধূসর লেটুস আর তরমুজ-ডালের চৌকো ফ্রেমের ভিতর দিয়ে আসা আলোয় নির্মীত হয়ে উঠেছে এক নিদ্রালু-স্বচ্ছতা। মাছির গুঞ্জন আসছে ভেসে।
বাগানে ‘রিটায়ার্ড’ ম্যাগ্রে । যথারূতি মুখে পাইপ কিন্তু মাথায় পুরানো খড়ের টুপি। ম্যাগ্রে বাগানে বসে ছাল ছাড়াচ্ছে টমেটো’র। … উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলো ম্যাগ্রে। সেখানে, পাক-ঘরে, মাদাম ম্যাগ্রে। যেন নীলচে একটি ছায়া। ম্যাগ্রে’কে পাকঘরের দিকে আসতে দেখে হাতের সস্প্যান-সহ থমকাল মাদাম ম্যাগ্রে। … তখুনি কাঠের নিচু গেটটি খোলার এবং অব্যবহিত পরেই দরজায় পিতলের ঠকঠক শব্দ হল। অর্থাৎ কেউ এসেছে। মাদাম ম্যাগ্রে তার তুলার অ্যাপ্রোন খুলে রেখে দ্রুত হাতে চুল সামলে নিল।
… এই যে যাপন তা শার্লক হোমসের মৌমাছি-চাষ হেন বিশেষ করে দাগানো যাপন নয়। স্রেফ আটপৌরে এক যাপন। এই যাপনের আবহে গ্রামীণ চালচিত্র ঢেলে দিয়েছে বিশেষ আলোক। কিন্তু প্যারীসেও, প্রকৃত প্রস্তাবে, এই যাপনটিই করেছে ম্যাগ্রে দম্পতী। অন্ততঃ করতে চেয়েছে আর এই চাওয়াকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে অপরাধী-সন্ধান, অপরাধ। কিন্তু টলাতে পারেনি তার ভিত। এই যে যাপন-ছবি, তা নিজেই, সমসাময়িক বুর্জোয়া আর পড়তি সামন্ত-যাপনের বিপক্ষে এক প্রতিবাদ। মাদাম ম্যাগ্রে সেই প্রতিবাদের প্রতিমা।
বাল্যদশা পার হয়ে সদ্য কৈশোর-ছুঁতে যাওয়া বিরাট বড়লোকের ছেলে, তার মা-বাবার যাপন দেখে ভীত হয়। বেনামে চিঠি পাঠায় পুলিশ বিভাগে আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই হয়, খুন, তার পিতা। আসে ম্যাগ্রে। দেখে ওই পেটি-বুর্জোয়া, বড়লোক ট্রেডারের নিমিত্তিকতার ক্ষয় গুলি, ক্ষত গুলি। টের পায়, বেনামী চিঠিটি যে লিখেছে ওই বালকই। টের পায় বালকের অসহায়তা, হত পিতার প্রতি টানের নিরশ্রু সজলতা যা এই বালকের শুধু নয়, বিশ্বজোড়া এই অসময়ের সমস্ত ‘সচ্ছল’ পরিবারের জাত শিশুদিগের। এই টের পাওয়ার গহনে তার নিঃসন্তান হৃদয়ের হাহাকার মিশে গিয়ে নির্মীত হয় যে অনুভব তা’ই ‘রূপসী বাংলা’, মানবের হারিয়ে ফেলা ঐশ্বর্য। বিষণ্ণ ম্যাগ্রে মুক্তি চায়। এক ফাঁকে মাদাম ম্যাগ্রে’কে ফোন করে জানান দেয় সে আসবে। ডিনারে বাড়ি আসবে। ‘বাড়ি’। ‘বাসা’ নয়। সেখানে ম্যাগ্রে ফেরে ‘সন্ধ্যার কাকের মতো আকাংখায়’ – যে আকাংখা, গৃহ’কে ঘিরে, পরিবার শব্দকে ঘিরে, যা’কে বিনাশ না করলে, যে ‘পরিবার’কে একটি ‘বিজন্যাস ইউনিট’ না করলে পুঁজিবাদের চলবেনা, সেই ‘গৃহ’ ম্যাগ্রের মর্মে। তার গ্রাম্য শৈশবে, বাপ হারানো তারুণ্যে, সজল, সবুজ।
পিতা ও পিতৃত্ব বারবার এসে পড়েছে ম্যাগ্রের রহস্য-অভিযানে। বরদিনের আগের রাত্রে চোর ঢুকলো প্রতিবেশীর শিশু-কন্যাটির কোঠায়। সান্টা’র ছদ্মবেশে। যেহেতু প্রতিবেশী সুতরাং কথাটি ছড়াতে সময় লাগলো না খুব। মাদাম ম্যাগ্রে, সম্ভবতঃ বাজার-ফেরত এই সংবাদটি নিয়ে এলো বাড়িতে। ম্যাগ্রের কানে কথাটি ওঠামাত্র ম্যাগ্রে পেলো অপরাধের আর শিশুটির আশু বিপদের ঘ্রাণ। প্রথমেই শিশুটিকে সে নিয়ে এলো তার বাড়িতে। মাদাম ম্যাগ্রের জিম্মায়। তদন্ত চল্লো তদন্তের পথে। অবশেষে হলো সমাধানও। বাড়ি ফিরলো ম্যাগ্রেঃ
And as he stared at her in amused surprise:
‘You’ve not brought the child back?’
‘Not tonight. She’s asleep. Tomorrow morning you can go and fetch her, and make sure you’re nice to Mademoiselle Doncoeur.’
‘Really?’
‘I’ll have a couple of nurses sent, with a stretcher.’
‘But then… Can we…’
‘Sh!… Not for good, you understand? Maybe Jean Martin will find somebody else… and maybe his brother will get back into normal life and marry again some day…’
‘In short, she won’t be our own?’
‘Not our own, no. Only lent to us. I thought that would be better than nothing and that you’d be pleased.’
‘Of course I’m pleased… Only… only…’
She sniffed, hunted for a handkerchief, failed to find one and hid her face in her apron.
হায়, এই পর্বে এসে যে পাঠিকার, পাঠকের দৃষ্টি হয়না সজল …
মনেপড়ে রবীন্দ্রনাথ। ‘গুপ্তধন’। জীবন। জীবনই আদত গুপ্তধন। টের পায়, অন্তিমে, মৃত্যুঞ্জয়। এখানেই কি নামটি হয়ে ওঠে একটি প্রতীক? জানিনা। জীবন। কিন্তু কার? মানুষের। মানুষ? সে আদতে কি রকম? রবীন্দ্রনাথ বলেন “দুর্গম! সবচেয়ে দুর্গম”। বলেনঃ
“ সব চেয়ে দুর্গম-যে মানুষ আপন অন্তরালে,
তার কোনো পরিমাপ নাই বাহিরের দেশে কালে।
সে অন্তরময়,
অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয়”।
জর্জ সিমোনোর যাত্রা ওই দুর্গমের গহনে আর ওই যাত্রায় ম্যাগ্রে দম্পতীর সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমি টের পাই তাদের দুর্গম গুলি। সেগুলি বেজেওঠে আমার নিজস্ব দুর্গমে।
৫। শেষকথাঃ
১। দুর্গম মানুষের অন্তরাকাশের সূর্য-তারা-নষ্ট চাঁদ টের পেয়ে গেয়ে ওঠা ‘বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’ আর সে গান কে হারিয়ে ফেলে, মানুষের চক্রান্তেই, মানবের যে বিপন্ন বিস্ময় এই দুটি মেরুকেই ছুঁয়ে দিয়েছেন যে জন, অপরাধ কাহিনী কিংবা গোয়েন্দা কাহনের আদলটুকু মাত্র ব্যবহার করে, তিনিই জর্জ সিমোনো আর নরকের পথ ধরে স্বর্গের দিকে এই যাত্রায় ম্যাগ্রে দম্পতী তাঁর বিয়াত্রিচে।
২। ম্যাগ্রে কাহিনীগুলির নামের অনুল্লেখ বর্তমান লেখকের ইচ্ছাকৃত। যে পাঠকেরা সিমোনো'র সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা, আমি নিশ্চিত, কাহিনীগুলি, নামসহ, পারবেন সহজেই চিনে নিতে। আর যাঁরা, এখনো সমোনো-পথে হাঁটেননি, তাঁরা, এই রচনা পাঠান্তে ওই পথটি ধরে হেঁটে যান। নিজে পাঠ করে আবিষ্কার করুন কাহিনীগুলি। এই অনুরোধ।
*********** ********
১। https://www.trussel.com/maig/parisrev.htm
সপ্তর্ষি বিশ্বাস
৫/১১/২০২২ – ০৯/১১/২০২২
বেঙ্গালোর