ইন্টারস্টেলার
সপ্তর্ষি বিশ্বাস
যন্ত্রটিকে, ঠিক মাহেন্দ্রক্ষণে, ঝটকায় বার করে নিয়ে আসা এবং তারপর – ঊরুভাঁজ,তলপেট,নাভি,ত্রিকোন জমিটি – ঝোপঝাড়ে ঢাকা অথবা সাফসুতরা, তুলসীতলা হেন – যেমনই হোক, সেখানেই মাল খালাস করবার অভ্যাস এবং দক্ষতা – দুই-ই রয়েছে দিবাকরের। তাই, যখনই টের পেলো এবার ঢালবে, সে সতর্ক হলো এবং অভ্যাসবশেই চেষ্টা নিলো যন্ত্রটিকে হিঁচড়ে বার করে আনতে। কিন্তু খনন হতে থাকা খনিও টের পায় আসছে। টের পায় ঢালবে। বৃন্দাদিদিও পেলো। এবং চোখ বন্ধ রেখেই, স্পষ্ট তথা দ্বর্থ্যহীন গোঙ্গানিতে জানান দিল “হুঁ,হুঁ,উঁহুহু। থাকুক। ভিতরেই থাকুক”। অতএব বাধ্য দিবাকর ছিপি খুলে দিলো অন্দরেই।
এ প্রায় মিনিট পঁচিশ আগের কথা। অর্থাৎ অতীত। বর্তমান, অর্থাৎ এই মুহুর্তে, সে বসে আছে, পা ঝুলিয়ে, বৃন্দাদিদির ডবল-বেডের এক কিনারে। পা ঝুলিয়ে। এখন ঝুলছে, বুড়া ঠাকুর্দা-ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো, শিথিল তার লিঙ্গটিও। সে টানছে সিগারেট। তার পিঠের দিকে বৃন্দাদিদি। বৃন্দাদিদির শায়িত পিঠও তার দিকে। বৃন্দাদিদির সামনে দেওয়ার। তাদের বেডরুম-দেওয়াল। দিবাকরের সামনে জানালা। কাঁচের। বড় একটা। বন্ধ। ছোটো জানালাটি খোলা। তার পর্দা উড়ছে বাদলা বাতাসে। বাতাস উড়িয়ে দিচ্ছে বড় জানালার পর্দাও। দেখা যাচ্ছে তিল ঠাঁই না থাকা এক ধূসর, যা হয় আকাশ। তার নিচে ভেজা ডালপালা সহ গাছপালা। নীলমনি ইস্কুল। টিনচাল। জল ঝরছে নিশ্চয়। ঝরছে বৃন্দাদিদির ফুটো থেকেও। বার হয়ে আসছে। আসতে আসতে, নিতম্ব যেখানে পাছা, যেখানে ভাঁজ, সেখানে এসে আর এগোতে পারছেনা। শুকিয়ে যাচ্ছে। দাগ হয়ে যাচ্ছে। সামান্য ফিরে দেখলো দিবাকর, চোখ তখনো বন্ধই বৃন্দাদিদির। যা কয়েক মিনিট আগেই, শুক্রানু নিয়ে, বীর্য, বল, পৌরুষ হয়ে টগবগ করছিল দিবাকরের অধুনা বাদুড়-ঝোলা অন্ডাশয়ে, তা’ই এখন বার হয়ে আসছে বৃন্দাদিদির ফুটো থেকে – বেচারা, বেওয়ারিশ।
বেচারা, বেওয়ারিশ । সর্ব অর্থেই। যে সকল ফোঁটা গুলি ফুটোর ভিতরে সন্তরনে রত তারাও বেওয়ারিশ কেননা অন্দরে তাদের নিমিত্ত কোনো ডিম্বানু নেই অপেক্ষা করে, কেননা ঋতুমতী হওয়ার মাইলপাত্থর বৃন্দাদিদি পার হয়ে এসেছে অন্তত বছর পাঁচ। সহজ বাংলায় বৃন্দাদিদির মেনোপজ হয়েগেছে অন্তত তিন-চার বচ্ছর আগে। তবু, আশ্চর্য, বৃন্দাদিদির ফুটো অথথা ফুটা, তুলসীতলার মতোই পবিত্র-কামানো এবং তা ব্রেড নয়, হেয়ার-রিমুভার মহিমায়।
ত’লে ত’লে বিবাহ-অনুষ্ঠানকে তাক করেই এসেছিল দিবাকর। বৃন্দাদিদির ছেলে-বিয়ে কে তাক করে। কিন্তু ত’লে ত’লে। উপরে সে জানান দিয়েছিল, পত্নীসহ মা-বাপ-ভাইকে, যে, দেশগ্রামের জন্য মন টাটাচ্ছে। অকুস্থলে, অর্থাৎ বৃন্দাদিদিকে বলেছে “ঘটনাচক্রে এই সময় যখন এসেই পড়েছি, তখন ভাবলাম, আর বিয়ে-ভোজটাই ছাড়ি কেন”। এই ক্সকল বলতে হয়েছে কেননা বৃন্দাদিদি তেমন কোনো আপনা নয় অথবা সে’ও নয় বৃন্দাদিদির এমন কোনো আপনা – যার ছেলের বিয়েতে দিবাকরের আসা, তিন হাজার মাইল বিমানে উড়ে, আসা যায়।
আষাঢের দিন। আষাঢের একদিন। আরেকদিন বিয়েপাট চুকেছে। পাত্র, বৃন্দাদিদির পুত্র, পার্থ বৌ নিয়ে গেছে দ্বিরাগমনে। ইংরেজি ‘ই’ অক্ষরের মতো ছড়ানো বাড়ি জুড়ে হয়ে যাওয়া উৎসবের চিহ্ন। ভিজছে। উড়ছে। পচছে। জানাচ্ছে শেষ। জানাচ্ছে শেষ আছে। উৎসবের শেষ আছে। উৎসবেরো শেষ আছে। একই জানান, একই নিরুচ্চার ঘোষনা বৃন্দাদিদির ফুটো থেকে বার হয়ে আসতে আসতে, নিতম্ব যেখানে পাছা, যেখানে ভাঁজ, সেখানে এসে আর এগোতে না পারা বেচারা-বীর্যের দাগেও। শেষ আছে। উৎসবে আসা কুটুমদলেরাও চলে গেছে। “ তোর শংকরদার, আমার – মেক্সিমাম আত্মিয়ই ত, হয় করিমগঞ্জ নাহয় শিলচর। বড়জোর”। বলে বৃন্দাদি। অর্থাৎ নাইয়রি হয়ে থাকতে এসে, থেকে, দেড় দুই রাত পার করে, ওরা ফিরে গেছে। “আসবে আবার। পার্থ আর মিত্রা এলে। তখন হয়ত এক দেড় দিন থাকবে আবার”। শোলার গায়ে পার্থ-মিত্রা সহ বধূবরণ কলাগাছ, কচি, ফটকে। পাতাগুলি ছিঁড়ে যাচ্ছে বৃষ্টি, বাতাসের হাতে। উড়ছে নিশানের মতো। মৃত কলাগাছ। তার মৃত পাতা। তবু এগুলি নাকি খুলে ফেলতে নেই যদ্দিন না নিজেও থেকে খসে পড়ে। খুললে না-মঙ্গল। ছড়ানো উঠানে বাঁশ-খুঁটি ভরসায় টিন দিয়ে হয়েছিল প্যান্ডেল। লোক খাওয়ানো। বৌভাত। সেগুলির কিছু কিছু খুলে নেওয়া হয়েছে। তবে ষাট ভাগই হয়নি।
“কামলারা আজকেও আইলো না। আইবই বা কি রকম। বৃষ্টি তো সকাল থেইক্যা”। বলে বৃন্দাদিদি। বলতে বলতে পা বাড়িয়ে দেয় চাল থেকে নেমে আসা জলরেখার দিকে। পরনের আলখাল্লা মতো পোষাকের থেকে পা বার হয়ে আসে অনেকটা। নিলোম পা। কথা হচ্ছিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সামান্য আগেই এসেছে দিবাকর। বৃষ্টিও একটু জিরিয়ে নিচ্ছে এখন।
“ এসেছ। খুব ভালা । তোমার দিদির ত তারা যাওয়ার পর থেকেই মন খারাপ। আরে, তারা ত ফিরাযাত্রায় গেছে। — তবে বাসা খালি খালি লাগে। ঠিক। তুমি এসে ভাল করেছো। দুপুরে খেয়ে টেয়ে যাবে …”
বল্লো শংকর সেন। ভালমানুষ হিসাবে খ্যাত শংকর সেন। বৃন্দাদিদির বর। স্বামী।
“এই বিষ্টি-বাদলাত তুমি কই চললায়?” – বৃন্দাদিদি। “অই কয়েকটা পেমেন্ট বাকি। শেষ করিয়া আই”। বলে ভালোমানুষ শংকর সেন। বলে আর হাতে লাঠি-মতো করে ছাতাটি নিয়ে নামে উঠানে। পায়ে পায়ে উঠান পার হয়ে ফটকে না যেতেই নামে ঝুম। নামে আষাঢ়।
“এই শুনো, এই বৃষ্টি টা দেখে যাও” – বৃন্দাদিদি উতলা। প্রকৃত।
“আরে ধুর। বর্ষার দিন। বৃষ্টি ত’ …” বলতে বলতে ছাতা খোলে ভালমানুষ শংকর সেন। আধ-বলা বাক্যটি বৃষ্টি, বাতার ছিঁড়ে এগিয়ে আসতে আসতে বৃষ্টির অন্দরে মিলিয়ে যায় শংকর সেন। ওই মিলিয়ে যাওয়ার দিকে মায়ালু দৃষ্টি বিছিয়ে দিতে দিতে বৃন্দাদিদি বলে “ কে বলবে এ’র বয়স ষাট পার হলো”।
বৃষ্টিতে মিলিয়ে গেলো উঠান, সামনের রাস্তা, রাস্তা পাড়ের নীলমনি ইস্কুল। বৃষ্টিতে মিশে গেলো শংকর সেন। রইলো দিবাকর। দিবাকর আর বৃন্দাদিদি। রইলো লম্বা বারান্দা। বারান্দার কিনারে কিনারে কোঠাগুলি। রইলো অন্দর। অন্দরের পাকঘর। পাকঘরের রান্নামাসী।
রইলো বৃষ্টির অন্য পাড়ে হাড় বার করা নীলমণি রোড রাস্তা । নালা উপচানো জলে যা সাময়িক নদী। সাময়িক, কারণ সব সময় নদী কুশিয়ারা, কিনারেই। সেখানে চলে যায় জল, দল বেঁধে। রাস্তা ধারে নিচু দেওয়াল। ওপারে ঝিল । এই ঝিল বর্ষা-স্থায়ী। এই ঝিল নীলমনি স্কুলের খেলার মাঠ ।
মাঠের দুই প্রান্তে দুইজন বাঁশের গোল-পোস্ট । ভিজছে। স্কুল টুর্নামেন্টের খেলা পড়লে নালা কেটে ঝিলকে বিদায় করে ফিরিয়ে আনা হয় মাঠ । তবে সেও সাময়িক ।
বৃষ্টি-জলের সঙ্গে নীলমনি স্কুলের পুকুর , তারও বুক উছলায়। সে’ও অন্তর্বাসের পাহারা ছিঁড়ে এসে যোগ দেয় এই মাঠকে ঝিল করবার সৃষ্টি কাজে । জলের সৃষ্টি কাজ ,জলের সঙ্গে সৃষ্টির ,সৃষ্টির সঙ্গে জলের – কি যেন একটা যোগ, যোগাযোগ সহসা স্পষ্ট হতে চায়। “মৃত্তিকার মতো তুমি আজ, তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে”। কার প্রেম ? জলের ? বৃষ্টির ? মৃত্তিকা – কোন মৃত্তিকা ? ওই মাঠ নীলমনি স্কুলের ? গ্রীষ্মে যার গা থেকে ঘাস ঝরে যায়, মরে যায় ? তারপর ? তারপর আবার বৃষ্টি, তারপর আবার জল । মাটির শরীরে রোমের মতো নল, অনেক অনেক ফুটো। জল ঝরে। ঝাঁপ দিয়ে পড়ে জল। কল্লোল তোলে জল। সব ফুটোতে। মেনোপজ পার হওয়া ফুটোতে, অহল্যা ফুটোতেও। হয়তো সেই হেতুই “তোমার হৃদয় আজ ঘাস”। এখানে হৃদয় নিশ্চিত প্রতীক । দেহের ।
দেহজ ফুটোর । যোনির। নাহ্, যোনি বড়ই বিশুদ্ধ শব্দ ,ঠিক যেরকম কদর্য্য শব্দ গুদ, চুত। এর চেয়ে ফুটো ,ফুটা ঢের ভালো ।
এই সকল ভাবনার গেরিলা আক্রমণে সাময়িক ভুলে যায় পারিপার্শ্বিক।
সাময়িক। টোপ দেখে, তাকে মস্তির সুখাদ্য ভেবে মশগুল হয়ে পারিপার্শ্বিক বিস্তৃত মাছ-জনতার মত । অতঃপর সুতোয় টান পড়ে । সব মশগুল যায় তছনছ হয়ে । বঁড়শি টেনে তোলে মাছ-শরীর। সে নিজেই তখন সুখাদ্য।
“ কিরে কি এত ভাবছিস?” সামান্য থেমে “ তুই অবশ্য ছোটবেলা থেকেই ফিলোসফার টাইপ ছিলি”।
এই বাক্য-টুকরা গুলি তাকে ছিপ-সূতার মতনই, একটানে, মশগুল ছিঁড়ে তুলে আনে তার নিজস্ব জলের পৃথিবী থেকে অদ্যকার এই জলঝরা ঘড়ি-দিনে। বৃন্দাদিদি কথিত বাক্য-টুকরার অর্থ, ক্রমে, টের পেয়ে তার ইচ্ছা হয়, বলে “ভাবছিলাম নোরা। নোরার কথা। তার ওই বলা whats the idea making us … নাহ্ you .. with a big hole in the middle” । কিন্তু বল্লো না বা বলা গেলোনা। এই না -বলা এক ভেজা-শ্যাওলা হাসিতে উদ্ভাসিত হলে আবার বৃন্দাদিদি “কিতা রে, কিতা হইল? হাসতাসস্ যে”।
“না, কিচ্ছুনা তেমন। একটা পুরনো কথা মনে আইল”।
“কি? কি? কোন কথা? কি কথা?” বৃন্দাদিদির চোখেমুখে কৌতুহল। সরল।
ভাবছিলাম তোমার কথাই। তোমার দুধের কথা। দুধ অথবা বুনি। “মাই” নয়। “মাই” শব্দ জমেনা। অন্তত এই যুগে “মাই” শব্দ জমে ক্ষীর হয়না, ছানা হয়না, হয়না দৈ ও। “মাগীটি ছা’কে মাই দিতেছিল” – এই বাক্য যে কালের, সে কালে “মাই”, “মাগী” – দুই শব্দেই “মা” ছিল উপস্থিত। অদ্য তাহা নাই। পরিবর্তে “ল” যোগ হয়েছে। – সুতরাং “মাই” নয়, ভাবছিলাম তোমার দুধের কথা।
তুমি তখন গিয়ে ক্লাসে যাও আর আমি সিক্স কিংবা সেভেন শ্রেণীতে। সময় ছিল সকাল। ‘সকাল সকাল’ নয়, সকালদিক। সাড়ে দশ এগারো হবে। তুমি রাস্তার ওই ধার থেকে, তোমাদের বাড়ি-বেড়ার অন্দর থেকে, হাঁক দিলে “রিমাদি – রিমাদি —রিমাদি”। তারপর “দিবা– দিবা”। আমি শুনিনি । তুতু, ছোটপিসী, শুনলো। নিজে কি একটা কাজে ছিল তাই আমাকে বল্লো “বৃন্দা আমাকে একটা জিনিস দেওয়ার কথা । সেটাই এনেছে বোধহয়। এক দৌড়ে নিয়ে আয় না” —। যদি মুড না থাকতো, যেমন প্রায়ই থাকতো না, যদি ছোটোপিসীকে বলতাম, যেমন প্রায়শই বলেছি “পারবোনা” বা যদি আমি না থাকতাম বাড়িতেই, তাহলে কি হতো? কি ঘটতো? তখন? কি ঘটতো এখনই বা?
কি ঘটলে আরো কি কি ঘটতোনা বা কি না ঘটলে ঘটে যেতে পারতো আরো কি কি – কোন প্রজাপতির ডানা থেকে কোন রেণু কোথায় ঝরেনি বা ঝরেছিল বলে বিনষ্ট হয়ে গেলো পম্পেই কিংবা সাংহাই – এই সকল রহস্যের কিছু কিছু হয়তো আবিষ্কৃত হবে, হয়তো লক্ষ যুগ পরে, কিছু কিছু আর যাবেনা আবিষ্কার করাই, কোনোদিন। সুতরাং সে সকল সম্ভাবনা আমার কাছে বাস্তব নয়। বস্তু নয়। আমার বস্তু তা’ই যা বাস্তবে, বর্তমানে ঠিক যা। ঠিক যেভাবে হাজির উপস্থিত। যথা, সেদিনের তুমি আর তোমার দুধ। তোমার বেড়া পার হয়ে নুয়ে আমাকে দেওয়া একটি মচা। নুয়ে পড়বার মূল্যে তোমার উর্ধ-শরীর বেড়ার এইধারে। তোমার গোল-গলা-নাইটির ঝুলে যাওয়ার অন্দরে তোমার দুধ। গোল গোল দুইটি দুধ। তোমার চামড়া সফেদ নয়। তাই তোমার দুধও নয় দুগ্ধফেননীভ। তবে গোল। বর্তুল। দেখা গেলোনা বোঁটা। দুধের। তবে দেখা গেলো ঘাস। হাল্কা, পাতলা, ঘাস। ঘাস ঘাস। দুধে। দুই দুধের মাঝখানে, পায়েচলা পথে। সরু গলী। গলীর মৃত্তিকা ভেজা ভেজা। ঘাম ঘাম। মাংস। লোম। দুধেও লোম থাকে। ঘাস। “তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে”। প্রেম? নাহ্, প্রেম নয়। যদিও প্রেমের আবডালেও পাইপ হয়ে ওঠে পাইপগান, তবে তা সম্ভব, প্রেমটেম ছাড়াও, নেহাৎই কামে। কামবশে। কিন্তু বৃন্দাদিদি, ওই যুগল দুধ, ওই দুই দুধের মাঝপথ, রোম, লোম – আমাকে পাইপ থেকে পাইপগানে – তৎক্ষণাত পরিণত করলেও তা না ছিল প্রেম, না’ত কাম। সে আরো একটা কিছু। আরো অন্ধকার। আরো সূচীভেদ্য। তোমার হাত থেকে ওই মচা-টা নিতে নিতে আমার গান, পাইপ, পাইপগা, যে যেহেতু একচক্ষু, তার সেই চোখেই উঠে এসেছিল জল। জান না আগুন?
“বলছিস না যে কিচ্ছু? কেন হাসছিলি? কোন পুরনো কথা …” – বৃন্দাদিদি, বর্তমানে, সরব।
আবারো সেই টোপ-ফেলা মাছের মশগুলে টান। ছিপের। উঠে আসা। নিজস্ব জল থেকে। বাস্তব জলের মুখামুখি। অতএব বাস্তবের মতো করে সত্যকে গড়ে নিতে হবে উত্তরে। গড়ে নেওয়া। বানিয়ে নেওয়া। তবু সত্য। গোল, বর্তুল দু’টি দুধের রোম রোম মাঝপথ ধরে চলে যাওয়া অনেক পুরনো সত্যের একটির বদলে আরেকটিকে হাজির করা। দরকার। টুকরো সত্যকে তুলে দেখানো। যত্নে রেখে দেওয়া তবু অনেকদিন না-খোলা এলবাম খুললে যেমন। ফোটো আছে। ফোটো নেই। টুকরো আছে। টুকরো গিলে খেয়েছে মস্ত মাছ। সেই শকুন্তলার আংটির মতো। মাছ না'কি হাঙ্গর? হাঙ্গর না’কি ছিল সময়-হাঙ্গর ? সময়-হাঙ্গরের
দাঁত বাঁচিয়ে, গলা পার করে, পেট থেকে টেনে আনা দরকার আরো কোনো ছবি। পরিস্থিতি, পরিবেশ, পাত্রী,পাত্র সাপেক্ষে প্রাসঙ্গিক কোনো ছবি। —- সামান্য আয়াসে হলেও দিবাকর টেনে বার করে আনলো। আনলো ছবি। একটি শীত সকালের, শীত ঋতুর ছবি। আবহে কুয়াশা-ক্যানভাস। পথে নামলে তা'ই কুয়াশা-টানেল। টানেল ধরে এগিয়ে চলার আবডালে ঘুমঘুম সূর্যের আস্তেধীরে উঠে আসা। ঘুমঘুম বুক আজাদ সাগরের। জলেও মিশে আছে ঘুম। ভেসে বেড়ানো শ্যাওলা,শাপলা —- তারাও থেমে, জমে আছে ঘুমে। ঘুম ভাঙছে রাস্তার। ঘুম ভাঙছে দিবাকরের। তার অন্তর্গত শরীরের। আরো তিনটি পাড়া অএরোতে হবে। টিলার উঁচুতে পুরনো ক্রিস্টান মিশন। এগিয়ে, উঁচুতেই কালীবাড়ি। গাছ-কালীবাড়ি। রাতের গা ছমছম ভেঙ্গে তারও জেগেওঠা, কুয়াশার অন্দরে। পার হতেই ঢালু। গভর্নমেন্ট বয়েজ হায়ার সেকেন্ডারী। স্টেট ব্যাঙ্ক। তার পরেই সেই সন্তোষ নামক বিলুপ্ত মহাজনের দেওয়া দিঘি। সন্তোষ সাগর। হায়, এ'ও ‘সাগর’। বৃন্দাদিদির জন্য ওই সকালটি, আদতে ওই রকম সবগুলি সকালের টুকরো-টাকরা মিলিয়ে তার নির্মাণ করে তুলতে তুলতে দিবাকরের মনে হলো, দুটি দিঘি। দুটির নামই ‘সাগর’। যারা রেখেছিল নাম গুলি, তারা বাস্তবের সাগর দেখেছে কি? দেখেনি বলেই দিঘিকে দিতে চেয়েছে সাগরের বিস্তার? অতলতা? অন্যথায়, সাগর দেখে এসে, সেই দেখাকেই দিয়েছে সমাধি এই নামকরনে? সন্তোষ সাগরের কাছাকাছি হ'তে হ'তে কুয়াশা টানেল আর আর নেই। দিঘি ঘিরে থাকা গাছপালার জাল থেকেও কুয়াশা-দাগ প্রায় যাই-যাই। পরিবর্তে পাতায় জমে থাকা শিশির ঝরে যায় —- সকাল পাখি, সকাল-সকাল-পাখি দের ডানা ঝাড়ায়। এবার বাঁদিক নিতে হবে। বাঁ দিক উঁচু। উঁচু ধরে পিচরাস্তা। সমকোনে বেঁকে গেছে - নবেন্দুর চা-দোকান সাক্ষী রেখে। নবেন্দুর চা-দোকানের কোনাকোনি জাহাজ গুদাম। কুশিয়ারা নদী। জাহাজঘাটা। বর্ষায় বাংলাদেশের মালবাহী জাহাজ আসে, থামে, মাল নামায়, মাল তোলে, যায়। রাস্তার উঁচু পিঠ ধনুকের মতো, এখানে, ববেন্দুর দোকানের সামনে এসেই, নিচু। জাহাজীরাই নবেন্দুর মূল খরিদ্দার। নবেন্দু দোকান খোলে ভোর-ভোর। নবেন্দু সহপাঠী ছিল, ইস্কুলে। সম্ভবত ক্লাস সেভেনের পরে আর এগোয়নি। বাপের চা-দোকানে লেগে গেছে। ওই সকালে, ওই সকল সকালে দিবাকরের বয়স কত? মনেহয় ঠিক ততোই তখন বয়স দিবাকর, নবেন্দুর ঠিক যে বয়স ছিল বৃন্দাদিদির, তখন। অর্থাৎ যখন নাইটির ভিতরবাড়ি থেকে বার হয়ে এসেছিল বৃন্দাদিদির দুধগুলি, তাদের মধ্যেকার ঘাসপথ সহ বিঁধে গিয়েছিল দিবাকরে। উনিশ কিংবা কুড়ি।
“হালা, ভাদ্র মাসের কুত্তা, আইগেসস পথাকাল-অ” হেসে বলবে নবেন্দু। হাসবে দিবাকর। প্রথম কাপ চা খাবে দুই সহপাঠি। একজন চা'য়ে চুমুক দেবে দোকান ঝাড়ু দেওয়ার, সাফ-সুতরা করবার ফাঁকে ফাঁকে। আরেকজন, দিবাকর, চোখ রাখবে রাস্তার উঁচুতে। সেখানে আসবে, আসতে পারে, যে কোনো মুহুর্তেই —- না, আসা নয়, আবির্ভাব —- প্রথমে মোটাকাঁচ চশমায় রোদ-ঝলক। তারপর একটি গলা। দুধের আভাস। তারপরে সাইকেলের হ্যান্ডেল। সামনের চাকা। পা। প্যাডেল-ঘোরানো পা। হাওয়া-বাতাস এসে ছুঁয়ে যাবে স্কার্ট। চলে যাবে অন্দরে। হায়, দিবাকর যদি হতে পারতো বাতাস। বাতাস দয়ালু হয়ে, কোনো কোনো দিন ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্কার্টের মানচিত্র। বার হয়ে আসে উরু। দেখতে দেখতে একটা উষ্ণতা, ওই চলছবি থেকে উড়ে এসে গরম করে তোলে। কাকে? রাস্তার উট-পিঠ পার হয়ে সাইকেল-গতি শ্লথ হয়ে থেমে যাবে। এইবার চোখ টিপবে নবেন্দু। আড়ালে। দিবাকরের দিকে। ঠিক যেমন চোখ টিপে বলে “আর কত হাটাহাটি বেটা? খাইতে কবে?” হ্যাঁ, সাইকেল আরোহিনীর চলন্ত উষ্ণতা গরম করে, চাগিয়ে তোলে ওই ক্ষুধাকেই। পাশাপাশি হাঁটে। গা'য়ে যতোটা সম্ভব গা ঠেকিয়ে। হাঁটার এক কিনারে নীলমনি ইস্কুল। আরেক কিনারে, ক্রমে জানা যায়, এই ছড়ানো বাড়ি। এই তল্লাট। বৃন্দাদিদির। তবে সে আরো কিছু পরে। এই মুহুর্তে পাশাপাশি, ছোঁয়াছোঁয়ি খেলতে খতে যাওয়া। যাওয়া, যেখানে গিয়ে রাস্তা দুইভাগ। সাক্ষী চিত্রবানী সিনেমা হল। এখানে আবার সাইকেলে উঠবে মেয়েটি। যাবে ডানদিকের রাস্তা ধরে, যে রাস্তা চলে গেছে দুলু দাসের নাট মন্দির পার হয়ে, অশোক নামক জনৈক প্রাইভেট টিউটরের খাটালের দিকে। ওই সাইকেলে-ওঠা-মুহুর্তে আবার উড়বে স্কার্ট। উঠবে স্কার্ট। কপাল ভালো হলে, হাওয়া বাতাসের যোগসাজশে, দেখা যেতেও পারে নিতম্বরেখা। কানে বাজে নবেন্দুর “খাইতে কবে” প্রশ্ন। ওই প্রশ্নটি নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করতে করতে দেখবে মেয়েটির মিলিয়ে যাওয়া। জ্বালিয়ে নেবে চারমিনার সিগারেট। কয়েকটান পরে “খাইতে কবে” এই প্রশ্নটি নিয়েই বাড়িফেরা রাস্তা ধরবে। —- এ’ই হয় নিয়ম। সোম-বুধ-শুক্র সকালের। কিন্তু একদিন সিগারেট টানতে টানতে ফিরিতি রাস্তা ধরতে যেতেই শোনা গেলো “এই দিবা, এই দিবাকর”। ফিরে তাকালো দিবাকর আর ওই মুহুর্তেই, তরজাবেড়ার ওই পাড়ে নিম্ন শরীর আর তরজা বেড়ার উচ্চতা পার করে নুয়েপড়ে, কাগজের মচা দিতে দিতে, গোল-গলা আলখাল্লা-টাইপ গ'লে দুটি দুধ, তাদের মধ্যবর্তী পায়েচলা পথ, সেই বৃন্দাদিদি আবার প্রবেশ করলো কাহিনীতে। ছয় কিংবা সাত ক্লাসের সেই দুধ-সকালের পর। সেই দুধ-সকালের পর অনেকদিন ছিল বৃন্দাদিদি। দাহ্য কল্পনায় ছিল। ছিল ভিজিয়ে ফেলা হাফ-প্যান্টের শুকিয়ে থাকা দাগে। বিছানা-চাদরে। হলদে কাগজে ছাপা হওয়া, সাদাকালো ফোটোগ্রাফ সহ “জীবন যৌবন”, “ দুষ্টু প্রজাপতি” আদি গ্রন্থ জনিত উদ্ভাসে।
ছিল অনেকদিন। কিন্তু কতো দিন? কতো মাস? বৃন্দাদিদির দুধ-সকালের মতোই, ক্রমে, এলো বাবুমামীর উরুত-সন্ধ্যা, বাবলু-বৌদি'র নাভি বিকাল। ইত্যাদি। তাদের স্রোতে, বয়সের ঢেউয়ে ভেসে গিয়েছিল বৃন্দাদিদি তার দুধ-সকাল সহ, ঠিক যেমন বিক্রি হয়ে গেলো, পাকিস্তান-হওয়া-কালের মুসলমান ভদ্রলোককে ঠকিয়ে নেওয়া, বৃন্দাদিদিদের সেই মস্ত বাড়ি যা দুটি পুকুর, গাছপালা, গরুঘর, দাসদাসী-বসত আর সুপারী-নারকোল ছায়ায় রহস্য সংকুল। আম-কাঁঠালের ডাল গুলি এক সময় হয়ে উঠতো কাটাপড়া ঘুড়িদের কবরিস্তান। ঠিক যেমন প্রতি সন্ধ্যায়, স্বঘোষিত উকিল কিন্তু কাছারিতে পেশকার, হিমাংশু করের নেতৃত্বে “ভবসাগর তারন কারন হে” আসর, লম্বা বারান্দায়,ঠাকুর-কোঠার সামনে, পুত্র-কলত্র-কন্যা সহ। উপস্থিত সকলকেই অংশ নিতে হতো সেই “গুরুদেব দয়া কর দীনজনে” ফেস্টিভেলে। চন্দ্রাদিদি, বৃন্দাদিদি, সোমাদিদি আর তাদের মা শুধু নয়, জোড়হাতে, নিমীলিত চোখে বসতে হতো জোয়ান-মস্তান-চাকুরে শিবু এবং পাড়া বেপাড়ায় নাটক করে বেড়ানো বেকার, বেক্কার দেবুকেও। ক্লাস ছয়-সাত-আট পাঠকালে যদিও সকল “দিদি” ই রহস্য, তাদের সমস্ত কিছুই কুয়াশা, তখনো, ওই বাড়ির শুধু নয়, পাড়ারও অন্য সমস্ত “দিদি” দেরকে রহস্যে হারিয়ে দিয়েছিল বৃন্দাদিদি। প্রথমত, তার কোনো স্পষ্ট রহস্য, কোনো জড়াজড়ি-ছবি কোনো গলীতে, সন্ধ্যার ইস্কুলবাড়িতে —- ছিলনা। দ্বিতীয়ত ওই দুধ-সকাল দিবাকরকে সে'ই দিয়েছিল উপহার এবং পরদিন গভর্নমেন্ট বয়েজ হায়ারসেকেন্ডারি ইস্কুলের ক্লাস সেভেন বি'র সক্কলে যে সংবাদ শুনে চমকিত হয়েছিল, যে, মেয়েদের বুকেও, মানে, দুধেও লোম থাকে। শুধু চমকায়নি বিকাশ। তার বার চারেক ক্লাস সেভেন পেরোনোর ব্যর্থ চেষ্টার মূল্যে সে বলেছিল “দুধো ত থাকে। পুন্দো-অ লুম থাকে বেটিরার”। সেই দুধ-সকাল, সেই দুধ-সকাল যুগের পর, কোনো এক সোম-বুধ বা শুক্র সকালে, একদিন এই ডাক। “এই দিবা, এই দিবাকর”।
“ওই দিনটার কথা হঠাৎ মনে এলো। তাই হাসছিলাম”।
“ ইশ। দিন কি রকম যায়, টেরই পাওয়া যায়না। কি নাম ছিল যেন ওই মেয়েটার… ইশ, ওর বিয়েতেও গিয়েছিলাম। খুব হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু নামটা… গোবর্ধন কবিরাজের নাতনী” —-
“সুপর্ণা”। —- বলে দিবাকর। মনে ভাবে, পারলো, একটির বদলে আরো একটি ছবি তুলে আনতে পারলো সময়-হাঙ্গরের পেট থেকে। কিন্তু ওই ছবিতেও যে বৃন্দাদিদি তেমনই। সেই গোল-গলা কিছু একটা পরিহিতা। সেই দুধ গুলি। তেমনি যমজ বর্তুল। হয়তো ব্রেসিয়ার মহিমা। ভেবেছিল দিবাকর। বৃন্দাদিদি ডেকে, হাত ধরে প্রায় টেনেই নিয়ে গিয়েছিল বাড়িতে। যদিও টানা-হ্যাঁচড়ার দরকার ছিলোনা। এমনিই যেতো সে। ততোক্ষণে নবেন্দুর “ খাইতে কবে” র সঙ্গে একাকার হয়েগেছে দুধ-সকাল।
“অয়, মনো হইসে। সুপর্না। —- তোর সঙ্গে কাট হয়ে গেলো? ভালা মেয়ে না?”
“কাট? আরে ধুর। ভালা-মন্দ তখন কে দেখে”... বলতে বলতে চমকে ওঠে দিবাকর। বৃন্দাদিদিকে সে যেমন তুলে দেখাচ্ছে অন্য ছবি, চেষ্টা নিচ্ছে ঢেকে রাখতে সেই ছবি, যা তাতার দস্যুদের বর্শাফলার মতো বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা বৃন্দাদিদির পা, আজকেও পরে থাকা গোল-গলা আলখাল্লা আর তার অন্দরের দুধ-ইঙ্গিত দেখতে দেখতে, প্রকৃত মনে আসছে দিবাকরের, তেমনি বৃন্দাদিদিও কি?... অন্য কিছু ভাবছে? বলছে অন্য কিছু? কি ভাবছে বৃন্দাদিদি? কোন ছবি আসলেই এখন তার মনে?
কথার খেই ধরে দিবাকর রাশ টানতে চায়। বলে “ভালামন্দ আবার কি? ছয়-সাত মাস পরে বোর লাগছিল”।
“ তার মানে কিচ্ছু না কিচ্ছু করে নিয়েছিলি।” বৃন্দাদিদির অন্দরে একজন ছিনাল মেয়েমানুষ ছিল। এখনো আছে। তাকে নিয়ে কোনো বদনাম ছিল না। কোনো গল্প ছিলনা। ঠিক। কিন্তু ওই ছিনাল মেয়েমানুষটিকে, অন্দরের, চিনতে পারতো দিবাকর। “করে নেওয়া” বলার মধ্যে, পলকে উজিয়ে উঠেই আবার ডুবে গেলো ওই ছিনাল-জন। পরিবর্তে একজন বোষ্টুমীই যেন, মৃদু শ্বাস ছেড়ে বল্লো “ ছেলেগুলি সব এই রকমই। ক'রে ট'রে”... হাসিতে ভাঙলো এবার। “ছেড়ে দেয়”।
এই বৃন্দাদিদির বয়স কত? এ'কি মেনোপজ-ফলক পেরোনো, সদ্য শাশুড়ি হওয়া মহিলাটি? না'কি…
“কি রে কিচ্ছু হয়েছিল?” —- পংক্তিটিকে আবার উচ্চারন ক'রে যেন দাগিয়েই দিল বৃন্দাদিদি।
হয়েছিল। অনেক কিছু না হলেও বেশ কিছুই হয়েছিল। তবে উপরেই বেশী। নিচে যাওয়া যায়নি জামাকাপড়ের। তবে লোম যে ছিল… এতোটা বলতে পারেনা দিবাকর। মুচকি হেসে বলে “হুঁ, একটু-আধটু হয়েছিল”।
“ আমি জানি। ছেলেগুলি এই রকমেরই। এক রকমেরই। সব সময়। সব সময় ওই একই ধান্দা”। এবার বৃন্দাদিদি বোষ্টমী। তিলক-কাটা ছিনালী। কিন্তু টুকরো টুকরো করে বলা বাক্যগুলি দিবাকরের কাছে চাবুক। চমক। “ঠোক্কর বাবু” র কন্যাদের মধ্যে চন্দ্রাদিদি ছিল খ্যাতিসম্পন্না। প্রায় পিতাটির মতোই, যিনি দুষ্টলোকের ভাষার ঠগ-করবাবু, অর্থাৎ “ঠোক্কর” বাবু। তেমনি চন্দ্রাদিদিকেও খারাপ ছেলেরা নাম ফেলেছিল “চুচন্দ্রা”। সে এতো “ ছেলে” ঘেঁটেছে যে, তাকে বিয়ে দিতে হয়েছিল, কলকাতা নিয়ে গিয়ে। তার পক্ষে পুরুষ জাতি সম্বদ্ধে এইমতো অথবা যে কোনো রকমের মন্তব্যই মানায়। দিবাকর নিজেই অন্তত তিনবার, তিন আলাদা “দাদা” র সঙ্গে চুচন্দ্রা কে দেখেছে কলেজ ফাংশান কালে অন্ধকার আর্টস বিল্ডিং এ, সরল খাঁ দিঘিধারের বাঁশঝাড়ে। ইত্যাদি। পরের বোন সোমাদিদি। বুকে-পাছায় সে'ও দেবী সরস্বতী। চোখ, চুল, নাভির সংকেতে মেধাবিনী। কিন্তু “ যার-তার সঙ্গে ম্যাটিনী দেখতে যাওয়া রূপা চক্রবর্তী” তার বান্ধবী, এতদভিন্ন কোনো সরাসরি নভেলা, থুড়ি, ছোটোগল্পও ছিলনা। তবে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বৃন্দাদিদির তেমন সম্ভাবনার ঘ্রাণও আসেনি ওই কালে। বয়সের ঢের ফারাক থাকলেও বৃন্দাদিদি ছিল ছোটোপিসীর বান্ধবীই। তার অনেক দুপুর-বিকালই কেটেছে দিবাকরদের বাড়িতে। ছোটপিসীর সঙ্গে হাহা-হিহি, ফিসফিস আর নীহার গুপ্ত, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট —- ইত্যাদি নিয়ে। সে'ই দাগহীন বৃন্দাদিদি পুরুষমানুষের স্বভাব, যৌন লোভ —- এই সকল বিষয়ে এমত অন্তর্দৃষ্টি লাভ করলো কখন? কিভাবে? তাহলে বাইরের এই দাগহীন বৃন্দাদিদি আর অন্দরের আদত বৃন্দাদিদি কি ভিন্ন? আবার এ'ও সম্ভব, যে, এই সকল গহন-জ্ঞান সে আয়ত্ত করেছে বিবাহোত্তর? বিবাহোত্তর, সে নিজে জড়িয়েছে ভিন-পুরুষে না'কি মফস্বল-খ্যাত “ভালমানুষ” শংকর নন ততোটা “ভাল”? –--- এখানে এসে সিগারেট ধরাতে বাধ্য হয় দিবাকর কেননা এখানে এসে তার প্রশ্ন, “ভালো” শব্দটিকে মাপতে চায়। হায়, ওই বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকা পাইপটির শিরা-উপশিরা সহ চিতিয়ে উঠে কয়েক মিনিটের পাইপগান হওয়া আর ওই a big hole in the middle এর, ওই ফুটোটির জবজবে সিক্ততায় জ্বলেওঠা –--- এদের ভিত্তিতে “ভালো-মন্দ” নির্ধারন প্রক্রিয়াটি থেকে সে, দিবাকর, নিজেও কি তবে, আজো, পারলোনা বার হয়ে আসতে?
“বড়দি” —- প্রৌঢ়া-স্বর। ঘাড় ফেরায় দিবাকর। পরিচিত। একে সে দেখেছে সেই গোবর্ধন-কবিরাজের-নাতনী আমলেও, যখন ধরে বেঁধে তাকে আনতো বৃন্দাদিদি। আসর বসাতো ভালমানুষ শংকরবাবুকেও নিয়ে। তখনো প্রৌঢ়া’ই ছিল। এখনো তা'ই।
“চা লইয়া আইসি”। সামান্য থেমে “ পর্টি-কুঠা'ত আইয়ইন”। “পর্টি-কুঠা”, হায়, পর্টিকো থেকে, এই মফস্বলেও ব্যবহার হয়না কতো কতো দিন। শব্দটিকে হাতে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা হয় দিবাকরের। ইচ্ছা হয় তার মর্চে, জং ছাড়িয়ে ঝকঝকে করতে। এই ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে, বৃন্দাদিদির পিছনে পিছনে ঢোকে, ফটকের সোজাসোজি কোঠাটিতে, যা এখনো উৎসবের সাক্ষী। কোঠায় প্রবেশমাত্র আবার শোনা যায় প্রৌঢ়ার স্বর। “বড়দি, বিষ্টির ছাট আ'র। দরজাটা বন্ধ করি দেই”। এই বলায় দায়-দায়িত্ব ছিল। “ঘর-অ জল অই-যাইব। তুমি লাইট জালাইদেও ”। ছিটিকিনি তে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। জানালাও। ক্রমে ঘিরে আসার চেষ্টায় হামাগুড়ি রত অন্ধকার জ্বলে ওঠে নিওন আলোর নীলচে'তে।
বন্ধ কোঠা। বাইরের বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। কোঠার অন্দরে জ্বালানো লাইট। বাবা বলছে “যে কোঠায় দরকার নাই, লাইট জ্বালাইয়া রাখিও না। অই যে —- যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের”...। ছবিটি ঝড়ে ওড়া পাতার মত, ঝলক দিয়েই উড়ে গেলো। দিবাকর বল্লো, যেন অজান্তেই “ইশ, এইসব, ই-সব ছোটো ছোটো জিনিস, শালা, লাইফ থেকে এখন ফুল মাইনাস হয়ে গেছে”। কাঠ-সোফার মুখামুখি চৌকিতে বসে বৃন্দাদিদি। বলে “ কোন সব জিনিস ত'র লাইফ থেকিয়া মাইনাস হয়ে গেছে?” আবছা আন্ধারেও রহস্য-হাসির ইঙ্গিত টের পায় দিবাকর।
“ অইত্ত, ই সব জিনিস আর কি – ঝড়বিষ্টিত দরজা-জানলা বন্ধ করে লাইট জ্বালিয়ে রাখা, দিনের বেলাতেও”। সামান্য থেমে “বাড়ি-বাড়ি’তে ডাকাডাকি-কথা, বেড়ার এপারে-ওপাড়ে তরকারি-শব্জির চালাচালি …”। বলবার অন্তর্গত উত্তাপেই নাকি নিজ মনেও এমত কখনো ভেবেছে বলেই, বৃন্দাদিদির দৃষ্টিতেও মেঘলা নামে। বলে “সত্যি রে। সিটিতে এভাবে, এত কারেন্টও যায়না”। নিজের অজানাতেই, নিজের কথার টানে, দিবাকরের অন্দরে জাগে যে দিবাকর সমাজ ও সময়ের বিশ্লেষক। বলে “ যায়। কারেন্ট যায়। নামে ঝড়-বাদলও। কিন্তু সিটি তো এপার্টমেন্টের দখলে আর এপার্টমেন্ট মানেই জেনারেটার। ঠিক যেমন জুতো কিনতে, জামা কিনতে – মল্। শপিং মল্”।
“আমাদের তো জুতো কিনতে যাওয়া, ইস্কুল অব্দি অন্তত, ছিল ফেস্টিভেল। বাবা নাহলে বড়দা নিয়ে যেতো। স্টেশন রোডে। হয় বা-টা নয় পদশোভা”। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে বৃন্দাদিদি। এই বলায় অতীত, সত্য, ছিল। দিবাকর বলে “ ঠিকই। তবে সেসব এখনই নেই। আর বাকি যা যা আছে, তা’ও আর থাকবেনা খুব বেশী দিন। দেশী-বিদেশী ক্যাপিটেল লগ্নী হচ্ছে এই সব ছোটো শহরেও। নগর আসছে। খোঁড়া পায়ে হলেও, আসছে শপিং মল, এপার্টমেন্ট, জেনারেটার …”।
সামান্য নীরব। কি একটা, কিছু একটা বোঝাপড়া চলে কি বৃন্দাদিদির সঙ্গে বৃন্দাদিদির? হয়তো। নীরব ভেঙ্গে বলে বৃন্দাদিদি, যে বৃন্দাদিদি কিছুটা ছিনাল, কিছুটা খুকিঃ “ বাদ দে। এসব ভেবে লাভ নেই। যখন থাকবেনা, তখন থাকবেনা। এখন তো আছে। এখনো তো আছে। … এই দেখ না, আগে ছেলেমেয়ে বড় হয়ে, পাশ-টাশ শেষ করে, এখানেই বা বড়জোর আশেপাশের তল্লাটে, চাকরিবাকরি পেয়ে যেতো। আর এই যে তোরা, তুই যেমন, যেমন আমার ছেলে, পার্থ, চাকরির জন্য চলে গেলি কোন দুনিয়ায়। … এই যে এলো, বিয়ে করতে এলো। বিয়ে হয়ে গেলো। আরো কয়েকটা দিন। ব্যস। তারপরেই বৌ-সহ চলেযাবে। তখন আবার এই মস্ত, খাঁখাঁ বাড়িতে, আমরা দুই বুড়াবুড়ি”। টিন-চালে বৃষ্টির নেমে আসা হয়েছে ঘনতর, গাঢ়তর। হয়তো তা’ই শোনে, চুপ মেরে, বৃন্দাদিদি, দুয়েক পলক। বলেঃ “তুইওতো চলে যাবি …”। এই বলায় কিছু ছিল কি? খুঁজতে চেষ্টা নেয় দিবাকর। কিন্তু বৃন্দাদিদির অন্দরে সত্যই তখন অতীতের টালটমাল। বলেঃ “ চৈত্র-বৈশাখে বৃষ্টির সঙ্গে বাজও পড়তো। ব্যস, গেলো কারেন্ট। তখন তো দিনেও মোমবাত্তি, লেন্টন”।
– “খুব মনে আছে। আরে তোমার বোধহয় খেয়াল নেই, ঐ রকম একদিনই তো আমার বিমল মিত্র’র “কে” উপন্যাস পড়েফেলা, লেন্টনের আলোয়, তোমাদের বাড়িতে। বাদলায় আটকে গিয়ে। “আনন্দমেলা” ছিল সোমাদিদির। সংখ্যা গুলো সিরিয়েলি গুছিয়ে রাখত। আমি “কে” বেরোনো বেশ কটা সংখ্যা হারিয়ে ফেলেছিলা। ফলে একসঙ্গে পড়ার উপায় ছিল না”।
“ওই গুছিয়ে রাখাই”। হাসে বৃন্দাদিদি। “ এলে নেড়েচেড়ে দেখে ওই গুছিয়ে রাখাই ছিল ওর কাজ। সে’ও তো তোর দেখাদেখি”।
সোমাদিদির সঙ্গে দিবাকরের বয়েস-ফারাক দুই থেকে তিন বচ্ছর। অনেক বিকালদেই সোমাদিদি আর তার দলবল, রুনা,রূপা, সীমা’দের সঙ্গে খেলা করেছে নিতান্ত বালক-পর্বের দিবাকর। কুম্ভীর-কুম্ভীর, গোলাপ-পদ্ম, ছোঁয়াছোঁয়ি, লুকাচুরি। বৃন্দাদিদিদের বাড়ির পিছ-উঠান, পুকুরপাড় আর সুপারী-পাতাদের ভিড় হেতু আলো না এসে স্যাঁতস্যাঁতে যে জমি – খেলা উপত্যকা। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই, খেলা আরম্ভের বড়জোর আধঘন্টার মধ্যেই, কারো না কারো সঙ্গে ঝগড়া বেঁধে যেতো। তখন একদৌড়ে রাস্তা পার হয়ে বাড়ি এসে “আনন্দমেলা” নিয়ে আবার ফিরতো দিবাকর। ওদের খেলার কিনারে, ওদের দেবতা-কোঠার বারান্দা-সিঁড়িতে বসে বসে পড়তো। আজ, হঠাৎই মনে হয়, কেন? ঝগড়া, না-খেলা – ঠিক। কেন তবু ফিরে আসা, বই নিয়ে, আনন্দমেলা নিয়ে, আবার? কেন একলা বসে পড়েনি, অন্তত ওই সকল বিকালে? … দাড়িওলা ফ্রয়েড সাহেবকে, এই বৃষ্টির মধ্যেও এগিয়ে আসতে দেখে দিবাকর। কিন্তু এড়িয়ে যায়। তাঁকে চলে যেতে দেয়। সে এখন অন্যত্র যেতে চায়না। সে এখন ফিরে যেতে চায় ওই বিকালগুলিতেই যেখানে একঝাঁক সদ্য-কিশোরীর দলে সে’ই একমাত্র বালক।
“কি পড়ছিস? দেখি। আমাকে দেখা-না। আমিও একটু পড়ি”। – হয়তো গোলাপ-পদ্ম দলে লোক কম হওয়ায় দিবাকরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার খেলানোর তালেই আসে সোমাদিদি। গা ঘেঁষে বসে। বলে কথা গুলি। কিন্তু দিবাকর তখন প্রতিশোধ-ইচ্ছায় শংকরকুমারের “ড্রাগনের নিঃশ্বাস”। “না। যাও। দেবোনা দেখতে”। একা হলে হয়তো এমন করতোনা দিবাকর। একা হলে হয়তো এমনটা করলেও মুখ অমন কালো, করুন হতোনা সোমাদিদিরও। আশ্চর্য, দিবাকর টের পায় সে যেন সত্য বসে রয়েছে ওই সকল বিকালের কোনো একটিতে, ওই সিঁড়িতে। তার কিনারে সোমাদিদি। পুস্তক প্রত্যাখ্যানে মুখ কালো। যেন পা পিছলে পড়ে গেছে দিবাকর আর সময়ের কোনো এক লুকানো সুড়ঙ্গ তাকে গিলে নিয়ে উগড়ে দিয়েছে সময়ের আরেক অক্ষে। দিবাকরের অবচেতন থেকে উঠে এসে চেতনায় ঘাই মারে একটি শব্দ। “ইন্টারস্টেলার”। হেলিওস্ফিয়ার স্থান-কাল সংজ্ঞার সেই অঞ্চল যেখানে সূর্যের টান, তার ধ্রুবক পদার্থের প্রবাহ আর তার চৌম্বক ক্ষেত্র, বিকল। ইন্টারস্টেলার ওই অঞ্চলের পরিধি। অথবা পরিধিস্থ বিন্দু। ওই বিন্দুও সক্ষম, এইভাবে, সময়ের নিয়ম-পথ, নির্ধারিত পথ থেকে ভিন্ন, চোরাগলীপথে সময় ভ্রমণের ব্যবস্থা দিতে। সহসা তার মনে হয় বৃন্দাদিদিই যেন এক ইন্টারস্টেলার আর সে ওই গলীপথে অজান্তেই ঢুকেপড়া কেই। ভাবনায় থিতু হওয়ার আগেই বৃন্দাদিদির স্বর প্রকট হয়। স্থান-কাল-মহাকাল রহস্য থেকে টেনে নিয়ে আসে দিবাকরকে। বলেঃ “ তোর দেখাদেখিই তো সোমা একদিন জিদ ধরে বসলো ওরও আনন্দমেলা পত্রিকা চাই। আমাদের বাড়ির চাল তো জানাই তোর। বাংলা পত্রিকা একটা আসে। যথেষ্ট। আবার কি পত্রিকা? কেন? পড়ার বই পড়। পাশ দাও। চাকরিতে নামো। ছেলেরা। মেয়েরা বিএ অব্দি গেলে যা’ও নাহলে না। বিয়ে। ব্যস। তবু বাবা যে রাজি হলেন তা বোধয় সোমা তার বেশী বয়সের সন্তান আর বাড়ির সব চে ছোটো বলেই”। আবার নীরব। হয়তো রাস্তা খুঁজছে, খুঁজছে ফূটো, সময়ের, বৃন্দাদিদিও, অতীত থেকে বার হয়ে আসার। টিনচালে ঘনীভূত বৃষ্টি-ধ্বনিকে আবহে নিয়ে ফেরে বৃন্দাদিদি। “তুই তো এখনো অনেক পড়িস। আগের মতোই। পার্থ বলেছে। তোর বাসা ভর্তি নাকি খালি বই আর বই”।
বৃন্দাদিদি শুয়ে আছে পাশ ফিরে। পিঠ, পাছা – দিবাকরের দিকে। দিবাকরকে পার হয়ে জানালা। মুখ, দুধ, নাভি – দেওয়ালের দিকে। ওই দেওয়ালেও জানালা। তবে বন্ধ। আলখাল্লামতো ওই জামা, সূতি-ব্রেসিয়ার, শাদা, সূতি-পেন্টি – বৃন্দাদিদির, সঙ্গে দিবাকরের জীন্স, লেদার-বেল্ট, গেঞ্জি, টি-শার্ট – একত্র ও আবোল তাবোল। ঘরময়। তেমনি আবোল তাবোল, চুল, বৃন্দাদিদির। বালিশে। বালিশ পার হয়ে, খাটের সীমানা ছাড়িয়েও। “জটার মতন খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে — আজও এত চুল”। জীবনানন্দ। পরস্পর। ধূসর পান্ডুলিপি। এই কবিতারই শরীর থেকে “শাদাকথা” শব্দবন্ধ তুলে নিয়ে কবিতাবইএর নাম দিয়েছিল অমিতাভদা। “জটার মতন খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে — আজও এত চুল”। তবু ফুটোটি নিকানো উঠানের মতো। তুলসীবেদীর মতো। স্পষ্ট, পবিত্র। কামানো নয়। তুলে ফেলা। হেয়ার রিমুভারে। যত্নে। কেন? ভালোমানুষ শংকর সেনের দাবী? নাকি অন্য? অন্য কেউ, অন্য কেউ কেউ? মেনোপজ ডিঙ্গানোর পরেও? জানতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু জানা যাবেনা। অন্তত এই দৃশ্যে, এই পর্বে। এখন এই প্রশ্ন বা এসকল প্রশ্ন, যা নৈমিত্তিক, উঠলেই চুরমার হয়ে যাবে সমস্ত ম্যাজিক, সকল মশগুল। যেমন জানা যাবেনা, হয়তো কখনোই, যে, যা ঘটলো, যা যা ঘটলো – তা’কি কখনো কল্পনাও করেছিল, করতে পেরেছিল বৃন্দাদিদি? বৃন্দাদিদি কেন, দিবাকর নিজেই কি … কেজানে। যদি বৃন্দাদিদি হতো তার নৈমিত্তিক যাপনের একজন কেউ, সেক্ষেত্রে ভাবনা নিতো ভিন্ন বাঁক। কিন্তু বৃন্দাদিদি তাদের মধ্যে নয়। ছিল। হারিয়ে গিয়েছিল। আবার উঠেছিল ঘাই দিয়ে। ডুবে গিয়েছিল আবারো।
গোবর্ধন-নাতনি পর্বের একটি সকালে, যখন শীত আর কুয়াশার ভিতর থেকে ঘাই দিয়েছিল বৃন্দাদিদি, তখনো, দেখামাত্র, আর সকল ছবি বাদ দিয়ে ছিটকে উঠে এসেছিল ওই দুই দু’টি দুধের গোল। মধ্যবর্তী পায়েচলা পথ। পথের শরীরে নরম ঘাসের দাগানো। মনে হয়েছিল, ওই যে লোকটি, যে শংকর এবং শহরখ্যাত ভালমানুষ, সে এই দুধগুলির যথেচ্ছ মালিক। ডেকে দিবাকরকে বাড়ি নিয়ে গেলে, দেখেছিল, পার্থ। বৃন্দাদিদির ছেলে। তখন বছর দেড়-দুই। সে ওই দুধে মুখ দেয় বা দিতো। চোষে বা চুষতো। এই দুধ দুটি যদি চালান করা যেতো গোবর্ধন-নাতনির ব্রেসিয়ার-তাঁবুতে …
ওই প্রথম ঘাই মেরে উঠে তাকে ধরে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর থেকে অনেক সকালেই গেছে দিবাকর। কোনো কোনো দিন গোবর্ধনের মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময়ই দেখেছে, গেটের সামনে বৃন্দাদিদি দাঁড়িয়ে। চোখ ইশারায় জানিয়েছে নিমন্ত্রণ। অনেকদিন নিজে নিজেই গেছে দিবাকর। সামনের বারান্দায় বসেছে চা-আসর। এই একই মহিলাই ছিল তখনো, চা নিয়ে। সঙ্গে কিছু না কিছু খাবার নিয়ে। সকাল-আসরে থাকতো শংকর সেনও। নানা রঙ শীতপোষাক গায়ে টালটমাল আসা যাওয়া তখন পার্থর। রান্নাদিদির দেখভালে। তখনো বৃন্দাদিদি বলতো হারানো,পুরনো কথাই। “জানো তো, এরা দুই-অ ভাই-ই ব্রিলিয়েন্ট”। – ব্রিলিয়েন্ট, আরেকটি শব্দ, স্থান হিসাবে মফস্বলের, কাল হিসাবেও তার গন্ডি পার হয়ে এসেছে, মফস্বলও, অনেকদিন। তবু কেউ কেউ, হয়তো সময়ের ওই বাঁকটি পেরোতে পারেনি বলেই, ব্যবহার করে শব্দটি। “দুইটাই ব্রিলিয়েন্ট। তবে ছোটোটা, সোম, সোমক, পাগল ছিলনা এই দিবা’র মতো। কি যে করতো দিবা! রাস্তায় লোক যাচ্ছে সাইকেলে। হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে “অ দাদা, আপনার সাইকেলের চাক্কা কিন্তু উলটা ঘুরের”। … চিন্তা করো। মেরামেরি’র সময়, কাগজ কেরাসিনে ভিজিয়ে, পাথর-মুড়ে, তাতে আগুন দিয়ে ছুঁড়ে অন্যদের বুড়ির-ঘর অ আগুন লাগানি … সব এই দিবার কাজ নাহলে নেতৃত্ব। … আবার দুইভাই-ই খুব সুন্দর কবিতা বলতো। … রাত্রে, কারেন্ট টারেন্ট চলেগেলে, প্রায়ই ওরা দুইভাই ওদের বারান্দায় বসে কবিতা বলতো। একটার পর একটা। লম্বা লম্বা কবিতা। আমি আর সোমা চান্স পেলেই বাবার কোঠার সিঁড়িতে বসে বসে শুনতাম”। ওই দিবারাত্রি গুলির সহজ মনেপড়ে। মনে আসে। মনে আছে। কারেন্ট যাওয়া-রাত্রি, দুই রকমের। বৃষ্টির আর না-বৃষ্টির। না-বৃষ্টির না-কারেন্ট রাত্রি গুলির কোথাও জ্যোৎস্না, কোথাও নিখাদ অন্ধকার, তারা জ্বলানেভা। এই সমস্ত তার মিলেমিশে একটিই রাত্রি যেন। গ্রীষ্মের। গরম গুমোট। তাই ঘাম। তাই গায়ে জামা নেই। “লেনটনে পড়তে পড়তে চউখো বেদনা হইগেসে” – এই অছিলা ভর করে ছুটি মিলতো। মিলতো বাবা বাড়ি না থাকলে। অতঃপর দুইভাই সামনের বারান্দায়। বারান্দা তখনো ল্যাংটা। হাফ-দেওয়াল ওঠেনি। বসেনি লোহা-গ্রিল। বারান্দা থেকে তিনটি সিঁড়ি-ধাপ নেমে গেছে উঠানে। দুই নম্বর ধাপের কোনার দিকে বসে, তিন নম্বরে পা রেখে বসা। মুখামুখি নারকোল গাছ। তখনো কিশোর। একটি শেফালীর গাছ। পার হয়ে আকাশ। চাঁদ সামনাসামনি না থাকলেও চাঁদ বা চাঁদের মতন কিছু কোথাও রয়েছে। তারই আবছা আলোয়, রাস্তার ওই পাড়ে, লন্ডনীদের শিব-মন্দিরের চূড়া, গোঁসাই’র আমগাছ, ডাল, ডাল, পাতা। বৃন্দাদিদিদের দুর্গ। প্রহরী সুপারী-নারকোল। ছায়া-আলোর জলরং। মাঝে মাঝে মন্থর বাতাসে, হাওয়ায় নারকোল-সুপারীদের পাতা-আঙ্গুলদের নড়াচড়া। অন্ধকার কোনো পক্ষীর অন্ধকারের টানে উড়ান দেওয়া। সমস্তই অন্য। সমস্তই অচেনা-মতন। বৃন্দাদিদিদের মূল দুর্গের শাদা দেওয়াল, তার গায়ে ছায়া – অচেনা। কারেন্ট এলেই সব বদলে যাবে। চেনা লাগবে, পুরনো লাগবে ধারাপাতের পৃষ্ঠার মতন। অচেনা অন্ধকারে নানান ব্যঞ্জনের, সম্বার-ফোড়নের ঘ্রাণ। নিজেদের পাকঘর থেকে, চুলায়, কেরোসিন স্টোভে মা’র পাক-ধ্বনি। সামনের রাস্তা দিয়ে চলে যায় একজন দুইজন। কথা বলতে বলতে অথবা নিঃশব্দে। যায় একটি দু’টি রিক্সা। সওয়ারী নিয়ে, না-নিয়ে। ভাগ্য ভালো গলে যায় সেই গান-গাওয়া রিক্সাচালকজন। আশ্চর্য আবহের মতো তার গানগুলিও আজব। “তুমরা শুনছো নি খবর, কুনি বেঙ্গের পেটের ভিত্রে আসইন অজাগর”। যায় একটি দু’টি ট্রাক,লরীও। ততোদিনে সম্ভবর বৃন্দাদিদির গোল-দুধ দেখবার উৎসবটি হয়ে গেছে। হয়েগেছে এই ছবি ঘিরে কাহনের নির্মাণ আর তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি – হস্তমৈথুন। তখনো পার হওয়া যায়নি ওই কালসীমা যখন প্রতিবার, প্রতিটি হস্তমৈথুনের পরেই এক রকমের পাপ-পাপ, ভয়-ভয়, অশুচি-অশুচি’র মশারি, নিজেকে ঘিরে। কিন্তু সেই সমস্তই ক্ষণস্থায়ী। সেই সমস্ত মনে থাকেনা, মনে আসেনা এই সকল কারেন্ট-নেই এ মহিমান্বিত, প্রায় অবাস্তব রাত্রিতে, রাত্রি গুলিতে।
কারেন্ট-নেই এ মহিমান্বিত, প্রায় অবাস্তব রাত্রিকে দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে যখন দুইভাই আর পারেনা আপনাতেই বন্ধ রাখতে, বন্দী রাখতে ওই কুহককে, তখন, নিজেদের অজান্তেই, তারা চায় প্রকাশ। কিন্তু কিভাবে? তা’ও, হায়, কৈশোরের কিছুদূর না গেলে, অজানা। ফলত স্নায়ু দায়িত্ব নেয়। অজান্তেই তারা কবিতা বলে ওঠে। বলে ওঠে “ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে স্পন্দিত আম্র মুকুল … স্পন্দিত নদীজল ঝিলিমিলি করে, জ্যোৎস্নার ঝিকিমিকি বালুকার চরে”। কথা অন্যের, ছন্দ অন্যের। তবু যেন অন্যের নয়। তারা বলেঃ “অঞ্জনা নদীতীরে চন্দনী গাঁয়ে, পোড়ো মন্দির খানা গঞ্জের বাঁয়ে। জীর্ন, ফাটলধরা এক কোনে তারই, অন্ধ নিয়েছে বাসা কুঞ্জবিহারী”। নিজেদের উচ্চারন করা শব্দগুলিকে নিজেদেরই অচেনা লাগে। সুন্দর লাগে। উজ্জ্বল লাগে। উড়ন্ত লাগে। “বিদঘুটে রাত্তিরে ঘুটঘুটে ফাঁকা, গাছপালা মিশমিশে মখমলে ঢাকা। জটবাঁধা ঝুলকালো বটগাছ তলে, ধকধক জোনাকির চকমকি জ্বলে”। শব্দ ছবি আঁকে। রহস্য-ছবি। আরো রহস্যের টানে এইবার, বাবার মুখে শুনে শুনে শিখে ফেলা “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিঙ্ঘল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে” — সবই একশ্বাসে বলে যাওয়া। ‘অর্থ’ বুঝবার, “বিশ্লেষন-ব্যাখ্যা” দেওয়ার দায়-কাল তখনো ঢের দূর। আর যখন এলো, যখন আসে ‘অর্থ’ বুঝবার, “বিশ্লেষন-ব্যাখ্যা” দেওয়ার দায়-কাল, তখন, রক্ত আর নেচে ওঠেনা ছন্দে, চোখ আর ভেসে যায়না রহস্যে, রাস্তার আর-পাড়ে, সিঁড়ির আবডালে বসে কান পাতেনা বৃন্দাদিদি-সোমাদিদিহেন শ্রোতাদল। তবু, তারা যে একদা পেতেছিল কান, শুনেছিল, শুনে শুনে তারাও যে উঠেছিল দুলে, তারই রক্ত-মাংস-সত্যটি’ই , অদ্য, চাবি হয়ে খুলে দিলো, হাট করে, দরজা, বৃন্দাদিদির হাঁটুর,উরুর। হুড়মুড় করে ঢুকে এলো দিবাকর। আর তখুনি, আপ্যায়নে, ইচ্ছা সত্ত্বেও, সমস্ত ভিজিয়ে দিয়ে, অন্দরে তাকে সিক্ত না করতে পারার নিমিত্ত দুঃখিত হলো বৃন্দাদিদি। বল্লোঃ “তুই যখন এলি, চাইলি, তার আগেই সব গিয়েছে শুকিয়ে”। সামান্য থেমে “তখন চাইলে” …। তারপরই ঠিক নিজের আঙুলে থুথু দিল, ভিজিয়ে নিলো আর নীলছবির সহজতায় ভেজা আঙুল বুলিয়ে যথাসম্ভব সুগম-পিচ্ছিল করে দিলো নিজেকে। থুথু? নাকি লালা? মাকড়ের রস? – মাখিয়ে দিল দিবাকরের প্রত্যঙ্গেও। তারপর, ঠিক সম্বলহীনা বিধবার “ঠাকুর ঠাকুর” বলা অবলীলতায় “মেনোপজ, মেনোপজ” বলতে বলতে এলিয়ে গেলো, ছড়িয়ে দিল নিজেকে। নিকানো উঠানের মতো বিশুদ্ধ ফুটোতে প্রবিষ্ট হলো দিবাকর।
প্রবিষ্ট হলো । কিন্তু বাস্তবে ঠিক কোথায় ঢুকে গেলো দিবাকর? বৃন্দাদিদির মাংস-রক্তের ফুটোতে নাকি বৃন্দাদিদি নামক একটি সম্ভাবনার অন্দরে চাইলো ঢুকে যেতে? ডুবে যেতে? ডুবে গিয়ে তুলে আনতে নাহোক, অন্তত দেখে আসতে যুগান্তরের এক গুণমুগ্ধাকে, গোপন শ্রোতাকে? আরো একটু চাপ দিলে, আরো কতোটা চাপ দিলে, কতোটা ডুবলে পাওয়া যাবে, পাওয়া যেতে পারে, দেখা, ওই দুই বালক বলিয়ের? শোনা যেতে পারে ওই ছন্দিত বিস্তার, শব্দের – স্পন্দিত নদীজল ঝিলিমিলি করে, জ্যোৎস্নার ঝিকিমিকি বালুকার চরে …। বৃন্দাদিদির দুই বিপুল দুধের মধ্যবর্তী শুঁরিপথে জিহবা, দাঁত কতোটা বসিয়ে দিলে ফিরে দেখা দেবে ওই সকাল? ওই সকল সকাল? দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত? দাঁত বসিয়ে রক্ত বার করে আনলে কি আসবে ছোটোপিসী? তুতু? ক্যান্সারে দগ্ধ তার বিভৎস অকাল-মৃত্যুর কাঁটাজাল-দেওয়াল পেরিয়ে? প্রবিষ্ট হতে থাকে দিবাকর। বৃন্দাদিদিও খুলে যেতে থাকে। দিবাকরের মনে আসে “মৃত্তিকার মতো তুমি আজ”।
ভালোমানুষ-শংকর সেন শোনে। চুপ করে, মন দিয়ে শোনে। চা’য়ে চুমুক দেয়। সশব্দ। মাথা নাড়ে। বলেঃ “শক্তিকেশ স্যার আমাদের ক্লাস নিতেন। দুয়েকবার তোমাদের বাড়িতেও গেছি। তখন থেকেই শুনেছি তোমরা দুইভাই’ই যে ব্রিলিয়েন্ট। আর পরে, তোমার দিদি তো প্রায়ই বলে তোমার কথা। তোমাদের কথা”। দিবাকর শোনে। শুনতে শুনতেই দেখে, অথবা লখ্য করে, নাগা শাল-কাপড় দিয়ে বানানো ফুলহাত কোটের অন্দরে সেই গোল-গলা, আলখাল্লা-মতো’ই পরে আছে বৃন্দাদিদি। দুধের গোল দেখা না গেলেও, মধ্যবর্তী ওই শুঁড়িপথের ইঙ্গিত চেনা যায়। এই গোল দুটিকে যদি কোনোভাবে চালান দেওয়া যেতো গোবর্ধন-নাতনির ব্রেসিয়ারের তাঁবু-তলায়।
“জানো তো, প্রায়ই কাটাপড়া ঘুড়ির পিছনে দৌড়ে দৌড়ে এসে ঢুকতো আমাদের বাড়িতে। কখনো ওই উঁচু গেট টপকে। বাবার চোখে পড়েগেলে হুলুস্থুল হতো। দিবা তখন বাবার নামে ছড়া … কি যেন বানিয়েছিলি দিবা?” – স্মৃতি, স্নেহ, কৌতুহল ঠিক। আরো কিছু একটাও রয়েছে। চোখে। হ্যাঁ, ছেনালী। তবে সূক্ষ। খুবই সূক্ষ।
দিবাকর বলেঃ “ হিম-অংশু কর / রাখে কাউয়ার খবর / ভাগি যাইব, জলদি তার / লেজ-অ গিয়া ধর”।
শীত সকাল হাসিতে তোলপাড়। সবাইকে হাসতে দেখে হেসে ওঠে দেড়-দুই’এর পার্থও।
“কত বচ্ছরের কথা। দেখসো, দিবার কিন্তু পুরা মনে আছে। কি মেমোরী রে তোর। কি ব্রিলিয়েন্ট। ইশ, আমার পার্থটা জানি কিতা হইব। তোর মাথাটা যদি পেতো …”।
এহেন প্রায় প্রতিটি আসরের পরেই দ্রুত এবং সোজা বাড়ি, বাড়িই ফিরতে হয়েছে এবং ফিরেই তাগাদা-ভঙ্গিতে “হাগায় ধরসে” ঘোষনা,জনান্তিকে, দিয়ে ঢুকে যেতে হয়েছে হাগা-কোঠায়। ছিটকিনি তুলে দিয়েই, খাড়া অবস্থাতে প্যান্টের চেন প্রায় ছিঁড়ে ফেলার দ্রুততায় খুলে ফেলে … একদিন “বক্স” ভাড়া করা হবে। নিশ্চয় করা হবে। ওই “চিত্রবানী” হলেই করা হবে। পর্দায় যে’ই থাকুক, দর্শক আসনে, তার দুই কিনারে দুই জন। না’কি তিন দিন ভাড়া করা হবে বক্স? একেকদিন একেক জন। তিন নম্বর দিন তিনজন। মানে সে আর ওরা দুইজন? দুজনেরই কি ঝোপঝাড়ে ভরা না’কি সাফসুতরা, তুলসীতলা হেন পবিত্র? না’কি একজন ঝোপঝাড় একজন তুলসীতলা? বক্সে অন্ধকার ঘন থেকে ঘনতর। এক চক্ষু দৈত্যের ছাল উঠছে নামছে। বন্ধ হচ্ছে চোখ। খুলে যাচ্ছে পলকে। দুইজন না একজন? একজন না দুইজন? ক্রমে দুইজনই একাকার। দৈত্য ক্রমে সাপ। কুন্ডলী পাকানো। প্যান্টের উঠে আসা। আবার। কোমরে। হাগা-কোঠার দরজা খুলে বার হয়ে আসা। বাস্তবে, মাস ছয়ের চেষ্টায়, কুশিয়ারা-বাঁধের নির্জনে, এক সন্ধ্যায় টের পাওয়া গিয়েছিল দুইটিই তথ্য। গোবর্ধন-নাতনি ঝোপঝাড়ে ভরা আর বৃন্দাদিদির দুধের কাছে এর দুধ … কিন্তু বৃন্দাদিদি, ওই দুধ-দেখা সকালে, বয়সে কতো আর বড় ছিল সুপর্নার থেকে? সে যাই হোক। হয়তো কৌতুহল মিটে যাওয়ার কারনে অথবা অশোক মাস্টরের কাছে সুপর্নার পড়তে যাওয়া শেষ হওয়ায় অথবা হয়তো আর কোনো কারনে, যা তার নিজেরও অজানা, দিবাকরের ভূগোল থেকে বাদ হয়ে গেলো পার্ক-রাস্তা, নীলমনি ইস্কুল, চিত্রবানী হল। তার দৈনন্দিন থেকে মুছে গেলো ওই সকালফেরী। সেই সঙ্গে, স্বাভাবিক ভাবেই, বৃন্দাদিদিকে ঘিরে সকাল-আসর গুলিও লোপ পেলো। ওই লুপ্তি টেরও পেলোনা দিবাকর।
“মা বলেছে তোমার সঙ্গে দেখা হলে, কথা বলিয়ে দিতে”। বল্লো যুবক। সদ্য যুবক। যার নাম পার্থ। যে কখনো নিশ্চিত মুখ দিয়েছে বৃন্দাদিদির দুধে। সে’ই আবার দিবাকরের ইতিহাসে ফিরিয়ে আনলো বৃন্দাদিদিকে, তার দুধগুলি সহ।
“আচ্ছা। বলবো কথা। আগে তোরা কথা বলে নে” – বলে দিবাকর।
দক্ষিণের নগরে ততোদিনে, শিব্রামের “দেবতার জন্ম” গল্পের “দেবতা”র মতো “প্রতিষ্ঠা” ঘটে গেছে দিবাকরের। সময় গড়িয়ে গেছে প্রায় কুড়ি বচ্ছর। প্রতিষ্ঠা এবং কুড়ি বচ্ছরের নিয়মে অন্যান্য পরিবর্তন, বিবর্তন গুলিও, যাপনে গিয়েছে ঘটে। এক বিকালে, এক রবিবারে, বেজে উঠলো টেলিফোন। যেহেতু পুত্র-কন্যা সহ পত্নী গিয়েছে নিজের পিসতুতো দিদির বাড়ি, ফলে আরাম-ঘুম ছেড়ে, উঠে দিবাকরকেই তুলতে হলো রিসিভার।
“আচ্ছা, ইয়ে, মানে … দিব … দিবা … দিবাকর … দিবাকরমামা’র নম্বর কি এটা?” দ্বিধা-কাঁপা কন্ঠ। এক যুবক। কে? সে তার মামা? কিভাবে? সে কারো মামা? আদৌ? কার কার মামা? – ইত্যাকার প্রশ্নগুলিকে সাময়িক লালবাতির সংকেতে দাঁড় করিয়ে রেখে দিবাকর বলেঃ “হ্যাঁ। আমিই দিবাকর। আপনি?”
“ দিবাকরমামা” যুবকের কন্ঠে স্বস্তি “আমি পার্থ। আমি … মানে … আমি চিত্রবানী রোডের … ইয়ে… আমার মা’র নাম বৃন্দা”। নামটি উচ্চারিত হতেই মনের পুকুরজলে ঘাই মারলো সকাল, বেড়া পার হয়ে নুয়ে পড়বার মূল্যে একটি মেয়ে-দেহের উর্ধ-শরীর বেড়ার ওইধারে আর এইধারে গোল-গলা-নাইটির ঝুলে যাওয়ার অন্দরে দুধ। গোল গোল দুইটি দুধ। চামড়া সফেদ নয়। দুধও নয় দুগ্ধফেননীভ। দুই দুধের মাঝখানে, পায়েচলা পথ। সরু গলী। গলীর মৃত্তিকা ভেজা ভেজা। ঘাম ঘাম। মাংস। লোম। দুধেও লোম থাকে – আবিষ্কার। – এই যুবক নাম করছে সেই বৃন্দাদিদির। এই বৃন্দাদিদিকে পার হয়ে অনেক, অনেকটা পথ চলে এসেছে, এসেছিল দিবাকর। ঠিক যেমন অনেক শহর,নগর,চাকরী,বেতন, ঋণ, ঋণশোধ পার হয়ে আসা। পার হয়ে আসাস এবং ভুলে যাওয়া। তেমনি অনেক নাভি, নিতম্ব, দুধ, ফুটোও পেরিয়ে আসা এবং তারপর ভুলে যাওয়ার অন্তে দিবাকর, এখনের, এক্ষণের দিবাকর, চল্লিশের কোঠায় আর সেই একই হিসাবে বৃন্দাদিদিরও ছুঁইয়ে ফেলা উচিত পঞ্চাশ। আর পঞ্চাশ মানেই মেনোপজ। পার্থ’র পরে আরো কাচ্চাবাচ্চা করেছে কি বৃন্দাদিদি? পার্থ কি সিজার? সার্জারী? নর্মেল? সার্জারী হলে তলপেটে কাটা দাগ আর অন্যথায় ফুটো আর ফুটো নেই। ফুটো নিশ্চিত টানেল। — “আমার মা’র নাম বৃন্দা” বাক্যাংশেই থেমে থাকা দিবাকরের মগজে এই সকল ভাবনার ঝাঁপানো যদিও পলকের মধ্যেই তথাপি পলকে সে পার হয়ে যায় অনেক বচ্ছর। টের পায়, “বৃন্দা” এই নামটিই যথেষ্ট, এখনো, তার একচোখা দানবকে লোভ-সজল করে তুলতে। ফোনে ভেসে আসা অনেক বাক্যই যায়না দিবাকরের কানে। মোটামোটি এটুকু বুঝে নিতে পারে, যে, বৃন্দাদিদির দুধ, নিপলের একদা অধিকারী এই ছেলে এসেছে দক্ষিণ-নগরে। চাকরিবাকরির কিছু ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে চায়।
“তোমার কথা মা সব সময় বলে। আমি এখানে আসবার কথা উঠতেই তোমার ছোটোভাই … ইয়ে … সোমকমামার কাছ থেকে তোমার নাম্বার এনে দিলো মা”।
যুবককে নিজের ঠিকানা দেয় দিবাকর। দাওয়াত দেয় আসবার। স্বেচ্ছায় নাকি ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরের কোনো কিছুর দ্বারা তাড়িত হয়েই, যুবককে সে আসতে বলে যে শনিবার পত্নীর আবার পুত্র-কন্যা সহ বান্ধবীগৃহে নিমন্ত্রণ? ফোন ছেড়ে দেওয়ার ঠিক আগে এই যে বলা, দিবাকরের “ কত্তো যুগ দেখিনি ওদের। তোর সঙ্গে তোর বাবা-মা’র ফোটো থাকলে আনিস তো” – তা’ও কি নিতান্ত নির্মল না’কি? … যুবক সোৎসাহে বলেঃ “আছে আছে। ছোটো একটা ফ্যামিলি-এলবাম আমি নিয়েই এসেছি”।
ঘুটঘুটা আন্ধাইর লাফ দেয় হঠাৎই। ঘুটঘুইট্টা সেই আন্ধাইরে ঝমঝম বৃষ্টির মতো ঝর্ঝর ছড়িয়ে যায় একটি হাসি। “তুই বলছিলি না, আগের মতন কিচ্ছু আর নাই তোর লাইফে, দেখছিস, তুই আসার সঙ্গে সঙ্গে সব আবার আগের মতন হচ্ছে। বিষ্টির জন্য জানলা-দরজা বন্ধ। লাইট জ্বালানো। এইবার দেখ, লাইটও গেলো”। আবছা অন্ধকার চোখে সয়ে যায় না’কি বৃন্দাদিদিই, ক্রমে, নিজেকে প্রকাশ করে, তবু প্রকট করেনা? “আগের মতন” বলতে কি কিছু বোঝাতে চায় বৃন্দাদিদি? কি বোঝাতে চায়? তাকে ঘিরে দিবাকরের যৌন-টান কি টের পেতো বৃন্দাদিদি? মগজ শুধু ভেদ করতে চায়, ছিঁড়ে ফেলতে চায় সব পর্দা, সব রহস্য। মগজকে দমিয়ে দেয় দিবাকর। পরিবর্তে মনকে হুকুম করে এই রহস্যকে ম্যাজিকে পরিণত করতে।
“জেনারেটার আমাদেরো আছে একটা। কিন্তু মশকিল যে তোর শংকরদা আর পার্থ ছাড়া”।
“আরে নাহ্, এমনি থাক্না। এমনিই তো ভালো লাগছে। জেনারেটার-মেটার পুরো ম্যাজিকটাকেই দেবে গাঁঢ় মেরে”। “ম্যাজিক” শব্দটিকে মন অজান্তেই তার মুখে ঠেলে দিলো। ভাবলো দিবাকর। ভাবনা ছিঁড়ে আবার হাসি। “ইশ, বড় হয়েছিস, সংসার করছিস, ছেলেমেয়ে আছে, বড় চাকরি করছিস, কিন্তু মুখের বুলি সেই আগেই মতোই, যা-তা”।
“গাঁঢ়” শব্দটির অর্থ বৃন্দাদিদি বুঝতে পেরেছে ভেবে কেমন যেন একটা মস্তি-ভাব আসে মনে। বলেঃ “আরে, এইসব বুলি, রীতিমতো কোচিং নিয়ে শেখা। টফিকে মনে আছে? ওই যে গোঁসাইদের …”।
“বড়দি, কিতা করতাম? দাদা’ত ঘর-অ নাই। জেনালেটার ত চলত নায়। লেনটন ত পাকঘর-অ লাগব। মোমবাত্তি …” – সেই প্রৌঢ়া হাজির সময়োচিত বক্তব্য নিয়ে। বাক্য শেষ হতে দেয়না দিবাকর। বলেঃ “মোমবাতি থাকলে ত জমে যাবে। আজ মোম জ্বালিয়ে প্ল্যানচেট করবো। ভূত নামাবো”।
হাসি এবং অন্তে বৃন্দাদিদিঃ “কার ভূত নামাবি?”
“মানুষের না”।
“তাহলে?”
“ওই পুরনো দিনগুলির, রাতগুলির”।
কোনোক্রমে বাক্য সম্পুর্ণ করে প্রৌঢ়াঃ “মোমবাত্তির পেকট সব ডেকরেটারের বেটারা যে কই রাখলো”।
“লাগতো না। আমরা বেডরুমো গিয়া বইমু। গ্রাসের জানলার পর্দা সড়িয়ে দিলেই হবে”। – বৃন্দাদিদি বলে। বাক্যটি। কিন্তু বাক্য-মধ্যস্থ “বেডরুম” শব্দটি বঁড়শীর বাঁকানো আংটার মতো, গেঁথে ফেলে দিবাকরকে। এখন, ঘটনার পরে, মনেহয় “বেডরুম” শব্দটি কি ছিল আদতে কোনো চাবি? কি-ওয়ার্ড? বৃন্দাদিদির মনে ছিল? মন ঠেলে দিয়েছে মুখে? যেমন “ম্যাজিক” শব্দটি, দিবাকরের। কি-ওয়ার্ড যদি হয়ে থাকে, তবে কিসের? যা হলো, তার? দিবাকরের মতোই বৃন্দাদিদির মর্মেও “বেডরুম” শব্দ দেখিয়েছিল ছবি, একই ছবি? এইভাবে লেংটা, পাশাপাশি শুয়ে থাকবার? লেংটা,পাশাপাশি শুয়ে সিগারেট টানবার? হেডলী চেসের বই-মলাটের মতো? – থাকুক এ’ও রহস্য হয়েই। না-জানা হয়েই। ঠিক যেমন না-জানা থাকবে, যখন বাস্তবেই লেংটা হয়ে তারা নিজেদের মধ্যে সন্ধান করে ফিরছিল কুশিয়ারা, বাঁধ, নটীখাল, সরল খাঁ দিঘি, পাহাড়িয়া নদী লঙ্গাই, লন্ডনীদের শিব মন্দির, বৃন্দাদিদির বাড়ির সেই ভিতর-পুকুর যেখানে মা তাদের নিয়ে গিয়ে চেষ্টা নিতো সাঁতার শেখানোর — ওই সন্ধান-সময়ে, কোথায় ছিল “বড়দি চা”, “বড়দি দরজা লাগাইন” প্রৌঢ়াটি। হয়তো সবই দেখেছে। হয়তো কিছুই দেখেনি। কিছু আসে যায়না দিবাকরের। বরং ওই কর্মে লিপ্ত থাকতে তাকে কেউ দেখুক – এরকম একটি ফ্যান্টাসী তার, আবছা। তবে এক্ষেত্রে, দিবাকর ভাবে, না-দেখাটাই চায় সে কেননা এখানে বৃন্দাদিদি তো আসলেই নেই। যা আছে, যে আছে, যে ছিল, তখন লেংটা হয়ে, তাকে দিয়েছিল ঢুকতে, সে’তো এক ম্যাজিক। “চিচিং ফাঁক”। আলিবাবার গুহার যে গুহায় এখনো রয়েছে কুশিয়ারা, বাঁধ, নটীখাল, সরল খাঁ দিঘি, পাহাড়িয়া নদী লঙ্গাই, লন্ডনীদের শিব মন্দির, “ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল”, সিঁড়ি,বারান্দা…।
“নে, কফি খা”। পার্থর দিকে কফি-কাপ ঠেলে দিয়ে বলে দিবাকরঃ “এটাতে আমার এসপার্টাইজ। চা’ও পারি। আর ওমলেট। তবে চা সবসময় ঠিকঠাক পারিনা। তাই রিক্স নিলাম না। দ্যাখ কেমন হয়েছে”।
“আরে ঠিকাসে,মামা, পুরা ঠিকাসে”। – এ’যে ভালোমানুষ শংকর সেনের ঔরসজাত তা সদ্য গজানো দাড়ি-গোঁফে গাল-মুখ ঢেকে রাখলেও টের পাওয়া যায়। ছেলেটি দক্ষিণেরই কোনো পাঠ-বিপণী থেকে কম্পিউটার লাইনেই কিছু একটা ডিগ্রী নিয়েছে। ক্যাম্পাসে পায়নি । পরে আরো ডজন খানেক ইন্টারভিউ দিয়েও কিছু হয়নি তখন। তাই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। এবার এসেছে অফার। একসঙ্গে দুইটা। কোনটি নিলে তার জীবনে উন্নতি, হবে দ্রুত এবং মসৃণ, এই সিদ্ধান্ত নাকি দিবাকরের হাতেই ন্যস্ত করেছে তার মা, বৃন্দাদিদি। দায়িত্ব পালনার্থ দুটি কোম্পানীর অফার-চিঠি পাঠ করে দিবাকর। দুটি সিগারেট খায়। ভান করে ভাববার। আলোচনার করার ভান করে তর-তম বিচারের। অতঃপর রায় ঘোষনা করেই আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিতে নিতে, বলে, হঠাৎই মনেপড়ার ভঙ্গিতেঃ “তোকে কি যেন একটা …”।
“হ্যাঁ,হ্যাঁ মামা। ঠিক ঠিক। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি বাবা-মা’দের ফোটো” … বলতে বলতে কিনারে রাখা পিঠ-ব্যাগ থেকে বার করে আনে সরু তবে বাহারি এলবাম। দিবাকর টের পায় শিহরণ, তবে, কোথায়, কোন প্রত্যঙ্গে? “এটাতে তেমন পুরনো ফোটো … নেই। সবই প্রায় আমি এবারে আসার আগে আগেই তোলা”।
বেড রুম। শোয়া-কোঠা। শোয়াশোয়ির নিমিত্ত কক্ষ। নিতান্ত নিরামিষ এই শব্দবন্ধই হঠাৎ করে সশরীর হলো আমিষ-গন্ধে। আমিষ-গন্ধ, দিবাকর টের পেলো তার নিজের অন্দরেই। বাইরে, বাস্তবে যে বেডরুমে এনে তাকে হাজির করলো বৃন্দাদিদি, তাতে হালের “ইন্টিরিয়র” সপ্রমাণ —- বেড-শিরয়ে দুটি বাঁধানো ফোটো সহ, কিন্তু বাদবাকি সবই নিরামিষ। ভালোমানুষ শংকর সেনের মতো। শংকর সেন সত্যই কি নিরামিষ —- এই ভাবনাকে খালের মতন কিনারে কিনারে নিয়ে বেডরুমে ঢুকে গেলো দিবাকর। দুটি ফোটোর একটিতে বৃন্দাদিদি যুবতী। ঘোমটা-চিহ্ন সহ বেনারসি গোছের কিছু একটা পরিহিতা। ফোটোতে “শুভ বিবাহ” ভাব, প্রজাপতি অনুষঙ্গ —- ঠিকঠাকই তুলে এনেছে বৃন্দাদিদি তবে চোখের আশ্চর্য ছেনালী, দিবাকরকে ঠিক ছুঁয়ে দিলো। ফোটোতে, বৃন্দাদিদির কিনারে, অবশ্যই শংকর সেন। কোট গা'য়ে। ভালোমানুষ। ফোটো নম্বর টু’তে সিক্স-সেভেনের পার্থকে মাঝখানে রেখে দুপাশে মা-বাপ। “প্রাউড পেরেন্টস” কথাটি খেলে যায় দিবাকরের মনে আর একই সঙ্গে মনে আসে আরো দুটি কথা। ওই সেভেন-এইট আমলে পার্থ'র কি ছিল, না'কি ছিলনা কোনো বৃন্দাদিদি? যে হয় পত্নী, দিবাকরের, দীর্ঘদিনের “ধর্মপত্নী”, সে'ও কি ছিল, না'কি ছিলনা, তার আশেপাশের কোনো কিশোরের “ বৃন্দাদিদি”? এইভাবে “বৃন্দাদিদি” যখন প্রায় প্রতীকে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক তখুনি, ট্রে-তে করে কাপ-প্লেট ইত্যাদি নিয়ে দৃশে আবার ঢুকলো প্রৌঢ়া। ইতিউতি তাকালো। বেডরুমে আছে ড্রেসিং টেবিল, আছে নিচু একটা স্টুল কিন্তু তাতে না-খোলা, বড় আকারের কিছু প্যাকেট। বিয়ের উপহারই হবে। এক্ষেত্রে ট্রে কোথায় নামাবে? “রাখিদেও, বিছানাতেই রাখো”। বৃন্দাদিদি বলে।
“ মা বলে দিয়েছে তোমাকে যেন বলি, ফোন করতে”। পার্থ বলেছিল। ফোন করেওছিল দিবাকর। তখুনি। করেছিল, কেননা ওই ফোটোগুলি, পার্থ'র নিয়ে আসা ওই ছোটো এলবামের, যেখানে বৃন্দাদিদির চুলে কলপ-শিল্প দিবাকর টের পেলেও সকলে পাবেনা আর টের পাওয়া সত্ব্বেও, সমস্ত ছাপিয়ে, ঐ কলপ-করা চুলই পার হয়ে গেছে পাছা। নিতম্ব। তানপুরা। “শ্রোণীভারাদলসগমনা”। দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন ছেনালী। ব্লাউজ লো-কাট। নাভি বে-আব্রু। সামান্য মোটা ঠোঁটে হালকা কালচে আস্তর। …যদি ওই দিন, ওই ফোটো, ওই ফোটোগুলি না দেখতো দিবাকর, তাহলে? পার্থ’র কাছে মা-বাপের,গুষ্টির, ফোটো নেই – হতেই পারতো। পার্থ’র বয়সে সেটাই স্বাভাবিক। হতে পারতো ফোটো, এলবাম – আছে, কিন্তু নিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছে, ওই দিন। তাহলে? – ধরা যাক, এলবাম, ফোটো – আনলো পার্থ, কিন্তু সেই সকল ফোটোর মধ্যে এমন কোনো ফোটো নেই, যা ভেজামাটির স্যাঁতস্যাতে, যা একটি পায়ে চলার পথ ধরে, মুহুর্তে, সময়ের বর্তুল এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলেগেছে যেখানে …। এলবামের পাতা উল্টে, দ্রুত অন্য, অন্য অন্য ফোটোতে গিয়েও নিস্তার ছিলনা। ভালোমানুষ শংকর, তার আত্মিয়দল বা নিজের বোনেদের সঙ্গেও যে সকল ফোটো, সেখানেও বৃন্দাদিদি আলাদা। শাড়ি কাপড় গায়ে দিয়েও বে-আব্রু। আদতে লেংটা। নিজের অজান্তেই লেংটা। না’কি দিবাকরের অবচেতনেই, সতত, এমন লেংটা’ই ছিল বৃন্দাদিদি? যখন সে ছিল অন্ধকারে, দুই বালকের চিল্লিয়ে কবিতা-বলার শ্রোতা, তখনো যেন লেংটাই ছিল বৃন্দাদিদি। – সে যাই হোক, ওই ফোটোগুলির সম্মোহন না থাকলে, দু-মুখো মিথ্যা বলে, হাজার মাইল উড়ে, এখানে, এই দৃশ্যে হাজির হতো কি দিবাকর? করতো কি, ওইদিন, ফোনও? – এলবামের পাতা উল্টে যেতে যেতে সেই একচক্ষু দানবটি, দিবাকরের, সমর্থ এবং সজল। তারে তারে ফোনের সিগন্যাল ছুটে গেলো। ছুঁয়ে ফেল্লো, অবশেষে, বৃন্দাদিদিকে।
“কথা ইকো হচ্ছে। মনো-হয় ফউনের লাইন-অ জল ঢুকসে”। – বলে ফোন। এর অর্থ হয় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃন্দাদিদিকে ঘিরে ঝরছে জল। অঝোর। যেন কোন বিরাট একচোখা রাক্ষসের হাঁ গিয়েছে খুলে। বার হয়ে আসছে জল। মেঘে ছাওয়া আকাশ। মেঘ আর জলে একাকার বিকালের মেদুরতায় বৃন্দাদিদি। এখন। এই মুহূর্তে। আর এখানে গুমোট। বৃষ্টি নেই। ফোন বলেঃ “শুনতে পাইরে নি, আওয়াজ, বৃষ্টির?”
দিবাকর বলেঃ “শুনছি। বলো …”
ফোন বলে “তোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেই আমাকে ফোন করেছিল পার্থ। বল্লো দিবা-মামা’র সঙ্গে কথা হলো। ‘মামা’ কথাটা এমন ভাবে বল্লো, তোকে কি বলি, এতো আপন, এতো চেনা সুরে বল্লো, ঠিক যেন মেজদার কথা বা দেবুর কথা বলছে। অথচ কোন্ কালে তোকে দেখেছে, তা মনে নাই। থাকার কথাও না। তবু এই টান, এতো টান। – এই বোধহয় দেশের … নাভির টান…”। – দিবাকর চুপ। তার চুপের অন্দরে ফুঁসছে দানব। একচক্ষু। ফুটছে জল। ছুটছে ঘোড়া। টগবগ টগবগ।
“ সোমার যে বন্ধু ছিল, রিনা, মনে আছে?” ফোন বলে। কিন্তু মনে থাকা-না-থাকার পরোয়া করেনা। থামেনা। বলে চলে “ ওর বরটা অকালে মারা গেছে। এক্সিটেন্ট”।
“এক্সিটেন্ট”, আহ, এক্সিডেন্ট কে এক্সিটেন্ট বা এস্কিটেন্ট বলা — এ’ও এক মাইল ফলক। অতীতের। “ওই যে রতনদা, বেটি রতন, বিয়ে করেছে” … ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সমস্ত সংবাদই দিবাকরের অনেকদিন-জ্ঞাত। বছরে একবার অন্তত সে যায় দেশগ্রামে। টেনে নিতে চায় ক্লোরোফিল, সারা বছরের নিমিত্ত। ফলে এই সমস্তই পুরনো খবর। বাস্তবে বৃন্দাদিদি’র সময় অক্ষ গিয়েছে ভেসে। জলে। বৃষ্টিতে। বৃন্দাদিদি তাকে শোনাচ্ছে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস যার আরম্ভ, সেই গোবর্ধন-নাতনি-যুগ থেকে। সেই যুগ থেকে অদ্যাবধি যা-যা ঘটেছে, তাদের শহরে, তা থেকে যা’ই আসছে উঠে, সময়ের পাতাল থেকে উপরের আস্তরে, তা’ই বলে যাচ্ছে টেলিফোন। প্রতিটি বাসি খবরই তরজাতা সংবাদের উৎসাহে গিলবার ভান করছে দিবাকর। আর টেলিফোনের কিনারে নড়ছে, নড়ে যাচ্ছে দুটি সামান্য মোটা ঠোঁট, তাদের কিনারে হালকা কালচে আস্তর। পরনে নিশ্চয় ওই আলখাল্লা মতন পোষাক। বৃষ্টিবাতাসে ঘষটে যাচ্ছে দুই গোল-গোল দুধের সঙ্গে। নিশ্চয় ব্রেসিয়ার নেই। যেহেতু বাড়িতে। পেন্টিও নেই নিশ্চয়। বাড়িতে। শংকর সেন, ভালোমানুষ, বিছানায় কেমন? কেন একটা মাত্র বাচ্চা করেই থামলো? একেকটি ভাবনা, ঝলসে উঠেই, মুহুর্তে পার হয়ে যাচ্ছে মেঘলা আকাশ। চলে আসছে পরের চিন্তা রেখা। আবহে বলে চলেছে টেলিফোনঃ “নাহ, কিন্তু এই পাড়ার কোনো উন্নতি নাই। সেই ব্যাঙ্গে মুতলে জল। নীলমনি ইস্কুলের মাঠ পুস্কনি হইযায়…”।
‘পুস্কনি’ শব্দ, ওই এক্সিটেন্টের মতোই, আরেক মাইল ফলক। অতীত যদি হয় শরীর, কোনো নারীশরীর … কোনো কেন? বৃন্দাদিদিরই শরীর, তাহলে, শব্দগুলি নেমে যাচ্ছে, ওই শরীরের গভীর থেকে গহনে। আবহে বৃষ্টি হচ্ছে। জল বাড়ছে।
“কয়েকদিন আগেই গিয়েছিলাম আমরা’র পাড়াতে”। আমরা’র, আমাদের পাড়া। এখানে পাড়া, নীলমনি রোড নয়। লঙ্গাই রোড। তাই ‘আমাদের’। দিবাকর এবং বৃন্দাদিদির।
“গিয়েছিলাম এক বিয়াবাড়ি। গিয়া কাকিমা’র সঙ্গে দেখা। অনেকদিন পরে। কার বিয়া ছিল বলতো? ওই যে, পানু, পানু শর্মা …, মনে আছে রিনার সঙ্গে? …”। বাক্য উড়ছে। বাক্য ঘিরে ঝরছে জল। সময়-শরীরের ফাঁক-ফোঁকড় গ’লে নামছে জল আর উঠে আসছে বাক্য। মুখ। কাহিনী।
“ওই যে বাপ্পা, চার্চ রোডের বাপ্পা, বাপ্পা ভট, মারা গেছে ত, অত মাল খেয়ে এতোদিনই যে কিরকম বাঁচলো”। সামান্য থামা। লাইনে ইকো? জলের নিমিত্ত? “ আমরা-পাড়ার যে শ্মশান, ওই নদীরপাড়ের, ওই টা এখন ইলেকটিক চুলা। বাপ্পা রে ত ওই শ্মশান-অ”।
বৃষ্টি। অঝোর। বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। ঝরছে। ঝরেই চলেছে। উড়ে আসছে নূতন নূতন মেঘ। ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টি হয়ে। ঠিক যেমন ঝরছিল ওই দিন, টেলিফোনের আবহে। ওই দিনের মতো, কিন্তু ওই দিনের মেঘ নয়। নতুন মেঘ। নতুন বৃষ্টি। আজ, মাঝখানে টেলিফোন-তরঙ্গের পরিবর্তে, চা- কাপ আর প্লেটে খাবার সহ ট্রে। চা’য়ে চুমুক দিতেই উগ্র হয়েওঠে তৃষ্ণা। নিকোটিনের। নিকোটিনের? না’কি আর কোনো তৃষ্ণাকে ঢাকা দিতে চায়, দিবাকর অথবা দিবাকরের অন্দরে থাকা আর কেউ? ঠাউরে ওঠার আগেই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র তার হাতকে আদেশ করে পকেট থেকে বার করে আনতে সিগারেট-প্যাকেট, দেশলাই। জ্বলে ওঠে। আগুন। সিগারেটের তামাকে। ঘর ভরেযায় নীলচে ধোঁয়ায়।
“ইশ, ঠিক নেশারু-কায়দায় … কবে থেকে খাচ্ছিস বলতো? … আমি কলেজে থাকতেই তোকে বিড়ি ফুঁকতে দেখেছি মনেহয়”।
“আরে, তখন তো আমরা টানতাম মরিন্ড-মা’জনের দোকানের পিছে। খালপাড়ে…”।
“দেবুটাও ওই বয়েসেই ধরেছিল। সিগারেটও না। বিড়ি। তুই …”।
“আরে, তখন ত প্রথম-প্রথম, যা পেতাম, তা’ই ফুঁকতাম …।
“তোকে ওই নন্তু সেন ছোকরাটাই শিখিয়েছে, ঠিক-না?”।
“আরে ধুর। এগুলো আবার কেউ কাউকে শেখাতে পারে না’কি…
“বাবা যে কতদিন দেবুকে জুতো দিয়ে পিটিয়েছেন, মুখে বিড়ির গন্ধ পেয়ে…। শ্যামলকাকু তোকে …”।
“নাহ্। বিড়ি-সিগ্রেটের জন্য পেটায়নি। তবে …”
“এমনি যে পেটাতো শ্যামলকাকু, তা আর আমাকে কি বলবি? আর তোকে না পিটিয়ে উপায় ছিল? ইশ। কতোদিন এমন হয়েছে যে শ্যামলকাকু এসে খালি পা রেখেছে বাড়িতে আর একসঙ্গে তিন চারজন হাজির হয়েছে নালিশ নিয়ে…”।
ছবিগুলি মনে আছে। এমন মারধোরের মধ্যে ঝাঁপ দিতো ছোটোপিসী। কখনো পিসীর সঙ্গে গল্প করতে আসা বৃন্দাদিদিও। বৃন্দাদিদির চোখ দিবাকরের চোখে স্থির। না, স্থির নয়। দিবাকরকে ছিঁড়ে ওই দৃষ্টি চলে গেছে, যেখানে, দিবাকরদের সামনের উঠানে নালিশ-সহ দাঁড়িয়ে আছে পুলু’র মা, জামগাছ-অলা বাড়ির মুকুন্দ আর বাবা, সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই …। বৃন্দাদিদির দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখে দিবাকরও। সে’ও যায় বৃন্দাদিদিকে পার হয়ে।
“ইশ্, কি যে বান্দর ছিলি”। – বাক্যটি, ভেঙ্গে দেয়, দুই দৃষ্টিতে মিলে সেতু হয়ে উঠবার সম্ভাবনা। অন্তত ওই মুহুর্তে।
জানালা গুলি বন্ধ। পর্দা সড়ানো। ঘষাকাঁচের ভিতর দিয়ে আলো ঢুকছে। প্রতিসরণের ফলে বেঁকে ঢুকছে। দিবাকর যেন টের পায় আলোর, আলোরেখার ওই সামান্য বেঁকে আসাও। ফাঁক ফোকড় দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে বাতাসও। নড়িয়ে দিচ্ছে, দুলিয়ে দিচ্ছে পর্দা। উড়িয়ে দিচ্ছে চুল – বৃন্দাদিদির। টলিয়ে দিচ্ছে দিবাকরকে। শুধুই দিবাকরকে? হয়তো না। হয়তো বৃন্দাদিদিও টলছে। নাহলে তারও কেন মনেপড়ে যাবে “টফি”র কথা? তখুনি? … “একটা মরকাইষ্টা ছেলে আসিল, লাল লাল চুল, কিতা নাম … ত’র সঙ্গে এই দোস্তি, এই মারামারি”...?
“হ্যাঁ,টফি”। টফিও একটি চরিত্র, একজন বাসিন্দা সেই পৃথিবীর যাকে, মনেহয়, নিজের শরীর দিয়েই এতোদিন, দিবাকরের জন্যই আগলে রেখেছে বৃন্দাদিদি। টফি ছিল দিবাকরেরই বয়সী বা সামান্য বড়। তবে পিতাটি যেহেতু রিক্সাচালক, অতএব অপুষ্টির জীবন্ত মূর্তি ছিল টফি। “মারানি” অব্যয়-বিশিষ্ট সম্বোধন গুলিতে তার কাছ থেকেই দীক্ষা নিয়েছে দিবাকর। ভাব ছিল। আবার কথায় কথায় খগড়াও লেগে যেতো। কোনো কোনো দিন অকারনেই খিট খিট করতো টফি। আজ, অনেক বছরের ব্যবধানে, মনেহয়, হয়ত সেগুলি ছিল টফির উপোসী দুপুর, ক্ষুধা-বিকাল। এমনই এক খিটিখিটে বিকালে দিবাকরের অশান্ত হাত মেরেছিল এক ঘুঁষি, নাহ্ একে ঘুঁষি বলেনা, কিল, কিল বসিয়ে দিয়েছিল দিবাকর। তাতেই মাটিতে পড়ে গিয়ে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে যায় টফি। টফির মা যখন এসেছিল বাবার কাছে নালিশ নিয়ে, ততোক্ষণে টফির সঙ্গে আবার ভাব, সব ঠিকঠাক। কোথায় ওই ক্ষেনেক-ঝগড়া ক্ষেনেক-ভাব দিনরাত্রি গুলি? কোথায় গেলো টফি? টফি’রা? – দিবাকরদের পাশের জমিটিতে এখনো চলছে গোঁসাই’র জমদারী। ছোট জমি। সতেরো ভাইবোনে ভাগাভাগি হলে থাকবেনা কিছুই। তবু কেউ দাবী ছাড়তে নারাজ। ওই জমিতে ছন-বাঁশের ঘর করে ঠেলা-চালক, রিক্সা-চালক পরিবারগুলিকে ভাড়া দেয় গোঁসাই। পরিবর্তন বলতে, হালে চাল হয়েছে টিনের।
“ এই জমিদারী ত চলছে আমাদের ফ্রকপড়া যুগ থেকে। বুড়া গোঁসাই আরম্ভ করেছিল। পরে ছেলে-ছেলের বৌ। আসল ধান্দা বাসার কাজ ওই বৌ গুলিকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া। তোর মনে আছে, মৃদুলের মা’কে? মাইগ্য, কি মুখ কি মুখ!”
মৃদুল। আরেকটি মুখ। আরেকজন বাসিন্দা সেই গ্রহের অথবা গ্রহান্তরের যাকে নিজের শরীরে রেখে দিয়েছে, এতোদিন ধরে, বৃন্দাদিদি। শুধু মৃদুল না। মৃদুল-বাবুল। দুই ভাই। সৎ ভাই। বাবুল বড়। বয়স, তখন, মনেহয় বৃন্দাদিদির মতোই ছিল। মৃদুল ছোট। দিবাকররের সমবয়সী। এরমধ্যেই আবার বাচ্চা দিল মৃদুলের মা। নন্তু সেন বিড়িতে টান দিয়ে, মনীন্দ্র মহাজনের দোকানের পিছে, ঘোষনা করলো “আরে, এটা অইন্য বেটার বাইচ্চা। মৃদুলের বাপের বয়স ত সত্তইর”। – এটা জানে দিবাকর। বাবুল-মৃদুলের বাবা কখনো পিওন ছিল কলেজের। বাবাকে তাই “স্যার” বলে। প্রথম পক্ষের বৌ’এর ছেলে বাবুল। মৃদুলের মা’কে বিয়ে করেছে অনেক পরে। একদিন ইস্কুল থেকে ফিরে, সামনের দরজা দিয়ে না ঢুকে, পিছনের উঠানে এসে চমকে দিতে চেয়েছিল দিবাকর। সেদিনই কানে এসেছিল মৃদুলের মা’র ঘুমপাড়ানী গান “এক ছিনালের ঘরের তলে আরেক ছিনালের ঘর, আরেক ছিনাল ডাক’দি জিগায় লাং নি আইসে ত’র?” … । দিবাকর দাঁড়িয়ে পড়েছিল ছড়া শুনে। চোখে পড়ে গিয়েছিল মা’র। মুহুর্ত পরে আবার ছড়ায় ফিরতেই মা’র আভিজাত্যে ঠেস্ দিয়েছিল ছড়াটি। আরো দিবাকরের মুখামুখি বলেই হয়তো, চোখ-কান থেকে আগুন বেরোচ্ছিল মা’র। কোনোদিন যা করেনি, তা’ই করে বসেছিল মা। চীৎকার করে উঠেছিল “মৃদুলের মা, অ মৃদুলের মা, ই সব কি খারাপ খারাপ গীত গাও? হ্যাঁ? ভদ্রলোকের পাড়া …”
উত্তর, বর্শাফলা, উড়ে এলো পলকে “ভাগ বেটি ত’র ভদ্রলুকি লইয়া। ত’র ঘর-অ তুই ভদ্দলুক, আমার ঘর-অ আমি। তর উঠান-অ আইয়া গীত গাইলে, তখন কইস …”।
ঘটেছিল অগ্ন্যূৎপাত। লাভা উঠেছিল অনেক। ছড়িয়ে, গড়িয়েছিল অনেক দূর। পাড়ার সমস্ত ভদ্রলোকরা যখন বাবুল-মৃদুলের মা’র বাক্য-বল্লমে ঘায়েল হয়ে, ঘটনাস্থল ঘিরে, স্থানুবৎ, তখনই, ত্রাহা হয়ে এসেছিল সেই কর-সাহেব। “হই মৃদুলের মা, মুখ বন্ধ করতে নি? না সায়া তুলা দিয়া রাস্তাত আনিয়া জুতাই-তাম?” … এবম্বিধ আরো কিছু বজ্র প্রয়োগের পর, জয় হয়েছিল ভদ্রলোকদিগের, ভদ্রলোক-পাড়ারও। – ঘটনাটির ভিতর দিয়ে ঘুরে, ফিরে আসে দিবাকর, বৃন্দাদিদির সঙ্গে। হাসতে হাসতে বৃন্দাদিদি বলে “আমার বাবারও এক মুখ ছিল রে ভাই”।
“কিন্তু মৃদুলের মা রিয়েল জালিম-লোশন”।
“ইশ, এখনো মনে আছে, দেই নামও তোর দেওয়া …”। – আবার হেসে ওঠে বৃন্দাদিদি। বৃন্দাদিদি নাকি দিবাকর আর বৃন্দাদিদির সমগ্র অতীতই ওঠে হেসে? বাইরে বৃষ্টি। অন্দরে আবছা অন্ধকারের সংগে মিশে গেছে সিগারেট-ধোঁয়া’র নীল। সিগারেটে অনভ্যস্ত বৃন্দাদিদি বল্লো “দাঁড়া, একটা জানালা একটু ফাঁক করে দিই, ধোঁয়া বার হয়ে যাবে”। উঠে দাঁড়িয়ে, দিবাকরকে পার হয়ে, বৃন্দাদিদি গেলো জানালায়। ছিটিকিনি খুলে পাল্লা সামান্য ফাঁক করে দিতেই উড়ে এলো, হুড় হুড় করে, সব। এলো হাওয়া। বাতাস। এলো টফি, মৃদুল,মৃদুলের মা। বৃন্দাদিদির খোলা চুলে ঝাঁপ দিল জালিম-লোশন, মনীন্দ্র মহাজন, তার দোকান। খোলাচুলের অন্দর থেকেই কি, উঠে এলো ঘ্রাণ – সরল খাঁ দিঘির? সরল খাঁ সাহেবের কবর থেকে উঠে এলেন কি সরল খাঁ সাহেব নিজে? নাহলে কে বল্লো, বলতে লাগলো, দিবাকরের কানে, কানে কানে “দে, ঝাঁপ দে। দে ডুব দে। পাবি। সব পাবি। সবই আগলে রাখা আছে। দে, ঝাঁপ দে…” … আছে। মনে হলো দিবাকরেরও। আছে সব সকাল, সব দুপুর, সব কারেন্ট-যাওয়া, কবিতা-বলা রাত। আছে গ্রীষ্ম দুপুরের বাঁশঝাড়, বাঁশঝাড়ে হাওয়ায় হাহা, আছে মেঘলা জানালায় সেই শেঁওড়া গাছ – গোঁসাই-জমিদারীর প্রান্তে। আছে …। বৃন্দানদীতে ঝাঁপ দিলো দিবাকর। বাধা পেলোনা। কথা কি ছিল বাধা পাওয়ার? এখন? বা কখনো? কখনোই? কেজানে। কেজানে হয়তো তাঁর কবর ছেড়ে উড়ে এসে, বৃন্দাদিদির কানেও বলেছেন সরল খাঁ “আছে, সব আছে, তোর অন্দরে আছে, তোর পাতালে আছে। খুলে দে। পাতাল-ফটক খুলে দে। ঢকতে দে ছোকরাকে। খুঁজতে দে”। … ডুবে গেলো দিবাকর। ঢুকে গেলো। আরম্ভ হলো তার সন্ধান। ওই তো দুটি দুধ। মাঝখানে …। নাহ, ওই তো দেউড়ি-টিল্লা আর কুতুবের-টিল্লার মাঝখান দিয়ে হাঁটাপথ। ওই পথ ধরেই, সাইকেলে রেডিও ঝুলিয়ে যায় মানুষ। হাট-বাজার-ভাঙ্গা মানুষ। ভাঙ্গা মানুষ। আস্ত মানুষ। এরই এক ধারে ধানক্ষেত। বন্দ্। নেমে গেলে হা-ডু-ডু-ডু খেলা। কিনারে বসে সিগারেট টানা। বসে থাকা সিগারেট-গন্ধ মুখ থেকে না যাওয়া অব্দি। চিবানো চিউয়ং গাম। না। চুইঞ্জাম। চুইঞ্জাম? না’কি বৃন্ত? বোঁটা? দুধের? আরেকটি এগোলে কবরিস্তান। পাওয়া গেলো। পাওয়া গেলো মেনোপজ-মাইল-ফলক পার করেও। উঠে এলো সন্ধানী হাত। বৃন্দাদিদির। নাকি বৃন্দানদীর? হাত খুঁজছে। আঙ্গুল, দশটি, খুঁজছে। এই তো সেই শিব মন্দির, শিব-ছাড়া মন্দির, লন্ডনীদের পুকুরপাড়ে। পাওয়া গেলো সুপারী-নারকোলের পাহারাদার গাছগুলিও। পাহারা পার হয়ে ঢালু। ঢালু দিয়ে দৌড়ে নামলে খাল। নটী খাল। তখনো খাল বেয়ে ভেসে যাওয়া যেতো পাহাড়িয়া নদী লঙ্গাই-এ। “জানস্ নি, লঙ্গাই-র পুল আর কাঠের নাই। সিমেন্টের। সিমেন্টের ব্রীজ”। জানান দিয়েছিল বৃন্দাদিদি। সেইদিন। ফোনে। বাসি খবর। বাসিস থেকেও বাসি খবর। তবু চমকে উঠবার ভান করে বৃন্দানদীকে খুশি করেছে দিবাকর। এই বৃন্দানদীর উৎস কোথায়? কোথায় সে মিশেছে সঙ্গমে? আর কি কি আছে তার জলে? অতলে? পাতালে? আছে কি ছোটোপিসী? সে’ত ছিল বৃন্দানদীর বন্ধুই। চলে গেছে অকালে। অসময়ে তাকে নিয়ে কে চলেগেছে? সময় না ক্যানসার? তাকে কি পাওয়া যাবে আরো ডুবে যেতে পারলে এই বৃন্দানদীতে? নামে দিবাকর। নামতে থাকে। ঢেউএর মতন চুল লাগে তার চোখে, তার মুখে ঢুলে যায় চুল। চুলে কলপ-চিহ্ন। তা’ও উঠে গিয়েছে অনেক চুল থেকে। তবু, মনে আসে “আজো এতো চুল … খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে”। কিসের মতন খোঁপা যেন? “জটার মতন খোঁপা”। তারপর? “দুটো হাত, ক’খানা আঙ্গুল” – সর্বস্ব শক্তিতে টেনে নিচ্ছে দিবাকরকে। চাইছে গেঁথে দিতেই যেন। দিবাকরের মুখে যা নেমে আসে, তা’কি চুম্বন? না। চুম্বন, স্তনের মতোই, বড় শিষ্ট শব্দ। দিবাকরের মুখে, চোখে, গালে, কপালে যা একাদিক্রমে নামে, তা ঠোক্কর, তা কামড়। পোড়ামাটিতে গড়া ঠোঁটের। কামড়ের মধ্যবর্তী বাজ-পড়া আলোর, মুহুর্তে যা দেখে, তাতে মনে আসে “চোখ দুটো চূণ-চূণ– মুখ খড়ি খড়ি”। তবু কামড়ায় দিবাকরও। কামড়ে কামড়ে লালা ঝরে। লালা মিশে যায় লালায়। মাখামাখি হয়। উঠে আসে অতীত। শুধু অতীত। অতীতের স্বাদ। তবু অতীত নয় যেন। যেন সমস্তই ঘটছে এইমাত্র। আবার। অতীত, অতীত ভিন্ন আমাদের সংস্থান নেই। উপার্জন নেই। অতীত ভিন্ন হয়তো নেই বৃন্দানদীও। নদী। নদীপাড়ে শ্মশান। চ্যালা-কাঠ, লাকড়ি’র শ্মশান। রোজ মড়া আসেনা। তবু রোজই ত মরে। তবু রোজ মড়া আসেনা পুড়তে। চুলা ঘিরে থাকে অন্ধকারে। নদীর স্পন্দন ভাসে বাতাসে। সহসাই জ্বলে ওঠে জোনাকি। আশ্চর্য! একটি-একটি কিংবা একটি দু’টি করে নয়, সহসা সমস্ত জোনাকি উঠেছে জ্বলে, সমস্ত ঝিঁঝিঁ ডাকছে! তবে কি জোয়ার? ঝরে যাওয়া? একচক্ষু দানব যেন জলস্তম্ভ। ভেঙ্গে পড়বে এখুনি। দানবটিকে, ঠিক মাহেন্দ্রক্ষণে, ঝটকায় বার করে নিয়ে আসা এবং তারপর বাইরেই মাল খালাস করবার অভ্যাস এবং দক্ষতাবশে – দানবটিকে হিঁচড়ে বার করে আনতে গিয়েই শোনে, স্পষ্ট তথা দ্বর্থ্যহীন গোঙ্গানিতে “হুঁ,হুঁ,উঁহুহু। থাকুক। ভিতরেই থাকুক”, দেখে চোখ বন্ধ। তাহলে বৃন্দাদিদিও অন্দরে হয়েছিল বৃন্দানদী? দেখেছিল “সাধ্বী মেয়ে”র সায়া-ব্লাউজ ছিঁড়ে অন্ররের ছিনাল মেয়েমানুষটিকে? পাচ্ছিল অতীতকে? না-অতীতের মতো করে? শুনেছিল ঝিঁঝিঁ-ডাক, দেখেছিল সমস্ত জোনাকিদের একত্র জেগেওঠা? তাই, সে, স-সমস্তই রেখে দিতে চায় নিজের অন্দরে? পাতালে? একা, নিঝুম হয়ে আবার দেখবে বলে? বালিকাদিনের পুতুলবাক্স যেমন রেখে দেয় কেউ কেউ…। উজাড় করে দেয় দিবাকর – একচোখা দৈত্যের আগলে রাখা সমস্ত সংস্থান, উপার্জন উগড়ে দিয়ে নিঃস্ব হতে থাকে আর মেনোপজের তরজা-বেড়া ভেঙ্গে, ভাসিয়ে, নেমে যায় স্রোত। … হ’তে হ’তে, হ’তে হ’তে এক সময় ভাঁটা আসে। বৃন্দানদী, হয় বৃন্দাদিদি। উঠে আসে দিবাকর। গড়িয়ে এসে পাশ ফিরে শোয়। পিঠে পিঠ ছুঁয়ে থাকে। দিবাকর টের পায় ঘাম। ক্রমে, উঠে বসে। বসে, পা ঝুলিয়ে। কিশোর দিবাকর। ধরিয়ে নেয় সিগারেট। কিশোর দিবাকর।
বৃষ্টি ঝরছে। ঝরছেই। যে জানালা আলতো ফাঁক করেছিল বৃন্দাদিদি তা’ই এখন হাটখোলা। আসছে হাহা বাতাস, হুহু বাতাস। উৎসব-বাড়ি, ব্যাপার-বাড়ির প্যান্ডেল-কাগজ, শোলা, ফটকের কলা গাছ, মড়া কলাপাতা, শুভ বিবাহ – ছিঁড়ছে বাতাস। ছিঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে জলের হাতে। জল আর হাওয়া নিয়ে যাচ্ছে উড়িয়ে। দিচ্ছে বিলিয়ে। চিত হয়ে শুয়েছে বৃন্দাদিদি। চোখ বন্ধ। মুখে অভিব্যক্তি কিছু নেই। হ্যাঁ, বৃন্দাদিদির বোঁটা কালো। বোঁটা ঘিরে যে বৃত্তটি, তাও কালো। একটি বেশীই ছড়ানো। তলপেটে কাটা দাগ। উরুত, মোটা নাহলেও, খিলানের মতো মনে হয়। এখন। যেন ফটক ওই ফুটোর। রহস্য-ফুটোর। যেন পিপ্-শো দেখার কি-হোল, যেন রাস্তায় সিনেমা-রীল দেখানো বাজিকরের চোঙা। ওই ফুটো বরাবরই শর্টকাট। সময়ের বর্তুল, ঘুরপথে না গিয়ে, ওই ফুটো ধরে, সময়-নিয়ম কে যায় এড়িয়ে যাওয়া। মুহুর্তে যায় পৌঁছে যাওয়া বিপরীত বিন্দুতে। ফুটোটি আবার টান দেয় দিবাকরকে। টান দেয় অন্তর্গত রহস্যের না-দেখা মাকড়-জালে। বিছানায় উঠে বসে ওই ফুটোটির দিকে চেয়ে থাকে দিবাকর। আশ্চর্য! দেখারও কি স্পর্শ পাওয়া যায়? নাহলে চোখ-বন্ধ বৃন্দাদিদি কেন খুলে দেয় ফুটোর ফটক? আঙ্গুল রাখে দিবাকর। পোড়ামাটি ঠোঁট “আহ্” ভঙ্গিতে নড়েওঠে। আদতে এই ফুটোটি, নির্দিষ্ট ফুটোটি, খুঁজে পাওয়াই ম্যাজিক। তারপরে আর দরকার নেই সময়ের নিয়ম মানবার। অজান্তেই অস্ফুট “ইন্টারস্টেলার” বলে ওঠে দিবাকর।
চোখ খোলেনা। ফাঁক হয় পোড়ামাটির ঠোঁট “কিচ্ছু বললি”? নিরুত্তর দিবাকর নত হয় ইন্টারস্টেলারের সামনে। ক্রমে, স্পর্শ করে জিহ্বা দিয়ে। শিউরে ওঠে। উভয়েই। আবার ডুব দেবে। – ভাবে দিবাকর। ডুব দেবে আর ওই ইন্টারস্টেলার ফুটো দিয়ে, হাইপারস্পেস বেয়ে, সোজা উঠে যাবে যে কোনো একটি দুপুরে, বই-আলমারির মাথায় রাখা ফিলিপ্স রেডিওর সামনে, একটা বেজে দশ মিনিটে। কান খাড়া করবে। কন্ঠকে যথাসম্ভব সিংহ মহাশয় করে ঘোষক বলবে “এখন প্রচারিত হবে গ্রামোফোন রেকর্ডে রোবিন্ড সোং-গীত” … এবারে কার নাম বলবে ঘোষক? বেজে উঠবেন কোন কন্ঠ? কোন গানে? নিশ্চয় আবার বৃন্দানদী হতে চায় বৃন্দাদিদিও। বন্ধ চোখেই বলে উঠলো পোড়ামাটি ঠোঁট “তুই যখন এলি, চাইলি, তার আগেই সব গিয়েছে শুকিয়ে”। সামান্য থেমে “তখন চাইলে” …। তারপরই ঠিক নিজের আঙুলে থুথু দিল, ভিজিয়ে নিলো আর নীলছবির সহজতায় ভেজা আঙুল বুলিয়ে যথাসম্ভব সুগম-পিচ্ছিল করে দিলো নিজেকে। থুথু? নাকি লালা? মাকড়ের রস? – মাখিয়ে দিল দিবাকরের প্রত্যঙ্গেও। তারপর, ঠিক সম্বলহীনা বিধবার “ঠাকুর ঠাকুর” বলা অবলীলতায় “মেনোপজ, মেনোপজ” বলতে বলতে হাট করে খুলে দিল ফটক। আগের মতন না হলেও, ফুঁসে উঠেছে এক-চোখা রাক্ষস। দানব। লালা-ভেজানো পথে দিয়েছে ঝাঁপ। আবার। সমস্ত শক্তি, হিম্মৎ নিয়ে। দানবটিকে নিজের অন্দরে ঠেসে দিতে, আরো ঠেসে দিতে সাহায্য করে বৃন্দাদিদি। পোড়ামাটির ঠোঁট ফাঁক করে জিহ্বাকেও ভরে দেয় দিবাকর। কামড়, আরো জোরে, বসায় বৃন্দাদিদি। চলে খেলা। খেলা? না’কি খেলার চেষ্টা? পরস্পরকে জড়িয়ে এক পাক ঘুরেও যায় তারা। তবু যেন জমেওঠেনা খেলা। এবার একচোখা-দানবকে পোড়ামাটির ঠোঁট টেনে নেয়। ভিজিয়ে দেয় লালায়। আবার চিত হয়ে মেলে ধরে ফটক। দানব ঢোকে। সহজতর ঢোকে। দড়িতে বাঁধা বালতি নামতে থাকে কূপের অন্দরে। নামতেই থাকে। কিন্তু ওঠেনা ছলাৎ ধ্বনি। আশ্চর্য। আবার টেনে তুলে আনে বালতি। আবার লালায় ভিজিয়ে নিয়ে নামিয়ে দেয় অন্দরে। কিন্তু এইবার নটীখাল, লঙ্গাই নদী, শ্মশানঘাট, পাহারাদার সুপারী-নারকোলের পরিবর্তে ওই একচক্ষু দানব পায়, পেতে থাকে জরায়ু ,প্রশস্ত লিগামেন্ট,স্ত্রী-ট্রাঙ্কের নিচের স্যাগিটাল অংশ। তাহলে বৃন্দাদিদি নেহাৎই বৃন্দাদিদি? বৃন্দানদী নয়? ছিলনা কখনো? জৈব ঘর্ষনে অন্ডাশয় থেকে বার হয়ে আসে নিয়মিত আধা-তরল। নেমে যায় জরায়ু ,প্রশস্ত লিগামেন্ট ইত্যাদি বেয়ে। তখুনি মনে আসে, কথাটি, ঐ লেখকজনের, এক সকালে, এক ছোট্ট কেক, যার নাম মেদেলিন, চা’য়ে ডুবিয়ে চুমুক দেওয়ামাত্র, লেখকজন টের পেলেন আশ্চর্য। টের পেলেন তিনি অবচ্ছিন্ন। তিনি ছড়িয়ে আছেন শৈশব-মালঞ্চে, এক দুপুরে ডেকেওঠা পাখিস্বর থেকে অদ্য অবধি। এই বিস্তারের প্রতিটি বিন্দুই তিনি। ভিন্ন ভিন্ন তিনি। কিন্তু সমস্ত মিলিয়ে তিনি এক। অবিচ্ছিন্ন। – লেখকজন লোভী হলেন। চাইলেন ওই অবিচ্ছিন্নতার পলকটিকে আবার স্পর্শ করতে। আরো একটি চুমুক দিলেন, মেদেলিন ডোবানো চা’য়ে। কিন্তু, যেন এই মুহুর্তের দিবাকরের মতনই দেখলেন, ঘটছেনা। কিচ্ছুই হচ্ছেনা। ফলে আবার চুমুক। আবার। আবার। কিন্তু কোথায় সেই অবিচ্ছিন্নতার অনুভুতি? বরং চুমুকে চুমুকে উঠে আসছে বিস্বাদ। এবার থাবলেন লেখকজন। থামলেন, কেননা, তিনি টের পেলেন “It is time to stop; the potion is losing virtue” – এই হয় থামার সময়। যাদু-টনিক হারিয়ে ফেলেছে তার যাদু। আর চুমুক দিলে, দিতে থাকলে, হবেনা কিছু। ঘটবেনা কিছুই – চুমুকে চুমুকে বিস্বাদ ভিন্ন। ম্যাজিক হারাচ্ছে বৃন্দাদিদিও। আর বৃন্দানদী নয়, এইবার শুধু বৃন্দাদিদি। শুধু বড় বড় দুধ, রিমুভারে সাফ রাখা ফুটো, যে ফুটো আর ইন্টারস্টেলার হবেনা, অন্তত দিবাকরের নিমিত্ত। ঠিক যেমন দিবাকরের অন্দরেও আর জ্বলে উঠছেনা, উঠবেনা অসংখ্য জোনাকি, একত্রে। যাদু-নলটি দিয়ে বয়ে তারা যাবেনা নদীপাড়ে অন্ধকারে আর। এখন যা ঝরছে তা নেহাৎই শুক্রানু যা টগবগ করছিল দিবাকরের অধুনা বাদুড়-ঝোলা অন্ডাশয়ে। যা বা যারা বেচারা, বেওয়ারিশ । সর্ব অর্থেই। ফুটোর ভিতরে সন্তরনে রত তারাও বেওয়ারিশ কেননা অন্দরে তাদের নিমিত্ত কোনো ডিম্বানু নেই অপেক্ষা করে, কেননা ঋতুমতী হওয়ার মাইলপাত্থর বৃন্দাদিদি পার হয়ে এসেছে অন্তত বছর পাঁচ। মেদেলিন চা’য়ে আর চুমুক দিলে হয়তো উঠে আসতে পারে গরলও।
–
সপ্তর্ষি বিশ্বাস
১৬/০৪/২৪ – ২৮/০৬/২৪
বেঙ্গালোর



