প্রবেশিকা

ভিড়েই রয়েছি মিশে, নিজবেশে, তাই চিনতে পারছেনা কেউ। এ'ই স্বাভাবিক। ম্যাজিক-মাহাত্ম্য ছাড়া, ম্যাজিক-মাহাত্ম্যের মূলে অন্ধকার টুপি আর ঝোলা কোট ছাড়া, কে হে আমি? কে’বা আমি? কিভাবে ভিড়কে বলি ইন্দুরে কেটেছে টুপি, লাল-নীল রুমালের ঝাঁক উড়ে গেছে পায়রা, কাক হয়ে...
Showing posts with label মুখমিছিল. Show all posts
Showing posts with label মুখমিছিল. Show all posts

Wednesday, October 30, 2019

ছোটোকাকু

ছোটোকাকু

তারপর একে একে শিবির বিভিন্ন হয়েগেলো। অন্ন বিভিন্ন হয়েছিল,

হে ১৯৪৭ , আরো কিছুদিন আগে, তোমার কল্যাণে। একটি শিবিরে

সেনাপতি পিতার মাতুল, সদ্য বিধবা হওয়া আমার ঠাকুমা তাঁর

তুরুপের তাস। আরেক শিবির আগ্‌লে দিদিভাই। বাবার পিসীমা।

‘দাস ক্যাপিটেল’এর কসম, আবেগ বা অভিমানে নয় গহনে শিবিরগুলি

জন্মেছিল আয়-ব্যয়-স্থিতি নিরিখেই। ১৯৪৭ সাল তা’ই চেয়েছিল।

বাজারে গুজব এই শিবিরে শিবিরে নাকি প্রকাশ্য সমরও হয়েছে। হে পাঠক,

গো পাঠিকা, শিবিরের এমনই মহিমা – আমরা কেলাস ফোর-ফাইভ অব্দিও

জানতামই না ছোটোপিসী ছাড়া আমাদের দুয়েকজন আরো পিসী আছে

এবং ঠাকুমা আছেন, সুভাষনগর স্কুলে, প্রধান শিক্ষিকা। ঠাকুমার

বড়ছেলে, বাবা, সেনাপতি দিদিভাই শিবিরের আর ছোটোপিসী, ঠাকুমার

সব ছোটো মেয়ে।

                    হে ১৯৪৭ সাল, শিবিরের এ জটিল কাহিনী ছাড়িয়ে

একটু উঁচুতে ছিল আরেকজন বেঁটেখাটো ফর্সা মানুষ। হাসিখুশি। শিবির

কখনো তাকে আটকে রাখতে পারেনি কোথাও। শিবিরের আইন ভেঙ্গে

সে আমাকে নিয়ে আমাদের মামাবাড়ি গেছে, ছোটোপিসীর নাচের ফাংশান

ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরী হলে, দেখিয়েছে কাঁধে তুলে সে’ই। দীপাবলী সন্ধ্যাবেলা

বাজি নিয়ে হাজির হয়েছে ঠাকুমা শিবির থেকে দিদিভাই-শিবিরে অবলীল।

মানুষটি বেঁটেখাটো তবে অনেক অনেক উঁচু ওই সব শিবির আর সৈন্য আর

হে ১৯৪৭ সাল, তোমার আকাশছোঁয়া দেওয়ালের চেয়ে।

মাতামহ

মাতামহ

সযত্নে রেখেছি মাতামহ, আপনার দিনলিপি, ব্রাউন পেপারে মুড়ে,

মোটা খামে, নিবিড় দেরাজে। যেটুকু মুদ্রিত তা পাঠ করে আমি

আপনাকে প্রথমবার জেনেছি প্রকৃত, আপনার মৃত্যুসাল আমি

যদিও অদ্যাবধি সঠিক জানিনা।

                                   যেটুকু মুদ্রিত তা’তে আপনার

দাঁড়ি,কমা, যতি ও অক্ষরে অভিভূত হওয়া সত্ত্বেও বাকিটুকু

পাঠে আজো ভীত। যদিও রাত্রি জেগে খুলে বসবো ভাবি আপনার

অমুদ্রিত দিনলিপিখাতা,মোমের আলোতে তবু দেরাজের কাছে

গিয়েও পিছিয়ে আসি, মাতামহ, ভয়ে না’কি অপরাধবোধে?

১৯৪৭ সাল আজো, মাতামহ, গুপ্তঘাতকহেন আমার পেছনে ঘোরে

রক্তমোছা ছুরি হাতে নিয়ে। তাই ভয় করে আপনার দিনলিপিগত

কোনোও অক্ষর, যতি, বাক্য-অংশ যদি ওই গুপ্তঘাতকের চোখে

দুঃসাহসী চেয়ে দেখতে বলে, যদি বলে খুঁজে আনতে

হারানো, পোড়ানো মুখ ৪৭’এর অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমার থেকে?

তাহলে এ দাহ্য আমি, মাতামহ, কোন পথে, কোথায় পালাবো?

                            মানুষ জীবিত ছিল কোথাও, কখনো –

তার সাক্ষবহ আপনার এ দিনলিপি আমি সযত্নে রেখেছি মাতামহ,

ব্রাউন পেপারে মুড়ে, মোটা খামে, মর্ম-দেরাজে।

সেজোমামা

সেজোমামা

আজকাল আমি আর একদমই পারিনা সেজোমামা। দামী হোক,

কমদামী হোক দুই পেগ, বড়জোর তিন পেগে বেহেড আউট

হয়ে যাই। অকালে অক্কা না পেলে হয়তো তোমার সাথে

বসতাম। কেননা এখন আমি ‘রাজা’, ‘রাঙ্গাদির ছেলে’ ৪৭

ছুঁয়েছি নিজেও। তোমরা তো ১৯৪৭ ছুঁয়েছিলে।

                                                জীবিত তোমাকে আমি

শেষ কবে দেখেছি কেজানে। আমার বিয়ের পরে বর-বৌ জোড়ে

তোমাদের বাড়ি গেছি বিধিবদ্ধ নিমন্ত্রণে আর তখনই তোমার ফোটো,

মামির টেবিলে, দেখামাত্র চমকে উঠেছি। এখন নাহয় গালে এবং গতরে

মাংস লেগেছে, তা নাহলে ওই ফোটো একেবারে আমি। ‘নরানাং

মাতুলক্রম’?

              মরতে মরতেও তুমি মামিকে বলেছো গাইতে ‘এ মায়া

প্রপঞ্চময়’, জানি। তুমি জানো না’কি তোমার এই ভাগ্নেবৌটিও,

তেমন ওস্তাদ কিছু নয়, তবে গান গাইতে পারে। জানো নাকি

এ আমারো খুবই প্রিয় গান। তাকে আমি শিখে রাখতে বলেছি

কেননা মরবার আগে যদি বাহ্যজ্ঞান থাকে তাহলে আমিও

শুনে মরতে চাই ওই গান।

 

জীবিত তোমাকে আমি শেষ কবে দেখেছি কেজানে। অথচ

তোমাকে দেখি পাশে এসে বসো প্রায়ই যখনই একলা ঘরে

বসে গান শুনি। অকালে অক্কা না পেলে হয়তো তোমার সাথে

বসতাম বোতল নিয়েও কোনোদিন। আমি ‘রাজা’, ‘রাঙ্গাদির ছেলে’

৪৭ ছুঁয়েছি নিজেও। তোমরা তো ১৯৪৭ ছুঁয়েছিলে।

যোগমাসি

যোগমাসি

‘যোগমাসি’র গল্পে আসি এবার তাহলে। পুরো নাম যোগমায়া। সংক্ষেপে

‘যোগমাসি’। ছায়া না’কি ভিন্ন কায়াতে বড়মাসি নিজে? সম্পর্ক-শোণিত

খুঁড়লে পুনরায় ১৯৪৭ সাল। জিন্নার ‘স্তান’ থেকে নেহেরুর ‘স্থান’ এ

ভাইবোন এসেছিল - যেভাবে উদ্বাস্তু আসে, বুক বেঁধে স্বপ্ন-আশাতে।

নিয়তি কৌতুকবশে তাদেরকে এনে রেখেগেলো আরেক উদ্বাস্তু-গৃহে,

মাতামহ আর তাঁর ভ্রাতাদের ভিড়ের সংসারে। - সেই ‘আসা’। ‘যাই

বলতে নেই’ – যোগমাসি আজো বলে দুয়ারে দাঁড়িয়ে।

‘স্থান’এর মাহাত্মবশে যোগমায়ামাসির দাদাটি একদিন নেহেরুর

সেনাবাহিনীতে কাজ পেলো তবে ছুটি হলে ফিরে আসতো

সেই উদ্বাস্তুর গৃহে, মাতামহ আর তাঁর ভ্রাতাদের ভিড়ের সংসারে।

                                            মাতামহ আর তাঁর ভ্রাতাদের

ভিড়ের সংসার থেকে বড়মাসি ‘পরের বাড়িতে’ ‘বধূ’ হয়ে যাওয়ার সময়

যোগমাসি এসেছিল সাথে। - সেই ‘আসা’। ‘যাই বলতে নেই’ –

যোগমাসি আজো বলে দুয়ারে দাঁড়িয়ে। তারপর কবে যেন

যোগমাসি নিজে বড়মাসীদের বাড়ি নিবিড় রেইনট্রি হয়ে আরেকজন

‘মাসি’ হয়েগেছে। - যোগমাসি ছাড়া তাই অসম্পূর্ণ থাকে

বড়মাসীদের বাড়ি, আমাদের শৈশব আর বড়মাসি নিজে।

                                                    যোগমায়া মাসিকে ভাবলেই কেন যেন 

উইলিয়াম ব্লেকের “নার্সেস্‌ সঙ” মনে আসে।

 

Tuesday, October 29, 2019

বড়মাসী

বড়মাসী
বাস্তবে আমাদের কোনো 'মামাবাড়ি' কখনো ছিলনা। মাতামহী, 
দূরের মানুষ, নামমাত্র বসবাস দেওরের সংসারের ভিড়ে। মাতুলেরা
১৯৪৭ সালে বাস্তুহারা আর সব জনতার মতো পেটেভাতে
কষ্টে প্রতিষ্ঠিত নানা অক্ষে, নানা দ্রাঘিমাতে। 'বড়মাসী' –
উদ্বাস্তু সংসারের বড়মেয়ে। অতএব 'বধূ' প্রায় বালিকা বয়সে।
'পক্ষীমাতা', বালিকা বয়সে। 'দিদি, মা'র মতো'। - মা বলেছে।
মামারা বলেছে। আমিও পেয়েছি টের যখন ভূগর্ভস্থ তাঁর স্নেহঘ্রাণে
ক্রমে ক্রমে ভুলেগেছি বাস্তবে আমাদের কোনো 'মামাবাড়ি'
কখনো ছিলনা। 
'নক্সী কাঁথা' শিল্পটির মতো অধুনা বিলুপ্ত যে স্নেহের সীবনশিল্প
তার সূঁচে এবং সূতোতে বুনে তোলা বড়মাসীদের বাড়ি
তেমন দালান, হর্ম্য, রাজপ্রাসাদ নয়। আত্মিয়-স্বজন এলে
রাত্রিবেলা মেঝে জোড়া ঢালাও বিছানা, দুপুরে পংক্তিভোজ,
পাকঘরে, “যোগমাসী, আলুভাজা, আরো”.. বড়মাসীদের বাড়ি
আজো আছে। বড়মাসী নেই। 'নেই' নাকি ঘুমিয়ে রয়েছে
এসকল অক্ষরের দাহ্য ছায়াতে?...

Sunday, October 27, 2019

বড়মামা

বড়মামা
বছরে একবার আসতেন। এসেই মানচিত্র খুঁড়ে
অধুনা বিলুপ্তদের পোড়া মুখ, ফসিল, ঠিকানা,
সহৃদয় সংগ্রহে যাঁর আমরণ শ্রান্তি ছিলোনা –
তিনি বড়মামা। 'বড়ছেলে' ১৯৪৭ সালে ছিন্নমূল 
বৃহৎ সংসারের। কিছু মেধা, গুটিকয় মার্কশীট আর
বাকিটা দুঃসাহস নিয়ে কোনোক্রমে বিলেত পৌঁছানোর
ইতিহাস জানে শুধু ঘুণাক্ষরে লেখা এরোগ্রাম। 
বছরে একবার আসতেন। আসামাত্র
বৃদ্ধ এক টাইপযন্ত্র নিয়ে দরখাস্ত, আবেদন পত্র –
ভ্রাতা ও ভগিণীগণসহ অনেক অনাত্মীয়,আত্মিয়জনের
কুশলমঙ্গলার্থ চাকরি বা শিক্ষাতলাসে।
তিনি বড়মামা। 'বড়ছেলে' ১৯৪৭ সালে ছিন্নমূল 
বৃহৎ সংসারের। 
সঙ্গ, সংশ্রব বলতে দুয়েকবার দেখা আর কয়েকটি পত্র বিনিময়।
তথাপি স্পষ্ট দেখি ইস্টম্যানকালার পর্দাতে টাইপমেশিন নিয়ে বসা
বড়মামা, টানা বারান্দার প্রান্তে ছোটো কোঠাটিতে। দেখি
ট্রেনে, বাসে একা একা গ্রামেগঞ্জে ফেরা অধুনা বিলুপ্তদের
ফসিল সন্ধানে। অথবা বিলেতে চাকরি জোটার আগে
নিরক্ষর বা বুড়ো-বুড়ি 'এন আর আই' দের চিঠি বা টেলিগ্রাম লিখে
দিনান্তে কয়েক শিলিং সফলতা… 
'ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন' ছিল কিনা তখন, জানিনা, তবে ছিল
এসকল 'বড়ছেলে', 'বড়মেয়ে' গুলি ১৯৪৭ সালে ছিন্নমূল 
বহু পরিবারে। ছিলেন ঋত্বিক আর ছিল তাঁর 
'মেঘে ঢাকা তারা'।

ঘুম ঘর